কবিতার খাতা
- 46 mins
ব্রিলিয়ান্ট ছেলেরা – শুভ দাশগুপ্ত।
ব্রিলিয়ান্ট ছেলেরা ব্রিলিয়ান্ট কেরিয়ার তৈরী করে …….
তারা প্রথমে গাঁয়ে- মফস্বলে হরিপ্রসন্ন স্কুলে গেঁয়ো বন্ধুদের সাথে লেখাপড়া শেখে ।
তারপর –
ব্রিলিয়ান্ট রেজাল্ট করে সকলকে চমকে দেয় ।
তারপর তারা উচ্চতর শিক্ষার জন্য চলে যায়
ব্যাঙ্গালোর কিংবা দিল্লী ,কিংবা পুণে
সেখানে গিয়ে তারা বড় বড় নম্বর পায় ! পজিশন পায় !
তারপর সেই নম্বর প্লেট গলায় ঝুলিয়ে
তারা মস্ত মস্ত কোম্পানীতে ভালো ভালো চাকরি পায় !
প্রচুর স্যালারি ! দামি ফ্ল্যাট ! ভালো গাড়ী !
ব্রিলিয়ান্ট ছেলেরা ….. এরপর বিদেশের বিমানে গিয়ে বসে ।
পৌঁছে যায় আমেরিকা ,জার্মানি কিংবা আবুধাবী …. অথবা সিঙ্গাপুর কিংবা কানাডা !
ব্রিলিয়ান্ট ছেলেদের , ঐ সব দেশ টপাটপ কিনে নেয় ।
ঐ সব ব্রিলিয়ান্ট দেশ ,আমাদের ব্রিলিয়ান্টদের জন্য বিলাসবহুল বাড়ি – গাড়ি
আর প্রচুর ডলারের ব্যবস্থা করে দেয় ….
সেখানে আমাদের ব্রিলিয়ান্টরা সুখে থাকে
সুখে থাকতে থাকতে ব্রিলিয়ান্ট ছেলেরা ভুলে যায় তাদের দেশ গাঁয়ের কথা ,
হরিপ্রসন্ন স্কুলের কথা —
গাঁয়ের বন্ধুদের কথা ক্রমে ভুলে যেতে থাকে !
মনে রাখতে পারে না —– খুড়তুতো , জ্যাঠতুতো সব অসফল ভাই বোনেদের কথা ।
ব্রিলিয়ান্টদের জগতে ইমোশন নেই ! প্রোমোশন আছে ।
ব্রিলিয়ান্টদের অতীত নেই ! কেবল ভবিষ্যৎ , কেবল ফিউচার ।
ছোট চেয়ার থেকে বড় চেয়ার ……নন এসি থেকে এসি ।
ব্রিলিয়ান্ট ছেলেরা বাবা- মা কে মাঝে মধ্যে টাকা পাঠায় ….অ -নে -ক টাকা !!!!
সেই টাকা হাতে পেয়ে ব্রিলিয়ান্টদের বাবার মুখে ফুটে ওঠে হাসি।
মায়ের চোখ ভরে ওঠে জলে ।
ব্রিলিয়ান্টরা এই ন্যাস্টি ইন্ডিয়াতে আর ফিরে আসতে চায় না ।
এত ভিড় ! এত ধুলোকাদা ! এত কোরাপশন !
এসবের মধ্যে তাদের গা ঘিনঘিন করে
তবু যদি কখনও আসে ……..
অনেক অনেক ফরেইন জিনিস নিয়ে আসে ।
মায়ের জন্য ইতালির চাদর , বাবার জন্য ফ্রান্সের সিগারেট .. সঙ্গে জাপানি লাইটার ,
আলো জ্বললেই যা থেকে টুং টাং করে বাজনা বেজে ওঠে ।।
ব্রিলিয়ান্টদের ব্যাপার স্যাপারই আলাদা ……..
ব্রিলিয়ান্টদের ব্রিলিয়ান্ট বানিয়ে তুলতে কেরানী বাবাকে যে কতদিন
কর্মক্লান্ত দুপুরে টিফিনে একটা চাপাকলা কিংবা
একটাকার শুকনো মুড়িতে পেট ভরিয়েছেন ……
কতকাল যে মা কোনো নতুন শাড়ী কেনাকে বিলাসিতা মনে করে ছেঁড়া শাড়ীতে দিন কাটিয়েছেন !!!
এসব তথ্য ব্রিলিয়ান্টদের ল্যাপটপে থাকেনা ।
ব্রিলিয়ান্টদের ল্যাপটপে নায়াগ্রার দূরন্ত জলোচ্ছ্বাস , কিংবা
ভিসুভিয়াসের ছবি থাকে …….
এই শ্যামল বাংলার নদী গাছ , বর্ষার মেঘ —–
এসব হাবিজাবি সেখানে ইনসার্ট করা যায় না ।
ব্রিলিয়ান্টরা সদা ব্যস্ত ! ভীষণ ব্যস্ত …… !
তারা সঙ্গীত শোনেনা , তারা গল্প বা কবিতা পড়ে সময় নষ্ট করেনা ।
তারা আকাশ দেখে না , বৃষ্টিতে তাদের মন খারাপ হয় না ।
তারা কেবল কাজ করে ,কেবল ব্যাস্ততায় ডুবে থাকে ।
বৃষ্টি নেমেছে আকাশ ভেঙ্গে …….শ্রাবণ মাস ।
মা মৃত্যুশয্যায় …..বাড়ি ভর্তি লোকজন ।
অসুস্থ বাবা বারান্দায় চেয়ারে বসে আছেন শূন্য চোখে ……
ডাক্তার জবাব দিয়ে গেছেন ….গোটা বাড়িতে অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা !
কাঁপা কাঁপা ঠোঁটে মা জিজ্ঞেস করছেন ….. খোকন এলো ? খো – ক – ন ………….!
ব্রিলিয়ান্ট খোকন তখন ফ্লাইটে …..
সবাই মা কে বোঝাচ্ছে ঐ তো ঐ তো খোকন এলো বলে !
কিন্তু সে ফ্লাইট চলে যাচ্ছে কানাডায়।
কানাডায় কোম্পানীর নতুন শাখা উদ্বোধন।
খোকন যাচ্ছে আরও বড়ো দায়িত্ব নিয়ে , আরও বেশী ডলার ……..
এখানে এই পোড়া দেশে ব্রিলিয়ান্ট খোকনের মা
ছেলের মুখ না দেখেই শেষ বারের মতো চোখ বুঁজলেন …..।।
আমরা এখন ঘরে ঘরে সবাই —— এমন ব্রিলিয়ান্ট ছেলে গড়ে তুলতেই ব্যস্ত…….।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। শুভ দাশগুপ্ত।
ব্রিলিয়ান্ট ছেলেরা – শুভ দাশগুপ্ত | আধুনিক বাংলা কবিতা | সমাজ সচেতন কবিতা
ব্রিলিয়ান্ট ছেলেরা: শুভ দাশগুপ্তের তীক্ষ্ণ সমাজ সমালোচনা ও প্রবাসী বাঙালির মর্মস্পর্শী চিত্র
শুভ দাশগুপ্তের “ব্রিলিয়ান্ট ছেলেরা” কবিতাটি বাংলা কবিতার এক অনন্য ও তীক্ষ্ণ সমাজ সমালোচনা, যা আমাদের সমাজের ‘মেধাবী’ সন্তানদের জীবনযাত্রা, তাদের সাফল্যের পেছনের গল্প এবং সেই সাফল্যের মূল্য চিহ্নিত করেছে। “ব্রিলিয়ান্ট ছেলেরা ব্রিলিয়ান্ট কেরিয়ার তৈরী করে” — এই সরল বক্তব্য দিয়ে শুরু হয়ে কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে এক মর্মান্তিক বাস্তবতা। শুভ দাশগুপ্ত বাংলা কবিতার একজন শক্তিমান কণ্ঠ, যিনি তার কবিতায় সমকালীন সমাজের নানা অসঙ্গতি, মধ্যবিত্তের জীবনসংগ্রাম ও মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়কে তুলে ধরেছেন। “ব্রিলিয়ান্ট ছেলেরা” কবিতায় তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে আমাদের ‘মেধাবী’ সন্তানেরা উচ্চশিক্ষা ও ক্যারিয়ারের নামে বিদেশে পাড়ি জমায়, সেখানে সাফল্যের চূড়ায় ওঠে, কিন্তু ক্রমে হারিয়ে ফেলে নিজের শিকড়, নিজের দেশ, নিজের মানুষকে। শেষ পর্যন্ত সেই সাফল্যের মূল্য দিতে হয় সবচেয়ে প্রিয়জনদের — মা-বাবাকে, যারা সারাজীবন সন্তানের জন্য ত্যাগ স্বীকার করে শেষ বয়সে একা হয়ে যান।
শুভ দাশগুপ্ত: সমাজ সচেতন কবির কণ্ঠ
শুভ দাশগুপ্ত বাংলা কবিতার একজন গুরুত্বপূর্ণ কবি, যিনি তার কবিতায় সমকালীন সমাজের নানা অসঙ্গতি, মধ্যবিত্তের জীবনসংগ্রাম, মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ও প্রবাসী বাঙালির মনস্তত্ত্বকে তুলে ধরেছেন। তার কবিতার ভাষা সহজ-সরল অথচ তীক্ষ্ণ, যা সরাসরি পাঠকের হৃদয়ে আঘাত করে। তিনি কোনো কাব্যিক জটিলতার আশ্রয় নেন না, বরং সরল ভাষায় গভীর বেদনা ও সত্যকে ফুটিয়ে তোলেন। “ব্রিলিয়ান্ট ছেলেরা” তার একটি বহুল পঠিত ও আলোচিত কবিতা, যা প্রবাসী বাঙালি পরিবারের এক মর্মস্পর্শী চিত্র এঁকেছে। এই কবিতায় তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে আমাদের সমাজের ‘মেধাবী’ সন্তানেরা বিদেশে গিয়ে সাফল্যের চূড়ায় ওঠে, কিন্তু ক্রমে হারিয়ে ফেলে নিজের শিকড়, নিজের দেশ, নিজের মানুষকে। শুভ দাশগুপ্তের কবিতা পাঠককে আত্মদর্শনে উদ্বুদ্ধ করে এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ করে তোলে।
ব্রিলিয়ান্ট ছেলেরা কবিতার মূল সুর ও বিষয়বস্তু
“ব্রিলিয়ান্ট ছেলেরা” কবিতার মূল বিষয়বস্তু হলো আমাদের সমাজের ‘মেধাবী’ সন্তানদের জীবনচক্র ও তার ফলাফলের তীক্ষ্ণ সমালোচনা। কবিতাটি একটি সরল বক্তব্য দিয়ে শুরু — “ব্রিলিয়ান্ট ছেলেরা ব্রিলিয়ান্ট কেরিয়ার তৈরী করে”। তারপর ধাপে ধাপে বর্ণিত হয়েছে তাদের জীবনের গল্প — গ্রাম-মফস্বলের হরিপ্রসন্ন স্কুলে গেঁয়ো বন্ধুদের সাথে লেখাপড়া শেখা, ব্রিলিয়ান্ট রেজাল্ট করে সকলকে চমকে দেওয়া, উচ্চশিক্ষার জন্য ব্যাঙ্গালোর-দিল্লী-পুনে যাওয়া, সেখানে বড় বড় নম্বর ও পজিশন পাওয়া, সেই নম্বর প্লেট গলায় ঝুলিয়ে মস্ত মস্ত কোম্পানিতে ভালো চাকরি পাওয়া, প্রচুর স্যালারি, দামি ফ্ল্যাট, ভালো গাড়ি, তারপর বিদেশের বিমানে গিয়ে বসা — আমেরিকা, জার্মানি, আবুধাবি, সিঙ্গাপুর, কানাডা। সেখানে ব্রিলিয়ান্ট দেশগুলো তাদের কিনে নেয়, বিলাসবহুল জীবন দেয়। আর তখনই শুরু হয় বিস্মৃতি — তারা ভুলে যায় তাদের দেশ, গাঁয়ের কথা, হরিপ্রসন্ন স্কুলের কথা, গাঁয়ের বন্ধুদের কথা, খুড়তুতো-জ্যাঠতুতো ভাই-বোনদের কথা। কবি বলেন — “ব্রিলিয়ান্টদের জগতে ইমোশন নেই ! প্রোমোশন আছে। ব্রিলিয়ান্টদের অতীত নেই ! কেবল ভবিষ্যৎ, কেবল ফিউচার।” তারা বাবা-মাকে টাকা পাঠায়, অনেক টাকা! সেই টাকা পেয়ে বাবার মুখে হাসি ফোটে, মায়ের চোখ জলে ভরে। কিন্তু তারা আর ফিরে আসতে চায় না এই ন্যাস্টি ইন্ডিয়াতে — ভিড়, ধুলোকাদা, কোরাপশন — এসবে তাদের গা ঘিনঘিন করে। তবু যদি কখনও আসে, নিয়ে আসে বিদেশি জিনিস — মায়ের জন্য ইতালির চাদর, বাবার জন্য ফ্রান্সের সিগারেট, জাপানি লাইটার। তারা ভুলে যায় — কেরানী বাবা কতদিন কর্মক্লান্ত দুপুরে টিফিনে একটা চাপাকলা বা একটাকার শুকনো মুড়িতে পেট ভরিয়েছেন, মা কতকাল নতুন শাড়ি কেনাকে বিলাসিতা মনে করে ছেঁড়া শাড়িতেই দিন কাটিয়েছেন। এসব তথ্য তাদের ল্যাপটপে থাকে না। তাদের ল্যাপটপে থাকে নায়াগ্রার জলোচ্ছ্বাস, ভিসুভিয়াসের ছবি — এই শ্যামল বাংলার নদী-গাছ-বর্ষার মেঘ সেখানে ইনসার্ট করা যায় না। তারা সদা ব্যস্ত — সঙ্গীত শোনে না, গল্প-কবিতা পড়ে সময় নষ্ট করে না, আকাশ দেখে না, বৃষ্টিতে মন খারাপ হয় না। শেষ অংশে আসে চূড়ান্ত বেদনা — মা মৃত্যুশয্যায়, বাবা অসুস্থ, ডাক্তার জবাব দিয়ে গেছেন, কাঁপা কাঁপা ঠোঁটে মা জিজ্ঞেস করছেন — “খোকন এলো? খো-ক-ন…!” ব্রিলিয়ান্ট খোকন তখন ফ্লাইটে, কানাডায় যাচ্ছে কোম্পানির নতুন শাখা উদ্বোধনে — আরও বড় দায়িত্ব, আরও বেশি ডলার। আর এখানে এই পোড়া দেশে ব্রিলিয়ান্ট খোকনের মা ছেলের মুখ না দেখেই শেষ বারের মতো চোখ বুজলেন। শেষ লাইনে কবি বলেন — “আমরা এখন ঘরে ঘরে সবাই —— এমন ব্রিলিয়ান্ট ছেলে গড়ে তুলতেই ব্যস্ত………”
ব্রিলিয়ান্ট ছেলেরা কবিতার শৈলীগত ও কাব্যিক বিশ্লেষণ
“ব্রিলিয়ান্ট ছেলেরা” কবিতাটির ভাষা সহজ-সরল, অথচ তীক্ষ্ণ ও ব্যঙ্গাত্মক। শুভ দাশগুপ্ত কোনো কাব্যিক জটিলতার আশ্রয় নেননি, বরং গদ্যের মতো সরল ভাষায় একটি সম্পূর্ণ জীবনকাহিনী বুনেছেন। কবিতায় বারবার ‘ব্রিলিয়ান্ট’ শব্দটির পুনরাবৃত্তি একটি ব্যঙ্গাত্মক সুর তৈরি করেছে। কবিতায় ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ চিত্রকল্প ও প্রতীকগুলো: ‘হরিপ্রসন্ন স্কুল’ — ছোট শহর বা গ্রামের সাধারণ স্কুলের প্রতীক, যেখানে মেধাবীদের যাত্রা শুরু; ‘নম্বর প্লেট গলায় ঝুলিয়ে’ — সাফল্যের শংসাপত্রকে একটি পণ্যে পরিণত করার ব্যঙ্গ; ‘বিদেশের বিমানে গিয়ে বসে’ — দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার সহজতাকে নির্দেশ করে; ‘ঐ সব দেশ টপাটপ কিনে নেয়’ — মেধাবীদের পণ্য হিসেবে দেখা, তাদেরকে কেনাবেচা করা; ‘ব্রিলিয়ান্টদের জগতে ইমোশন নেই ! প্রোমোশন আছে’ — সাফল্যের পেছনে মানবিকতার অভাব; ‘ছোট চেয়ার থেকে বড় চেয়ার ……নন এসি থেকে এসি’ — ক্যারিয়ারের ক্রমোন্নতি, কিন্তু মানবিকতার অবনতি; ‘মায়ের জন্য ইতালির চাদর , বাবার জন্য ফ্রান্সের সিগারেট’ — বিদেশি পণ্যে ভালোবাসা প্রকাশের ব্যঙ্গ; ‘ল্যাপটপে নায়াগ্রার দূরন্ত জলোচ্ছ্বাস , কিংবা ভিসুভিয়াসের ছবি’ — বিদেশের প্রতি মোহ, নিজ দেশের প্রতি উদাসীনতা; ‘এই শ্যামল বাংলার নদী গাছ , বর্ষার মেঘ —– এসব হাবিজাবি’ — নিজের সংস্কৃতি ও প্রকৃতিকে ‘হাবিজাবি’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার বেদনা; ‘খোকন এলো? খো – ক – ন ………….!’ — মায়ের শেষ আকুতি, সন্তানের মুখ দেখার শেষ ইচ্ছা; ‘ব্রিলিয়ান্ট খোকন তখন ফ্লাইটে’ — জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে অনুপস্থিতি; ‘আমরা এখন ঘরে ঘরে সবাই —— এমন ব্রিলিয়ান্ট ছেলে গড়ে তুলতেই ব্যস্ত’ — সমাজের প্রতি চূড়ান্ত ব্যঙ্গ ও আত্মসমালোচনা।
ব্রিলিয়ান্ট ছেলেরা কবিতায় ‘ব্রিলিয়ান্ট’ শব্দের ব্যঙ্গার্থ
কবিতায় ‘ব্রিলিয়ান্ট’ শব্দটি বারবার ব্যবহার করা হয়েছে, কিন্তু এটি কোনো প্রশংসাসূচক শব্দ নয়, বরং গভীর ব্যঙ্গ। ‘ব্রিলিয়ান্ট ছেলেরা’ বলতে বোঝানো হয়েছে সেই সব মেধাবী ছেলেদের যারা পড়াশোনায় ভালো, ক্যারিয়ারে সফল, কিন্তু মানবিকতায় শূন্য। কবি দেখিয়েছেন, এই ‘ব্রিলিয়ান্ট’ হওয়ার পেছনে যে ত্যাগের প্রয়োজন, তার মূল্য তারা বুঝতে পারে না। বাবা-মায়ের ত্যাগ, দেশের মাটি, নিজের সংস্কৃতি — সবকিছু তারা ভুলে যায়। ‘ব্রিলিয়ান্ট’ শব্দটি এখানে সাফল্যের বাহ্যিক চাকচিক্যকে নির্দেশ করে, কিন্তু অন্তরের শূন্যতাকে ঢেকে রাখে। কবির ভাষায় — “ব্রিলিয়ান্টদের জগতে ইমোশন নেই ! প্রোমোশন আছে। ব্রিলিয়ান্টদের অতীত নেই ! কেবল ভবিষ্যৎ, কেবল ফিউচার।” এই কয়েক লাইনে তিনি ‘ব্রিলিয়ান্ট’ হওয়ার সম্পূর্ণ অর্থ উন্মোচন করেছেন।
ব্রিলিয়ান্ট ছেলেরা কবিতায় প্রবাসী বাঙালির জীবনচিত্র
কবিতাটি প্রবাসী বাঙালির এক মর্মস্পর্শী জীবনচিত্র এঁকেছে। কবি দেখিয়েছেন কীভাবে একজন মেধাবী ছেলে গ্রাম-মফস্বল থেকে শুরু করে ধাপে ধাপে বিদেশে পৌঁছে যায়। সেখানে সে সাফল্যের চূড়ায় ওঠে — প্রচুর স্যালারি, দামি ফ্ল্যাট, ভালো গাড়ি, বিলাসবহুল জীবন। কিন্তু এই সাফল্যের পেছনে সে হারিয়ে ফেলে নিজের শিকড়। সে ভুলে যায় তার দেশ, তার গাঁয়ের কথা, তার বন্ধুদের কথা, তার আত্মীয়-স্বজনদের কথা। সে আর ফিরে আসতে চায় না এই দেশে — কারণ এখানে ভিড়, ধুলোকাদা, কোরাপশন। এসবের মধ্যে তার গা ঘিনঘিন করে। সে বাবা-মাকে টাকা পাঠায়, অনেক টাকা, কিন্তু নিজে আর ফিরে আসে না। এমনকি মায়ের মৃত্যুশয্যায় শেষবারের মতো দেখা করার সময়ও তার থাকে না — কারণ সে ব্যস্ত, আরও বড় দায়িত্ব নিয়ে কানাডায় যাচ্ছে। এই চিত্রের মধ্য দিয়ে কবি প্রবাসী বাঙালির এক করুণ বাস্তবতা তুলে ধরেছেন — সাফল্যের পেছনে ছুটতে গিয়ে তারা হারিয়ে ফেলেন জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান মুহূর্তগুলো।
ব্রিলিয়ান্ট ছেলেরা কবিতায় মধ্যবিত্ত ত্যাগের চিত্র
কবিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে রয়েছে মধ্যবিত্ত পরিবারের ত্যাগের চিত্র। কবি বলেছেন — “ব্রিলিয়ান্টদের ব্রিলিয়ান্ট বানিয়ে তুলতে কেরানী বাবাকে যে কতদিন কর্মক্লান্ত দুপুরে টিফিনে একটা চাপাকলা কিংবা একটাকার শুকনো মুড়িতে পেট ভরিয়েছেন …… কতকাল যে মা কোনো নতুন শাড়ী কেনাকে বিলাসিতা মনে করে ছেঁড়া শাড়ীতে দিন কাটিয়েছেন !!!” এই লাইনগুলোতে মধ্যবিত্ত পরিবারের ত্যাগের এক জীবন্ত চিত্র ফুটে উঠেছে। বাবা তার সন্তানকে ব্রিলিয়ান্ট বানাতে নিজের খাওয়ায় কাটছাঁট করেছেন, মা নতুন শাড়ির বদলে ছেঁড়া শাড়িতেই দিন কাটিয়েছেন। কিন্তু ব্রিলিয়ান্ট সন্তান এসব কিছুই মনে রাখে না। তার ল্যাপটপে এসব তথ্য থাকে না। এই ত্যাগের ইতিহাস তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। কবি এখানে কৃতজ্ঞতার অভাব ও স্মৃতিহীনতার তীব্র সমালোচনা করেছেন।
ব্রিলিয়ান্ট ছেলেরা কবিতায় প্রযুক্তি ও প্রকৃতির দ্বন্দ্ব
কবিতায় একটি চমৎকার দ্বন্দ্ব ফুটে উঠেছে — প্রযুক্তি ও প্রকৃতির দ্বন্দ্ব। ব্রিলিয়ান্টদের ল্যাপটপে থাকে নায়াগ্রার জলোচ্ছ্বাস, ভিসুভিয়াসের ছবি — বিদেশের বিখ্যাত স্থানের ছবি। কিন্তু এই শ্যামল বাংলার নদী-গাছ-বর্ষার মেঘ সেখানে ইনসার্ট করা যায় না। তাদের কাছে এসব ‘হাবিজাবি’। অর্থাৎ তারা নিজ দেশের প্রকৃতিকে, নিজের সংস্কৃতিকে তুচ্ছজ্ঞান করে, বিদেশের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়। এই দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে কবি দেখিয়েছেন কীভাবে প্রযুক্তি ও আধুনিকতা আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। ল্যাপটপে সব কিছু ঢোকানো যায়, কিন্তু নিজের দেশের মাটির গন্ধ, বর্ষার সোঁদা গন্ধ, নদীর কলতান — এসব কি ল্যাপটপে ইনসার্ট করা যায়? না, এগুলো অনুভব করতে হয়, বাঁচতে হয়। কিন্তু ব্রিলিয়ান্টরা এত ব্যস্ত যে তারা এসব অনুভব করার সময়ই পায় না।
ব্রিলিয়ান্ট ছেলেরা কবিতায় মায়ের মৃত্যুশয্যার চিত্র
কবিতার শেষ অংশটি সবচেয়ে মর্মস্পর্শী। “বৃষ্টি নেমেছে আকাশ ভেঙ্গে …….শ্রাবণ মাস। মা মৃত্যুশয্যায় …..বাড়ি ভর্তি লোকজন। অসুস্থ বাবা বারান্দায় চেয়ারে বসে আছেন শূন্য চোখে …… ডাক্তার জবাব দিয়ে গেছেন ….গোটা বাড়িতে অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা ! কাঁপা কাঁপা ঠোঁটে মা জিজ্ঞেস করছেন ….. খোকন এলো ? খো – ক – ন ………….!” এই দৃশ্যটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। মা মৃত্যুশয্যায়, তার শেষ ইচ্ছা সন্তানের মুখ দেখা। চারপাশে নিস্তব্ধতা, শুধু মায়ের কাঁপা কাঁপা ঠোঁটে প্রশ্ন — খোকন এলো? কিন্তু ব্রিলিয়ান্ট খোকন তখন ফ্লাইটে — কানাডায় যাচ্ছে কোম্পানির নতুন শাখা উদ্বোধনে, আরও বড় দায়িত্ব, আরও বেশি ডলারের পেছনে। আর এখানে এই পোড়া দেশে মা ছেলের মুখ না দেখেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এই একটি দৃশ্যে কবি সাফল্যের পুরো ব্যর্থতা, পুরো শূন্যতা, পুরো বেদনাকে ধারণ করেছেন।
ব্রিলিয়ান্ট ছেলেরা কবিতায় শেষ লাইনের তাৎপর্য
“আমরা এখন ঘরে ঘরে সবাই —— এমন ব্রিলিয়ান্ট ছেলে গড়ে তুলতেই ব্যস্ত………” — এই শেষ লাইনটি কবিতার সবচেয়ে তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ ও আত্মসমালোচনা। কবি বলেছেন, আমরা সবাই (অভিভাবকরা, সমাজ) এই মর্মান্তিক ঘটনা জেনেও, প্রতিদিন দেখেও, নিজেরা ঠিক একই কাজ করে যাচ্ছি — আমাদের সন্তানদের ‘ব্রিলিয়ান্ট’ করে তুলতে ব্যস্ত। আমরা চাই আমাদের সন্তান বিদেশে যাক, বড় চাকরি করুক, প্রচুর টাকা উপার্জন করুক। আমরা তাদের শেখাই ক্যারিয়ার গড়তে, কিন্তু শেখাই না মানুষ হতে, কৃতজ্ঞ হতে, নিজের শিকড়কে ভালোবাসতে। ফলে প্রতিটি ঘরেই একদিন এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে — মা-বাবা একা, সন্তান বিদেশে ব্যস্ত। এই শেষ লাইনটি একটি চোখ খুলে দেওয়ার মতো, একটি জাগরণের আহ্বান। কিন্তু আমরা কি সত্যিই জাগ্রত হব? নাকি একই পথে এগিয়ে যাব? কবি প্রশ্ন রেখে গেছেন, উত্তর আমাদের খুঁজে নিতে হবে।
ব্রিলিয়ান্ট ছেলেরা কবিতা সম্পর্কে প্রশ্নোত্তর
ব্রিলিয়ান্ট ছেলেরা কবিতার লেখক কে?
ব্রিলিয়ান্ট ছেলেরা কবিতার লেখক শুভ দাশগুপ্ত। তিনি বাংলা কবিতার একজন গুরুত্বপূর্ণ কবি, যিনি তার কবিতায় সমকালীন সমাজের নানা অসঙ্গতি, মধ্যবিত্তের জীবনসংগ্রাম, মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ও প্রবাসী বাঙালির মনস্তত্ত্বকে তুলে ধরেছেন। তার কবিতার ভাষা সহজ-সরল অথচ তীক্ষ্ণ, যা সরাসরি পাঠকের হৃদয়ে আঘাত করে। তিনি কোনো কাব্যিক জটিলতার আশ্রয় নেন না, বরং সরল ভাষায় গভীর বেদনা ও সত্যকে ফুটিয়ে তোলেন। “ব্রিলিয়ান্ট ছেলেরা” তার একটি বহুল পঠিত ও আলোচিত কবিতা, যা প্রবাসী বাঙালি পরিবারের এক মর্মস্পর্শী চিত্র এঁকেছে।
ব্রিলিয়ান্ট ছেলেরা কবিতার মূল বিষয়বস্তু কী?
ব্রিলিয়ান্ট ছেলেরা কবিতার মূল বিষয়বস্তু হলো আমাদের সমাজের ‘মেধাবী’ সন্তানদের জীবনচক্র ও তার ফলাফলের তীক্ষ্ণ সমালোচনা। কবিতায় দেখানো হয়েছে কীভাবে একজন মেধাবী ছেলে গ্রাম-মফস্বল থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা ও ক্যারিয়ারের নামে বিদেশে পাড়ি জমায়, সেখানে সাফল্যের চূড়ায় ওঠে, কিন্তু ক্রমে হারিয়ে ফেলে নিজের শিকড়, নিজের দেশ, নিজের মানুষকে। তারা বাবা-মাকে টাকা পাঠায় কিন্তু নিজে আর ফিরে আসে না। শেষ পর্যন্ত সেই সাফল্যের মূল্য দিতে হয় সবচেয়ে প্রিয়জনদের — মা-বাবাকে, যারা সারাজীবন সন্তানের জন্য ত্যাগ স্বীকার করে শেষ বয়সে একা হয়ে যান। কবিতার শেষ দৃশ্যে মা মৃত্যুশয্যায় সন্তানের মুখ দেখতে চান, কিন্তু ব্রিলিয়ান্ট সন্তান তখন বিদেশের ফ্লাইটে ব্যস্ত। শেষ লাইনে কবি বলেন — “আমরা এখন ঘরে ঘরে সবাই —— এমন ব্রিলিয়ান্ট ছেলে গড়ে তুলতেই ব্যস্ত………”
“ব্রিলিয়ান্টদের জগতে ইমোশন নেই ! প্রোমোশন আছে” — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
“ব্রিলিয়ান্টদের জগতে ইমোশন নেই ! প্রোমোশন আছে” — এই পঙ্ক্তিতে কবি মেধাবীদের জীবনযাত্রার একটি তীক্ষ্ণ সমালোচনা করেছেন। ব্রিলিয়ান্টদের পৃথিবীতে আবেগ-অনুভূতি বলে কিছু নেই, আছে শুধু ক্যারিয়ারের উন্নতি, প্রমোশন। তারা মা-বাবাকে ভালোবাসে, কিন্তু সেই ভালোবাসা প্রকাশ পায় শুধু টাকা পাঠানোর মাধ্যমে। নিজে এসে দেখা হয় না, সময় দেওয়া হয় না, শেষ মুহূর্তে পাশে থাকা হয় না। আবেগ তাদের কাছে মূল্যহীন, কারণ আবেগ ক্যারিয়ারে সাহায্য করে না, প্রমোশন দেয় না। এই একটি লাইনে কবি পুরো একটি প্রজন্মের মানসিকতা ধরে ফেলেছেন — যেখানে সাফল্যের মাপকাঠি শুধু ক্যারিয়ার, টাকা, পদ-পদবি, আর মানবিক সম্পর্কগুলো হয়ে উঠেছে গৌণ।
“ব্রিলিয়ান্টদের অতীত নেই ! কেবল ভবিষ্যৎ , কেবল ফিউচার” — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
“ব্রিলিয়ান্টদের অতীত নেই ! কেবল ভবিষ্যৎ , কেবল ফিউচার” — এই পঙ্ক্তিতে কবি মেধাবীদের আরেকটি বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন। ব্রিলিয়ান্টরা তাদের অতীত ভুলে যায় — তারা ভুলে যায় তাদের শিকড়, তাদের পরিবার, তাদের বন্ধু, তাদের ত্যাগের ইতিহাস। তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ শুধু ভবিষ্যৎ — আরও বড় চাকরি, আরও বেশি টাকা, আরও উন্নত জীবন। তারা ফিরে তাকায় না, দেখে না কে তাদের পেছনে ফেলে এসেছে। অতীত তাদের কাছে বোঝা, স্মৃতি তাদের কাছে সময় নষ্ট। এই মানসিকতার কারণেই তারা মায়ের শেষ ইচ্ছা পূরণ করতে পারে না, বাবার অসুস্থতার খোঁজ রাখে না। তারা সব সময় এগিয়ে চলেছে, কিন্তু পেছনে ফেলে আসছে সবচেয়ে মূল্যবান মানুষগুলোকে।
“এই শ্যামল বাংলার নদী গাছ , বর্ষার মেঘ —– এসব হাবিজাবি সেখানে ইনসার্ট করা যায় না” — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
“এই শ্যামল বাংলার নদী গাছ , বর্ষার মেঘ —– এসব হাবিজাবি সেখানে ইনসার্ট করা যায় না” — এই পঙ্ক্তিতে কবি ব্রিলিয়ান্টদের নিজ সংস্কৃতি ও প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার বেদনা প্রকাশ করেছেন। ব্রিলিয়ান্টদের ল্যাপটপে থাকে নায়াগ্রার জলোচ্ছ্বাস, ভিসুভিয়াসের ছবি — বিদেশের বিখ্যাত স্থানের ছবি। কিন্তু নিজের দেশের শ্যামল বাংলার নদী-গাছ-বর্ষার মেঘ সেখানে ইনসার্ট করা যায় না। তারা এসবকে ‘হাবিজাবি’ বলে উড়িয়ে দেয়। অর্থাৎ তারা নিজ দেশের প্রকৃতিকে, নিজের সংস্কৃতিকে তুচ্ছজ্ঞান করে, বিদেশের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়। এই বিচ্ছিন্নতা তাদের মানসিকতাকে আরও দুর্বল করে, তাদের শিকড় থেকে উপড়ে ফেলে।
“মা মৃত্যুশয্যায় ….. কাঁপা কাঁপা ঠোঁটে মা জিজ্ঞেস করছেন ….. খোকন এলো ? খো – ক – ন ………….!” — এই দৃশ্যের তাৎপর্য কী?
“মা মৃত্যুশয্যায় ….. কাঁপা কাঁপা ঠোঁটে মা জিজ্ঞেস করছেন ….. খোকন এলো ? খো – ক – ন ………….!” — এই দৃশ্যটি কবিতার সবচেয়ে মর্মস্পর্শী ও শক্তিশালী অংশ। মা মৃত্যুশয্যায়, তার শেষ ইচ্ছা সন্তানের মুখ দেখা। কাঁপা কাঁপা ঠোঁটে তিনি বারবার প্রশ্ন করছেন — খোকন এলো? এই একটি প্রশ্নের মধ্যে মায়ের সারাজীবনের ত্যাগ, ভালোবাসা, আকাঙ্ক্ষা ধরা আছে। কিন্তু ব্রিলিয়ান্ট খোকন তখন ফ্লাইটে — কানাডায় যাচ্ছে কোম্পানির নতুন শাখা উদ্বোধনে, আরও বড় দায়িত্ব, আরও বেশি ডলারের পেছনে। আর এখানে এই পোড়া দেশে মা ছেলের মুখ না দেখেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এই দৃশ্যের মধ্য দিয়ে কবি দেখিয়েছেন সাফল্যের পুরো ব্যর্থতা, পুরো শূন্যতা, পুরো বেদনা। সাফল্যের চূড়ায় ওঠার পেছনে কত মূল্য দিতে হয়, তা এই একটি দৃশ্যে ফুটে উঠেছে।
“আমরা এখন ঘরে ঘরে সবাই —— এমন ব্রিলিয়ান্ট ছেলে গড়ে তুলতেই ব্যস্ত………” — এই শেষ লাইনের তাৎপর্য কী?
“আমরা এখন ঘরে ঘরে সবাই —— এমন ব্রিলিয়ান্ট ছেলে গড়ে তুলতেই ব্যস্ত………” — এই শেষ লাইনটি কবিতার সবচেয়ে তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ ও আত্মসমালোচনা। কবি বলেছেন, আমরা সবাই (অভিভাবকরা, সমাজ) এই মর্মান্তিক ঘটনা জেনেও, প্রতিদিন দেখেও, নিজেরা ঠিক একই কাজ করে যাচ্ছি — আমাদের সন্তানদের ‘ব্রিলিয়ান্ট’ করে তুলতে ব্যস্ত। আমরা চাই আমাদের সন্তান বিদেশে যাক, বড় চাকরি করুক, প্রচুর টাকা উপার্জন করুক। আমরা তাদের শেখাই ক্যারিয়ার গড়তে, কিন্তু শেখাই না মানুষ হতে, কৃতজ্ঞ হতে, নিজের শিকড়কে ভালোবাসতে। ফলে প্রতিটি ঘরেই একদিন এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে — মা-বাবা একা, সন্তান বিদেশে ব্যস্ত। এই শেষ লাইনটি একটি চোখ খুলে দেওয়ার মতো, একটি জাগরণের আহ্বান। কিন্তু আমরা কি সত্যিই জাগ্রত হব? নাকি একই পথে এগিয়ে যাব? কবি প্রশ্ন রেখে গেছেন, উত্তর আমাদের খুঁজে নিতে হবে।
শুভ দাশগুপ্ত সম্পর্কে সংক্ষেপে বলুন।
শুভ দাশগুপ্ত বাংলা কবিতার একজন গুরুত্বপূর্ণ কবি, যিনি তার কবিতায় সমকালীন সমাজের নানা অসঙ্গতি, মধ্যবিত্তের জীবনসংগ্রাম, মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ও প্রবাসী বাঙালির মনস্তত্ত্বকে তুলে ধরেছেন। তার কবিতার ভাষা সহজ-সরল অথচ তীক্ষ্ণ, যা সরাসরি পাঠকের হৃদয়ে আঘাত করে। তিনি কোনো কাব্যিক জটিলতার আশ্রয় নেন না, বরং সরল ভাষায় গভীর বেদনা ও সত্যকে ফুটিয়ে তোলেন। “ব্রিলিয়ান্ট ছেলেরা” তার একটি বহুল পঠিত ও আলোচিত কবিতা, যা প্রবাসী বাঙালি পরিবারের এক মর্মস্পর্শী চিত্র এঁকেছে। এই কবিতায় তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে আমাদের সমাজের ‘মেধাবী’ সন্তানেরা বিদেশে গিয়ে সাফল্যের চূড়ায় ওঠে, কিন্তু ক্রমে হারিয়ে ফেলে নিজের শিকড়, নিজের দেশ, নিজের মানুষকে।
ব্রিলিয়ান্ট ছেলেরা কবিতাটি আধুনিক পাঠকের জন্য কীভাবে প্রাসঙ্গিক?
“ব্রিলিয়ান্ট ছেলেরা” কবিতাটি আজকের আধুনিক পাঠকের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক: প্রথমত, এটি প্রবাসী বাঙালি পরিবারের এক মর্মস্পর্শী বাস্তবচিত্র তুলে ধরে। দ্বিতীয়ত, এটি আমাদের সন্তানদের ‘ব্রিলিয়ান্ট’ বানানোর পেছনে কী মূল্য দিতে হয়, তা স্মরণ করিয়ে দেয়। তৃতীয়ত, এটি ক্যারিয়ার ও মানবিকতার মধ্যে ভারসাম্যের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে সাহায্য করে। চতুর্থত, এটি মধ্যবিত্ত পরিবারের ত্যাগের ইতিহাসকে সম্মান করতে শেখায়। পঞ্চমত, এটি নিজের শিকড়, নিজের সংস্কৃতি, নিজের দেশকে ভালোবাসার গুরুত্ব বোঝায়। ষষ্ঠত, এটি মা-বাবার প্রতি কৃতজ্ঞতা ও দায়িত্ববোধের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। সপ্তমত, এটি একটি জাগরণের আহ্বান — আমরা কি আমাদের সন্তানদের শুধু ‘ব্রিলিয়ান্ট’ বানাবো, নাকি ভালো মানুষও বানাবো? অষ্টমত, এটি সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার কথা বলে।
এই কবিতার অন্যতম সেরা লাইন কোনটি এবং কেন?
এই কবিতার অন্যতম সেরা লাইন: “ব্রিলিয়ান্টদের জগতে ইমোশন নেই ! প্রোমোশন আছে” অথবা “আমরা এখন ঘরে ঘরে সবাই —— এমন ব্রিলিয়ান্ট ছেলে গড়ে তুলতেই ব্যস্ত………” — এই দুই লাইনের মধ্যে যেকোনো একটি সেরা বলা যায়। প্রথম লাইনটি সেরা হওয়ার কারণ: এটি একটি পুরো প্রজন্মের মানসিকতা মাত্র দুটি শব্দে ধরে ফেলেছে — ইমোশন বনাম প্রোমোশন। দ্বিতীয় লাইনটি সেরা হওয়ার কারণ: এটি সম্পূর্ণ কবিতার সারমর্ম ও আত্মসমালোচনাকে ধারণ করে, একটি জাগরণের আহ্বান জানায়। তবে শেষ লাইনটির তীব্রতা ও ব্যঙ্গার্থ একে আরও শক্তিশালী করে তুলেছে — “আমরা এখন ঘরে ঘরে সবাই —— এমন ব্রিলিয়ান্ট ছেলে গড়ে তুলতেই ব্যস্ত………” এই লাইনটি পড়ে প্রতিটি অভিভাবকের আত্মদর্শন করা উচিত।
ট্যাগস: ব্রিলিয়ান্ট ছেলেরা, শুভ দাশগুপ্ত, শুভ দাশগুপ্তের কবিতা, বাংলা কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, সমাজ সচেতন কবিতা, প্রবাসী বাঙালির কবিতা, মধ্যবিত্তের কবিতা, মা-বাবার ত্যাগ, ক্যারিয়ার বনাম আবেগ, বিদেশপলায়ন, মেধাবী সন্তান, সামাজিক সমালোচনা






