কবিতার খাতা
- 42 mins
শেষ ইচ্ছে – নবারুণ ভট্টাচার্য।
আমি মরে গেলে
আমি শব্দ দিয়ে যে বাড়িটি তৈরি করেছি
সেটা কান্নায় ভেঙে পড়বে
তাতে অবাক হবার কিছু নেই
বাড়ির আয়না আমাকে মুছে ফেলবে
দেওয়ালে আমার ছবি রাখবে না
দেওয়াল আমার ভালো লাগত না
তখন আকাশ আমার দেওয়াল
তাতে চিমনির ধোঁয়া দিয়ে পাখিরা
আমার নাম লিখবে
অথবা আকাশ তখন আমার লেখার টেবিল
ঠান্ডা পেপারওয়েট হবে চাঁদ
কালো ভেলভেটের পিনকুশনে ফোটানো থাকবে তারা।
আমাকে মনে করে তোমার
দুঃখ করার কিছু নেই
এই কথাগুলো লেখার সময় আমার হাত কাঁপছে না
কিন্তু যখন প্রথম তোমার হাত ধরেছিলাম
তখন আমার হাত থরথর করে কেপেছিল
কিছুটা আবেগে কিছুটা আড়ষ্টতায়
আমার সুন্দরী স্ত্রী, আমার প্রেয়সী–
আমার স্মৃতি তোমাকে ঘিরে থাকবে
তোমার তাকে আঁকড়ে থাকার কিছু নেই
তুমি নিজের জীবন গড়ে নিও
আমার স্মৃতি তোমার কমরেড
তুমি যদি কাউকে ভালোবাস
তাকে এই স্মৃতিগুলো দিয়ে দিও
অবশ্য আমি সবটা তোমার উপর ছেড়ে দিচ্ছি
আমি বিশ্বাস করি তুমি ভুল করবে না।
তুমি আমার ছেলেকে
প্রথম অক্ষর শেখাবার সময়ে
ওকে মানুষ, রোদ্দুর আর তারাদের ভালোবাসতে শিখিও
ও অনেক কঠিন কঠিন অঙ্ক করতে পারবে
বিপ্লবের অ্যালজেব্রা ও আমার চেয়ে
অনেক ভালো বুঝবে
আমাকে হাঁটতে শেখাবে মিছিলে
পাথুরে জমিতে আর ঘাসে
আমার দোষগুলোর কথা ওকে বোলো
ও যেন আমাকে না বকে
আমার মরে যাওয়াটা কোনো বড় কথা নয়
খুব বেশিদিন বাঁচব না আমি
এটা আমি জানতাম
কিন্তু আমার বিশ্বাস কখনও হটে যায়নি
সমস্ত মৃত্যুকে অতিক্রম করে
সমস্ত অন্ধকারকে অস্বীকার করে
বিপ্লব দীর্ঘজীবী হয়েছে
বিপ্লব চিরজীবী হয়েছে।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। নবারুণ ভট্টাচার্য।
শেষ ইচ্ছে – নবারুণ ভট্টাচার্য | শেষ ইচ্ছে কবিতা নবারুণ ভট্টাচার্য | নবারুণ ভট্টাচার্যের কবিতা | আধুনিক বাংলা কবিতা
শেষ ইচ্ছে: নবারুণ ভট্টাচার্যের মৃত্যু, প্রেম ও বিপ্লবের অসাধারণ কাব্যভাষা
নবারুণ ভট্টাচার্যের “শেষ ইচ্ছে” একটি অনন্য সৃষ্টি, যা মৃত্যু, প্রেম, সৃষ্টি ও বিপ্লবের এক গভীর কাব্যিক অন্বেষণ। “আমি মরে গেলে / আমি শব্দ দিয়ে যে বাড়িটি তৈরি করেছি / সেটা কান্নায় ভেঙে পড়বে / তাতে অবাক হবার কিছু নেই” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে এক গভীর চেতনা — মৃত্যুর পরেও শব্দের তৈরি বাড়ি কান্নায় ভেঙে পড়ে, দেওয়াল কবির ছবি রাখে না, কিন্তু আকাশ তখন দেওয়াল হয়, চাঁদ হয় লেখার টেবিলের পেপারওয়েট, আর তারা ফোটানো থাকে কালো ভেলভেটের পিনকুশনে। নবারুণ ভট্টাচার্য (২৩ জুন ১৯৪৮ – ৩১ জুলাই ২০১৪) ছিলেন একজন বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি কবি ও কথাসাহিত্যিক । তিনি সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার (১৯৯৭) ও বঙ্কিম পুরস্কার (১৯৯৬) গ্রহণ করেছেন । তিনি ছিলেন বিখ্যাত নাট্যকার ও অভিনেতা বিজন ভট্টাচার্য এবং বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবীর একমাত্র পুত্র । “শেষ ইচ্ছে” কবিতাটি তাঁর একটি বহুপঠিত কবিতা যা মৃত্যুর প্রাক্কালে প্রিয় মানুষ ও বিপ্লবের প্রতি শেষ বার্তা ।
নবারুণ ভট্টাচার্য: বিপ্লবী সাম্যবাদী ধারার কবি ও কথাসাহিত্যিক
নবারুণ ভট্টাচার্য ১৯৪৮ সালের ২৩ জুন পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুরে জন্মগ্রহণ করেন [citation:3]। তিনি ছিলেন বিখ্যাত নাট্যকার ও অভিনেতা বিজন ভট্টাচার্য এবং বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবীর একমাত্র পুত্র [citation:1][citation:3]। স্কুল জীবনে তিনি বালিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমে ভূতত্ত্ব ও পরবর্তীতে ইংরেজি বিষয়ে পড়াশোনা করেন [citation:1]।
১৯৭২ সালে ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না’ নামে তাঁর প্রথম কবিতার বই প্রকাশিত হয় [citation:3]। তিনি এই কবিতার বই এর মধ্য দিয়ে শাসকের সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে তার প্রতিবাদী সত্তা ব্যক্ত করেছেন [citation:3]। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘হারবার্ট’ ১৯৯২ সালে প্রকাশিত হয়েছিল৷ উপন্যাসটির পটভূমি ছিল সত্তরের দশকের নকশাল আন্দোলন [citation:3]। প্রথম উপন্যাস ‘হারবার্ট’ এর জন্য নবারুণ নরসিংহ দাস (১৯৯৪), বঙ্কিম (১৯৯৬) ও সাহিত্য অকাদেমি (১৯৯৭) পুরস্কার পেয়েছেন [citation:3]।
তাঁর বাস্তববাদী লেখা বাঙালী পাঠকদের মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল৷ তিনি ‘ফ্যাতাড়ু’ নামে একটি জনপ্রিয় কাল্পনিক চরিত্র তৈরী করেছিলেন [citation:3]। তাঁর সৃষ্ট চরিত্র ফ্যাতাড়ুরা উড়তে পারে এবং তাদের মন্ত্র হল “ফ্যাঁত ফ্যাঁত সাঁই সাঁই”। এই মন্ত্রবলে ফ্যাতাড়ুরা উড়ে গিয়ে হানা দিত, কখনও কালোবাজারিদের ভয় দেখাতে, কখনও বা ভন্ড সাহিত্যিকের মুখোশ খুলতে [citation:3]।
চাকরি জীবনে তিনি ১৯৭৩ সালে একটি বিদেশি সংস্থায় যোগ দেন এবং ১৯৯১ পর্যন্ত সেখানে চাকরি করেন। এরপর কিছুদিন বিষ্ণু দে-র ‘সাহিত্যপত্র’ সম্পাদনা করেন এবং ২০০৩ থেকে ‘ভাষাবন্ধন’ নামের একটি পত্রিকা পরিচালনা করেন [citation:1][citation:3]। একসময় দীর্ঘদিন তিনি ‘নবান্ন’ নাট্যগোষ্ঠী পরিচালনা করেছেন [citation:3]।
তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলির মধ্যে রয়েছে ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না’ (১৯৮৩), ‘পুলিশ করে মানুষ শিকার’ (১৯৮৭), ‘রাতের সার্কাস’ [citation:1][citation:3]। উপন্যাসগুলির মধ্যে রয়েছে ‘হারবার্ট’ (১৯৯৩), ‘যুদ্ধ পরিস্থিতি’ (১৯৯৬), ‘অটো ও ভোগী’, ‘ফ্যাতাড়ু ও চোক্তার’, ‘কাঙাল মালসাট’, ‘মবলগে নভেল’, ‘খেলনা নগর’, ‘লুব্ধক’ (২০০৬) [citation:1][citation:3]। ছোটগল্পের মধ্যে রয়েছে ‘হালাল ঝাণ্ডা’ (১৯৮৭), ‘ফ্যাতাড়ুর কুম্ভীপাক’, ‘ফ্যাতাড়ুর বোম্বাচাক’, ‘ফ্যাতাড়ু বিংশতি’ [citation:1][citation:3]।
তিনি সুমন মুখোপাধ্যায়ের ‘হারবার্ট’, ‘মহানগর@কলকাতা’ এবং ‘কাঙাল মালসাট’ চলচ্চিত্রের মূল রচয়িতা [citation:3]। নবারুণ ভট্টাচার্য ২০১৪ সালের ৩১ জুলাই আন্ত্রিক ক্যান্সারের কারণে কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন [citation:1][citation:3][citation:9]।
শেষ ইচ্ছে কবিতার বিস্তারিত বিশ্লেষণ
কবিতার শিরোনামের তাৎপর্য
“শেষ ইচ্ছে” শিরোনামটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ‘শেষ’ শব্দটি মৃত্যুর ইঙ্গিত বহন করে। ‘ইচ্ছে’ হলো আকাঙ্ক্ষা, প্রার্থনা। কবি তাঁর মৃত্যুর পরবর্তী সময়ের জন্য কিছু ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন — স্ত্রীর জন্য, পুত্রের জন্য, সৃষ্টির জন্য, বিপ্লবের জন্য। শিরোনামেই কবি ইঙ্গিত দিয়েছেন — এই কবিতা মৃত্যুর প্রাক্কালে প্রিয় মানুষ ও আদর্শের প্রতি শেষ বার্তা ।
প্রথম স্তবকের বিশ্লেষণ: শব্দের তৈরি বাড়ি
“আমি মরে গেলে / আমি শব্দ দিয়ে যে বাড়িটি তৈরি করেছি / সেটা কান্নায় ভেঙে পড়বে / তাতে অবাক হবার কিছু নেই / বাড়ির আয়না আমাকে মুছে ফেলবে / দেওয়ালে আমার ছবি রাখবে না / দেওয়াল আমার ভালো লাগত না / তখন আকাশ আমার দেওয়াল / তাতে চিমনির ধোঁয়া দিয়ে পাখিরা / আমার নাম লিখবে / অথবা আকাশ তখন আমার লেখার টেবিল / ঠান্ডা পেপারওয়েট হবে চাঁদ / কালো ভেলভেটের পিনকুশনে ফোটানো থাকবে তারা।” প্রথম স্তবকে কবি শব্দের তৈরি বাড়ির কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন — আমি মরে গেলে, আমি শব্দ দিয়ে যে বাড়িটি তৈরি করেছি, সেটা কান্নায় ভেঙে পড়বে। তাতে অবাক হবার কিছু নেই। বাড়ির আয়না আমাকে মুছে ফেলবে। দেওয়ালে আমার ছবি রাখবে না — দেওয়াল আমার ভালো লাগত না। তখন আকাশ আমার দেওয়াল হবে, তাতে চিমনির ধোঁয়া দিয়ে পাখিরা আমার নাম লিখবে। অথবা আকাশ তখন আমার লেখার টেবিল হবে, ঠান্ডা পেপারওয়েট হবে চাঁদ, কালো ভেলভেটের পিনকুশনে ফোটানো থাকবে তারা ।
‘আমি শব্দ দিয়ে যে বাড়িটি তৈরি করেছি’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
শব্দ দিয়ে তৈরি বাড়ি — কবির সৃষ্ট সাহিত্য, তাঁর কবিতা-গল্প-উপন্যাস। তিনি তাঁর লেখার মাধ্যমে এক বিশাল সৃষ্টিজগৎ তৈরি করেছেন। সেই বাড়ি তাঁর মৃত্যুর পর কান্নায় ভেঙে পড়বে — অর্থাৎ শোক আসবে, কিন্তু সেই শোকও সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসারই প্রকাশ ।
‘বাড়ির আয়না আমাকে মুছে ফেলবে / দেওয়ালে আমার ছবি রাখবে না’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
মৃত্যুর পর মানুষের ভৌত উপস্থিতি মুছে যায়। আয়নায় তাঁর প্রতিবিম্ব আর দেখা যায় না, দেওয়ালে তাঁর ছবি রাখা হয় না। কিন্তু কবি এতে দুঃখিত নন — ‘দেওয়াল আমার ভালো লাগত না’ বলে তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, বাস্তবের দেওয়াল তাঁর কাছে অর্থহীন ।
‘তখন আকাশ আমার দেওয়াল / তাতে চিমনির ধোঁয়া দিয়ে পাখিরা আমার নাম লিখবে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
মৃত্যুর পর পার্থিব দেওয়ালের বদলে আকাশই তাঁর দেওয়াল হবে। চিমনির ধোঁয়া — মানুষের বসতির প্রতীক। পাখিরা সেই ধোঁয়া দিয়ে তাঁর নাম লিখবে — অর্থাৎ প্রকৃতি ও মানবসভ্যতা মিলে তাঁকে স্মরণ করবে ।
‘আকাশ তখন আমার লেখার টেবিল / ঠান্ডা পেপারওয়েট হবে চাঁদ / কালো ভেলভেটের পিনকুশনে ফোটানো থাকবে তারা’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
আকাশ হবে তাঁর লেখার টেবিল, চাঁদ হবে পেপারওয়েট, তারা ফোটানো থাকবে কালো ভেলভেটের পিনকুশনে। মৃত্যুর পরও তাঁর সৃষ্টি থেমে থাকবে না — তিনি মহাজাগতিক মাত্রায় সৃষ্টি চালিয়ে যাবেন ।
দ্বিতীয় স্তবকের বিশ্লেষণ: প্রেয়সীর প্রতি বার্তা
“আমাকে মনে করে তোমার / দুঃখ করার কিছু নেই / এই কথাগুলো লেখার সময় আমার হাত কাঁপছে না / কিন্তু যখন প্রথম তোমার হাত ধরেছিলাম / তখন আমার হাত থরথর করে কেপেছিল / কিছুটা আবেগে কিছুটা আড়ষ্টতায়” দ্বিতীয় স্তবকে কবি তাঁর স্ত্রী বা প্রেয়সীর প্রতি বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন — আমাকে মনে করে তোমার দুঃখ করার কিছু নেই। এই কথাগুলো লেখার সময় আমার হাত কাঁপছে না, কিন্তু যখন প্রথম তোমার হাত ধরেছিলাম, তখন আমার হাত থরথর করে কেঁপেছিল — কিছুটা আবেগে, কিছুটা আড়ষ্টতায় ।
‘এই কথাগুলো লেখার সময় আমার হাত কাঁপছে না’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
মৃত্যুর কথা লিখতে গিয়ে তাঁর হাত কাঁপছে না — কারণ তিনি মৃত্যুকে মেনে নিয়েছেন, ভয় পান না। কিন্তু প্রথমবার প্রেয়সীর হাত ধরার সময় তাঁর হাত থরথর করে কেঁপেছিল — প্রেমের প্রথম স্পর্শের স্মৃতি এখনও জীবন্ত ।
তৃতীয় স্তবকের বিশ্লেষণ: স্ত্রীর জন্য নির্দেশনা
“আমার সুন্দরী স্ত্রী, আমার প্রেয়সী— / আমার স্মৃতি তোমাকে ঘিরে থাকবে / তোমার তাকে আঁকড়ে থাকার কিছু নেই / তুমি নিজের জীবন গড়ে নিও / আমার স্মৃতি তোমার কমরেড / তুমি যদি কাউকে ভালোবাস / তাকে এই স্মৃতিগুলো দিয়ে দিও / অবশ্য আমি সবটা তোমার উপর ছেড়ে দিচ্ছি / আমি বিশ্বাস করি তুমি ভুল করবে না।” তৃতীয় স্তবকে কবি তাঁর স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন। তিনি বলেছেন — আমার সুন্দরী স্ত্রী, আমার প্রেয়সী — আমার স্মৃতি তোমাকে ঘিরে থাকবে। তোমার তাকে আঁকড়ে থাকার কিছু নেই। তুমি নিজের জীবন গড়ে নিও। আমার স্মৃতি তোমার কমরেড হবে। তুমি যদি কাউকে ভালোবাস, তাকে এই স্মৃতিগুলো দিয়ে দিও। অবশ্য আমি সবটা তোমার উপর ছেড়ে দিচ্ছি — আমি বিশ্বাস করি তুমি ভুল করবে না ।
‘আমার স্মৃতি তোমার কমরেড’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
কমরেড মানে বন্ধু, সহযোদ্ধা। কবি চান না তাঁর স্মৃতি স্ত্রীর জীবনে বোঝা হয়ে থাকুক। বরং তাঁর স্মৃতি যেন তাঁর নতুন জীবনের সঙ্গী হয়, সহায়তা করে, শক্তি দেয়। এটি এক অসাধারণ উদারতা ও ভালোবাসার প্রকাশ ।
‘আমি বিশ্বাস করি তুমি ভুল করবে না’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
কবি স্ত্রীর প্রতি অগাধ আস্থা রাখেন। তিনি জানেন, তাঁর স্ত্রী তাঁর দেওয়া স্বাধীনতার সদ্ব্যবহার করবেন, কোনও ভুল সিদ্ধান্ত নেবেন না। এটি সম্পর্কের গভীর আস্থা ও বিশ্বাসের প্রকাশ ।
চতুর্থ স্তবকের বিশ্লেষণ: পুত্রের জন্য নির্দেশনা
“তুমি আমার ছেলেকে / প্রথম অক্ষর শেখাবার সময়ে / ওকে মানুষ, রোদ্দুর আর তারাদের ভালোবাসতে শিখিও / ও অনেক কঠিন কঠিন অঙ্ক করতে পারবে / বিপ্লবের অ্যালজেব্রা ও আমার চেয়ে / অনেক ভালো বুঝবে / আমাকে হাঁটতে শেখাবে মিছিলে / পাথুরে জমিতে আর ঘাসে / আমার দোষগুলোর কথা ওকে বোলো / ও যেন আমাকে না বকে।” চতুর্থ স্তবকে কবি তাঁর পুত্রের জন্য নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন — তুমি আমার ছেলেকে প্রথম অক্ষর শেখাবার সময়ে ওকে মানুষ, রোদ্দুর আর তারাদের ভালোবাসতে শিখিও। ও অনেক কঠিন কঠিন অঙ্ক করতে পারবে। বিপ্লবের অ্যালজেব্রা ও আমার চেয়ে অনেক ভালো বুঝবে। আমাকে হাঁটতে শেখাবে মিছিলে, পাথুরে জমিতে আর ঘাসে। আমার দোষগুলোর কথা ওকে বোলো — ও যেন আমাকে না বকে ।
‘ওকে মানুষ, রোদ্দুর আর তারাদের ভালোবাসতে শিখিও’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
মানুষকে ভালোবাসা, রোদ্দুর ও তারাদের ভালোবাসা — অর্থাৎ মানবতা ও প্রকৃতিকে ভালোবাসা। পুত্রকে প্রথম অক্ষর শেখানোর সময় এই শিক্ষাটা দেওয়া সবচেয়ে জরুরি ।
‘বিপ্লবের অ্যালজেব্রা ও আমার চেয়ে অনেক ভালো বুঝবে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘বিপ্লবের অ্যালজেব্রা’ — বিপ্লবের গাণিতিক সূত্র, তার জটিলতা। কবি আশা করেন তাঁর পুত্র বিপ্লবকে আরও গভীরভাবে বুঝতে পারবেন, তাঁর চেয়েও ভালো। নবারুণ ভট্টাচার্য আজীবন বিপ্লবী চেতনায় বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেছিলেন ‘আমি একজন অ্যাকটিভিস্ট’ এবং তাঁর লেখাকে রাজনৈতিক অ্যাক্টিভিসমের অংশ মনে করতেন [citation:6]।
‘আমাকে হাঁটতে শেখাবে মিছিলে / পাথুরে জমিতে আর ঘাসে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
পুত্রই তাঁকে শেখাবে মিছিলে হাঁটতে — অর্থাৎ নতুন প্রজন্ম পথ দেখাবে। পাথুরে জমি ও ঘাস — সব ধরনের পথে, সব ধরনের সংগ্রামে।
‘আমার দোষগুলোর কথা ওকে বোলো / ও যেন আমাকে না বকে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
ছেলে যেন তাঁর দোষগুলোর জন্য তাঁকে গালি না দেয়, সেগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে এগিয়ে যায়। এটি এক গভীর আত্ম-উপলব্ধি ও বিনয়ের প্রকাশ ।
পঞ্চম স্তবকের বিশ্লেষণ: মৃত্যু ও বিপ্লব
“আমার মরে যাওয়াটা কোনো বড় কথা নয় / খুব বেশিদিন বাঁচব না আমি / এটা আমি জানতাম / কিন্তু আমার বিশ্বাস কখনও হটে যায়নি / সমস্ত মৃত্যুকে অতিক্রম করে / সমস্ত অন্ধকারকে অস্বীকার করে / বিপ্লব দীর্ঘজীবী হয়েছে / বিপ্লব চিরজীবী হয়েছে।” পঞ্চম স্তবকে কবি মৃত্যু ও বিপ্লবের কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন — আমার মরে যাওয়াটা কোনো বড় কথা নয়। খুব বেশিদিন বাঁচব না আমি — এটা আমি জানতাম। কিন্তু আমার বিশ্বাস কখনও হটে যায়নি। সমস্ত মৃত্যুকে অতিক্রম করে, সমস্ত অন্ধকারকে অস্বীকার করে — বিপ্লব দীর্ঘজীবী হয়েছে, বিপ্লব চিরজীবী হয়েছে ।
‘আমার মরে যাওয়াটা কোনো বড় কথা নয়’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
ব্যক্তির মৃত্যু অনিবার্য, কিন্তু বিপ্লব চিরন্তন। কবি তাঁর মৃত্যুকে তুচ্ছ মনে করেন, কারণ তাঁর বিশ্বাস — বিপ্লব — চিরকাল বেঁচে থাকবে। এটি এক গভীর রাজনৈতিক ও দার্শনিক চেতনার প্রকাশ ।
‘সমস্ত মৃত্যুকে অতিক্রম করে / সমস্ত অন্ধকারকে অস্বীকার করে / বিপ্লব দীর্ঘজীবী হয়েছে / বিপ্লব চিরজীবী হয়েছে’ — শেষ পঙ্ক্তির তাৎপর্য
এটি কবিতার চূড়ান্ত বাণী। বিপ্লব সব মৃত্যুকে অতিক্রম করে, সব অন্ধকারকে অস্বীকার করে। নবারুণ ভট্টাচার্যের এই লাইন তাঁর সারাজীবনের বিশ্বাসের প্রতিফলন। তিনি বারবার বিপ্লবের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তাঁর ভাষায়, “বিপ্লবটা আমার কাছে একটা প্রত্যক্ষ প্রয়োজনীয়তা” [citation:6]।
কবিতার গঠনশৈলী ও শিল্পরূপ
কবিতাটি পাঁচটি স্তবকে বিভক্ত। প্রথম স্তবকে শব্দের তৈরি বাড়ি ও মহাজাগতিক সৃষ্টির কথা, দ্বিতীয় স্তবকে প্রেয়সীর প্রতি প্রথম স্পর্শের স্মৃতি, তৃতীয় স্তবকে স্ত্রীর জন্য নির্দেশনা, চতুর্থ স্তবকে পুত্রের জন্য নির্দেশনা, পঞ্চম স্তবকে বিপ্লবের চিরন্তনতা — এই ক্রমিক কাঠামো কবিতাটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ শেষ ইচ্ছের রূপ দিয়েছে। শেষের পঙ্ক্তি “বিপ্লব দীর্ঘজীবী হয়েছে / বিপ্লব চিরজীবী হয়েছে” কবিতাটিকে একটি বিপ্লবী মাত্রা দিয়েছে।
শব্দচয়ন ও শৈলীগত বিশেষত্ব
নবারুণ ভট্টাচার্যের ভাষা বলিষ্ঠ ও প্রতীকী। এখানে তিনি ব্যবহার করেছেন — ‘শব্দ দিয়ে তৈরি বাড়ি’, ‘কান্নায় ভেঙে পড়া’, ‘বাড়ির আয়না’, ‘আকাশ দেওয়াল’, ‘চিমনির ধোঁয়া’, ‘লেখার টেবিল’, ‘ঠান্ডা পেপারওয়েট’, ‘কালো ভেলভেটের পিনকুশন’, ‘থরথর করে কাঁপা’, ‘স্মৃতি কমরেড’, ‘প্রথম অক্ষর’, ‘মানুষ রোদ্দুর তারাদের ভালোবাসা’, ‘কঠিন অঙ্ক’, ‘বিপ্লবের অ্যালজেব্রা’, ‘মিছিলে হাঁটা’, ‘পাথুরে জমিতে আর ঘাসে’, ‘সমস্ত মৃত্যু অতিক্রম’, ‘সমস্ত অন্ধকার অস্বীকার’, ‘বিপ্লব চিরজীবী’।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য
“শেষ ইচ্ছে” কবিতাটি নবারুণ ভট্টাচার্যের এক অসাধারণ সৃষ্টি। কবি প্রথমে বলেছেন — তাঁর শব্দের তৈরি বাড়ি কান্নায় ভেঙে পড়বে, আয়না তাঁকে মুছে ফেলবে, দেওয়ালে ছবি থাকবে না। কিন্তু তখন আকাশ হবে তাঁর দেওয়াল, চাঁদ হবে পেপারওয়েট, তারা ফোটানো থাকবে পিনকুশনে। তিনি স্ত্রীকে বলেছেন — তাঁর স্মৃতি আঁকড়ে থাকতে হবে না, নিজের জীবন গড়ে নিতে হবে, তাঁর স্মৃতি হবে কমরেড। তিনি পুত্রকে মানুষ, রোদ্দুর ও তারাদের ভালোবাসতে শেখাতে বলেছেন। পুত্র বিপ্লবের অ্যালজেব্রা তাঁকে শেখাবে, তাঁকে হাঁটতে শেখাবে মিছিলে। শেষে তিনি বলেছেন — তাঁর মরে যাওয়া বড় কথা নয়, কারণ বিপ্লব সব মৃত্যুকে অতিক্রম করে চিরজীবী হয়।
এই কবিতা আমাদের শেখায় — ব্যক্তির মৃত্যু অনিবার্য, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি, তাঁর আদর্শ, তাঁর বিশ্বাস চিরকাল বেঁচে থাকে। নবারুণ ভট্টাচার্যের জীবনের শেষ বার্তা এটি — বিপ্লব চিরজীবী।
শেষ ইচ্ছে কবিতায় ব্যবহৃত প্রতীক ও চিহ্নের গভীর বিশ্লেষণ
শব্দের তৈরি বাড়ির প্রতীকী তাৎপর্য
শব্দের তৈরি বাড়ি — কবির সৃষ্ট সাহিত্য, তাঁর কবিতা-গল্প-উপন্যাসের সমষ্টি। এই বাড়ি কান্নায় ভেঙে পড়বে — শোক আসবে, কিন্তু সেই শোকও সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসারই প্রকাশ ।
আকাশ দেওয়ালের প্রতীকী তাৎপর্য
পার্থিব দেওয়ালের বদলে আকাশ দেওয়াল — মৃত্যুর পর কবি মহাজাগতিক মাত্রায় পৌঁছে যান। সেখানে তাঁর সীমাহীন জায়গা।
চিমনির ধোঁয়ায় পাখিদের নাম লেখার প্রতীকী তাৎপর্য
চিমনির ধোঁয়া — মানুষের বসতির প্রতীক। পাখিরা সেই ধোঁয়া দিয়ে নাম লেখে — প্রকৃতি ও মানবসভ্যতা মিলে তাঁকে স্মরণ করবে ।
চাঁদ পেপারওয়েট ও তারা ফোটানো পিনকুশনের প্রতীকী তাৎপর্য
চাঁদ পেপারওয়েট, তারা ফোটানো পিনকুশনে — মৃত্যুর পরও তাঁর সৃষ্টি থেমে থাকবে না। তিনি মহাজাগতিক মাত্রায় সৃষ্টি চালিয়ে যাবেন ।
হাত কাঁপা না কাঁপার প্রতীকী তাৎপর্য
মৃত্যুর কথা লিখতে গিয়ে হাত না কাঁপা — মৃত্যুকে মেনে নেওয়া, ভয় না পাওয়া। প্রথম প্রেমের সময় হাত কাঁপা — জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তের স্মৃতি।
স্মৃতি কমরেডের প্রতীকী তাৎপর্য
স্মৃতি যেন বোঝা না হয়ে বন্ধু হয়, সহযোদ্ধা হয়। কবি চান তাঁর স্মৃতি স্ত্রীর জীবনে শক্তি জোগাক, পথ দেখাক ।
প্রথম অক্ষর শেখানোর প্রতীকী তাৎপর্য
প্রথম অক্ষর শেখানো মানে জীবনশিক্ষার সূচনা। সেই প্রথম শিক্ষায় মানুষ, প্রকৃতি ও তারাদের ভালোবাসা দেওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ।
বিপ্লবের অ্যালজেব্রার প্রতীকী তাৎপর্য
বিপ্লবের জটিলতা, তার সূত্র, তার গাণিতিক নিশ্চয়তা। কবি আশা করেন তাঁর পুত্র তাঁকে এই অ্যালজেব্রা শেখাবে — অর্থাৎ নতুন প্রজন্ম পথ দেখাবে।
পাথুরে জমি ও ঘাসের প্রতীকী তাৎপর্য
পাথুরে জমি কঠিন সংগ্রামের প্রতীক, ঘাস সহজ পথের প্রতীক। সব ধরনের পথে, সব ধরনের সংগ্রামে কবিকে হাঁটতে শেখাবে পুত্র।
দোষ না বলা ও না বকা-র প্রতীকী তাৎপর্য
দোষগুলো জানানো দরকার, কিন্তু সেই দোষের জন্য গালি দেওয়া ঠিক নয়। দোষ থেকে শিক্ষা নিয়ে এগিয়ে যাওয়াই আসল কথা ।
বিপ্লব চিরজীবী হওয়ার প্রতীকী তাৎপর্য
এটি কবিতার চূড়ান্ত প্রতীক। ব্যক্তি মরে, কিন্তু বিপ্লব বেঁচে থাকে। নবারুণ ভট্টাচার্যের জীবনদর্শনের মূল সুর এটি — বিপ্লব চিরন্তন ।
নবারুণ ভট্টাচার্যের সাহিত্যিক শৈলী ও দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি
নবারুণ ভট্টাচার্য ছিলেন আদ্যপান্ত রাজনৈতিক মানুষ, প্রবলভাবে প্রগতিশীল ও সমালোচক [citation:9]। তিনি নিজেকে বলতেন “আমি একজন অ্যাকটিভিস্ট” [citation:6]। তাঁর লেখাকে তিনি রাজনৈতিক অ্যাক্টিভিসমের অংশ মনে করতেন [citation:6]।
তাঁর লেখায় উঠে আসে সমসাময়িক ঘটনার শ্লেষ, বিদ্রোহ, আকণ্ঠ সত্যতা [citation:9]। পুঁজিবাদী কাঠামোর বিরোধী ছিলেন তিনি, ‘হারবার্ট’, ‘কাঙাল মালসাট’, ‘খেলনা নগর’, ‘লুব্ধক’ প্রভৃতি উপন্যাস প্রণালীতে এইসব চিত্র পরিস্কার ফুটে ওঠে [citation:9]। তিনি সাম্রাজ্যবাদের ঘোরতর বিরোধী ছিলেন, কমিউনিস্ট হলেও সমালোচনা করেছেন বামপন্থার কাঠামো, ক্ষমতার ব্যবহার, অবস্থান, নীতি নিয়ে [citation:9]।
তিনি মানুষের মুখের ভাষা তথা রাস্তাঘাটের তথাকথিত জীবন যেভাবে তাঁর লেখায় উঠে এসেছে, সেই রচনাশৈলী যেন এক বিশেষ ধারার জন্ম দিয়েছিল [citation:9]। তাঁর রচনাকে বলা হয়েছে “জীর্ণ সভ্যতার ভিতর বারুদের দলিল” [citation:9]।
শেষ ইচ্ছে কবিতার আত্মজৈবনিক তাৎপর্য
নবারুণ ভট্টাচার্য ২০১৪ সালের ৩১ জুলাই আন্ত্রিক ক্যান্সারে মৃত্যুবরণ করেন [citation:1][citation:3][citation:9]। “শেষ ইচ্ছে” কবিতাটি তাঁর মৃত্যুর আগে লেখা, যা তাঁর শেষ বার্তা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কবিতায় তিনি তাঁর স্ত্রী ও পুত্রের জন্য নির্দেশনা রেখে গেছেন। তিনি স্ত্রীকে বলেছেন নিজের জীবন গড়ে নিতে, স্মৃতিকে কমরেড বানাতে। তিনি পুত্রকে মানুষ, প্রকৃতি ও তারাদের ভালোবাসতে শেখাতে বলেছেন। তিনি পুত্রের কাছ থেকে বিপ্লবের অ্যালজেব্রা শেখার আশা করেছেন।
কবিতার শেষ লাইন — “বিপ্লব দীর্ঘজীবী হয়েছে / বিপ্লব চিরজীবী হয়েছে” — তাঁর আজীবন লালিত বিশ্বাসের প্রতিফলন। তিনি জানতেন তাঁর মৃত্যু আসন্ন, কিন্তু তাঁর বিশ্বাস কখনও হটেনি।
শিক্ষামূলক গুরুত্ব ও পাঠ্যক্রমিক স্থান
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাংলা সাহিত্যের পাঠ্যক্রমে এই কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত হওয়ার যোগ্য। এটি শিক্ষার্থীদের নবারুণ ভট্টাচার্যের কবিতার বিশেষত্ব, মৃত্যু ও বিপ্লবের দার্শনিক গভীরতা এবং আধুনিক বাংলা কবিতার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বুঝতে সাহায্য করে।
সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা
আজকের পৃথিবীতেও এই কবিতাটি অসম্পূর্ণ প্রাসঙ্গিক। ব্যক্তির মৃত্যু অনিবার্য, কিন্তু তার আদর্শ, তার বিশ্বাস, তার সৃষ্টি চিরকাল বেঁচে থাকে। নবারুণ ভট্টাচার্যের এই কবিতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় — বিপ্লব চিরজীবী।
সম্পর্কিত কবিতা ও সাহিত্যকর্ম
নবারুণ ভট্টাচার্যের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কবিতার মধ্যে রয়েছে ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না’, ‘পুলিশ করে মানুষ শিকার’, ‘রাতের সার্কাস’ প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলি [citation:1][citation:3]। তাঁর ‘হারবার্ট’ উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ [citation:1][citation:3]।
শেষ ইচ্ছে কবিতা সম্পর্কে প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: শেষ ইচ্ছে কবিতাটির লেখক কে?
এই কবিতাটির লেখক নবারুণ ভট্টাচার্য। তিনি ১৯৪৮ সালের ২৩ জুন বহরমপুরে জন্মগ্রহণকারী একজন বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি কবি ও কথাসাহিত্যিক [citation:1][citation:3]।
প্রশ্ন ২: শেষ ইচ্ছে কবিতাটির মূল বিষয়বস্তু কী?
এই কবিতার মূল বিষয়বস্তু হলো মৃত্যুর প্রাক্কালে প্রিয় মানুষ ও আদর্শের প্রতি শেষ বার্তা। কবি দেখিয়েছেন — শব্দের তৈরি বাড়ি কান্নায় ভেঙে পড়বে, কিন্তু আকাশ হবে দেওয়াল, চাঁদ হবে পেপারওয়েট। তিনি স্ত্রীকে স্মৃতি আঁকড়ে না থেকে নিজের জীবন গড়তে বলেছেন। পুত্রকে মানুষ, প্রকৃতি ও তারাদের ভালোবাসতে শেখাতে বলেছেন। শেষে তিনি বলেছেন — তাঁর মৃত্যু বড় কথা নয়, বিপ্লব চিরজীবী হবে ।
প্রশ্ন ৩: ‘আমি শব্দ দিয়ে যে বাড়িটি তৈরি করেছি’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
শব্দ দিয়ে তৈরি বাড়ি — কবির সৃষ্ট সাহিত্য, তাঁর কবিতা-গল্প-উপন্যাস। তিনি তাঁর লেখার মাধ্যমে এক বিশাল সৃষ্টিজগৎ তৈরি করেছেন [citation:4]।
প্রশ্ন ৪: ‘আকাশ আমার দেওয়াল’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
মৃত্যুর পর পার্থিব দেওয়ালের বদলে আকাশই তাঁর দেওয়াল হবে। এটি মহাজাগতিক মাত্রায় পৌঁছে যাওয়ার প্রতীক [citation:4]।
প্রশ্ন ৫: ‘আমার স্মৃতি তোমার কমরেড’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
কমরেড মানে বন্ধু, সহযোদ্ধা। কবি চান না তাঁর স্মৃতি স্ত্রীর জীবনে বোঝা হয়ে থাকুক। বরং তাঁর স্মৃতি যেন তাঁর নতুন জীবনের সঙ্গী হয়, সহায়তা করে, শক্তি দেয় [citation:4]।
প্রশ্ন ৬: ‘ওকে মানুষ, রোদ্দুর আর তারাদের ভালোবাসতে শিখিও’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
মানুষকে ভালোবাসা, রোদ্দুর ও তারাদের ভালোবাসা — অর্থাৎ মানবতা ও প্রকৃতিকে ভালোবাসা। পুত্রকে প্রথম অক্ষর শেখানোর সময় এই শিক্ষাটা দেওয়া সবচেয়ে জরুরি [citation:4]।
প্রশ্ন ৭: ‘বিপ্লবের অ্যালজেব্রা’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘বিপ্লবের অ্যালজেব্রা’ — বিপ্লবের গাণিতিক সূত্র, তার জটিলতা। নবারুণ ভট্টাচার্য আজীবন বিপ্লবী চেতনায় বিশ্বাসী ছিলেন এবং তাঁর লেখাকে রাজনৈতিক অ্যাক্টিভিসমের অংশ মনে করতেন [citation:6]।
প্রশ্ন ৮: ‘বিপ্লব চিরজীবী হয়েছে’ — শেষ পঙ্ক্তির তাৎপর্য কী?
এটি কবিতার চূড়ান্ত বাণী। ব্যক্তির মৃত্যু অনিবার্য, কিন্তু বিপ্লব চিরন্তন। নবারুণ ভট্টাচার্যের এই লাইন তাঁর সারাজীবনের বিশ্বাসের প্রতিফলন। তিনি বিপ্লবকে প্রত্যক্ষ প্রয়োজনীয়তা বলে মনে করতেন [citation:6]।
প্রশ্ন ৯: নবারুণ ভট্টাচার্যের প্রথম কাব্যগ্রন্থ কোনটি?
নবারুণ ভট্টাচার্যের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না’ ১৯৭২ সালে প্রকাশিত হয় [citation:3]।
প্রশ্ন ১০: নবারুণ ভট্টাচার্যের বিখ্যাত উপন্যাস কোনটি?
নবারুণ ভট্টাচার্যের বিখ্যাত উপন্যাস ‘হারবার্ট’ ১৯৯২ সালে প্রকাশিত হয়। এই উপন্যাসের জন্য তিনি সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার (১৯৯৭) ও বঙ্কিম পুরস্কার (১৯৯৬) লাভ করেন [citation:1][citation:3]।
প্রশ্ন ১১: নবারুণ ভট্টাচার্য সম্পর্কে সংক্ষেপে বলুন।
নবারুণ ভট্টাচার্য (১৯৪৮-২০১৪) একজন বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি কবি ও কথাসাহিত্যিক [citation:1][citation:3]। তিনি ছিলেন নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্য ও কথাসাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবীর পুত্র [citation:1][citation:3]। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না’ ১৯৭২ সালে প্রকাশিত হয় [citation:3]। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘হারবার্ট’ [citation:1][citation:3]। তিনি সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার (১৯৯৭) ও বঙ্কিম পুরস্কার (১৯৯৬) লাভ করেন [citation:1]। তিনি আজীবন বিপ্লবী চেতনায় বিশ্বাসী ছিলেন এবং ২০১৪ সালের ৩১ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন [citation:1][citation:3][citation:9]।
ট্যাগস: শেষ ইচ্ছে, নবারুণ ভট্টাচার্য, নবারুণ ভট্টাচার্যের কবিতা, শেষ ইচ্ছে কবিতা নবারুণ ভট্টাচার্য, আধুনিক বাংলা কবিতা, বিপ্লবের কবিতা, মৃত্যুর কবিতা, হারবার্টের কবি
© Kobitarkhata.com – কবি: নবারুণ ভট্টাচার্য | কবিতার প্রথম লাইন: “আমি মরে গেলে / আমি শব্দ দিয়ে যে বাড়িটি তৈরি করেছি / সেটা কান্নায় ভেঙে পড়বে / তাতে অবাক হবার কিছু নেই” | বাংলা বিপ্লবের কবিতা বিশ্লেষণ





