কবিতার খাতা
- 45 mins
বলতে নেই – শুভ দাশগুপ্ত।
সব জায়গায় সব কথা বলতে নেই,
পরস্ত্রীর সৌন্দর্যের কথা
আর অফিসের সঠিক মাইনের কথা –
নিজের বৌ কে ; বলতে নেই।
হিন্দুদের সামনে গো – মাংসের কথা, বলতে নেই।
রেলের কর্তাদের সামনে টাইম – টেববিলের কথা, বলতে নেই।
ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার ব্যাপারে – শিক্ষকদের, বলতে নেই।
আর পুলিশকে সততার কথা, বলতে নেই।
যখনই যা ইচ্ছে হলো ওমনি বলে ফেলতে নেই।
ইচ্ছে আপনার করবে, জিহ্বটা উসখুস করবে,
গলার ভেতরটা কুটকুট করে উঠবে,
তবু ; বলতে নেই।
আপনি ভাববেন পরিকল্পনার পাঠশালায় –
সব শালাই ভাওতা মারছে।
ভাবতে নিশ্চয়ই পারেন,
কিন্তু ; বলতে নেই।
আপনি ভাববেন হাসপাতাল, থানা , সরকারি দপ্তরগুলো –
ক্রমশ ফোঁড়ে আর দালালদের মৃগয়া ক্ষেত্র হয়ে উঠছে।
ভাবতে সারাদিন ধরে পারেন,
কিন্তু ; বলতে নেই।
এমনি বাজারে ছেড়ে দিলে –
কুঁড়ি টাকা রোজের মুটেগিরিও জুটতো না যে ব্যাটার !
রাজনীতির সোনার কাঠির ছোঁয়ায় –
সে ব্যাটা, গাড়ি – বাড়ি করে জনগণের মাথায় চড়ে ব্রেকড্যান্স করছে !
সেসব ভেবে আপনি তেলে – বেগুনে চটে উঠতে পারেন,
কিন্তু ; বলতে নেই।
প্রাক্তন মন্ত্রী জেলে ঢুকছেন –
পর্দার মেগা স্টারেরা কোটি কোটি টাকার ট্যাক্স ফাঁকি দিচ্ছে
আর টিভিতে ‘ মেরা দেশ মহান ’ বলে দাঁত বের করে হাঁসছে।
বাংলার সিনেমা বেদের মেয়ের পাল্লায় পড়ে-
সিঁদুর নিও না মুছে বলে আর্তনাদ করছে।
একশ টাকার ঢাউস পুজো সংখ্যার উপন্যাসে –
কাহিনীর চেয়ে ছায়া আর ব্লাউজের কথা বেশি থাকছে।
বুদ্ধিমান পরিচালক, হাড় – হাবাদের জীবন নিয়ে সিনেমা তৈরি করে –
ফরেনে পুরস্কার হাতাচ্ছেন
আর পাঁচতারা হোটেলে বসে ফুর্তি মারছেন।
খবরের কাগজ খুন, ডাকাতি আর ধর্ষণের সিরিয়াল ছাপছে –
টিভিতে মুড়ো ঝেটার বিজ্ঞাপনে উলঙ্গ মেয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।
সব কিছুতে আপনি বিরক্ত হতে পারেন,
কিন্তু ; বলতে নেই।
কারখানার পর কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে –
শ্রমিকরা বাটি হাতে ভিক্ষে করছে, গলায় দড়ি দিচ্ছে।
ইউনিয়নের দাদারা রান্না ঘরে টাইলস বসাচ্ছেন !
সাংসদ – বিধায়করা প্রীতি ক্রিকেট ম্যাচ খেলছে –
দেখে শুনে আপনার বাপের নাম খগেন হয়ে যেতে পারে,
কিন্তু ; বলতে নেই।
বলেছেন কি ফেঁসেছেন,
লাল বলবে এ ব্যাটা নীলের দলাল, প্রতিক্রিয়াশীল
আর নীল বলবে ও ব্যাটা লালের দালাল, দেশদ্রোহী।
মাঝখান থেকে আপনি নাকাল।
আপনার ধোপা – নাপিত বন্ধ হয়ে যেতে পারে –
বলেছেন কি ফেঁসেছেন,
প্যাঁচে পরুন – তখন বুঝবেন।
বাড়িতে চোর ঢুকে সব সাফ করে দিক –
থানা বলবে বাড়িতে এতো জিনিস রাখেন কেন !
দিনকাল বোঝেন না ! খালি বড় বড় কতা !
সুতরাং ; বলতে নেই।
বোবার শত্রু নেই, বোবা হয়ে থাকুন !
চোখে ছানি পড়লে কাঁটাবেন না, দৃষ্টি যতো ঝাপসা –
বেঁচে থাকার আনন্দ ততো বেশি।
একটা কথা সাফ বলে দিই,
যে ব্যাটা এখনও জন্মায়নি আর যে ব্যাটা টেশে গেছে,
এরা ছাড়া কোন মিয়াই সুখে নেই।
আপনি ভ্যাব্লা, না নেতা, না অভিনেতা,
না ঘরের, না ঘাটের,
আপনার মশাই চুপ করে থাকাই শ্রেয় ;
চুপ করে মটকা মেরে পরে থাকুন না !
আর তো ক ’ টা দিন।
মনে মনে গান করুন –
ঐ মহাসিন্ধুর ওপার থেকে কি সঙ্গীত ভেসে আসে।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। শুভ দাশগুপ্ত।
বলতে নেই – শুভ দাশগুপ্ত | বলতে নেই কবিতা শুভ দাশগুপ্ত | শুভ দাশগুপ্তের কবিতা | আধুনিক বাংলা কবিতা | সামাজিক বিদ্রূপের কবিতা | নীরবতার রাজনীতি | বাকস্বাধীনতার কবিতা
বলতে নেই: শুভ দাশগুপ্তের নীরবতা, চাপিয়ে দেওয়া নিয়ম ও সামাজিক বিদ্রূপের অসাধারণ কাব্যভাষা
শুভ দাশগুপ্তের “বলতে নেই” আধুনিক বাংলা কবিতার এক অনন্য ও তীক্ষ্ণ সামাজিক বিদ্রূপের কবিতা। “সব জায়গায় সব কথা বলতে নেই, / পরস্ত্রীর সৌন্দর্যের কথা / আর অফিসের সঠিক মাইনের কথা – / নিজের বৌ কে ; বলতে নেই।” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে সমাজের বিভিন্ন স্তরে চাপিয়ে দেওয়া নীরবতার নিয়ম, বলার অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার যন্ত্রণা, এবং শেষ পর্যন্ত বোবা হয়ে থাকার নির্মম পরামর্শের এক গভীর ও বহুমাত্রিক কাব্যচিত্র। শুভ দাশগুপ্ত (জন্ম: ১৯৬৬) একজন বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি কবি, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতায় নিজস্ব ভাষাভঙ্গি ও বিষয়বৈচিত্র্যের জন্য পরিচিত। তাঁর কবিতায় সাধারণ মানুষের জীবন, সামাজিক অসঙ্গতি, নীরবতার রাজনীতি, এবং ক্ষমতার বিরুদ্ধে বিদ্রূপাত্মক ভাষা গভীরভাবে ফুটে উঠেছে। “বলতে নেই” তাঁর সেই স্বকীয় কাব্যভাষার এক অসাধারণ শিল্পরূপ — যেখানে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে সমাজের প্রতিটি স্তরে, প্রতিটি সম্পর্কে, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কিছু না কিছু ‘বলতে নেই’ এর নিয়ম চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, কীভাবে সত্য কথা বলার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে, এবং কীভাবে শেষ পর্যন্ত মানুষ বোবা হয়ে থাকতে বাধ্য হয়।
শুভ দাশগুপ্ত: সাধারণ জীবন, সামাজিক অসঙ্গতি ও বিদ্রূপের কবি
শুভ দাশগুপ্ত ১৯৬৬ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি কবিতা চর্চা শুরু করেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই নিজস্ব ভাষাভঙ্গি ও বিষয়বৈচিত্র্যের জন্য আলাদা স্থান তৈরি করেন। তিনি ‘কৃত্তিবাস’ ও অন্যান্য সাহিত্য পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘ট্রেন’ (১৯৯৫), ‘বলতে নেই’ (২০০০), ‘নির্বাচিত কবিতা’ (২০০৫), ‘স্মৃতির শহর’ (২০১০), ‘আমার কবিতা’ (২০১৫) ইত্যাদি। তিনি ছোটগল্প ও প্রবন্ধও লিখেছেন।
শুভ দাশগুপ্তের কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো সাধারণ মানুষের জীবনের সরল চিত্রায়ন, সামাজিক অসঙ্গতির তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ, নীরবতার রাজনীতির বিরুদ্ধে বিদ্রূপাত্মক ভাষা, এবং ক্ষমতার মুখোশ উন্মোচনের দক্ষতা। ‘বলতে নেই’ সেই ধারার একটি অসাধারণ উদাহরণ।
বলতে নেই: শিরোনামের তাৎপর্য ও কবিতার সামাজিক পটভূমি
শিরোনাম ‘বলতে নেই’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি একটি নিষেধাজ্ঞা, একটি নিয়ম, একটি চাপিয়ে দেওয়া বাধ্যবাধকতা। ‘বলতে নেই’ — এই বাক্যটি সমাজের প্রতিটি স্তরে, প্রতিটি সম্পর্কে, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে উচ্চারিত হয়। কখনো স্পষ্টভাবে, কখনো ইঙ্গিতে, কখনো ভয়ে, কখনো লজ্জায় — কিন্তু সব জায়গায় কিছু না কিছু ‘বলতে নেই’ এর নিয়ম চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। কবি এই কবিতায় সেই সব ‘বলতে নেই’ এর তালিকা দিয়েছেন — পরস্ত্রীর সৌন্দর্যের কথা, অফিসের সঠিক মাইনের কথা, নিজের বৌ কে; হিন্দুদের সামনে গো-মাংসের কথা, রেলের কর্তাদের সামনে টাইম-টেবিলের কথা, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার ব্যাপারে শিক্ষকদের কথা, পুলিশকে সততার কথা। যখনই যা ইচ্ছে হলো ওমনি বলে ফেলতে নেই। ইচ্ছে করবে, জিভ উসখুস করবে, গলার ভেতরটা কুটকুট করবে, তবু বলতে নেই।
কবি ধাপে ধাপে দেখিয়েছেন — পরিকল্পনার পাঠশালায় সব শালাই ভাওতা মারছে, ভাবতে পারেন, কিন্তু বলতে নেই। হাসপাতাল, থানা, সরকারি দপ্তরগুলো ক্রমশ ফোঁড়ে আর দালালদের মৃগয়া ক্ষেত্র হয়ে উঠছে, ভাবতে পারেন, কিন্তু বলতে নেই। রাজনীতির সোনার কাঠির ছোঁয়ায় এক ব্যাটা গাড়ি-বাড়ি করে জনগণের মাথায় চড়ে ব্রেকড্যান্স করছে, ভেবে তেলে-বেগুনে চটতে পারেন, কিন্তু বলতে নেই। প্রাক্তন মন্ত্রী জেলে ঢুকছেন, পর্দার মেগা স্টাররা কোটি কোটি টাকার ট্যাক্স ফাঁকি দিচ্ছে, টিভিতে ‘মেরা দেশ মহান’ বলে দাঁত বের করে হাঁসছে, বাংলার সিনেমা বেদের মেয়ের পাল্লায় পড়ে আর্তনাদ করছে, খবরের কাগজ খুন-ডাকাতি-ধর্ষণের সিরিয়াল ছাপছে, টিভিতে মুড়ো ঝেটার বিজ্ঞাপনে উলঙ্গ মেয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে — সব কিছুতে বিরক্ত হতে পারেন, কিন্তু বলতে নেই।
কারখানার পর কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, শ্রমিকরা বাটি হাতে ভিক্ষে করছে, গলায় দড়ি দিচ্ছে, ইউনিয়নের দাদারা রান্নাঘরে টাইলস বসাচ্ছেন, সাংসদ-বিধায়করা প্রীতি ক্রিকেট ম্যাচ খেলছে — দেখে শুনে আপনার বাপের নাম খগেন হয়ে যেতে পারে, কিন্তু বলতে নেই।
শেষে কবি বলছেন — বলেছেন কি ফেঁসেছেন, লাল বলবে এ ব্যাটা নীলের দালাল, নীল বলবে ও ব্যাটা লালের দালাল। মাঝখান থেকে আপনি নাকাল। ধোপা-নাপিত বন্ধ হয়ে যেতে পারে। বলেছেন কি ফেঁসেছেন, প্যাঁচে পরুন তখন বুঝবেন। বাড়িতে চোর ঢুকে সব সাফ করে দিক, থানা বলবে বাড়িতে এত জিনিস রাখেন কেন! দিনকাল বোঝেন না! খালি বড় বড় কথা! সুতরাং বলতে নেই।
সব শেষে কবি পরামর্শ দিচ্ছেন — বোবার শত্রু নেই, বোবা হয়ে থাকুন। চোখে ছানি পড়লে কাটাবেন না, দৃষ্টি যত ঝাপসা, বেঁচে থাকার আনন্দ তত বেশি। যারা জন্মায়নি আর যারা মরে গেছে, তারা ছাড়া কোন মিয়াই সুখে নেই। আপনি ভ্যাবলা, না নেতা, না অভিনেতা, না ঘরের, না ঘাটের — আপনার মশাই চুপ করে থাকাই শ্রেয়। চুপ করে মটকা মেরে পরে থাকুন না! আর তো ক’টা দিন। মনে মনে গান করুন — ঐ মহাসিন্ধুর ওপার থেকে কি সঙ্গীত ভেসে আসে।
বলতে নেই: স্তবকভিত্তিক বিস্তারিত বিশ্লেষণ
প্রথম স্তবক: ব্যক্তিজীবনে বলতে নেই
“সব জায়গায় সব কথা বলতে নেই, / পরস্ত্রীর সৌন্দর্যের কথা / আর অফিসের সঠিক মাইনের কথা – / নিজের বৌ কে ; বলতে নেই।”
প্রথম স্তবকে কবি ব্যক্তিজীবনে বলতে নেই এমন কথার তালিকা দিচ্ছেন। ‘সব জায়গায় সব কথা বলতে নেই’ — কবিতার মূল সুর। ‘পরস্ত্রীর সৌন্দর্যের কথা’ — অন্যের স্ত্রীর সৌন্দর্য নিয়ে কথা বলা সামাজিকভাবে অনুচিত। ‘অফিসের সঠিক মাইনের কথা’ — বেতন নিয়ে কথা বলা অফিসে নিষিদ্ধ। ‘নিজের বৌ কে’ — এসব কথা নিজের স্ত্রীর কাছেও বলা যায় না।
দ্বিতীয় স্তবক: সামাজিক ও পেশাগত জীবনে বলতে নেই
“হিন্দুদের সামনে গো – মাংসের কথা, বলতে নেই। / রেলের কর্তাদের সামনে টাইম – টেবিলের কথা, বলতে নেই। / ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার ব্যাপারে – শিক্ষকদের, বলতে নেই। / আর পুলিশকে সততার কথা, বলতে নেই। / যখনই যা ইচ্ছে হলো ওমনি বলে ফেলতে নেই। / ইচ্ছে আপনার করবে, জিহ্বটা উসখুস করবে, / গলার ভেতরটা কুটকুট করে উঠবে, / তবু ; বলতে নেই।”
দ্বিতীয় স্তবকে কবি সামাজিক ও পেশাগত জীবনে বলতে নেই এমন কথার তালিকা দিচ্ছেন। ‘হিন্দুদের সামনে গো-মাংসের কথা’ — ধর্মীয় সংবেদনশীলতা। ‘রেলের কর্তাদের সামনে টাইম-টেবিলের কথা’ — কর্মকর্তাদের ভুল ধরিয়ে দেওয়া যায় না। ‘ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার ব্যাপারে শিক্ষকদের’ — শিক্ষকদের সমালোচনা করা যায় না। ‘পুলিশকে সততার কথা’ — পুলিশের দুর্নীতি নিয়ে কথা বলা যায় না। ‘যখনই যা ইচ্ছে হলো ওমনি বলে ফেলতে নেই’ — ইচ্ছেমতো কথা বলা নিষিদ্ধ। ‘ইচ্ছে আপনার করবে, জিহ্বটা উসখুস করবে, গলার ভেতরটা কুটকুট করে উঠবে, তবু বলতে নেই’ — ভেতরে চাপ থাকলেও, জিভ উসখুস করলেও, গলা কুটকুট করলেও, তবু বলতে নেই।
তৃতীয় স্তবক: চিন্তা করতে পারেন, কিন্তু বলতে নেই
“আপনি ভাববেন পরিকল্পনার পাঠশালায় – / সব শালাই ভাওতা মারছে। / ভাবতে নিশ্চয়ই পারেন, / কিন্তু ; বলতে নেই।”
তৃতীয় স্তবকে কবি পরিকল্পনার পাঠশালার কথা বলছেন। ‘পরিকল্পনার পাঠশালায়’ — সম্ভবত সরকারি পরিকল্পনা কমিশন বা নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠান। ‘সব শালাই ভাওতা মারছে’ — সবাই ভান করছে, ভণ্ডামি করছে। ‘ভাবতে নিশ্চয়ই পারেন, কিন্তু বলতে নেই’ — ভাবতে পারেন, কিন্তু বলতে নেই।
চতুর্থ স্তবক: প্রতিষ্ঠানের পতন ভাবতে পারেন, কিন্তু বলতে নেই
“আপনি ভাববেন হাসপাতাল, থানা , সরকারি দপ্তরগুলো – / ক্রমশ ফোঁড়ে আর দালালদের মৃগয়া ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। / ভাবতে সারাদিন ধরে পারেন, / কিন্তু ; বলতে নেই।”
চতুর্থ স্তবকে কবি সরকারি প্রতিষ্ঠানের পতনের কথা বলছেন। ‘হাসপাতাল, থানা, সরকারি দপ্তরগুলো’ — জনগণের সেবার জন্য প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান। ‘ক্রমশ ফোঁড়ে আর দালালদের মৃগয়া ক্ষেত্র হয়ে উঠছে’ — ফোঁড়ে (ভাগাড়, আবর্জনার স্থান) ও দালালদের শিকারের জায়গা হয়ে উঠছে। ‘ভাবতে সারাদিন ধরে পারেন, কিন্তু বলতে নেই’ — ভাবতে পারেন, কিন্তু বলতে নেই।
পঞ্চম স্তবক: রাজনীতির দুর্নীতি ভাবতে পারেন, কিন্তু বলতে নেই
“এমনি বাজারে ছেড়ে দিলে – / কুঁড়ি টাকা রোজের মুটেগিরিও জুটতো না যে ব্যাটার ! / রাজনীতির সোনার কাঠির ছোঁয়ায় – / সে ব্যাটা, গাড়ি – বাড়ি করে জনগণের মাথায় চড়ে ব্রেকড্যান্স করছে ! / সেসব ভেবে আপনি তেলে – বেগুনে চটে উঠতে পারেন, / কিন্তু ; বলতে নেই।”
পঞ্চম স্তবকে কবি রাজনীতির দুর্নীতির কথা বলছেন। ‘এমনি বাজারে ছেড়ে দিলে – কুঁড়ি টাকা রোজের মুটেগিরিও জুটতেও না যে ব্যাটার’ — বাজারে ছেড়ে দিলে, সেই ব্যাটার রোজগারের পথও জুটত না। ‘রাজনীতির সোনার কাঠির ছোঁয়ায়’ — রাজনীতির সোনার কাঠি (ক্ষমতার লাঠি) ছোঁয়ায়। ‘সে ব্যাটা, গাড়ি-বাড়ি করে জনগণের মাথায় চড়ে ব্রেকড্যান্স করছে’ — সে গাড়ি-বাড়ি করে জনগণের মাথায় চড়ে ব্রেকড্যান্স করছে। ‘সেসব ভেবে আপনি তেলে-বেগুনে চটে উঠতে পারেন, কিন্তু বলতে নেই’ — ভেবে চটে উঠতে পারেন, কিন্তু বলতে নেই।
ষষ্ঠ স্তবক: সংস্কৃতি ও গণমাধ্যমের অবক্ষয় ভাবতে পারেন, কিন্তু বলতে নেই
“প্রাক্তন মন্ত্রী জেলে ঢুকছেন – / পর্দার মেগা স্টারেরা কোটি কোটি টাকার ট্যাক্স ফাঁকি দিচ্ছে / আর টিভিতে ‘ মেরা দেশ মহান ’ বলে দাঁত বের করে হাঁসছে। / বাংলার সিনেমা বেদের মেয়ের পাল্লায় পড়ে – / সিঁদুর নিও না মুছে বলে আর্তনাদ করছে। / একশ টাকার ঢাউস পুজো সংখ্যার উপন্যাসে – / কাহিনীর চেয়ে ছায়া আর ব্লাউজের কথা বেশি থাকছে। / বুদ্ধিমান পরিচালক, হাড় – হাবাদের জীবন নিয়ে সিনেমা তৈরি করে – / ফরেনে পুরস্কার হাতাচ্ছেন / আর পাঁচতারা হোটেলে বসে ফুর্তি মারছেন। / খবরের কাগজ খুন, ডাকাতি আর ধর্ষণের সিরিয়াল ছাপছে – / টিভিতে মুড়ো ঝেটার বিজ্ঞাপনে উলঙ্গ মেয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। / সব কিছুতে আপনি বিরক্ত হতে পারেন, / কিন্তু ; বলতে নেই।”
ষষ্ঠ স্তবকে কবি সংস্কৃতি ও গণমাধ্যমের অবক্ষয়ের কথা বলছেন। ‘প্রাক্তন মন্ত্রী জেলে ঢুকছেন’ — প্রাক্তন মন্ত্রী জেলে যাচ্ছেন। ‘পর্দার মেগা স্টারেরা কোটি কোটি টাকার ট্যাক্স ফাঁকি দিচ্ছে আর টিভিতে ‘মেরা দেশ মহান’ বলে দাঁত বের করে হাঁসছে’ — সিনেমা তারকারা ট্যাক্স ফাঁকি দিচ্ছে, টিভিতে দেশমহিমা গাইছে। ‘বাংলার সিনেমা বেদের মেয়ের পাল্লায় পড়ে – সিঁদুর নিও না মুছে বলে আর্তনাদ করছে’ — বাংলা সিনেমা নিম্নমানের সিনেমার পাল্লায় পড়ে আর্তনাদ করছে। ‘একশ টাকার ঢাউস পুজো সংখ্যার উপন্যাসে – কাহিনীর চেয়ে ছায়া আর ব্লাউজের কথা বেশি থাকছে’ — পুজো সংখ্যার উপন্যাসে কাহিনির চেয়ে ছায়া (ফটোগ্রাফি) ও ব্লাউজের কথা বেশি। ‘বুদ্ধিমান পরিচালক, হাড়-হাবাদের জীবন নিয়ে সিনেমা তৈরি করে – ফরেনে পুরস্কার হাতাচ্ছেন আর পাঁচতারা হোটেলে বসে ফুর্তি মারছেন’ — বুদ্ধিমান পরিচালক দরিদ্র মানুষের জীবন নিয়ে সিনেমা বানিয়ে বিদেশে পুরস্কার পাচ্ছেন, পাঁচতারা হোটেলে ফুর্তি করছেন। ‘খবরের কাগজ খুন, ডাকাতি আর ধর্ষণের সিরিয়াল ছাপছে – টিভিতে মুড়ো ঝেটার বিজ্ঞাপনে উলঙ্গ মেয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে’ — খবরের কাগজে অপরাধের সিরিয়াল ছাপা হচ্ছে, টিভিতে অশ্লীল বিজ্ঞাপন দেখানো হচ্ছে। ‘সব কিছুতে আপনি বিরক্ত হতে পারেন, কিন্তু বলতে নেই’ — সব কিছুতে বিরক্ত হতে পারেন, কিন্তু বলতে নেই।
সপ্তম স্তবক: শিল্প ও শ্রমের সংকট ভাবতে পারেন, কিন্তু বলতে নেই
“কারখানার পর কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে – / শ্রমিকরা বাটি হাতে ভিক্ষে করছে, গলায় দড়ি দিচ্ছে। / ইউনিয়নের দাদারা রান্না ঘরে টাইলস বসাচ্ছেন ! / সাংসদ – বিধায়করা প্রীতি ক্রিকেট ম্যাচ খেলছে – / দেখে শুনে আপনার বাপের নাম খগেন হয়ে যেতে পারে, / কিন্তু ; বলতে নেই।”
সপ্তম স্তবকে কবি শিল্প ও শ্রমের সংকটের কথা বলছেন। ‘কারখানার পর কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে’ — শিল্প বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ‘শ্রমিকরা বাটি হাতে ভিক্ষে করছে, গলায় দড়ি দিচ্ছে’ — শ্রমিকরা ভিক্ষে করছে, আত্মহত্যা করছে। ‘ইউনিয়নের দাদারা রান্না ঘরে টাইলস বসাচ্ছেন’ — শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা নিজেদের বাড়ি সাজাচ্ছেন। ‘সাংসদ-বিধায়করা প্রীতি ক্রিকেট ম্যাচ খেলছে’ — জনপ্রতিনিধিরা ক্রিকেট খেলছে। ‘দেখে শুনে আপনার বাপের নাম খগেন হয়ে যেতে পারে’ — দেখে শুনে রাগে আপনার বাপের নাম খগেন (ক্ষিগেন) হয়ে যেতে পারে। ‘কিন্তু বলতে নেই’ — কিন্তু বলতে নেই।
অষ্টম স্তবক: বললে কী হয় — ফাঁসি, দলাদলি, নাকাল
“বলেছেন কি ফেঁসেছেন, / লাল বলবে এ ব্যাটা নীলের দলাল, প্রতিক্রিয়াশীল / আর নীল বলবে ও ব্যাটা লালের দালাল, দেশদ্রোহী। / মাঝখান থেকে আপনি নাকাল। / আপনার ধোপা – নাপিত বন্ধ হয়ে যেতে পারে – / বলেছেন কি ফেঁসেছেন, / প্যাঁচে পরুন – তখন বুঝবেন। / বাড়িতে চোর ঢুকে সব সাফ করে দিক – / থানা বলবে বাড়িতে এতো জিনিস রাখেন কেন ! / দিনকাল বোঝেন না ! খালি বড় বড় কতা ! / সুতরাং ; বলতে নেই।”
অষ্টম স্তবকে কবি বললে কী হয় তা দেখাচ্ছেন। ‘বলেছেন কি ফেঁসেছেন’ — বলেছেন কি ফেঁসে গেছেন। ‘লাল বলবে এ ব্যাটা নীলের দলাল, প্রতিক্রিয়াশীল’ — এক দল বলবে আপনি অপর দলের দালাল। ‘আর নীল বলবে ও ব্যাটা লালের দালাল, দেশদ্রোহী’ — অপর দল বলবে আপনি দেশদ্রোহী। ‘মাঝখান থেকে আপনি নাকাল’ — মাঝখান থেকে আপনি নাকাল। ‘আপনার ধোপা-নাপিত বন্ধ হয়ে যেতে পারে’ — আপনার পেশা, ব্যবসা, সামাজিক সম্পর্ক বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ‘বলেছেন কি ফেঁসেছেন, প্যাঁচে পরুন তখন বুঝবেন’ — বলেছেন কি ফেঁসে গেছেন, প্যাঁচে পড়লে বুঝবেন। ‘বাড়িতে চোর ঢুকে সব সাফ করে দিক – থানা বলবে বাড়িতে এত জিনিস রাখেন কেন’ — বাড়িতে চোর ঢুকলে থানা বলবে বাড়িতে এত জিনিস রাখেন কেন। ‘দিনকাল বোঝেন না! খালি বড় বড় কথা!’ — দিনকাল বোঝেন না, বড় বড় কথা বলেন। ‘সুতরাং বলতে নেই’ — সুতরাং বলতে নেই।
নবম স্তবক: বোবা হয়ে থাকার পরামর্শ
“বোবার শত্রু নেই, বোবা হয়ে থাকুন ! / চোখে ছানি পড়লে কাঁটাবেন না, দৃষ্টি যতো ঝাপসা – / বেঁচে থাকার আনন্দ ততো বেশি। / একটা কথা সাফ বলে দিই, / যে ব্যাটা এখনও জন্মায়নি আর যে ব্যাটা টেশে গেছে, / এরা ছাড়া কোন মিয়াই সুখে নেই। / আপনি ভ্যাব্লা, না নেতা, না অভিনেতা, / না ঘরের, না ঘাটের, / আপনার মশাই চুপ করে থাকাই শ্রেয় ; / চুপ করে মটকা মেরে পরে থাকুন না ! / আর তো ক ’ টা দিন। / মনে মনে গান করুন – / ঐ মহাসিন্ধুর ওপার থেকে কি সঙ্গীত ভেসে আসে।”
নবম স্তবকে কবি বোবা হয়ে থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন। ‘বোবার শত্রু নেই, বোবা হয়ে থাকুন’ — বোবা হয়ে থাকুন, বোবার কোনো শত্রু নেই। ‘চোখে ছানি পড়লে কাঁটাবেন না, দৃষ্টি যত ঝাপসা – বেঁচে থাকার আনন্দ ততো বেশি’ — চোখে ছানি পড়লে কাটাবেন না, দৃষ্টি যত ঝাপসা, বেঁচে থাকার আনন্দ তত বেশি (বিদ্রূপাত্মক)। ‘যে ব্যাটা এখনও জন্মায়নি আর যে ব্যাটা টেশে গেছে, এরা ছাড়া কোন মিয়াই সুখে নেই’ — যারা এখনও জন্মায়নি আর যারা মরে গেছে, তারা ছাড়া কেউ সুখে নেই। ‘আপনি ভ্যাব্লা, না নেতা, না অভিনেতা, না ঘরের, না ঘাটের’ — আপনি সাধারণ মানুষ, না নেতা, না অভিনেতা, না ঘরের, না ঘাটের। ‘আপনার মশাই চুপ করে থাকাই শ্রেয়’ — আপনার চুপ করে থাকাই শ্রেয়। ‘চুপ করে মটকা মেরে পরে থাকুন না! আর তো ক’টা দিন’ — চুপ করে শুয়ে থাকুন, আর তো ক’টা দিন বাকি। ‘মনে মনে গান করুন – ঐ মহাসিন্ধুর ওপার থেকে কি সঙ্গীত ভেসে আসে’ — মনে মনে গান করুন — ওই মহাসিন্ধুর ওপার থেকে কী সঙ্গীত ভেসে আসে।
কবিতার গঠনশৈলী, ছন্দ ও শিল্পরূপ
কবিতাটি নয়টি স্তবকে বিভক্ত। প্রথম স্তবকে ব্যক্তিজীবনে বলতে নেই, দ্বিতীয় স্তবকে সামাজিক ও পেশাগত জীবনে বলতে নেই, তৃতীয় স্তবকে পরিকল্পনার পাঠশালা, চতুর্থ স্তবকে প্রতিষ্ঠানের পতন, পঞ্চম স্তবকে রাজনীতির দুর্নীতি, ষষ্ঠ স্তবকে সংস্কৃতি ও গণমাধ্যমের অবক্ষয়, সপ্তম স্তবকে শিল্প ও শ্রমের সংকট, অষ্টম স্তবকে বললে কী হয়, নবম স্তবকে বোবা হয়ে থাকার পরামর্শ।
ভাষা সরল, প্রাঞ্জল, কথ্যরীতির কাছাকাছি, কিন্তু বিদ্রূপাত্মক ও তীক্ষ্ণ। তিনি ব্যবহার করেছেন — ‘পরস্ত্রীর সৌন্দর্য’, ‘অফিসের সঠিক মাইনের কথা’, ‘গো-মাংসের কথা’, ‘টাইম-টেবিলের কথা’, ‘সততার কথা’, ‘জিহ্বা উসখুস করবে’, ‘গলার ভেতরটা কুটকুট করবে’, ‘ভাওতা মারছে’, ‘ফোঁড়ে আর দালালদের মৃগয়া ক্ষেত্র’, ‘তেলে-বেগুনে চটে উঠতে পারেন’, ‘ব্রেকড্যান্স করছে’, ‘বেদের মেয়ের পাল্লায় পড়ে’, ‘হাড়-হাবাদের জীবন’, ‘মুড়ো ঝেটার বিজ্ঞাপন’, ‘বাপের নাম খগেন’, ‘ধোপা-নাপিত বন্ধ’, ‘বোবার শত্রু নেই’, ‘মটকা মেরে পরে থাকুন’।
পুনরাবৃত্তি শৈলী কবিতার সুর তৈরি করেছে। ‘বলতে নেই’ — প্রতিটি স্তবকের শেষে বা ভেতরে এই পুনরাবৃত্তি কবিতার মূল সুরকে জোরালো করেছে।
প্রতীক ব্যবহারে তিনি দক্ষ। ‘পরিকল্পনার পাঠশালা’ — সরকারি পরিকল্পনা কমিশন। ‘ফোঁড়ে আর দালালদের মৃগয়া ক্ষেত্র’ — সরকারি প্রতিষ্ঠানের পতন। ‘সোনার কাঠির ছোঁয়া’ — ক্ষমতার প্রভাব। ‘বেদের মেয়ের পাল্লায় পড়ে’ — নিম্নমানের সিনেমার প্রভাব। ‘মুড়ো ঝেটার বিজ্ঞাপন’ — অশ্লীল বিজ্ঞাপন। ‘বোবার শত্রু নেই’ — নীরবতার নিরাপত্তা। ‘মহাসিন্ধুর ওপার থেকে কি সঙ্গীত ভেসে আসে’ — জ্ঞানগম্যির শেষ আশ্রয়, আত্মরক্ষার শেষ উপায়।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য ও দার্শনিক মাত্রা
“বলতে নেই” শুভ দাশগুপ্তের এক অসাধারণ সৃষ্টি। কবি সমাজের প্রতিটি স্তরে চাপিয়ে দেওয়া নীরবতার নিয়মের তালিকা দিয়েছেন। ব্যক্তিজীবনে, পারিবারিক জীবনে, পেশাগত জীবনে, সামাজিক জীবনে, রাজনীতিতে, সংস্কৃতিতে, গণমাধ্যমে, সর্বত্র ‘বলতে নেই’ এর নিয়ম চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। পরস্ত্রীর সৌন্দর্যের কথা বলতে নেই, অফিসের সঠিক মাইনের কথা নিজের বৌ কে বলতে নেই। হিন্দুদের সামনে গো-মাংসের কথা বলতে নেই, রেলের কর্তাদের সামনে টাইম-টেবিলের কথা বলতে নেই, শিক্ষকদের সামনে পড়াশোনার কথা বলতে নেই, পুলিশকে সততার কথা বলতে নেই। ইচ্ছে করবে, জিভ উসখুস করবে, গলার ভেতরটা কুটকুট করবে, তবু বলতে নেই।
পরিকল্পনার পাঠশালায় সবাই ভাওতা মারছে, ভাবতে পারেন, কিন্তু বলতে নেই। হাসপাতাল, থানা, সরকারি দপ্তরগুলো ফোঁড়ে আর দালালদের মৃগয়া ক্ষেত্র হয়ে উঠছে, ভাবতে পারেন, কিন্তু বলতে নেই। রাজনীতির সোনার কাঠির ছোঁয়ায় ব্যাটা গাড়ি-বাড়ি করে ব্রেকড্যান্স করছে, ভেবে তেলে-বেগুনে চটতে পারেন, কিন্তু বলতে নেই। প্রাক্তন মন্ত্রী জেলে ঢুকছেন, মেগা স্টাররা ট্যাক্স ফাঁকি দিচ্ছে, বাংলার সিনেমা বেদের মেয়ের পাল্লায় পড়ে আর্তনাদ করছে, খবরের কাগজ খুন-ডাকাতি-ধর্ষণের সিরিয়াল ছাপছে, টিভিতে অশ্লীল বিজ্ঞাপন দেখাচ্ছে — সব কিছুতে বিরক্ত হতে পারেন, কিন্তু বলতে নেই।
কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, শ্রমিকরা ভিক্ষে করছে, ইউনিয়নের দাদারা টাইলস বসাচ্ছেন, সাংসদ-বিধায়করা ক্রিকেট খেলছে — দেখে শুনে আপনার বাপের নাম খগেন হয়ে যেতে পারে, কিন্তু বলতে নেই।
বলেছেন কি ফেঁসেছেন — লাল বলবে নীলের দালাল, নীল বলবে লালের দালাল, দেশদ্রোহী। মাঝখান থেকে আপনি নাকাল। আপনার ধোপা-নাপিত বন্ধ হয়ে যেতে পারে। বলেছেন কি ফেঁসেছেন, প্যাঁচে পরুন তখন বুঝবেন। বাড়িতে চোর ঢুকে সব সাফ করে দিক, থানা বলবে বাড়িতে এত জিনিস রাখেন কেন! দিনকাল বোঝেন না! খালি বড় বড় কথা! সুতরাং বলতে নেই।
শেষে কবি পরামর্শ দিচ্ছেন — বোবার শত্রু নেই, বোবা হয়ে থাকুন। চোখে ছানি পড়লে কাটাবেন না, দৃষ্টি যত ঝাপসা, বেঁচে থাকার আনন্দ তত বেশি। যারা এখনও জন্মায়নি আর যারা মরে গেছে, তারা ছাড়া কেউ সুখে নেই। আপনি ভ্যাবলা, না নেতা, না অভিনেতা, না ঘরের, না ঘাটের — আপনার চুপ করে থাকাই শ্রেয়। চুপ করে মটকা মেরে পরে থাকুন না! আর তো ক’টা দিন। মনে মনে গান করুন — ঐ মহাসিন্ধুর ওপার থেকে কি সঙ্গীত ভেসে আসে।
এই কবিতা আমাদের শেখায় — সমাজের প্রতিটি স্তরে, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কিছু না কিছু ‘বলতে নেই’ এর নিয়ম চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। সত্য কথা বলার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। যারা কথা বলে, তারা ফেঁসে যায়, তাদের দলাদলির শিকার হতে হয়, তাদের পেশা-বৃত্তি বন্ধ হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত বোবা হয়ে থাকাই নিরাপদ। এটি নীরবতার রাজনীতির এক নির্মম ও বিদ্রূপাত্মক চিত্র।
শুভ দাশগুপ্তের কবিতায় নীরবতা, বিদ্রূপ ও সামাজিক সমালোচনা
শুভ দাশগুপ্তের কবিতায় নীরবতা ও বিদ্রূপ একটি পুনরাবৃত্ত বিষয়। তিনি দেখিয়েছেন — কীভাবে সমাজের প্রতিটি স্তরে কথা বলার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়, কীভাবে সত্য কথা বললে শাস্তি পাওয়া যায়, কীভাবে শেষ পর্যন্ত বোবা হয়ে থাকাই শ্রেয়। ‘বলতে নেই’ সেই ধারার একটি অসাধারণ উদাহরণ।
তাঁর কবিতায় ‘বলতে নেই’ একটি কেন্দ্রীয় প্রতীক — যা সমাজের চাপিয়ে দেওয়া নীরবতার নিয়ম।
শিক্ষামূলক গুরুত্ব ও পাঠ্যক্রমিক স্থান
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাংলা সাহিত্যের উচ্চতর পাঠ্যক্রমে শুভ দাশগুপ্তের ‘বলতে নেই’ কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত থাকার যোগ্য। এই কবিতাটি শিক্ষার্থীদের নীরবতার রাজনীতি, বাকস্বাধীনতার সংকট, সামাজিক অসঙ্গতির বিরুদ্ধে বিদ্রূপাত্মক ভাষা, এবং আধুনিক বাংলা কবিতার ধারা সম্পর্কে বুঝতে সাহায্য করে।
বলতে নেই সম্পর্কে বিস্তারিত প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: বলতে নেই কবিতাটির লেখক কে?
এই কবিতাটির লেখক শুভ দাশগুপ্ত (জন্ম: ১৯৬৬)। তিনি একজন বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি কবি, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘ট্রেন’ (১৯৯৫), ‘বলতে নেই’ (২০০০), ‘নির্বাচিত কবিতা’ (২০০৫), ‘স্মৃতির শহর’ (২০১০), ‘আমার কবিতা’ (২০১৫)।
প্রশ্ন ২: ‘সব জায়গায় সব কথা বলতে নেই’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
এটি কবিতার মূল সুর। সমাজের প্রতিটি স্তরে, প্রতিটি সম্পর্কে, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কিছু না কিছু ‘বলতে নেই’ এর নিয়ম চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। সত্য কথা বলার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
প্রশ্ন ৩: ‘পরস্ত্রীর সৌন্দর্যের কথা / আর অফিসের সঠিক মাইনের কথা – / নিজের বৌ কে ; বলতে নেই’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
পরস্ত্রীর সৌন্দর্যের কথা বলা সামাজিকভাবে অনুচিত। অফিসের সঠিক মাইনের কথা বলা অফিসে নিষিদ্ধ। নিজের স্ত্রীর কাছেও এসব কথা বলা যায় না। এটি ব্যক্তিজীবনে চাপিয়ে দেওয়া নীরবতার নিয়মের উদাহরণ।
প্রশ্ন ৪: ‘রেলের কর্তাদের সামনে টাইম-টেবিলের কথা, বলতে নেই’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
রেলের কর্তাদের সামনে টাইম-টেবিলের কথা বলা যায় না — অর্থাৎ তাদের ভুল ধরিয়ে দেওয়া যায় না। এটি পেশাগত জীবনে চাপিয়ে দেওয়া নীরবতার নিয়মের উদাহরণ।
প্রশ্ন ৫: ‘পুলিশকে সততার কথা, বলতে নেই’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
পুলিশের দুর্নীতি নিয়ে কথা বলা যায় না। এটি আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থায় চাপিয়ে দেওয়া নীরবতার নিয়মের উদাহরণ।
প্রশ্ন ৬: ‘পরিকল্পনার পাঠশালায় – সব শালাই ভাওতা মারছে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘পরিকল্পনার পাঠশালা’ — সম্ভবত সরকারি পরিকল্পনা কমিশন বা নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠান। ‘ভাওতা মারছে’ — ভান করছে, ভণ্ডামি করছে।
প্রশ্ন ৭: ‘হাসপাতাল, থানা , সরকারি দপ্তরগুলো – ক্রমশ ফোঁড়ে আর দালালদের মৃগয়া ক্ষেত্র হয়ে উঠছে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
জনগণের সেবার জন্য প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমশ ভাগাড় (আবর্জনার স্থান) ও দালালদের শিকারের জায়গা হয়ে উঠছে। এটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের পতনের চিত্র।
প্রশ্ন ৮: ‘বলেছেন কি ফেঁসেছেন, / লাল বলবে এ ব্যাটা নীলের দলাল, প্রতিক্রিয়াশীল / আর নীল বলবে ও ব্যাটা লালের দালাল, দেশদ্রোহী’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
কথা বললে ফেঁসে যেতে হয়। এক রাজনৈতিক দল বলবে আপনি অন্য দলের দালাল, অন্য দল বলবে আপনি দেশদ্রোহী। এটি দলাদলির শিকার হওয়ার চিত্র।
প্রশ্ন ৯: ‘বোবার শত্রু নেই, বোবা হয়ে থাকুন’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
বোবা হয়ে থাকুন, বোবার কোনো শত্রু নেই। এটি নীরবতার নিরাপত্তার পরামর্শ। কথা বললে শত্রু তৈরি হয়, চুপ থাকলে শত্রু থাকে না।
প্রশ্ন ১০: কবিতার মূল শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা কী?
কবিতাটি আমাদের শেখায় — সমাজের প্রতিটি স্তরে, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কিছু না কিছু ‘বলতে নেই’ এর নিয়ম চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। সত্য কথা বলার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। যারা কথা বলে, তারা ফেঁসে যায়, তাদের দলাদলির শিকার হতে হয়, তাদের পেশা-বৃত্তি বন্ধ হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত বোবা হয়ে থাকাই নিরাপদ। এটি নীরবতার রাজনীতির এক নির্মম ও বিদ্রূপাত্মক চিত্র। আজকের পৃথিবীতে — যেখানে বাকস্বাধীনতা ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে, সত্য কথা বলা বিপজ্জনক হয়ে উঠছে — এই কবিতার প্রাসঙ্গিকতা অপরিসীম।
ট্যাগস: বলতে নেই, শুভ দাশগুপ্ত, শুভ দাশগুপ্তের কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, নীরবতার রাজনীতি, বাকস্বাধীনতার কবিতা, সামাজিক বিদ্রূপের কবিতা, সামাজিক অসঙ্গতির কবিতা, বাংলা কবিতা বিশ্লেষণ
© Kobitarkhata.com – কবি: শুভ দাশগুপ্ত | কবিতার প্রথম লাইন: “সব জায়গায় সব কথা বলতে নেই, / পরস্ত্রীর সৌন্দর্যের কথা / আর অফিসের সঠিক মাইনের কথা – / নিজের বৌ কে ; বলতে নেই” | নীরবতা ও বিদ্রূপের কবিতা বিশ্লেষণ | আধুনিক বাংলা কবিতার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন





