যেতে নাহি দিব কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর | বাংলা কবিতা বিশ্লেষণ
যেতে নাহি দিব কবিতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ বিশ্লেষণ
যেতে নাহি দিব কবিতা বাংলা সাহিত্যের একটি চিরন্তন, হৃদয়স্পর্শী ও গভীর মানবিক আবেগময় রচনা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত এই কবিতাটি একটি সরল কিন্তু গভীর পারিবারিক বিদায়ের দৃশ্যকে কেন্দ্র করে মানব জীবনের মৌলিক দ্বন্দ্ব – প্রেমের আকাঙ্ক্ষা ও বিচ্ছেদের বাস্তবতা, শিশুর সরল আবেগ ও প্রাপ্তবয়স্কের দায়িত্বের মধ্যে সংঘাত, এবং সার্বজনীন মাতৃ-স্নেহের চিরন্তন আকুতি চিত্রিত করেছে। “দুয়ারে প্রস্তুত গাড়ি; বেলা দ্বিপ্রহর; হেমন্তের রৌদ্র ক্রমে হতেছে প্রখর” – এই প্রাকৃতিক ও পারিবারিক দৃশ্যের বর্ণনা দিয়ে শুরু হওয়া যেতে নাহি দিব কবিতা পাঠককে একদিকে গৃহস্থালির ব্যস্ততা ও অন্যদিকে হৃদয়ের গভীর ব্যথার মধ্যে নিয়ে যায়। যেতে নাহি দিব কবিতা পড়লে মনে হয় যেন কবি শুধু কবিতা লিখেননি, সমগ্র মানবজাতির এক সার্বজনীন অভিজ্ঞতা ও আবেগকে শব্দ দান করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যেতে নাহি দিব কবিতা বাংলা সাহিত্যে পারিবারিক কবিতা, মানবিক আবেগের কবিতা ও শিশু-মনের কবিতার ধারায় একটি অমর সৃষ্টি হিসেবে স্বীকৃত।
যেতে নাহি দিব কবিতার কাব্যিক বৈশিষ্ট্য
যেতে নাহি দিব কবিতা একটি আখ্যানধর্মী, চিত্রময় ও দার্শনিক গভীরতায় রচিত মহাকাব্যিক কবিতা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই কবিতায় সামান্য পারিবারিক দৃশ্যকে মহাবিশ্বের সার্বজনীন সত্যে রূপান্তরিত করেছেন, শিশুর সরল উক্তিকে চিরন্তন মানবিক আকুতিতে পরিণত করেছেন এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে সার্বজনীন দার্শনিক সত্যে উন্নীত করেছেন। “মাগো, আসি,” সে কহিল বিষণ্ণ নয়ন ম্লান মুখে ‘যেতে আমি দিব না তোমায়!'” – যেতে নাহি দিব কবিতাতে এই পংক্তির মাধ্যমে কবি একটি শিশুর সরল কিন্তু গভীর আবেগকে এমন বিশ্বজনীন রূপ দিয়েছেন যা সমগ্র কবিতার মূল বক্তব্যে পরিণত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যেতে নাহি দিব কবিতাতে ভাষা অত্যন্ত চিত্রময়, সংগীতময় ও আবেগময়, সরল কিন্তু গভীর দার্শনিক অর্থবহ। যেতে নাহি দিব কবিতা পড়ার সময় প্রতিটি স্তবকে ব্যক্তিগত ও সার্বজনীনের মিশ্রণ, শিশু ও মহাবিশ্বের সংযোগ এবং ক্ষুদ্র ও বৃহতের একত্বের নতুন মাত্রার উন্মোচন দেখা যায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যেতে নাহি দিব কবিতা বাংলা কবিতার মানবিক আবেগ, দার্শনিক গভীরতা ও শৈল্পিক সৌন্দর্যের অনন্য প্রকাশ।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার বৈশিষ্ট্য
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি, দার্শনিক ও শিল্পী যিনি তাঁর সর্বজনীনতা, গভীর মানবিকতা, শৈল্পিক সৌন্দর্য ও দার্শনিক প্রজ্ঞার জন্য বিশ্বসাহিত্যে অমর হয়ে আছেন। তাঁর কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে সার্বজনীন সত্যে রূপান্তর, মানবিক আবেগের গভীর চিত্রণ, প্রকৃতির সাথে মানুষের আত্মিক সংযোগ, ভাষার সংগীতময়তা এবং জীবনের জটিল প্রশ্নের সৌন্দর্যময় উত্তর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যেতে নাহি দিব কবিতা এই সকল গুণের পূর্ণ ও পরিপূর্ণ প্রকাশ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতায় শিশুর সরল উক্তি বিশ্বের চিরন্তন বাণী হয়ে ওঠে, গৃহস্থালির দৃশ্য মহাবিশ্বের প্রতিচ্ছবি হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যেতে নাহি দিব কবিতাতে পারিবারিক বিদায়ের এই কাব্যিক রূপায়ণ অসাধারণ দক্ষতা, গভীরতা ও সূক্ষ্মতায় অঙ্কিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বমর্যাদা দান করেছে।
যেতে নাহি দিব কবিতা সম্পর্কে প্রশ্নোত্তর
যেতে নাহি দিব কবিতার লেখক কে?
যেতে নাহি দিব কবিতার লেখক বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
যেতে নাহি দিব কবিতার মূল বিষয় কী?
যেতে নাহি দিব কবিতার মূল বিষয় পারিবারিক বিদায়, শিশুর সরল আবেগের মাধ্যমে প্রকাশিত প্রেমের চিরন্তন আকুতি, বিচ্ছেদের অনিবার্যতা ও মানব জীবনের মৌলিক দ্বন্দ্ব, এবং স্নেহ-প্রেমের সার্বজনীন অভিব্যক্তি।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কে?
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিক, শিল্পী ও শিক্ষাবিদ যিনি নোবেল পুরস্কার প্রাপ্ত প্রথম এশীয় হিসাবে বিশ্বসাহিত্যে অমর হয়ে আছেন।
যেতে নাহি দিব কবিতা কেন বিশেষ?
যেতে নাহি দিব কবিতা বিশেষ কারণ এটি একটি শিশুর সরল উক্তি “যেতে আমি দিব না তোমায়!” কে মহাবিশ্বের চিরন্তন বাণীতে রূপান্তরিত করেছে, পারিবারিক একটি দৃশ্যকে মানবজাতির সার্বজনীন অভিজ্ঞতায় পরিণত করেছে এবং প্রেম ও বিচ্ছেদের চিরন্তন দ্বন্দ্বকে অসাধারণ শৈল্পিক রূপ দিয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার বৈশিষ্ট্য কী?
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার বৈশিষ্ট্য হলো সর্বজনীনতা, গভীর মানবিকতা, দার্শনিক প্রজ্ঞা, শৈল্পিক সৌন্দর্য, ভাষার সংগীতময়তা, প্রকৃতির সাথে আত্মিক সংযোগ এবং জীবনের গভীর সত্যের কাব্যিক প্রকাশ।
যেতে নাহি দিব কবিতা কোন কাব্যগ্রন্থের অংশ?
যেতে নাহি দিব কবিতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “সোনার তরী” বা “মানসী” কাব্যগ্রন্থের অংশ, যা তাঁর পরিপক্ব কাব্যচর্চার একটি উল্লেখযোগ্য সংকলন।
যেতে নাহি দিব কবিতা থেকে কী শিক্ষা পাওয়া যায়?
যেতে নাহি দিব কবিতা থেকে প্রেমের সার্বজনীনতা, মানবিক আবেগের গভীরতা, জীবনের অনিবার্য বিচ্ছেদের স্বীকৃতি, শিশু মনের পবিত্রতা এবং স্নেহ-মমতার চিরন্তন মূল্য সম্পর্কে শিক্ষা ও উপলব্ধি পাওয়া যায়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অন্যান্য বিখ্যাত কবিতা কী কী?
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অন্যান্য বিখ্যাত কবিতার মধ্যে রয়েছে “সোনার তরী”, “চিত্রা”, “বলাকা”, “গীতাঞ্জলি”, “বিচিত্রা”, “কল্পনা”, “ক্ষণিকা”, “নৈবেদ্য” প্রভৃতি অমর কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
যেতে নাহি দিব কবিতা পড়ার সেরা সময় কখন?
যেতে নাহি দিব কবিতা পড়ার সেরা সময় হলো যখন পারিবারিক বন্ধন, মানবিক সম্পর্ক, প্রেম-বিচ্ছেদের দ্বন্দ্ব এবং জীবনের গভীর আবেগ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার ইচ্ছা থাকে।
যেতে নাহি দিব কবিতা আধুনিক প্রেক্ষাপটে কতটা প্রাসঙ্গিক?
যেতে নাহি দিব কবিতা আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও প্রয়োজনীয়, কারণ প্রেম, বিচ্ছেদ, পারিবারিক বন্ধন এবং মানবিক আবেগের চিরন্তন বিষয়গুলি সকল যুগে, সকল সমাজে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ।
যেতে নাহি দিব কবিতার গুরুত্বপূর্ণ লাইন বিশ্লেষণ
“দুয়ারে প্রস্তুত গাড়ি; বেলা দ্বিপ্রহর; হেমন্তের রৌদ্র ক্রমে হতেছে প্রখর” – কবিতার শুরুতে বিদায়ের প্রস্তুতি, সময় ও প্রকৃতির চিত্রায়ণ যা সমগ্র কবিতার মর্মবেদনার পটভূমি তৈরি করে।
“শুধু মোর ঘরে নাহি বিশ্রামের ঘুম” – বাহ্যিক শান্তির বিপরীতে অন্তরের অশান্তি ও ব্যথার ইঙ্গিত।
“গিয়েছে আশ্বিন,—পূজার ছুটির শেষে ফিরে যেতে হবে আজি বহু দূর দেশে সেই কর্মস্থানে” – সময়, কর্তব্য ও দূরত্বের বাস্তবতার উল্লেখ।
“ঘরের গৃহিণী, চক্ষু ছলছল করে, ব্যথিছে বক্ষের কাছে পাষাণের ভার” – স্ত্রীর মৌন বেদনা ও আবেগের গভীর চিত্রণ।
“সে কথায় কর্ণপাত নাহি করে কোন জন” – আবেগের চেয়ে ব্যবহারিকতার প্রাধান্যের বর্ণনা।
“তবে আসি” অমনি ফিরায়ে মুখখানি নতশিরে চক্ষুপরে বস্ত্রাঞ্চল টানি অমঙ্গল অশ্রুজল করিল গোপন” – বিদায়ের মুহূর্তে স্ত্রীর মৌন কান্নার মর্মস্পর্শী চিত্র।
“যেতে আমি দিব না তোমায়!” – কবিতার কেন্দ্রীয়, চিরস্মরণীয় ও সার্বজনীন বাণী যা একটি শিশুর মুখে বিশ্বের চিরন্তন আকুতি হয়ে ধ্বনিত।
“কে রে তুই, কোথা হতে কি শকতি পেয়ে কহিলি এমন কথা” – শিশুর সরল উক্তির গভীরতা নিয়ে কবির বিস্ময় ও প্রশ্ন।
“শুধু লয়ে ওইটুকু বুকভরা স্নেহ!” – শিশুর একমাত্র অস্ত্র ও শক্তির উৎস হিসেবে স্নেহের স্বীকৃতি।
“সব চেয়ে পুরাতন কথা, সব চেয়ে গভীর ক্রন্দন ‘যেতে নাহি দিব।'” – শিশুর উক্তিকে বিশ্বের চিরন্তন বাণী হিসেবে চিহ্নিতকরণ।
“হায়, তবু যেতে দিতে হয়, তবু চলে যায়!” – জীবনের অনিবার্য বিচ্ছেদ ও নিয়তির স্বীকৃতি।
“সম্মুখ উর্মিরে ডাকে পশ্চাতের ঢেউ ‘দিবনা দিবনা যেতে’-নাহি শুনে কেউ” – বিশ্বব্যাপী এই আকুতির ধ্বনি ও তার নিরুত্তর থাকার চিত্র।
“তবু প্রেম কিছুতে না মানে পরাভব” – পরাজয় সত্ত্বেও প্রেমের অপরাজেয়তার ঘোষণা।
“মৃত্যু তুমি নাই।”—হেন গর্ব্বকথা! মৃত্যু হাসে বসি!” – প্রেমের গর্ব ও মৃত্যুর বাস্তবতার দ্বন্দ্ব।
“দেখিলাম তাঁর সেই ম্লান মুখখানি সেই দ্বারপ্রান্তে লীন, স্তব্ধ মর্ম্মাহত মোর চারি বৎসরের কন্যাটির মত” – কবিতার সমাপ্তিতে পৃথিবী মাতা ও শিশুকন্যার একাত্মতা চিত্রণ।
যেতে নাহি দিব কবিতার দার্শনিক, মানবিক ও সার্বজনীন তাৎপর্য
যেতে নাহি দিব কবিতা শুধু একটি কবিতা নয়, এটি মানবজাতির এক চিরন্তন, সার্বজনীন ও গভীর দার্শনিক অভিব্যক্তির দলিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই কবিতায় পাঁচটি মৌলিক দার্শনিক সত্য উপস্থাপন করেছেন: ১) প্রেমের চিরন্তন আকুতি ও বিচ্ছেদের অনিবার্য বাস্তবতার দ্বন্দ্ব, ২) শিশুর সরল উক্তি ও মহাবিশ্বের গভীর সত্যের মধ্যে সম্পর্ক, ৩) ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মাধ্যমে সার্বজনীন সত্যের প্রকাশ, ৪) স্নেহ-প্রেমের অপরাজেয় আকাঙ্ক্ষা ও জীবন-মৃত্যুর সীমাবদ্ধতার মধ্যে সংঘাত, ৫) মানবিক আবেগের চিরন্তনতা ও তার বিশ্বব্যাপী ধ্বনি। যেতে নাহি দিব কবিতা পড়লে বোঝা যায় যে রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে একটি শিশুর “যেতে আমি দিব না তোমায়!” এই সরল উক্তি শুধু পারিবারিক আবেগ নয়, এটি সমগ্র সৃষ্টির, প্রকৃতির, পৃথিবী মাতার এমনকি স্বয়ং সৃষ্টিকর্তার আকুতি। কবিতায় “দুয়ারে প্রস্তুত গাড়ি” শুধু একটি যানবাহন নয়, এটি জীবনযাত্রা, কর্তব্য, সময় ও নিয়তির প্রতীক। “চারি বৎসরের কন্যা” শুধু একটি শিশু নয়, তিনি মানবাত্মার প্রতীক, নির্দোষ আবেগের মূর্তি, প্রেমের অকৃত্রিম প্রকাশ। কবির বিস্ময় “কে রে তুই, কোথা হতে কি শকতি পেয়ে” শুধু শিশুকে নয়, প্রেমের অলৌকিক শক্তিকে নির্দেশ করে। কবিতার কেন্দ্রীয় বাণী “যেতে নাহি দিব” ক্রমে সম্প্রসারিত হয়ে প্রকৃতির মর্মরধ্বনিতে, পৃথিবীর আকুতিতে, মহাবিশ্বের ধ্বনিতে পরিণত হয়। সবচেয়ে গভীর সত্য প্রকাশিত হয় যখন কবি বলেন “সব চেয়ে পুরাতন কথা, সব চেয়ে গভীর ক্রন্দন ‘যেতে নাহি দিব।'” এখানে তিনি ইঙ্গিত দেন যে এই আকুতি সৃষ্টির শুরু থেকেই বিদ্যমান, সকল জীবের, সকল প্রেমিকের, সকল মাতার। কিন্তু এই আকুতির বিপরীতে আরেকটি কঠোর সত্য “তবু যেতে দিতে হয়, তবু চলে যায়!” – এখানে জীবনের অনিবার্য বিচ্ছেদ, সময়ের প্রবাহ ও নিয়তির শক্তি স্বীকৃত। কবিতার শেষে পৃথিবী মাতা ও শিশুকন্যার একাত্মতা চিত্রিত করে রবীন্দ্রনাথ দেখান যে এই আকুতি ব্যক্তিগত নয়, এটি বিশ্বজনীন, এটি পৃথিবীর নিজের আকুতি, প্রকৃতির নিজের বেদনা। যেতে নাহি দিব কবিতাতে মানবিক আবেগ, দার্শনিক সত্য ও শৈল্পিক সৌন্দর্যের এই অসাধারণ সমন্বয় ফুটে উঠেছে।
যেতে নাহি দিব কবিতায় প্রতীক, রূপক ও প্রকৃতির ব্যবহার
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যেতে নাহি দিব কবিতাতে বিভিন্ন শক্তিশালী প্রতীক, গভীর রূপক ও জীবন্ত প্রকৃতিচিত্র ব্যবহৃত হয়েছে। “গাড়ি” জীবনযাত্রা, কর্তব্য, যাত্রা ও নিয়তির প্রতীক। “হেমন্তের রৌদ্র” পরিণত বয়স, পক্কতা ও তাপের প্রতীক। “অশত্থের ছায়া” আশ্রয়, শান্তি ও বিশ্রামের প্রতীক। “ভিখারিণী” সামাজিক দারিদ্র্য, পরনির্ভরশীলতা ও ক্লান্তির প্রতীক। “পূজার ছুটি” আনন্দ, একত্রতা ও উৎসবের প্রতীক। “পাষাণের ভার” মৌন বেদনা, দায়িত্ব ও আবেগের ভার প্রতীক। “বুকভরা স্নেহ” শিশুর একমাত্র শক্তি, প্রেমের সম্পদ ও মানবিক মূল্যবোধের প্রতীক। “শরতের শস্যক্ষেত্র” পরিপক্বতা, ফলন ও জীবনচক্রের প্রতীক। “তরুশ্রেণী” প্রকৃতির নিরব সাক্ষী, সময়ের পর্যবেক্ষক প্রতীক। “ভরা গঙ্গা” জীবনপ্রবাহ, সময়স্রোত ও নিয়তির প্রতীক। “শুভ্র খণ্ডমেঘ” স্বপ্ন, নিষ্পাপতা ও সৌন্দর্যের প্রতীক। “মাতৃদুগ্ধ-পরিতৃপ্ত গোবৎস” তৃপ্তি, নিরাপত্তা ও নির্ভরতার প্রতীক। “ধরণী” পৃথিবী মাতা, সকলের আশ্রয়দাত্রী ও প্রেমের উৎস প্রতীক। “প্রলয়-সমুদ্র” সময়, পরিবর্তন ও ধ্বংসের প্রতীক। “দুই খানি অবোধ বাহু” মানবাত্মার আকুতি, ব্যর্থ আবেশ ও অনন্ত আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। এই সকল প্রতীক, রূপক ও প্রকৃতিচিত্র যেতে নাহি দিব কবিতাকে একটি সরল আখ্যানধর্মী কবিতার স্তর অতিক্রম করে গভীর দার্শনিক, মানবিক ও সার্বজনীন অর্থময়তা দান করেছে।
যেতে নাহি দিব কবিতা পড়ার সঠিক পদ্ধতি ও গভীর বিশ্লেষণ
- যেতে নাহি দিব কবিতা প্রথমে সম্পূর্ণভাবে, ধীরে ধীরে ও গভীর মনোযোগ সহকারে একবার পড়ুন
- কবিতার আখ্যানধর্মী কাঠামো (বিদায়ের দৃশ্য) ও তার দার্শনিক প্রসারণের মধ্যে সম্পর্ক বুঝুন
- কবিতার কেন্দ্রীয় বাণী “যেতে নাহি দিব” এর ক্রমিক বিকাশ ও বিশ্বজনীনীকরণ পর্যবেক্ষণ করুন
- প্রতিটি চরিত্রের (কবি, স্ত্রী, কন্যা) ভূমিকা ও তাদের মাধ্যমে প্রকাশিত আবেগ বিশ্লেষণ করুন
- কবিতার প্রতীকী অর্থ, রূপক ব্যবহার ও প্রকৃতির ভূমিকার গভীরতা বুঝতে সচেষ্ট হন
- ব্যক্তিগত পারিবারিক দৃশ্য ও তার সার্বজনীন দার্শনিক তাৎপর্যের মধ্যে সংযোগ অনুসন্ধান করুন
- প্রেম, বিচ্ছেদ, কর্তব্য ও আবেগের দ্বন্দ্ব সম্পর্কে নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে কবিতার বিষয়বস্তুর তাৎপর্য অনুসন্ধান করুন
- কবিতার চূড়ান্ত বক্তব্য – পৃথিবী মাতা ও শিশুকন্যার একাত্মতা – এর গভীর দার্শনিক, মানবিক ও সার্বজনীন তাৎপর্য চিন্তা করুন
- রবীন্দ্রনাথের অন্যান্য কবিতা ও দর্শনের সাথে এই কবিতার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করুন
- কবিতাটি নিয়ে অন্যদের সাথে গভীর, উন্মুক্ত ও সমৃদ্ধ আলোচনা, বিতর্ক ও চিন্তা বিনিময় করুন
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কবিতা ও কাব্যগ্রন্থ
- গীতাঞ্জলি (নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত কাব্য)
- সোনার তরী
- মানসী
- চিত্রা
- বলাকা
- কল্পনা
- ক্ষণিকা
- নৈবেদ্য
- খেয়া
- বনফুল
- পলাতকা
- পুনশ্চ
- শেষ লিখা
- পত্রপুট
- জন্মদিন
যেতে নাহি দিব কবিতা নিয়ে শেষ কথা ও সারসংক্ষেপ
যেতে নাহি দিব কবিতা বাংলা সাহিত্যের একটি চিরন্তন, অমর ও হৃদয়স্পর্শী রচনা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত এই কবিতাটি পারিবারিক কবিতা, মানবিক আবেগের কবিতা, শিশু-মনস্তত্ত্বের কবিতা ও দার্শনিক কবিতার ইতিহাসে একটি স্বর্ণাক্ষরে লিখিত, অনন্য ও মর্যাদাপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। যেতে নাহি দিব কবিতা পড়লে পাঠক বুঝতে পারেন কিভাবে কবিতা শুধু শিল্প, সৌন্দর্য বা আবেগ নয়, মানবজাতির চিরন্তন বেদনা, সার্বজনীন আকুতি ও গভীর দার্শনিক সত্যের অনন্য অভিব্যক্তিও হতে পারে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যেতে নাহি দিব কবিতা বিশেষভাবে সকল যুগের, সকল সমাজের, সকল মানুষের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রেম, বিচ্ছেদ, পারিবারিক বন্ধন, মানবিক আবেগ ও জীবনের মৌলিক দ্বন্দ্বগুলি চিরকালীন, সার্বজনীন ও মৌলিক মানবিক অভিজ্ঞতা। এই কবিতার মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ একটি শিশুর সরল উক্তিকে বিশ্বের চিরন্তন বাণীতে রূপান্তরিত করেছেন, পারিবারিক একটি দৃশ্যকে মহাবিশ্বের প্রতিচ্ছবিতে পরিণত করেছেন এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে সার্বজনীন সত্যে উন্নীত করেছেন। যেতে নাহি দিব কবিতা সকলের পড়া, বুঝা, চিন্তা করা, অনুভব করা ও আলোচনা করা উচিত যারা কবিতার মাধ্যমে মানবিক আবেগ, জীবনদর্শন, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং শিল্প-সৌন্দর্যের গভীর, সূক্ষ্ম, জটিল ও সমৃদ্ধ দিকগুলি অন্বেষণ করতে চান। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যেতে নাহি দিব কবিতা timeless, চিরন্তন, সর্বজনীন, অমর, এর আবেদন, বার্তা ও মূল্য চিরস্থায়ী, চিরন্তন, অনন্ত।
ট্যাগস: যেতে নাহি দিব কবিতা, যেতে নাহি দিব কবিতা বিশ্লেষণ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, বাংলা পারিবারিক কবিতা, মানবিক আবেগের কবিতা, শিশু কবিতা, দার্শনিক কবিতা, সোনার তরী, বাংলা সাহিত্য, বিশ্বকবি, নোবেল পুরস্কার, প্রেম ও বিচ্ছেদের কবিতা, সার্বজনীন কবিতা
দুয়ারে প্রস্তুত গাড়ি; বেলা দ্বিপ্রহর;
হেমন্তের রৌদ্র ক্রমে হতেছে প্রখর;
জনশূন্য পল্লিপথে ধূলি উড়ে যায়
মধ্যাহ্ন বাতাসে; স্নিগ্ধ অশত্থের ছায়
ক্লান্ত বৃদ্ধা ভিখারিণী জীর্ণ বস্ত্র পাতি’
ঘুমায়ে পড়েছে; যেন রৌদ্রময়ী বাতি
ঝাঁ ঝাঁ করে চারিদিকে নিস্তব্ধ নিঃঝুম;—
শুধু মোর ঘরে নাহি বিশ্রামের ঘুম।
গিয়েছে আশ্বিন,—পূজার ছুটির শেষে
ফিরে যেতে হবে আজি বহু দূর দেশে
সেই কর্ম্মস্থানে। ভৃত্যগণ ব্যস্ত হয়ে
বাঁধিছে জিনিষপত্র দড়াদড়ি লয়ে,
হাঁকাহাঁকি ডাকাডাকি এঘরে ওঘরে।
ঘরের গৃহিণী, চক্ষু ছলছল করে,
ব্যথিছে বক্ষের কাছে পাষাণের ভার,
তবুও সময় তার নাহি কাঁদিবার
একদণ্ড তরে; বিদায়ের আয়োজনে
ব্যস্ত হয়ে ফিরে; যথেষ্ট না হয় মনে
যত বাড়ে বোঝা আমি বলি, “এ কি কাণ্ড!
এত ঘট এত পট হাঁড়ি সরা ভাণ্ড
বোতল বিছানা বাক্স রাজ্যের বোঝাই
কি করিব, লয়ে! কিছু এর রেখে যাই
কিছু লই সাথে!”
সে কথায় কর্ণপাত
নাহি করে কোন জন। “কি জানি দৈবাৎ
এটা ওটা আবশ্যক যদি হয় শেষে
তখন কোথায় পাবে বিঁভুই বিদেশে!-
সোনা-মুগ সরুচাল সুপারি ও পান;
ও হাঁড়িতে ঢাকা আছে দুই চারি খান
গুড়ের পাটালি; কিছু ঝুনা নারিকেল;
দুই ভাণ্ড ভাল রাই-শরিষার তেল;
আমসত্ব আমচুর; সের দুই দুধ;
এই সব শিশি কৌটা ওষুধ বিষুধ।
মিষ্টান্ন রহিল কিছু হাঁড়ির ভিতরে,
মাথা খাও, ভুলিয়োনা, খেয়ো মনে করে।”
বুঝিনু যুক্তির কথা বৃথা বাক্যব্যয়।
বোঝাই হইল উঁচু পর্ব্বতের ন্যায়।
তাকানু ঘড়ির পানে, তার পরে ফিরে
চাহি প্রিয়ার মুখে; কহিলাম ধীরে
“তবে আসি”। অমনি ফিরায়ে মুখখানি
নতশিরে চক্ষুপরে বস্ত্রাঞ্চল টানি
অমঙ্গল অশ্রুজল করিল গোপন।
বাহিরে দ্বারের কাছে বসি অন্যমন
কন্যা মোর চারি বছরের; এতক্ষণ
অন্য দিনে হয়ে যেত স্নান সমাপন,
দুটি অন্ন মুখে না তুলিতে আঁখিপাতা
মুদিয়া আসিত ঘুমে; আজি তার মাতা
দেখে নাই তারে; এত বেলা হয়ে যায়
নাই স্নানাহার। এতক্ষণ ছায়াপ্রায়
ফিরিতেছিল সে মোর কাছে কাছে ঘেঁসে,
চাহিয়া দেখিতেছিল মৌন নির্ণিমেষে
বিদায়ের আয়োজন। শ্রান্ত দেহে এবে
বাহিরেব দ্বারপ্রান্তে কি জানি কি ভেবে
চুপিচাপি বসেছিল। কহিনু যখন
“মাগো, আসি,” সে কহিল বিষণ্ণ নয়ন
ম্লান মুখে “যেতে আমি দিব না তোমায়!”
যেখানে আছিল বসে’ রহিল সেথায়,
ধরিল না বাহু মোর, রুধিল না দ্বার,
শুধু নিজ হৃদয়ের স্নেহ-অধিকার
প্রচারিল—“যেতে আমি দিব না তোমায়!”
তবুও সময় হল শেষ, তবু হায়
যেতে দিতে হল।
ওরে মোর মূঢ় মেয়ে!
কে রে তুই, কোথা হতে কি শকতি পেয়ে
কহিলি এমন কথা, এত স্পর্দ্ধাভরে-
“যেতে আমি দিব না তোমায়।” চরাচরে
কাহারে রাখিবি ধরে’ দুটি ছোট হাতে,
গরবিনি, সংগ্রাম করিবি কার সাথে
বসি গৃহদ্বারপ্রান্তে শ্রান্ত ক্ষুদ্র দেহ
শুধু লয়ে ওইটুকু বুকভরা স্নেহ!
ব্যথিত হৃদয় হতে বহুভয়ে লাজে
মর্ম্মের প্রার্থনা শুধু ব্যক্ত করা সাজে
এ জগতে,—শুধু বলে রাখা “যেতে দিতে
ইচ্ছা নাহি!” হেন কথা কে পারে বলিতে
“যেতে নাহি দিব।” শুনি তোর শিশুমুখে
স্নেহের প্রবল গর্ব্ববাণী, সকৌতুকে
হাসিয়া সংসার টেনে নিয়ে গেল মোরে,
তুই শুধু পরাভূত চোখে জল ভোরে
দুয়ারে রহিলি বসে ছবির মতন,
আমি দেখে চলে’ এনু মুছিয়া নয়ন।
চলিতে চলিতে পথে হেরি দুইধারে
শরতের শস্যক্ষেত্র নত শস্যভরে
রৌদ্র পোহইছে। তরুশ্রেণী উদাসীন
রাজপথপাশে, চেয়ে আছে সারাদিন
আপন ছায়ার পানে। বহে খরবেগ
শরতের ভরা গঙ্গা। শুভ্র খণ্ডমেঘ
মাতৃদুগ্ধ-পরিতৃপ্ত সুখনিদ্রারত
সদ্যোজাত সুকুমার গোবৎসের মত
নীলাম্বরে শুয়ে।—দীপ্ত রৌদ্রে অনাবৃত
যুগযুগান্তরক্লান্ত দিগন্তবিস্তৃত
ধরণীর পানে চেয়ে ফেলিনু নিশ্বাস।
কি গভীর দুঃখে মগ্ন সমস্ত আকাশ,
সমস্ত পৃথিবী! চলিতেছি যতদুর
শুনিতেছি একমাত্র মর্মান্তিক সুর
“যেতে আমি দিব না তোমায়!” ধরণীর
প্রান্ত হতে নীলাভ্রের সর্ব্বপ্রান্ততীর
ধ্বনিতেছে চিরকাল অনাদ্যন্ত রবে
“যেতে নাহি দিব! যেতে নাহি দিব।” সবে
কহে “যেতে নাহি দিব!” তৃণ ক্ষুদ্র অতি
তারেও বাঁধিয়া বক্ষে মাতা বসুমতী
কহিছেন প্রাণপণে “যেতে নাহি দিব!”
আয়ুঃক্ষীণ দীপমুখে শিখা নিব’-নিব’
আঁধারের গ্রাস হতে কে টানিছে তারে,
কহিতেছে শতবার “যেতে দিব না রে!”
এ অনন্ত চরাচরে স্বৰ্গমর্ত্ত্য ছেয়ে
সব চেয়ে পুরাতন কথা, সব চেয়ে
গভীর ক্রন্দন “যেতে নাহি দিব।” হায়,
তবু যেতে দিতে হয়, তবু চলে যায়!
চলিতেছে এমনি অনাদিকাল হতে।
প্রলয়-সমুদ্রবাহী সৃজনের স্রোতে
প্রসারিত ব্যগ্রবাহ জ্বলন্ত আঁখিতে
“দিবনা দিবনা যেতে” ডাকিতে ডাকিতে
হুহু করে’ তীব্রবেগে চলে যায় সবে
পূর্ণ করি বিশ্বতট আর্ত্ত কলরবে।
সম্মুখ উর্ম্মিরে ডাকে পশ্চাতের ঢেউ
“দিবনা দিবনা যেতে”-নাহি শুনে কেউ,
নাহি কোন সাড়া!
চারিদিক হতে আজি
অবিশ্রাম কর্ণে মোর উঠিতেছে বাজি
সেই বিশ্ব-মর্ম্মভেদী করুণ ক্রন্দন
মোর কন্যাকণ্ঠস্বরে। শিশুর মতন
বিশ্বের অবোধ বাণী। চিরকাল ধরে’
যাহা পায় তাই সে হারায়, তবু ত রে
শিথিল হল না মুষ্টি, তবু অবিরত
সেই চারি বৎসরের কন্যাটির মত
অক্ষুণ্ণ প্রেমের গর্ব্বে কহিছে সে ডাকি
“যেতে নাহি দিব”; ম্লানমুখ, অশ্রু-আঁখি,
দণ্ডে দণ্ডে পলে পলে টুটিছে গরব
তবু প্রেম কিছুতে না মানে পরাভব,—
তবু বিদ্রোহের ভাবে রুদ্ধ কণ্ঠে কয়
“যেতে নাহি দিব।” যতবার পরাজয়
ততবার কহে-“আমি ভালবাসি যাবে
সে কি কভু আমা হতে দূরে যেতে পারে!
আমার আকাঙ্ক্ষাসম এমন আকুল,
এমন সকল-বাড়া, এমন অকুল,
এমন প্রবল, বিশ্বে কিছু আছে আর!”
এত বলি দর্পভরে করে সে প্রচার
“যেতে নাহি দিব!”—তখনি দেখিতে পায়
শুষ্ক তুচ্ছ ধূলিসম উড়ে’ চলে’ যায়
একটি নিশ্বাসে তার আদরের ধন,—
অশ্রুজলে ভেসে যায় দুইটি নয়ন,
ছিন্নমূল তরুসম পড়ে পৃথ্বীতলে
হতগর্ব্ব নতশির।—তবু প্রেম বলে
“সত্য ভঙ্গ হবে না বিধির। আমি তাঁর
পেয়েছি স্বাক্ষর-দেওয়া মহা অঙ্গীকার
চির-অধিকার লিপি!” তাই স্ফীতবুকে
সর্ব্বশক্তি মরণের মুখের সম্মুখে
দাঁড়াইয়া সুকুমার ক্ষীণ তনুলতা
বলে “মৃত্যু তুমি নাই।”—হেন গর্ব্বকথা!
মৃত্যু হাসে বসি! মরণ-পীড়িত সেই
চিরঞ্জীবী প্রেম আচ্ছন্ন করেছে এই
অনন্ত সংসার, বিষণ্ণ নয়ন পরে
অশ্রুবাষ্পসম, ব্যাকুল আশঙ্কাতরে
চির-কম্পমান। আশাহীন শ্রান্ত আশা
টানিয়া রেখেছে এক বিষাদ-কুয়াশা
বিশ্বময়। আজি যেন, পড়িছে নয়নে
দু’খানি অবোধ বাহু বিফল বাঁধনে
জড়ায়ে পড়িয়া আছে নিখিলেরে ঘিরে,
স্তব্ধ সকাতর। চঞ্চল স্রোতের নীরে
পড়ে’ আছে একখানি অচঞ্চল ছায়া,—
অশ্রুবৃষ্টিভরা কোন্ মেঘেব সে মায়া!
তাই আজি শুনিতেছি তরুর মর্ম্মরে
এত ব্যাকুলতা; অলস ঔদাস্যভরে
মধ্যাহ্ণের তপ্তবায়ু মিছে খেলা করে
শুষ্ক পত্র লয়ে; বেলা ধীরে যায় চলে’
ছায়া দীর্ঘতর করি’ অশত্থের তলে।
মেঠো সুরে কাঁদে যেন অনন্তের বাঁশি
বিশ্বের প্রান্তর মাঝে; শুনিয়া উদাসী
বসুন্ধরা বসিয়া আছেন এলোচুলে
দূরব্যাপী শস্যক্ষেত্রে জাহ্নবীর কূলে
একখানি রৌদ্রপীত হিরণ্য-অঞ্চল
বক্ষে টানি দিয়া; স্থির নয়নযুগল
দূর নীলাম্বরে মগ্ন; মুখে নাহি বাণী।
দেখিলাম তাঁর সেই ম্লান মুখখানি
সেই দ্বারপ্রান্তে লীন, স্তব্ধ মর্ম্মাহত
মোর চারি বৎসরের কন্যাটির মত।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।