কবিতার খাতা
- 17 mins
তুমি চলে যাবে বলতেই- মহাদেব সাহা।
তুমি চলে যাবে বলতেই বুকের মধ্যে
পাড় ভাঙার শব্দ শুনি-
উঠে দাঁড়াতেই দুপুরের খুব গরম
হাওয়া বয়,
মার্সির কাঁচ ভাঙতে শুরু করে;
দরোজা থেকে যখন এক পা বাড়াও আমি
দুই চোখে কিছুই দেখি না-
এর নাম তোমার বিদায়,
আচ্ছা আসি, শুভরাত্রি,
খোদাহাফেজ।
তোমাকে আরেকটু বসতে বললেই তুমি যখন
মাথা নেড়ে না, না বলো
সঙ্গে সঙ্গে সব মাধবীলতার ঝোপ
ভেঙে পড়ে;
তুমি চলে যাওয়ার জন্যে যখন
সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকো
তৎক্ষণাৎ পৃথিবীর আরো কিছু বনাঞ্চল উজাড় হয়ে যায়,
তুমি উঠোন পেরুলে আমি কেবল
শূন্যতা শূন্যতা
ছাড়া আর কিছুই দেখি না
আমার প্রিয় গ্রন্থগুলির সব
পৃষ্ঠা কালো কালিতে ঢেকে যায়।
অথচ চোখের আড়াল অর্থ কতোটুকু যাওয়া,
কতোদূর যাওয়া-
হয়তো নীলক্ষেত থেক বনানী,
ঢাকা থেকে ফ্রাঙ্কফুর্ট
তবু তুমি চলে যাবে বলতেই বুকের
মধ্যে মোচড় দিয়ে ওঠে
সেই থেকে অবিরাম কেবল পাড় ভাঙার শব্দ শুনি
পাতা ঝরার শব্দ শুনি-
আর কিছুই শুনি না।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। মহাদেব সাহা।
তুমি চলে যাবে বলতেই কবিতা – মহাদেব সাহা | সম্পূর্ণ বিশ্লেষণ
তুমি চলে যাবে বলতেই কবিতার সারাংশ ও মূলভাব
মহাদেব সাহার “তুমি চলে যাবে বলতেই” কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় আধুনিক প্রেম ও বিরহের কবিতা। কবিতার প্রথম চরণ “তুমি চলে যাবে বলতেই বুকের মধ্যে পাড় ভাঙার শব্দ শুনি” বাংলা কবিতার ইতিহাসে স্মরণীয় একটি লাইন। এই কবিতায় কবি প্রিয়জনের বিদায়ের পূর্বমুহূর্তের মানসিক যন্ত্রণা, শূন্যতা ও অন্তর্দহনকে অতুলনীয় শব্দচয়নের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। কবিতাটি পড়ে মনে হয় সমগ্র প্রকৃতি যেন প্রিয়জনের বিদায়ে কাঁদছে।
কবিতার প্রতিটি স্তবকের বিশ্লেষণ
প্রথম স্তবক: “তুমি চলে যাবে বলতেই বুকের মধ্যে পাড় ভাঙার শব্দ শুনি” – এই লাইনে কবি হৃদয়ের ভিত্তি ধ্বংসের শব্দ শোনার কথা বলেছেন। পাড় ভাঙা মানে জীবনের ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে যাওয়া।
দ্বিতীয় স্তবক: “মার্সির কাঁচ ভাঙতে শুরু করে” – মার্সি বা দয়ার প্রতীকী কাঁচ ভাঙা মানে সমস্ত মানবিক সম্পর্কের অবসান।
তৃতীয় স্তবক: “সব মাধবীলতার ঝোপ ভেঙে পড়ে” – মাধবীলতা প্রেম ও সৌন্দর্যের প্রতীক। এর ধ্বংস মানে জীবনের সৌন্দর্য লুপ্ত হওয়া।
চতুর্থ স্তবক: “পৃথিবীর আরো কিছু বনাঞ্চল উজাড় হয়ে যায়” – প্রিয়জনের চলে যাওয়ায় সমগ্র বিশ্বের পরিবেশগত ধ্বংসের রূপক।
পঞ্চম স্তবক: “গ্রন্থগুলির সব পৃষ্ঠা কালো কালিতে ঢেকে যায়” – জ্ঞান, স্মৃতি ও অতীত মুছে যাওয়ার চিত্র।
ষষ্ঠ স্তবক: “পাড় ভাঙার শব্দ শুনি পাতা ঝরার শব্দ শুনি” – অনন্ত শোক ও ক্ষয়ের ধ্বনি।
কবিতার রূপক ও প্রতীক সমূহ
- পাড় ভাঙার শব্দ: হৃদয়ভাঙার রূপক, মানসিক স্থিতিশীলতার ধ্বংস
- মার্সির কাঁচ: দয়া-মমতা-সহানুভূতির প্রতীক
- মাধবীলতার ঝোপ: প্রেম, সৌন্দর্য ও কোমলতার প্রতীক
- বনাঞ্চল উজাড়: জীবনের সবুজায়ন ও সজীবতা হারানো
- গ্রন্থের পৃষ্ঠা কালো হওয়া: স্মৃতি, জ্ঞান ও ইতিহাস মুছে যাওয়া
- পাতা ঝরার শব্দ: সময়ের অবসান ও শূন্যতার ধ্বনি
কবিতার ভাষাশৈলী ও শিল্পসৌকর্য
মহাদেব সাহার এই কবিতাটির ভাষা আপাতদৃষ্টিতে সরল গদ্যের মতো হলেও এর অন্তর্নিহিত গঠন অত্যন্ত জটিল ও বহুমাত্রিক। কবি এখানে:
- পুনরাবৃত্তির ব্যবহার: “তুমি চলে যাবে বলতেই”, “শূন্যতা শূন্যতা”
- রূপকের প্রয়োগ: প্রকৃতির মাধ্যমে মানবিক অনুভূতির প্রকাশ
- ছন্দের বৈচিত্র্য: গদ্যকবিতার মুক্ত ছন্দে লিখিত
- ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য চিত্রকল্প: শব্দ, দৃশ্য, স্পর্শের সমন্বয়
কবি মহাদেব সাহার জীবন ও সাহিত্যকর্ম
মহাদেব সাহা (জন্ম: ৫ আগস্ট ১৯৪৪) বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান আধুনিক কবি। তিনি বাংলা কাব্যজগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে স্বীকৃত। তাঁর কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো সহজ ভাষায় গভীর জীবনবোধের প্রকাশ।
জীবনবৃত্তান্ত
মহাদেব সাহা নরসিংদী জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। পেশাগত জীবনে তিনি দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ
- একটি পংক্তিও হেমন্ত নয় (১৯৭৩)
- যে তরুরা পথ দেখায় (১৯৭৮)
- আমাকে জাগাও (১৯৮১)
- মেঘের ছায়া বাংলার মুখ (১৯৮৫)
- পৃথিবীর প্রতি বিদায় (১৯৯০)
- প্রেমের কবিতা (১৯৯৫)
- উষ্ণীষে জলের রং (২০০০)
- অন্তর্গত নদী (২০০৫)
পুরস্কার ও সম্মাননা
- বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৮৩)
- একুশে পদক (২০০১)
- আলাওল সাহিত্য পুরস্কার
- কবিতালাপ পুরস্কার
- নুরুন্নাহার কবিতা পুরস্কার
তুমি চলে যাবে বলতেই কবিতা সম্পর্কে প্রশ্নোত্তর
তুমি চলে যাবে বলতেই কবিতার কবি কে?
উত্তর: এই কবিতাটির কবি হলেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত আধুনিক কবি মহাদেব সাহা। তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার ও একুশে পদক বিজয়ী কবি।
তুমি চলে যাবে বলতেই কবিতার প্রথম লাইন কী?
উত্তর: কবিতাটির প্রথম লাইন হলো: “তুমি চলে যাবে বলতেই বুকের মধ্যে পাড় ভাঙার শব্দ শুনি”। এই লাইনটি বাংলা কবিতার অন্যতম স্মরণীয় লাইন।
তুমি চলে যাবে বলতেই কবিতার মূল বিষয় কী?
উত্তর: কবিতাটির মূল বিষয় হলো প্রিয়জনের বিদায়ের পূর্বাভাসে একজন মানুষের গভীর মানসিক যন্ত্রণা, শূন্যতা ও অন্তর্দহন। কবি দেখিয়েছেন কীভাবে একটি ব্যক্তিগত ক্ষতি সমগ্র বিশ্বকে ধ্বংসের সমান অনুভূত হয়।
পাড় ভাঙার শব্দ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: “পাড় ভাঙার শব্দ” বলতে হৃদয়ভাঙা বা জীবনের ভিত্তি ধ্বংস হওয়ার রূপক বোঝানো হয়েছে। এটি মানসিক স্থিতিশীলতা হারানোর প্রতীক।
মার্সির কাঁচ ভাঙা বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: “মার্সির কাঁচ ভাঙা” বলতে দয়া, মমতা ও সহানুভূতির অবসান বোঝায়। এটি মানবিক সম্পর্কের শেষ আশ্রয়স্থল ধ্বংসের প্রতীক।
মাধবীলতার ঝোপ ভেঙে পড়ার অর্থ কী?
উত্তর: মাধবীলতা প্রেম, সৌন্দর্য ও কোমলতার প্রতীক। মাধবীলতার ঝোপ ভেঙে পড়া মানে জীবনের সৌন্দর্য, প্রেম ও কোমলতা ধ্বংস হওয়া।
বনাঞ্চল উজাড় হওয়ার রূপক অর্থ কী?
উত্তর: বনাঞ্চল উজাড় হওয়া বলতে জীবনের সবুজায়ন, সজীবতা ও জীবনীশক্তি হারানোর রূপক বোঝানো হয়েছে।
গ্রন্থের পৃষ্ঠা কালো হওয়া বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: গ্রন্থের পৃষ্ঠা কালো হওয়া বলতে স্মৃতি, জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও অতীত মুছে যাওয়ার প্রতীক বোঝানো হয়েছে।
নীলক্ষেত থেকে বনানী, ঢাকা থেকে ফ্রাঙ্কফুর্ট লাইনের অর্থ কী?
উত্তর: এই লাইনের মাধ্যমে কবি বলতে চেয়েছেন যে প্রিয়জনের বিদায়ের ব্যথা স্থানীয় (নীলক্ষেত-বনানী) হোক বা আন্তর্জাতিক (ঢাকা-ফ্রাঙ্কফুর্ট) – ব্যথার তীব্রতা একই থাকে।
শূন্যতা শূন্যতা পুনরাবৃত্তির তাৎপর্য কী?
উত্তর: এই পুনরাবৃত্তি শূন্যতার গভীরতা, ব্যাপ্তি ও বহুমাত্রিকতাকে নির্দেশ করে। এটি শূন্যতার ভিতরে আরেক শূন্যতার অনুভূতি প্রকাশ করে।
মহাদেব সাহার জন্ম কবে?
উত্তর: মহাদেব সাহার জন্ম ৫ আগস্ট ১৯৪৪ সালে নরসিংদী জেলায়।
মহাদেব সাহার উল্লেখযোগ্য কবিতা কোনগুলো?
উত্তর: মহাদেব সাহার উল্লেখযোগ্য কবিতার মধ্যে রয়েছে: ‘তুমি চলে যাবে বলতেই’, ‘আমাকে জাগাও’, ‘যে তরুরা পথ দেখায়’, ‘একটি পংক্তিও হেমন্ত নয়’, ‘মেঘের ছায়া বাংলার মুখ’।
মহাদেব সাহা কী পুরস্কার পেয়েছেন?
উত্তর: মহাদেব সাহা বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৮৩), একুশে পদক (২০০১), আলাওল সাহিত্য পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।
এই কবিতা কোন কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত?
উত্তর: “তুমি চলে যাবে বলতেই” কবিতাটি মহাদেব সাহার বিভিন্ন কবিতা সংকলনে অন্তর্ভুক্ত আছে।
কবিতাটি পড়ে পাঠকের কী প্রতিক্রিয়া হয়?
উত্তর: এই কবিতা পড়ে পাঠক গভীর মর্মস্পর্শী অনুভূতি লাভ করেন। কবিতাটি প্রেম, বিরহ ও মানবিক সম্পর্কের গভীরতা উপলব্ধি করতে সাহায্য করে।
মহাদেব সাহার কবিতার বৈশিষ্ট্য কী?
উত্তর: মহাদেব সাহার কবিতার বৈশিষ্ট্য হলো: সহজ ভাষায় গভীর ভাব প্রকাশ, প্রকৃতির সাথে মানবিক অনুভূতির সমন্বয়, রূপক ও প্রতীকের নিপুণ ব্যবহার, আধুনিক জীবনবোধের প্রতিফলন।
এই কবিতা বাংলা সাহিত্যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
উত্তর: এই কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের আধুনিক কবিতার ধারায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। এটি বিরহ কবিতার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
কবিতাটি শিক্ষার্থীদের জন্য কতটা উপযোগী?
উত্তর: এই কবিতাটি শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। তারা এখান থেকে রূপক, প্রতীক, ছন্দ ও কবিতার গঠনশৈলী সম্পর্কে শিখতে পারে।
মহাদেব সাহা বর্তমানে কী করছেন?
উত্তর: মহাদেব সাহা বর্তমানে সাহিত্য চর্চা ও সৃষ্টিশীল লেখালেখিতে নিয়োজিত আছেন। তিনি বাংলাদেশের সাহিত্যাঙ্গনের একজন সক্রিয় ব্যক্তিত্ব।
এই কবিতার অডিও বা ভিডিও পাওয়া যায় কি?
উত্তর: হ্যাঁ, ইন্টারনেটে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে এই কবিতার অডিও রেকর্ডিং ও ভিডিও পাওয়া যায়।
ট্যাগস: তুমি চলে যাবে বলতেই, তুমি চলে যাবে বলতেই কবিতা, তুমি চলে যাবে বলতেই বুকের মধ্যে পাড় ভাঙার শব্দ শুনি, মহাদেব সাহা, মহাদেব সাহার কবিতা, বাংলা কবিতা, বাংলা প্রেমের কবিতা, বাংলা বিরহের কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, বাংলাদেশের কবিতা, বাংলা সাহিত্য, কবিতা সংগ্রহ, বিচ্ছেদের কবিতা, শূন্যতার কবিতা, বাংলা কাব্য, পাড় ভাঙার শব্দ, মাধবীলতার ঝোপ, মহাদেব সাহার জীবনী, মহাদেব সাহার পুরস্কার, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক, বাংলা কবিতার বিশ্লেষণ






