নিমন্ত্রণ- পল্লী কবি জসীমউদ্দীন।

তুমি যাবে ভাই—যাবে মোর সাথে আমাদের ছোট গাঁয়,
গাছের ছায়ায় লতায় পাতায় উদাসী বনের বায়;
মায়া মমতায় জড়া-জড়ি করি’
মোর গেহখানি রহিয়াছে ভরি’,
মায়ের বুকেতে, বোনের আদরে, ভা’য়ের স্নেহের ছায়,
তুমি যাবে ভাই—যাবে মোর সাথে আমাদের ছোট গাঁয়।
ছোট গাঁওখানি—ছোট নদী চলে তারি এক পাশ দিয়া,
কালো জল তার মাজিয়াছে কেবা কাকের চক্ষু নিয়া।

ঘাটের কিনারে আছে বাঁধা তরী
পারের খবর টানাটানি করি’
বিনা সুতী মালা গাঁথিছে নিতুই এপার ওপার দিয়া
বাঁকা ফাঁদ পেতে টানিয়া আনিছে দুইটি তটের হিয়া।
তুমি যাবে ভাই—যাবে মোর সাথে ছোট সে কাজল গাঁয়,
গলাগলি ধরি কলাবন যেন ঘিরিয়া রয়েছে তায়।

সরু পথখানি সুতায় বাঁধিয়া
দূর পথিকেরে আনিছে টানিয়া,
বনের হাওয়ায়, গাছের ছায়ায়, ধরিয়া রাখিবে তায়;
বুকখানি তার ভ’রে দেবে বুঝি মায়া আর মমতায়।
তুমি যাবে ভাই যাবে মোর সাথে—নরম ঘাসের পাতে,
চুম্বন রাখি’ অধরখানিরে মেজে ল’য়ো নিরালাতে।

তেলাকুচ-লতা গলায় পরিয়া
মেঠো ফুলে নিও আঁচল ভরিয়া,
হেথায় সেথায় ভাব ক’র তুমি বুনো শাখীদের সাথে,
তোমার গায়ের রঙখানি তুমি দেখিবে তাদের পাতে।
তুমি যদি যাও আমাদের গাঁয়ে, তোমারে সঙ্গে করি
নদীর ওপারে চলে যাই তবে লইয়া ঘাটের তরী।

মাঠের যত না রাখাল ডাকিয়া
তব সনে দেই মিতালী করিয়া,
ঢেলা কুড়াইয়া গড়ি ইমারৎ সারা দিনমান ধরি,
সত্যিকারের নগর ভুলিয়া নকল নগর গড়ি।
তুমি যদি যাও—দেখিবে সেখানে মটর লতার সনে,
সীম—আর সীম—হাত বাড়া’লেই মুঠি ভরে সেই খনে।

তুমি যদি যাও সে-সব কুড়ায়ে
নাড়ার আগুনে পোড়ায়ে পোড়ায়ে,
খাব আর যত গেঁয়ো চাষীদের ডাকিয়া নিমন্ত্রণে
হাসিয়া হাসিয়া মুঠি মুঠি তাহা বিলাইব দুই জনে।
তুমি যদি যাও—শালুক* কুড়া’য়ে খুব —খুব বড় ক’রে
এমন একটি গাঁথিব মালা যা দেখিনি কাহারো করে,
কারেও দেব না, তুমি যদি চাও
আচ্ছা না হয় দিয়ে দেব তাও,
মালাটিরে তুমি রাখিও কিন্তু শক্ত করিয়া ধ’রে,
ওপাড়ার সব দুষ্ট ছেলেরা নিতে পারে জোর ক’রে।

সন্ধ্যা হইলে ঘরে ফিরে যাব, মা যদি বকিতে চায়,
মতলব কিছু আটিব যাহাতে খুসী তারে করা যায়!
লাল আলোয়ানে ঘুটো কুড়াইয়া
বেঁধে নিয়ে যাব মাথায় করিয়া,
এত ঘুস পেয়ে যদি বা তাহার মন না উঠিতে চায়,
বলিব—কালকে মটরের শাক এনে দেব বহু তায়।
খুব ভোর ক’রে উঠিতে হইবে, সূয্যি উঠারও আগে,
কারেও ক’বি না, দেখিস্ পায়ের শব্দে কেহ না জাগে।

রেল সড়কের ছোট খাদ ভ’রে
ডানকিনে মাছ কিল্বিশ্ করে;
কাদার বাঁধাল গাঁথি মাঝামাঝি জল সেঁচে আগে ভাগে
সব মাছগুলো কুড়া’য়ে আনিব কাহারো জানার আগে।
ভর দুপুরেতে এক রাশ কাদা আর এক রাশ মাছ
কাপড়ে জড়া’য়ে ফিরিয়া আসিব
আপন বাড়ীর কাছ,
‘ওরে মুখ-পোড়া ওরেরে বাঁদর!
গালি-ভরা মা’র অমনি আদর
কতদিন আমি শুনিনারে ভাই, আমার মায়ের পাছ
যাবি তুই ভাই আমাদের গাঁয়ে
যেথা ঘন কালো গাছ
যাবি তুই ভাই,
যাবি মোর সাথে আমাদের ছোট গাঁয়,
ঘন কালো বন—মায়া মমতায় বেঁধেছে বনের বায়।

গাছের ছায়ায় বনের লতায়
মোর শিশুকাল লুকায়েছে হায়!
আজিকে সে-সব সরা’য়ে সরা’য়ে খুঁজিয়া লইব তায়,
যাবি তুই ভাই, যাবি মোর সাথে আমাদের ছোট গাঁয়।
তোরে নিয়ে যাব আমাদের গাঁয়ে, ঘন-পল্লব তলে
লুকা’য়ে থাকিস,
খুঁজে যেন কেহ পায়না কোনই বলে।
মেঠো কোন ফুল কুড়াইতে যেয়ে
হারাইয়া যা’স পথ নাহি পেয়ে,
অলস দেহটি মাটিতে বিছায়ে
ঘুমা’স সন্ধ্যা হ’লে,
সারা গাঁও আমি খুঁজিয়া ফিরিব
তোরি নাম ব’লে ব’লে।।

আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। পল্লী কবি জসীমউদ্দীন।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest

0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x