কবিতার খাতা
- 17 mins
মন ভালো নেই – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।
মন ভালো নেই মন ভালো নেই মন ভালো নেই
কেউ তা বোঝে না সকলি গোপন মুখে ছায়া নেই
চোখ খোলা তবু চোখ বুজে আছি কেউ তা দেখেনি
প্রতিদিন কাটে দিন কেটে যায় আশায় আশায়
আশায় আশায় আশায় আশায়
এখন আমার ওষ্ঠে লাগে না কোনো প্রিয় স্বাদ
এমনকি নারী এমনকি নারী এমনকি নারী
এমনকি সুরা এমনকি ভাষা
মন ভালো নেই মন ভালো নেই মন ভালো নেই
বিকেল বেলায় একলা একলা পথে ঘুরে ঘুরে
একলা একলা পথে ঘুরে ঘুরে পথে ঘুরে ঘুরে
কিছুই খুঁজি না কোথাও যাই না কারুকে চাইনি
কিছুই খুঁজি না কোথাও যাই না
আমিও মানুষ আমার কী আছে অথবা কী ছিল
আমার কী আছে অথবা কী ছিল
ফুলের ভিতরে বীজের ভিতরে ঘুণের ভিতরে
যেমন আগুন আগুন আগুন আগুন আগুন
মন ভালো নেই মন ভালো নেই মন ভালো নেই
তবু দিন কাটে দিন কেটে যায় আশায় আশায়
আশায় আশায় আশায় আশায়—-
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।
মন ভালো নেই – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় | বাংলা কবিতা বিশ্লেষণ ও সংগ্রহ
মন ভালো নেই কবিতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ গাইড ও বিশ্লেষণ
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের “মন ভালো নেই” কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক, বিষণ্ণতামূলক ও অস্তিত্ববাদী রচনা যা বিষাদ, একাকীত্ব এবং জীবনের অর্থহীনতার অনুভূতি নিয়ে আলোচনা করে। “মন ভালো নেই মন ভালো নেই মন ভালো নেই/কেউ তা বোঝে না সকলি গোপন মুখে ছায়া নেই” – এই পুনরাবৃত্তিমূলক শুরুর লাইনগুলি কবিতার মূল থিম—অভ্যন্তরীণ যন্ত্রণার অব্যক্ততা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং জীবনের প্রতি অনীহার গভীর প্রকাশ—উপস্থাপন করে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের এই কবিতায় কবি তার মানসিক বিষাদের বহিঃপ্রকাশ, একাকী সময় কাটানো এবং জীবন থেকে বিচ্ছিন্নতার গল্প মূর্ত করেছেন। কবিতা “মন ভালো নেই” পাঠকদের মনে বিষাদের মনস্তত্ত্ব, সামাজিক বিচ্ছিন্নতার যন্ত্রণা এবং অস্তিত্বের মূল প্রশ্নের গভীর প্রভাব বিস্তার করে।
কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সাহিত্যিক পরিচিতি
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় (১৯৩৪-২০১২) বাংলা সাহিত্যের এক কিংবদন্তি কবি, ঔপন্যাসিক ও সাহিত্যিক। তিনি বাংলা সাহিত্যের আধুনিক ধারার অন্যতম প্রধান পুরোধা এবং তাঁর রচনায় নগর জীবন, মধ্যবিত্ত মানসিকতা ও অস্তিত্বের জিজ্ঞাসার অপূর্ব সমন্বয় দেখা যায়। তাঁর কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো বিষাদের সূক্ষ্ম চিত্রণ, ভাষার নিরীক্ষা এবং মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা। “মন ভালো নেই” কবিতায় তাঁর বিষাদের বহিঃপ্রকাশ, পুনরাবৃত্তির শৈলী এবং অস্তিত্ববাদী চেতনার বিশেষ প্রকাশ লক্ষণীয়। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ভাষা অত্যন্ত শক্তিশালী, ছন্দময় ও আবেগপ্রবণ।
মন ভালো নেই কবিতার সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় রচিত “মন ভালো নেই” কবিতাটি বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে রচিত, যখন বাংলা সাহিত্যে অস্তিত্ববাদ, বিষাদ ও নগর জীবনের একাকীত্ব নিয়ে গভীর চর্চা শুরু হয়েছিল। কবি আধুনিক মানুষের মানসিক বিষাদ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং জীবন থেকে বিযুক্তির অনুভূতির গল্প বলেছেন। “এমনকি নারী এমনকি নারী এমনকি নারী/এমনকি সুরা এমনকি ভাষা” – এই লাইন দিয়ে কবি এমনকি প্রিয় বিষয়গুলির প্রতিও অনীহার চিত্র তুলে ধরেছেন। কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের বিষাদ কবিতা, মনস্তাত্ত্বিক কবিতা এবং অস্তিত্ববাদী কবিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।
কবিতার সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য ও শৈলীগত বিশ্লেষণ
“মন ভালো নেই” কবিতাটির ভাষা অত্যন্ত পুনরাবৃত্তিমূলক, ছন্দময় ও আবেগপ্রবণ। কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কবিতাটিকে একটি অভ্যন্তরীণ কান্নার শৈলীতে রচনা করেছেন, যেখানে প্রতিটি পুনরাবৃত্তি বিষাদের গভীরতা বাড়িয়ে তোলে। কবিতার গঠন একটি মানসিক আবর্তের মতো: বিষাদের ঘোষণা → সামাজিক বিচ্ছিন্নতা → জীবন থেকে বিযুক্তি → একাকী সময় কাটানো → অস্তিত্বের প্রশ্ন → আগুনের রূপক → আশার পুনরাবৃত্তি। “ফুলের ভিতরে বীজের ভিতরে ঘুণের ভিতরে/যেমন আগুন আগুন আগুন আগুন আগুন” – এই চরণে কবি বিষাদের মধ্যেও লুকিয়ে থাকা আগুন (জীবনীশক্তি) এর রূপক তৈরি করেছেন। কবিতায় ব্যবহৃত ভাষা সরল কিন্তু গভীর মনস্তাত্ত্বিক অর্থবাহী।
কবিতার প্রধান থিম ও বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ
- অভ্যন্তরীণ বিষাদের অব্যক্ততা: “কেউ তা বোঝে না সকলি গোপন”
- সামাজিক বিচ্ছিন্নতা: “মুখে ছায়া নেই” – মুখোশধারণের অক্ষমতা
- জীবন থেকে বিযুক্তি: “ওষ্ঠে লাগে না কোনো প্রিয় স্বাদ”
- একাকীত্ব ও উদ্দেশ্যহীনতা: “একলা একলা পথে ঘুরে ঘুরে”
- ইন্দ্রিয়ের মৃত্যু: নারী, সুরা, ভাষার প্রতি অনীহা
- অস্তিত্বের প্রশ্ন: “আমার কী আছে অথবা কী ছিল”
- বিষাদের মধ্যেও লুকানো শক্তি: “ফুল, বীজ, ঘুণের ভিতরে আগুন”
- আশার পুনরাবৃত্তি: “আশায় আশায় আশায় আশায়”
- সময়ের প্রবাহ ও স্থবিরতা: “দিন কেটে যায়” কিন্তু “কিছুই খুঁজি না”
- মানুষিক সংবেদনশীলতার হ্রাস: “কারুকে চাইনি”
কবিতার কাঠামোগত বিশ্লেষণ
| পর্ব | লাইন | মূল বিষয় |
|---|---|---|
| প্রথম পর্ব | ১-৬ | বিষাদের ঘোষণা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা |
| দ্বিতীয় পর্ব | ৭-১২ | জীবন থেকে বিযুক্তি ও ইন্দ্রিয়ের মৃত্যু |
| তৃতীয় পর্ব | ১৩-১৯ | একাকীত্ব, উদ্দেশ্যহীনতা ও অস্তিত্বের প্রশ্ন |
| চতুর্থ পর্ব | ২০-২৫ | বিষাদের মধ্যেও লুকানো শক্তি ও আশার পুনরাবৃত্তি |
কবিতায় ব্যবহৃত প্রধান প্রতীক ও রূপকসমূহ
- মন ভালো নেই: বিষাদের মূল ঘোষণা, মানসিক অসুস্থতা
- মুখে ছায়া নেই: আবেগ প্রকাশের অক্ষমতা, সামাজিক মুখোশের অভাব
- চোখ খোলা তবু চোখ বুজে থাকা: শারীরিক উপস্থিতি কিন্তু মানসিক অনুপস্থিতি
- ওষ্ঠে লাগে না প্রিয় স্বাদ: জিভের স্বাদহীনতা, জীবনানন্দের অভাব
- নারী, সুরা, ভাষা: জীবনসুখের বিভিন্ন দিক যার প্রতি অনীহা
- একলা পথে ঘোরা: উদ্দেশ্যহীন ভ্রমণ, একাকীত্ব
- ফুল, বীজ, ঘুণ
- বিষাদের মনস্তাত্ত্বিক লক্ষণ চেনা
- মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব বোঝা
- সামাজিক বিচ্ছিন্নতার প্রভাব উপলব্ধি
- অস্তিত্বের সংকট মোকাবিলার কৌশল
- বিষাদের মধ্যেও আশার সন্ধান
- সাহিত্যের মাধ্যমে মানসিক যন্ত্রণা প্রকাশ
কবিতার মনস্তাত্ত্বিক ও অস্তিত্ববাদী তাৎপর্য
“মন ভালো নেই” কবিতায় কবি বিষাদ, একাকীত্ব এবং অস্তিত্বের সংকট নিয়ে গভীর মনস্তাত্ত্বিক আলোচনা করেছেন। “আমিও মানুষ আমার কী আছে অথবা কী ছিল” – এই অস্তিত্ববাদী প্রশ্নে কবি মানুষের পরিচয়, অর্জন ও অর্থ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। কবি দেখিয়েছেন যে বিষাদ শুধু মনের একটি অবস্থা নয়, এটি পুরো অস্তিত্বকে প্রভাবিত করে – ইন্দ্রিয়ের মৃত্যু ঘটায়, সামাজিক সম্পর্ককে বিচ্ছিন্ন করে এবং জীবনকে অর্থহীন করে তোলে। তবে “ফুলের ভিতরে বীজের ভিতরে ঘুণের ভিতরে/যেমন আগুন” – এই রূপকের মাধ্যমে কবি বিষাদের মধ্যেও লুকিয়ে থাকা জীবনীশক্তির সম্ভাবনা নির্দেশ করেছেন। কবিতাটি পাঠককে বিষাদের মনস্তত্ত্ব, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং অস্তিত্বের মূল প্রশ্ন সম্পর্কে চিন্তা করতে বাধ্য করে।
মন ভালো নেই কবিতা সম্পর্কে প্রশ্নোত্তর
মন ভালো নেই কবিতার লেখক কে?
মন ভালো নেই কবিতার লেখক বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তি কবি ও ঔপন্যাসিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।
মন ভালো নেই কবিতার মূল বিষয়বস্তু কী?
কবিতার মূল বিষয় বিষাদের গভীর অনুভূতি, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, জীবন থেকে বিযুক্তির অভিজ্ঞতা এবং অস্তিত্বের সংকট। কবিতাটি মানসিক বিষাদের বিভিন্ন দিক – আবেগপ্রকাশের অক্ষমতা, ইন্দ্রিয়ের মৃত্যু, একাকীত্ব এবং আশার পুনরাবৃত্তি নিয়ে আলোচনা করে।
কবিতায় “মুখে ছায়া নেই” বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
“মুখে ছায়া নেই” বলতে আবেগ প্রকাশের অক্ষমতা বোঝানো হয়েছে। সাধারণত মানুষের মুখে বিভিন্ন আবেগের ছায়া পড়ে, কিন্তু বিষাদগ্রস্ত ব্যক্তির মুখে সেই ছায়া থাকে না – মুখ হয়ে ওঠে আবেগহীন, অভিব্যক্তিহীন। এটি সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার অক্ষমতা নির্দেশ করে।
কবিতায় “এমনকি নারী এমনকি সুরা এমনকি ভাষা” – এর তাৎপর্য কী?
এটি জীবনের বিভিন্ন আনন্দের উৎসের প্রতি অনীহা নির্দেশ করে। নারী (প্রেম/কাম), সুরা (মাদক/উচ্ছ্বাস), ভাষা (সাহিত্য/যোগাযোগ) – জীবনসুখের এই তিনটি প্রধান উৎসের প্রতিও যখন আগ্রহ থাকে না, তখন তা গভীর বিষাদের লক্ষণ। এটি ডিপ্রেশনের একটি বৈশিষ্ট্য যেখানে আগে যা আনন্দ দিত তা আর আনন্দ দেয় না।
কবিতায় “আগুন” প্রতীকটি কী বোঝায়?
“আগুন” এখানে জীবনীশক্তি, আশা এবং অভ্যন্তরীণ শক্তির প্রতীক। “ফুলের ভিতরে বীজের ভিতরে ঘুণের ভিতরে/যেমন আগুন” – এই রূপকের মাধ্যমে কবি দেখান যে বিষাদের মধ্যেও, ধ্বংসের মধ্যেও (ঘুণ) জীবনীশক্তি (আগুন) লুকিয়ে থাকে। এটি বিষাদ থেকে উত্তরণের সম্ভাবনা নির্দেশ করে।
কবিতার শিক্ষণীয় দিক
ট্যাগস: মন ভালো নেই, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কবিতা, বাংলা কবিতা, বিষাদ কবিতা, মনস্তাত্ত্বিক কবিতা, অস্তিত্ববাদী কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, বাংলা সাহিত্য





