কবিতার খাতা
- 29 mins
যুগলসন্ধি – আবুল হাসান।
দেখা হলো যদি আমাদের দুর্দিনে
আমি চুম্বনে চাইব না অমরতা!
আমাদের প্রেম হোক বিষে জর্জর
সর্পচূড়ায় আমরা তো বাঁধি বাসা।
থাকুক দু’চোখে দুর্ভিক্ষের দাহ,
ঝরুক আবার আন্ধার আধিব্যাধি
আমাদের প্রেম না পেল কবির ভাষা
কাব্যচূড়ায় আমরা তো বাঁধি বাসা।
আমি খুঁড়ব না দু’চোখে দীর্ঘ জল,
ভাঙা যৌবন চিৎকার যদি করে,
কাজ নেই আর উল্টো নদীর বেগে,
অনাবেগে হোক আমাদের যাওয়া আসা!
কাজ নেই আর আবেগের কড়চায়
ভুলে যাও কবে ফুটত বকুল ফুল।
না হয় আমিই হব তার প্রতিনিধি
ক্ষতি কী, তুমি তো আছই বকুলতলা!
আমি যদি চাই যেতে ফের দক্ষিণে
তুমি বলে দিও ঘরে বাড়ন্ত চাল!
শুনব না আর নকল নদীর গান,
তার চেয়ে তুমি কাঁকনে কাঁদন তুলো!
বিঁধুক এ বুক তোমাতে কান্নাময়!
আমি নিষেধের অঙ্গুলি তুলব না,
অকালের প্রেমে শুভকাল হলে হোক
আমাদের ক্ষণজীবনের ক্ষণক্রন্দন!
দেখা হলো যদি আমাদের দুর্দিনে
আমি চুম্বনে চাইব না অমরতা!
আমাদের প্রেম হোক বিষে জর্জর
সর্পচূড়ায় আমরা তো বাঁধি বাসা!
ফুটুক তোমার অঙ্গে অগ্নিফুল
ক্ষতি কী, শরীরগ্রন্থিতে গেঁথে নেব
আমাদের প্রেম না পেল কবির ভাষা
কাব্যচূড়ায় আমরা তো বাঁধি বাসা।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। আবুল হাসান।
যুগলসন্ধি – আবুল হাসান | যুগলসন্ধি কবিতা | আবুল হাসানের কবিতা | বাংলা কবিতা
যুগলসন্ধি: আবুল হাসানের প্রেম, দুর্দিন ও চিরন্তন মিলনের অসাধারণ কাব্যভাষা
আবুল হাসানের “যুগলসন্ধি” কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের একটি অনন্য সৃষ্টি, যা প্রেম, দুর্দিন, মিলন ও চিরন্তনতার এক গভীর দার্শনিক চিন্তাকে ধারণ করেছে। “দেখা হলো যদি আমাদের দুর্দিনে আমি চুম্বনে চাইব না অমরতা” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে এক অসাধারণ প্রেমের দর্শন, যেখানে প্রেম সুখের নয়, বরং দুর্দিনের, বিষের, জর্জরিত হওয়ার। আবুল হাসান (১৯৪৭-১৯৭৫) বাংলা কবিতার এক কিংবদন্তি কবি, যিনি ‘রাজা যায় রাজা আসে’ খ্যাত এই কবি মাত্র ২৮ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করলেও বাংলা কবিতায় এক অনন্য স্থান দখল করে আছেন। তার কবিতায় প্রেম, মৃত্যু, সময় ও অস্তিত্বের গভীর চিন্তা ফুটে ওঠে। “যুগলসন্ধি” তার একটি বহুপঠিত কবিতা যা প্রেমের চিরন্তনতা ও দুর্দিনের মিলনের এক অসাধারণ কাব্যভাষা তৈরি করেছে।
আবুল হাসান: অকালপ্রয়াত কিংবদন্তি কবি
আবুল হাসান (১৯৪৭-১৯৭৫) বাংলা কবিতার এক কিংবদন্তি কবি। তিনি ১৯৪৭ সালের ৪ আগস্ট বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। মাত্র ২৮ বছর বয়সে ১৯৭৫ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘রাজা যায় রাজা আসে’ (১৯৭২) তাকে অমর করে রেখেছে। তার অন্যান্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘যে পারে চৌরাস্তার মোড়ে’, ‘প্রতিমা ও প্রতিবিম্ব’, ‘বিধ্বস্ত ক্রন্দনে আমার’ প্রভৃতি। তার কবিতায় প্রেম, মৃত্যু, সময় ও অস্তিত্বের গভীর চিন্তা ফুটে ওঠে। “যুগলসন্ধি” তার একটি বহুপঠিত কবিতা যা প্রেমের চিরন্তনতা ও দুর্দিনের মিলনের এক অসাধারণ কাব্যভাষা তৈরি করেছে।
যুগলসন্ধি কবিতার বিস্তারিত বিশ্লেষণ
কবিতার শিরোনামের তাৎপর্য
“যুগলসন্ধি” শিরোনামটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ‘যুগল’ মানে দুইজন, জুটি। ‘সন্ধি’ মানে মিলন, সংযোগ। যুগলসন্ধি অর্থ দুইয়ের মিলন, দুই প্রেমিকের মিলন। কিন্তু এই মিলন সাধারণ মিলন নয় — এটি সন্ধিক্ষণের মিলন, সংকটের মিলন, দুর্দিনের মিলন। শিরোনামেই কবি ইঙ্গিত দিয়েছেন — এই কবিতা সুখের প্রেম নিয়ে নয়, বরং কঠিন সময়ের প্রেম নিয়ে।
প্রথম স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“দেখা হলো যদি আমাদের দুর্দিনে / আমি চুম্বনে চাইব না অমরতা! / আমাদের প্রেম হোক বিষে জর্জর / সর্পচূড়ায় আমরা তো বাঁধি বাসা।” প্রথম স্তবকে কবি প্রেমের এক অনন্য দর্শন দিয়েছেন। তিনি বলছেন — যদি দুর্দিনে দেখা হয়, তবে তিনি চুম্বনে অমরতা চাইবেন না। সাধারণ প্রেমে মানুষ চায় চিরন্তনতা, অমরতা। কিন্তু এখানে কবি চান না অমরতা। তিনি চান তাদের প্রেম হোক বিষে জর্জর — অর্থাৎ বিষে জর্জরিত, কষ্টে পূর্ণ। তারা সর্পচূড়ায় বাসা বাঁধবেন — সাপের মাথায়, বিপদের মধ্যে। এটি প্রেমের এক বিপরীতধর্মী চিন্তা — প্রেম সুখের নয়, দুঃখের; প্রেম শান্তির নয়, বিপদের।
দুর্দিনে দেখা হওয়ার তাৎপর্য
দুর্দিন — কঠিন সময়, সংকটের সময়। কবি বলছেন, যদি দুর্দিনে তাদের দেখা হয়, তবে তিনি চুম্বনে অমরতা চাইবেন না। অর্থাৎ সুখের প্রেম নয়, দুঃখের প্রেম তারা করবেন। সংকটের সময় প্রেম আরও গভীর হয়, আরও অর্থবহ হয়। সাধারণ সময়ের প্রেম ভাসা ভাসা হতে পারে, কিন্তু দুর্দিনের প্রেম চিরন্তন।
বিষে জর্জর প্রেমের তাৎপর্য
বিষে জর্জর — বিষে জর্জরিত। প্রেমকে তারা বিষে জর্জরিত করতে চান। অর্থাৎ প্রেম হবে কষ্টের, যন্ত্রণার, বেদনার। কিন্তু সেই কষ্টই তাদের প্রেমকে গভীর করবে, শক্তিশালী করবে। সাধারণ প্রেম সুখ চায়, কিন্তু এই প্রেম সুখ চায় না, চায় বেদনা।
সর্পচূড়ায় বাসা বাঁধার তাৎপর্য
সর্পচূড়া — সাপের মাথা। সাপের মাথায় বাসা বাঁধা মানে বিপদের মধ্যে আশ্রয় নেওয়া। সাপের মাথা বিপজ্জনক, কিন্তু তারা সেখানেই বাসা বাঁধবেন। অর্থাৎ তারা বিপদকে আলিঙ্গন করবেন, বিপদের মধ্যেই প্রেম গড়বেন। এটি প্রেমের এক অসাধারণ দর্শন — বিপদকে এড়িয়ে নয়, বিপদকে আলিঙ্গন করে প্রেম গড়া।
দ্বিতীয় স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“থাকুক দু’চোখে দুর্ভিক্ষের দাহ, / ঝরুক আবার আন্ধার আধিব্যাধি / আমাদের প্রেম না পেল কবির ভাষা / কাব্যচূড়ায় আমরা তো বাঁধি বাসা।” দ্বিতীয় স্তবকে কবি প্রেমের আরও গভীরতা এনেছেন। তিনি বলেন — থাকুক দু’চোখে দুর্ভিক্ষের দাহ। দুর্ভিক্ষের দাহ — ক্ষুধার জ্বালা, অভাবের যন্ত্রণা। তিনি চান না সুখের অশ্রু, তিনি চান দুর্ভিক্ষের দাহ। ঝরুক আবার আন্ধার আধিব্যাধি — অন্ধকার ও মানসিক রোগ ঝরুক। অর্থাৎ দুঃখ, কষ্ট, অন্ধকার সব কিছু ঝরুক। তাদের প্রেম না পেল কবির ভাষা — অর্থাৎ কবির ভাষা না পেলেও, কাব্যিক সৌন্দর্য না পেলেও, তারা কাব্যচূড়ায় বাসা বাঁধবেন। ‘কাব্যচূড়া’ — কবিতার চূড়া, সাহিত্যের শীর্ষ। সেখানেই তারা বাসা বাঁধবেন।
দুর্ভিক্ষের দাহ ও আন্ধার আধিব্যাধির তাৎপর্য
দুর্ভিক্ষের দাহ — ক্ষুধার জ্বালা, অভাবের যন্ত্রণা। আন্ধার আধিব্যাধি — অন্ধকার ও মানসিক রোগ। কবি চান এই সব কষ্ট তাদের জীবনেও থাকুক। তারা সুখ চান না, তারা চান কষ্ট। কারণ কষ্টই প্রেমকে গভীর করে, কষ্টই প্রেমকে চিরন্তন করে।
কবির ভাষা না পাওয়ার তাৎপর্য
তাদের প্রেম না পেল কবির ভাষা — অর্থাৎ তাদের প্রেম কবিতার ভাষা পায়নি, সাহিত্যে স্থান পায়নি। কিন্তু তারা কাব্যচূড়ায় বাসা বাঁধবেন — কবিতার চূড়ায়, সাহিত্যের শীর্ষে। এই দ্বন্দ্ব অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। হয়তো কবি বলতে চান — তাদের প্রেম অজ্ঞাত, অচেনা, কিন্তু তবুও তা মহৎ।
তৃতীয় স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“আমি খুঁড়ব না দু’চোখে দীর্ঘ জল, / ভাঙা যৌবন চিৎকার যদি করে, / কাজ নেই আর উল্টো নদীর বেগে, / অনাবেগে হোক আমাদের যাওয়া আসা!” তৃতীয় স্তবকে কবি আবেগের বিপরীতের কথা বলেছেন। তিনি খুঁড়বেন না দু’চোখে দীর্ঘ জল — অর্থাৎ তিনি কাঁদবেন না, অশ্রু ফেলবেন না। ভাঙা যৌবন চিৎকার করলেও তিনি পাত্তা দেবেন না। কাজ নেই আর উল্টো নদীর বেগে — তিনি নদীর উল্টো স্রোতে যাবেন না। অনাবেগে হোক তাদের যাওয়া আসা — আবেগ ছাড়া, শান্তভাবে, নির্বিকারভাবে তাদের জীবন চলুক।
অনাবেগের তাৎপর্য
‘অনাবেগ’ শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আবেগ মানে উত্তেজনা, অনুভূতি। অনাবেগ মানে আবেগহীনতা, নির্বিকার অবস্থা। কবি চান তাদের যাওয়া আসা হোক অনাবেগে — অর্থাৎ আবেগের উত্তাল না হয়ে, শান্তভাবে, নির্বিকারভাবে। এটি প্রেমের এক উচ্চমার্গীয় অবস্থা — যেখানে আবেগের বন্যাও তাদের টলাতে পারে না।
চতুর্থ স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“কাজ নেই আর আবেগের কড়চায় / ভুলে যাও কবে ফুটত বকুল ফুল। / না হয় আমিই হব তার প্রতিনিধি / ক্ষতি কী, তুমি তো আছই বকুলতলা!” চতুর্থ স্তবকে কবি বকুল ফুলের উল্লেখ করেছেন। কাজ নেই আবেগের কড়চায় — আবেগের আলোচনায় কাজ নেই। ভুলে যাও কবে ফুটত বকুল ফুল — বকুল ফুল ফোটার সময় ভুলে যাও। না হয় আমিই হব তার প্রতিনিধি — বকুল ফুলের প্রতিনিধি তিনি হবেন। ক্ষতি কী, তুমি তো আছই বকুলতলা — প্রিয়া আছেন বকুলতলায়।
বকুল ফুলের তাৎপর্য
বকুল ফুল ছোট, সাদা, সুগন্ধি ফুল। এটি প্রেমের প্রতীক। কবি বলছেন — বকুল ফুল ফোটার সময় ভুলে যাও। অর্থাৎ প্রেমের প্রচলিত রূপ ভুলে যাও। তিনি নিজেই হবেন বকুল ফুলের প্রতিনিধি। আর প্রিয়া আছেন বকুলতলায় — বকুল গাছের নিচে। এই চিত্রকল্প অত্যন্ত সুন্দর — কবি নিজেই প্রেমের প্রতীক, আর প্রিয়া সেই প্রেমের আশ্রয়ে।
পঞ্চম স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“আমি যদি চাই যেতে ফের দক্ষিণে / তুমি বলে দিও ঘরে বাড়ন্ত চাল! / শুনব না আর নকল নদীর গান, / তার চেয়ে তুমি কাঁকনে কাঁদন তুলো!” পঞ্চম স্তবকে কবি দক্ষিণে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তিনি যদি দক্ষিণে যেতে চান, প্রিয়া যেন বলে দেন ঘরে বাড়ন্ত চাল — অর্থাৎ ফিরে আসার পথ। তিনি শুনবেন না আর নকল নদীর গান — ভেজাল, কৃত্রিম কিছু নয়। তার চেয়ে প্রিয়া কাঁকনে কাঁদন তুলুন — কাঁকন বাজিয়ে কান্নার সুর তুলুন।
দক্ষিণের তাৎপর্য
দক্ষিণ — দক্ষিণ দিক। কবি যদি দক্ষিণে যেতে চান, প্রিয়া তাকে ফিরিয়ে আনবেন। দক্ষিণ হয়তো মৃত্যুর প্রতীক, অজানার প্রতীক। কবি মৃত্যুতে যেতে চাইলেও প্রিয়া তাকে ফিরিয়ে আনবেন।
নকল নদীর গানের তাৎপর্য
নকল নদীর গান — কৃত্রিম, ভেজাল কিছু। কবি সেসব শুনবেন না। তিনি চান প্রিয়ার কাঁকনের কাঁদন — প্রকৃত, সত্যিকারের কিছু। কাঁকনের শব্দ প্রিয়ার উপস্থিতির প্রতীক, তার সান্নিধ্যের প্রতীক।
ষষ্ঠ স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“বিঁধুক এ বুক তোমাতে কান্নাময়! / আমি নিষেধের অঙ্গুলি তুলব না, / অকালের প্রেমে শুভকাল হলে হোক / আমাদের ক্ষণজীবনের ক্ষণক্রন্দন!” ষষ্ঠ স্তবকে কবি প্রিয়ার প্রতি সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করেছেন। তার বুক বিঁধুক প্রিয়াতে কান্নাময় — অর্থাৎ প্রিয়ার জন্য তার বুক কাঁদুক। তিনি নিষেধের অঙ্গুলি তুলবেন না — তিনি কিছু নিষেধ করবেন না। অকালের প্রেমে শুভকাল হলে হোক — অসময়ে প্রেম করলেও তা শুভ হোক। তাদের ক্ষণজীবনের ক্ষণক্রন্দন — ক্ষণস্থায়ী জীবনের ক্ষণস্থায়ী ক্রন্দন।
অকালের প্রেম ও শুভকালের তাৎপর্য
অকালের প্রেম — অসময়ের প্রেম, যে প্রেমের সময় হয়নি। কিন্তু কবি চান সেই অকালের প্রেমও শুভকাল হোক — অর্থাৎ তা শুভ হোক, সফল হোক। এটি প্রেমের প্রতি এক গভীর আস্থার প্রকাশ। সময় বাঁধা দিলেও প্রেম জয়ী হবে।
ক্ষণজীবনের ক্ষণক্রন্দনের তাৎপর্য
ক্ষণজীবন — ক্ষণস্থায়ী জীবন। মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী। সেই ক্ষণস্থায়ী জীবনে তাদের ক্রন্দনও ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু সেই ক্ষণস্থায়ী ক্রন্দনই তাদের প্রেমের পরিচয়।
সপ্তম স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“দেখা হলো যদি আমাদের দুর্দিনে / আমি চুম্বনে চাইব না অমরতা! / আমাদের প্রেম হোক বিষে জর্জর / সর্পচূড়ায় আমরা তো বাঁধি বাসা!” সপ্তম স্তবকে প্রথম স্তবকের পুনরাবৃত্তি হয়েছে। এটি কবিতাকে একটি চক্রাকার রূপ দিয়েছে। দুর্দিনে দেখা, চুম্বনে অমরতা না চাওয়া, বিষে জর্জর প্রেম, সর্পচূড়ায় বাসা — এই ভাবনাগুলো বারবার ফিরে এসেছে।
অষ্টম স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“ফুটুক তোমার অঙ্গে অগ্নিফুল / ক্ষতি কী, শরীরগ্রন্থিতে গেঁথে নেব / আমাদের প্রেম না পেল কবির ভাষা / কাব্যচূড়ায় আমরা তো বাঁধি বাসা।” অষ্টম স্তবকে কবি প্রিয়ার অঙ্গে অগ্নিফুল ফুটতে বলেছেন। অগ্নিফুল — আগুনের ফুল, লাল ফুল, বিপদের প্রতীক। ক্ষতি কী — তিনি তাতে রাজি। তিনি সেই ফুল শরীরগ্রন্থিতে গেঁথে নেবেন। তাদের প্রেম না পেল কবির ভাষা — কবিতার ভাষা না পেলেও তারা কাব্যচূড়ায় বাসা বাঁধবেন।
অগ্নিফুলের তাৎপর্য
অগ্নিফুল — আগুনের ফুল, লাল ফুল, বিপদের প্রতীক। প্রিয়ার অঙ্গে অগ্নিফুল ফুটুক — অর্থাৎ সে বিপদে পড়ুক, কষ্ট পাক। কবি তাতে রাজি। তিনি সেই বিপদকেই আলিঙ্গন করবেন, সেই ফুল শরীরগ্রন্থিতে গেঁথে নেবেন। এটি প্রেমের এক চরম পর্যায় — যেখানে প্রিয়ার কষ্টও প্রিয়।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য
“যুগলসন্ধি” কবিতাটি প্রেমের এক অনন্য দর্শন দিয়েছে। সাধারণ প্রেম সুখ চায়, শান্তি চায়, চিরন্তনতা চায়। কিন্তু এই কবিতার প্রেম চায় দুর্দিন, চায় বিষ, চায় সর্পচূড়া, চায় অগ্নিফুল। এই প্রেম সুখের নয়, দুঃখের; শান্তির নয়, বিপদের। কিন্তু এই বিপদের মধ্যেই প্রেম গভীর হয়, চিরন্তন হয়। কবি বারবার বলেছেন — তাদের প্রেম না পেল কবির ভাষা, তবুও তারা কাব্যচূড়ায় বাসা বাঁধবেন। অর্থাৎ এই প্রেম অজ্ঞাত, অচেনা, কিন্তু মহৎ। এটি আবুল হাসানের প্রেম-দর্শনের এক অসাধারণ প্রকাশ।
যুগলসন্ধি কবিতা সম্পর্কে প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: যুগলসন্ধি কবিতার লেখক কে?
যুগলসন্ধি কবিতার লেখক আবুল হাসান (১৯৪৭-১৯৭৫)। তিনি বাংলা কবিতার এক কিংবদন্তি কবি। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘রাজা যায় রাজা আসে’ (১৯৭২) তাকে অমর করে রেখেছে। তার অন্যান্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘যে পারে চৌরাস্তার মোড়ে’, ‘প্রতিমা ও প্রতিবিম্ব’, ‘বিধ্বস্ত ক্রন্দনে আমার’ প্রভৃতি। মাত্র ২৮ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করলেও তিনি বাংলা কবিতায় এক অনন্য স্থান দখল করে আছেন।
প্রশ্ন ২: যুগলসন্ধি কবিতার মূল বিষয়বস্তু কী?
যুগলসন্ধি কবিতার মূল বিষয়বস্তু হলো প্রেমের এক অনন্য দর্শন — দুর্দিনের প্রেম, বিষে জর্জর প্রেম, বিপদের মধ্যে প্রেম গড়া। কবি বলেছেন — যদি দুর্দিনে দেখা হয়, তিনি চুম্বনে অমরতা চাইবেন না। তিনি চান তাদের প্রেম হোক বিষে জর্জর, তারা সর্পচূড়ায় বাসা বাঁধবেন। তিনি চান দুর্ভিক্ষের দাহ, আন্ধার আধিব্যাধি। তাদের প্রেম না পেল কবির ভাষা, তবু তারা কাব্যচূড়ায় বাসা বাঁধবেন।
প্রশ্ন ৩: ‘সর্পচূড়ায় আমরা তো বাঁধি বাসা’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘সর্পচূড়ায় আমরা তো বাঁধি বাসা’ — সর্পচূড়া মানে সাপের মাথা। সাপের মাথায় বাসা বাঁধা মানে বিপদের মধ্যে আশ্রয় নেওয়া। সাপের মাথা বিপজ্জনক, কিন্তু তারা সেখানেই বাসা বাঁধবেন। অর্থাৎ তারা বিপদকে আলিঙ্গন করবেন, বিপদের মধ্যেই প্রেম গড়বেন। এটি প্রেমের এক অসাধারণ দর্শন — বিপদকে এড়িয়ে নয়, বিপদকে আলিঙ্গন করে প্রেম গড়া।
প্রশ্ন ৪: ‘কাব্যচূড়ায় আমরা তো বাঁধি বাসা’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘কাব্যচূড়ায় আমরা তো বাঁধি বাসা’ — কাব্যচূড়া মানে কবিতার চূড়া, সাহিত্যের শীর্ষ। তাদের প্রেম না পেল কবির ভাষা — অর্থাৎ কবিতার ভাষা পায়নি, সাহিত্যে স্থান পায়নি। কিন্তু তারা কাব্যচূড়ায় বাসা বাঁধবেন — কবিতার চূড়ায়, সাহিত্যের শীর্ষে। এই দ্বন্দ্ব অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। হয়তো কবি বলতে চান — তাদের প্রেম অজ্ঞাত, অচেনা, কিন্তু তবুও তা মহৎ।
প্রশ্ন ৫: ‘অকালের প্রেমে শুভকাল হলে হোক’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘অকালের প্রেমে শুভকাল হলে হোক’ — অকালের প্রেম মানে অসময়ের প্রেম, যে প্রেমের সময় হয়নি। কবি চান সেই অকালের প্রেমও শুভকাল হোক — অর্থাৎ তা শুভ হোক, সফল হোক। এটি প্রেমের প্রতি এক গভীর আস্থার প্রকাশ। সময় বাঁধা দিলেও প্রেম জয়ী হবে — এই বিশ্বাস এখানে প্রকাশ পেয়েছে।
প্রশ্ন ৬: ‘ফুটুক তোমার অঙ্গে অগ্নিফুল’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘ফুটুক তোমার অঙ্গে অগ্নিফুল’ — অগ্নিফুল মানে আগুনের ফুল, লাল ফুল, বিপদের প্রতীক। প্রিয়ার অঙ্গে অগ্নিফুল ফুটুক — অর্থাৎ সে বিপদে পড়ুক, কষ্ট পাক। কবি তাতে রাজি — ‘ক্ষতি কী’ বলেছেন। তিনি সেই বিপদকেই আলিঙ্গন করবেন, সেই ফুল শরীরগ্রন্থিতে গেঁথে নেবেন। এটি প্রেমের এক চরম পর্যায় — যেখানে প্রিয়ার কষ্টও প্রিয়।
প্রশ্ন ৭: আবুল হাসান সম্পর্কে সংক্ষেপে বলুন।
আবুল হাসান (১৯৪৭-১৯৭৫) বাংলা কবিতার এক কিংবদন্তি কবি। তিনি ১৯৪৭ সালের ৪ আগস্ট বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। মাত্র ২৮ বছর বয়সে ১৯৭৫ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘রাজা যায় রাজা আসে’ (১৯৭২) তাকে অমর করে রেখেছে। তার কবিতায় প্রেম, মৃত্যু, সময় ও অস্তিত্বের গভীর চিন্তা ফুটে ওঠে।
ট্যাগস: যুগলসন্ধি, আবুল হাসান, আবুল হাসানের কবিতা, যুগলসন্ধি কবিতা, বাংলা কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, রাজা যায় রাজা আসে, প্রেমের কবিতা, দুর্দিনের প্রেম, সর্পচূড়া, কাব্যচূড়া





