কবিতার খাতা
- 49 mins
জীবনের জলছাপ – মমতাজ মৌ।
ড্রয়ারে জমিয়ে রাখি অপূর্ণ শখ, ভাঙা স্বপ্ন।
বাণিজ্যিক ব্যাংকে ঠাই হয় না বলে ওদের নিয়তি অলিন্দের ড্রয়ারেই জমে থাকা ।
হুটহাট আগল খুললেই
অপূর্ণ শখগুলো ভেংচি কাটে, বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায়
“হেরো” বলে গালি দেয় নাকের ডগায় চড়ে ।
শত শত ভাঙ্গা স্বপ্ন ” টা টা! গুডবাই! ” বলে মার্চপাস্ট করে, ধুন্ধুমার হুলুস্থুল করে।
বলে যায়, “সাতে যা পেতে হয়, সত্তুরে তা পাবে না।
আর পেলেই বা কী!
মন বদলাবে, শরীর সচল থাকবে না! “
রাজপ্রাসাদ থেকে ঝুপড়ি ঘর –
রাজরানী থেকে বস্ত্রবালিকা –
সকলের গল্প এক
সকলের গল্প এই-ই।
জীবনের পায়ে পায়ে শেকল, পদে পদে হিমালয়।
দুহাতে জঞ্জাল সরাতে পারি ,
দু পায়ে ডিঙ্গাতে পারি কিলিমাঞ্জারো।
শেকল আটকে রাখে নোম্যান্স ল্যান্ডে ।
তারপর একদিন কোটি কোটি আফসোস আর অপূর্ণতার জাদুঘর হয়ে
জীবনকে “গুডবাই” বলে চলে যাবো মৃতের জগতে!
জীবন একমুখী পথ
বোড়ের মতো সামনে এগিয়ে যাওয়াই ভবিতব্য।
ফিরে গিয়ে শূণ্যতা পূরণের সুযোগ সে দেয় না !
কিছু তামাদির তো কিছুতেই মওকুফ হয় না ।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। মমতাজ মৌ।
জীবনের জলছাপ – মমতাজ মৌ | সম্পূর্ণ বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা ও তাৎপর্য
কবিতা: জীবনের জলছাপ (সম্পূর্ণ পাঠ)
ড্রয়ারে জমিয়ে রাখি অপূর্ণ শখ, ভাঙা স্বপ্ন। বাণিজ্যিক ব্যাংকে ঠাই হয় না বলে ওদের নিয়তি অলিন্দের ড্রয়ারেই জমে থাকা। হুটহাট আগল খুললেই অপূর্ণ শখগুলো ভেংচি কাটে, বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায় “হেরো” বলে গালি দেয় নাকের ডগায় চড়ে। শত শত ভাঙ্গা স্বপ্ন ” টা টা! গুডবাই! ” বলে মার্চপাস্ট করে, ধুন্ধুমার হুলুস্থুল করে। বলে যায়, “সাতে যা পেতে হয়, সত্তুরে তা পাবে না। আর পেলেই বা কী! মন বদলাবে, শরীর সচল থাকবে না!” রাজপ্রাসাদ থেকে ঝুপড়ি ঘর – রাজরানী থেকে বস্ত্রবালিকা – সকলের গল্প এক সকলের গল্প এই-ই। জীবনের পায়ে পায়ে শেকল, পদে পদে হিমালয়। দুহাতে জঞ্জাল সরাতে পারি, দু পায়ে ডিঙ্গাতে পারি কিলিমাঞ্জারো। শেকল আটকে রাখে নোম্যান্স ল্যান্ডে। তারপর একদিন কোটি কোটি আফসোস আর অপূর্ণতার জাদুঘর হয়ে জীবনকে “গুডবাই” বলে চলে যাবো মৃতের জগতে! জীবন একমুখী পথ বোড়ের মতো সামনে এগিয়ে যাওয়াই ভবিতব্য। ফিরে গিয়ে শূণ্যতা পূরণের সুযোগ সে দেয় না ! কিছু তামাদির তো কিছুতেই মওকুফ হয় না।
কবি পরিচিতি
মমতাজ মৌ বাংলাদেশের একজন নতুন কবি। আধুনিক বাংলা কবিতার এই তরুণ কণ্ঠ নারীমন, জীবনের সংগ্রাম, অপূর্ণতা ও স্বপ্নের জটিল সম্পর্ক নিয়ে কবিতা রচনা করছেন। ‘জীবনের জলছাপ’ তাঁর একটি উল্লেখযোগ্য কবিতা। একজন নতুন কবি হিসেবে তিনি সাহিত্য অঙ্গনে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করার চেষ্টা করছেন। তাঁর কবিতায় শহুরে জীবনের জটিলতা, মধ্যবিত্তের স্বপ্ন-ভাঙা, সময়ের নির্দয়তা এবং নারীর ভেতরকার সংগ্রাম ফুটে ওঠে। নতুন কবি হয়েও তিনি বাংলা কবিতার চিরায়ত বিষয়বস্তুকে নিজস্ব ভঙ্গিতে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন।
শিরোনামের তাৎপর্য
“জীবনের জলছাপ” শিরোনামটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। জলছাপ বা ওয়াটারমার্ক যেমন স্বচ্ছ, তেমনি অদৃশ্য কিন্তু স্থায়ী। জীবনের ঘটনাগুলোও তেমনি – আমরা হয়তো সব ঘটনা মনে রাখি না, কিন্তু তারা আমাদের ওপর এক অদৃশ্য ছাপ ফেলে যায়। জল যেমন স্থায়ী ছাপ ফেলে না, তেমনি জীবনের অনেক অভিজ্ঞতা আমরা ভুলে যাই, কিন্তু তাদের প্রভাব থেকে যাবে। অথবা জলছাপ যেমন জাল টাকার পার্থক্য করে, তেমনি জীবনের প্রকৃত অভিজ্ঞতা আমাদের আসল ও নকলের পার্থক্য শেখায়। এই শিরোনামের মধ্য দিয়ে কবি জীবনের ক্ষণস্থায়ী অথচ স্থায়ী সেই ছাপগুলোর কথা বলতে চেয়েছেন, যা আমরা ড্রয়ারে জমিয়ে রাখি, যা আমাদের অস্তিত্বের অংশ হয়ে যায়।
কবিতার মূল বিষয়বস্তু
এই কবিতার মূল বিষয়বস্তু হলো জীবনের অপূর্ণতা, ভাঙা স্বপ্ন, সময়ের নির্দয়তা এবং জীবনসংগ্রামের বাস্তবতা। কবি তাঁর ড্রয়ারে জমিয়ে রাখা অপূর্ণ শখ ও ভাঙা স্বপ্নের কথা বলেছেন। যেসব স্বপ্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকে ঠাই পায়নি, যেসব শখ পূরণ হয়নি, তারা ড্রয়ারেই জমে থাকে। কিন্তু মাঝে মাঝে তারা বেরিয়ে আসে, ভেংচি কাটে, গালি দেয়, কবিকে মনে করিয়ে দেয় যে যা পাওয়ার কথা ছিল তা পাওয়া যায়নি। কবি দেখিয়েছেন, সমাজের সকল স্তরের মানুষের গল্প একই – রাজপ্রাসাদ থেকে ঝুপড়ি ঘর, রাজরানী থেকে বস্ত্রবালিকা – সকলের জীবনেই শেকল, সকলের পদেই হিমালয়। কবি তাঁর শক্তি নিয়েও কথা বলেছেন – তিনি জঞ্জাল সরাতে পারেন, কিলিমাঞ্জারো ডিঙোতে পারেন, কিন্তু শেকল তাঁকে নো-ম্যান্স ল্যান্ডে আটকে রাখে। শেষ পর্যন্ত তিনি জানেন, একদিন তিনি অপূর্ণতার জাদুঘর হয়ে মৃতের জগতে চলে যাবেন। কবিতার শেষ অংশে তিনি জীবনের একমুখী পথের কথা বলেছেন – বোড়ের মতো সামনে এগিয়ে যাওয়াই নিয়তি, ফিরে গিয়ে শূন্যতা পূরণের সুযোগ জীবন দেয় না, কিছু তামাদির মওকুফ হয় না।
কবিতার ঐতিহাসিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট
একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে রচিত এই কবিতাটি বর্তমান সময়ের মানুষের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। বিশেষ করে করোনা পরবর্তী সময়ে যখন মানুষ জীবনের অনিশ্চয়তা, অর্থনৈতিক সংকট ও মানসিক চাপের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে, তখন এই কবিতা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কবিতাটি শহুরে মধ্যবিত্তের স্বপ্নভাঙার গল্প বলে। যারা বাণিজ্যিক ব্যাংকে ঠাই পাওয়ার স্বপ্ন দেখে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়। কবিতাটি বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের বেকারত্ব, হতাশা ও সংগ্রামের চিত্রও ধারণ করে। পাশাপাশি এটি নারীর জীবনসংগ্রামের কথাও বলে – রাজরানী থেকে বস্ত্রবালিকা সবার জীবনেই শেকল, সবার পথেই বাধা। কবিতাটি বর্তমান সময়ের নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল মানুষের চিরন্তন সংগ্রামের কথা বলে।
কবিতার শৈলীগত ও কাঠামোগত বিশ্লেষণ
কবিতাটি মুক্তছন্দে রচিত, কিন্তু এর ভেতরে একটি সুসংহত কাঠামো রয়েছে। কবিতাটি প্রধানত তিনটি ভাগে বিভক্ত – প্রথম ভাগে অপূর্ণ শখ ও ভাঙা স্বপ্নের বর্ণনা, দ্বিতীয় ভাগে জীবনের সর্বজনীন সংগ্রামের চিত্র এবং তৃতীয় ভাগে জীবনের একমুখী পথ ও তার নির্দয়তার বর্ণনা। কবিতার ভাষা অত্যন্ত সরল ও সাবলীল, কিন্তু প্রতিটি শব্দই গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। কবি এখানে বাংলা ও ইংরেজি শব্দের মিশ্রণ ঘটিয়েছেন – যেমন ‘হেরো’, ‘গুডবাই’, ‘মার্চপাস্ট’, ‘নোম্যান্স ল্যান্ড’ ইত্যাদি। এই মিশ্রণ কবিতাকে আধুনিক ও শহুরে স্বাদ দিয়েছে। কবিতার পংক্তিগুলো ছোট ছোট, কিন্তু প্রতিটি পংক্তি যেন একটি করে সম্পূর্ণ ছবি তৈরি করে।
প্রতিটি অংশের বিশ্লেষণ
প্রথম অংশ: ড্রয়ারের জমাকৃত স্বপ্ন
“ড্রয়ারে জমিয়ে রাখি অপূর্ণ শখ, ভাঙা স্বপ্ন। বাণিজ্যিক ব্যাংকে ঠাই হয় না বলে ওদের নিয়তি অলিন্দের ড্রয়ারেই জমে থাকা।” – এই পংক্তিতে কবি আমাদের প্রত্যেকের জীবনের সেই সব স্বপ্নের কথা বলেছেন যা আমরা পূরণ করতে পারিনি। বাণিজ্যিক ব্যাংক এখানে সাফল্য, অর্থ, প্রতিষ্ঠার প্রতীক। যেসব স্বপ্ন এই বাণিজ্যিক ব্যাংকে ঠাই পায়নি, সেগুলো আমাদের ড্রয়ারে জমে থাকে। ‘অলিন্দ’ শব্দটি বারান্দা বা ঘরের বাইরের অংশকে বোঝায়। অর্থাৎ এই স্বপ্নগুলো আমাদের জীবনের মূলকক্ষে নয়, বরং প্রান্তে, ড্রয়ারে জমে থাকে।
“হুটহাট আগল খুললেই অপূর্ণ শখগুলো ভেংচি কাটে, বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায় ‘হেরো’ বলে গালি দেয় নাকের ডগায় চড়ে।” – মাঝে মাঝে যখন আমরা আমাদের ড্রয়ার খুলি, অর্থাৎ যখন আমরা আমাদের অপূর্ণ স্বপ্নগুলোর কথা ভাবি, তখন তারা আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। তারা ভেংচি কাটে, বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায়, ‘হেরো’ বলে গালি দেয়। ‘হেরো’ শব্দটি সম্ভবত ‘হিরো’ এর বিপরীত, অর্থাৎ ব্যর্থ, পরাজিত। অপূর্ণ স্বপ্নগুলো কবিকে ব্যর্থ বলে সম্বোধন করে, তাঁর নাকের ডগায় চড়ে।
“শত শত ভাঙ্গা স্বপ্ন ‘টা টা! গুডবাই!’ বলে মার্চপাস্ট করে, ধুন্ধুমার হুলুস্থুল করে।” – ভাঙা স্বপ্নগুলো একসাথে মিছিল করে, ‘টা টা! গুডবাই!’ বলে চলে যায়। ‘মার্চপাস্ট’ শব্দটি সামরিক কুচকাওয়াজকে বোঝায়। ভাঙা স্বপ্নগুলো যেন এক সামরিক কুচকাওয়াজের মতো সাজানো গোছানোভাবে চলে যায়, কিন্তু তারা চলে যাওয়ার সময় ধুন্ধুমার হুলুস্থুল করে যায়। অর্থাৎ আমাদের মনে গভীর আলোড়ন তুলে যায়।
“বলে যায়, ‘সাতে যা পেতে হয়, সত্তুরে তা পাবে না। আর পেলেই বা কী! মন বদলাবে, শরীর সচল থাকবে না! ‘” – ভাঙা স্বপ্নগুলো বিদায় নেওয়ার সময় বলে যায়, জীবনের সাত বছর বয়সে যা পাওয়ার ছিল, সত্তর বছর বয়সে তা আর পাওয়া যাবে না। আর পেলেই বা কী? তখন মন বদলে যাবে, শরীর সচল থাকবে না। সময়ের নির্দয়তা এখানে ফুটে উঠেছে। জীবনের প্রতিটি বয়সের নিজস্ব চাহিদা আছে, নিজস্ব পাওয়ার বিষয় আছে। সময় পেরিয়ে গেলে তা আর পাওয়া যায় না।
দ্বিতীয় অংশ: সর্বজনীন সংগ্রাম
“রাজপ্রাসাদ থেকে ঝুপড়ি ঘর – রাজরানী থেকে বস্ত্রবালিকা – সকলের গল্প এক সকলের গল্প এই-ই।” – এই পংক্তিতে কবি জীবনের সর্বজনীন সংগ্রামের কথা বলেছেন। রাজপ্রাসাদের বাসিন্দা হোক বা ঝুপড়ি ঘরের বাসিন্দা, রাজরানী হোক বা বস্ত্রবালিকা – সকলের জীবনের গল্প একই। সকলের জীবনেই আছে অপূর্ণতা, আছে সংগ্রাম। সামাজিক শ্রেণিবিভাগ যাই হোক না কেন, মানুষের জীবনের মৌলিক অভিজ্ঞতা একই।
“জীবনের পায়ে পায়ে শেকল, পদে পদে হিমালয়।” – এই পংক্তিটি অত্যন্ত শক্তিশালী। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে শেকল, প্রতিটি পদে হিমালয় পর্বতের মতো বাধা। ‘পায়ে পায়ে শেকল’ মানে চলার পথে প্রতিটি মুহূর্তে বাধা, ‘পদে পদে হিমালয়’ মানে প্রতিটি পদক্ষেপে বিরাট বাধা। এখানে ‘হিমালয়’ শব্দটি বিশাল বাধার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
“দুহাতে জঞ্জাল সরাতে পারি, দু পায়ে ডিঙ্গাতে পারি কিলিমাঞ্জারো।” – কবি তাঁর শক্তি নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি দুহাতে জঞ্জাল সরাতে পারেন, দু পায়ে কিলিমাঞ্জারো পর্বত ডিঙোতে পারেন। কিলিমাঞ্জারো আফ্রিকার সর্বোচ্চ পর্বত, যা ৫,৮৯৫ মিটার উঁচু। কবি বলছেন, তিনি এই বিশাল পর্বতও ডিঙোতে পারেন – অর্থাৎ তিনি যে কোনো বাধা অতিক্রম করার শক্তি রাখেন।
“শেকল আটকে রাখে নোম্যান্স ল্যান্ডে।” – কিন্তু সমস্যা হলো, তিনি যত শক্তিমানই হোন না কেন, শেকল তাঁকে আটকে রাখে ‘নো-ম্যান্স ল্যান্ডে’। নো-ম্যান্স ল্যান্ড হলো দুই রাষ্ট্রের মাঝখানের যে ভূমি, যার কোনো মালিক নেই, যেখানে কেউ থাকতে পারে না। শেকল তাঁকে এমন এক জায়গায় আটকে রাখে যেখানে কোনও গন্তব্য নেই, কোনও অগ্রগতি নেই।
“তারপর একদিন কোটি কোটি আফসোস আর অপূর্ণতার জাদুঘর হয়ে জীবনকে ‘গুডবাই’ বলে চলে যাবো মৃতের জগতে!” – শেষ পর্যন্ত, জীবনের শেষ দিনে, আমরা কোটি কোটি আফসোস আর অপূর্ণতার জাদুঘর হয়ে যাই। আমাদের সমগ্র জীবন যেন এক বিরাট জাদুঘর, যেখানে আমাদের অপূর্ণ স্বপ্নগুলো, আমাদের আফসোসগুলো টাঙানো থাকে। তারপর একদিন আমরা জীবনকে ‘গুডবাই’ বলে চলে যাই মৃতের জগতে।
তৃতীয় অংশ: জীবনের একমুখী পথ
“জীবন একমুখী পথ বোড়ের মতো সামনে এগিয়ে যাওয়াই ভবিতব্য।” – জীবন একমুখী পথ। এখানে ‘বোড়ের মতো’ একটি গুরুত্বপূর্ণ উপমা। বোড় অর্থাৎ বোলতা বা ভিমরুল। বোলতা যেমন সোজা লাইনে উড়ে, তেমনি জীবনও সোজা লাইনে এগিয়ে চলে। পেছনে ফিরে তাকানোর অবকাশ নেই। সামনে এগিয়ে যাওয়াই নিয়তি।
“ফিরে গিয়ে শূণ্যতা পূরণের সুযোগ সে দেয় না !” – জীবন ফিরে গিয়ে শূন্যতা পূরণের সুযোগ দেয় না। একবার সময় পেরিয়ে গেলে, একবার সুযোগ হারিয়ে গেলে, তা আর ফিরে পাওয়া যায় না। জীবনের এই নির্দয় বাস্তবতা কবি তুলে ধরেছেন।
“কিছু তামাদির তো কিছুতেই মওকুফ হয় না।” – ‘তামাদি’ শব্দটি আইনি পরিভাষা, যার অর্থ সময়সীমা অতিক্রান্ত হওয়ার কারণে কোনো অধিকার হারানো। কবি বলছেন, জীবনের কিছু কিছু বিষয় আছে যার সময়সীমা একবার পেরিয়ে গেলে তা আর ফিরিয়ে আনা যায় না। সেগুলোর মওকুফ হয় না, কোনও ছাড় নেই। সময়ের নির্দয়তা এখানে চূড়ান্ত রূপ পেয়েছে।
প্রতীক ও চিত্রকল্পের বিশ্লেষণ
কবিতাটি বিভিন্ন প্রতীক ও চিত্রকল্পে সমৃদ্ধ। প্রধান কয়েকটি প্রতীক হলো:
- ড্রয়ার: আমাদের অবচেতন মন, যেখানে আমরা আমাদের অপূর্ণ স্বপ্ন ও ভাঙা আশাগুলো জমিয়ে রাখি।
- বাণিজ্যিক ব্যাংক: সাফল্য, অর্থ, প্রতিষ্ঠার প্রতীক। যে স্বপ্নগুলো বাণিজ্যিক ব্যাংকে জায়গা পায়নি, অর্থাৎ যে স্বপ্নগুলো সফল হয়নি।
- অপূর্ণ শখ/ভাঙা স্বপ্ন: আমাদের জীবনের ব্যর্থতা, অপূর্ণতা, অপ্রাপ্তির প্রতীক।
- ভেংচি কাটা, বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখা, গালি দেওয়া: এই অপূর্ণ স্বপ্নগুলো আমাদের মনে অশান্তি তৈরি করে, আমাদের ব্যর্থতার কথা মনে করিয়ে দেয়।
- মার্চপাস্ট: সুসংহতভাবে চলে যাওয়া, জীবনের অগ্রযাত্রার প্রতীক।
- রাজপ্রাসাদ-ঝুপড়ি ঘর, রাজরানী-বস্ত্রবালিকা: সামাজিক বৈষম্যের প্রতীক, কিন্তু কবি দেখিয়েছেন সকলের গল্প একই।
- শেকল: জীবনের বাধা, সামাজিক বিধিনিষেধ, পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর প্রতীক।
- হিমালয়: বিশাল বাধা, দুর্গম পথের প্রতীক।
- কিলিমাঞ্জারো: অতিক্রম করার শক্তির প্রতীক, মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তির প্রতীক।
- নো-ম্যান্স ল্যান্ড: অনিশ্চয়তা, গন্তব্যহীনতার প্রতীক।
- জাদুঘর: আমাদের সমগ্র জীবনের সঞ্চিত অভিজ্ঞতা, অপূর্ণতা, আফসোসের প্রতীক।
- জীবন একমুখী পথ: সময়ের অপরিবর্তনীয়তার প্রতীক।
- বোড় (বোলতা): একমুখী, সরল গতির প্রতীক।
- তামাদি: সময়ের নির্দয়তা, হারানো সুযোগের প্রতীক।
ছন্দ ও ভাষাশৈলী
কবিতাটি মুক্তছন্দে রচিত। এখানে কোনো নির্দিষ্ট মাত্রার বাঁধন নেই, কিন্তু একটি অভ্যন্তরীণ ছন্দ আছে যা কবিতাকে প্রবাহিত রেখেছে। কবি এখানে বাংলা ও ইংরেজি শব্দের মিশ্রণ ঘটিয়েছেন, যা কবিতাকে আধুনিক ও শহুরে স্বাদ দিয়েছে। যেমন – ‘হেরো’, ‘গুডবাই’, ‘মার্চপাস্ট’, ‘নোম্যান্স ল্যান্ড’ ইত্যাদি। এই মিশ্রণ বর্তমান সময়ের শহুরে তরুণ প্রজন্মের ভাষার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কবিতার বাক্যগুলো ছোট ছোট, খণ্ডিত, যা আধুনিক জীবনের ভাঙাচোরা অবস্থার প্রতিফলন। কোথাও কোথাও কবি দীর্ঘ বাক্য ব্যবহার করেছেন, যা কবিতাকে এক ধরনের বৈচিত্র্য দিয়েছে।
জীবনদর্শন ও দার্শনিক তাৎপর্য
এই কবিতার গভীরে লুকিয়ে আছে এক জীবনদর্শন। কবি দেখিয়েছেন, জীবনে অপূর্ণতা থাকবেই। আমাদের অনেক স্বপ্ন পূরণ হবে না, অনেক শখ অধরা থেকে যাবে। কিন্তু এই অপূর্ণতাগুলো আমাদের অস্তিত্বের অংশ। তারা আমাদের ড্রয়ারে জমে থাকে, মাঝে মাঝে বেরিয়ে এসে আমাদের ব্যর্থতার কথা মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমাদের এগিয়ে যেতে হবে, কারণ জীবন একমুখী পথ, ফিরে যাওয়ার সুযোগ নেই।
কবি মানুষের শক্তি ও সীমাবদ্ধতার দ্বন্দ্বও দেখিয়েছেন। তিনি যেমন কিলিমাঞ্জারো ডিঙোতে পারেন, তেমনি শেকল তাঁকে আটকে রাখে নো-ম্যান্স ল্যান্ডে। অর্থাৎ মানুষের শক্তি অপরিসীম, কিন্তু সামাজিক বাধা, পারিপার্শ্বিক অবস্থা তাকে থমকে দেয়। শেষ পর্যন্ত মানুষ হয়ে ওঠে আফসোস আর অপূর্ণতার জাদুঘর।
কবিতার শেষ অংশে কবি সময়ের নির্দয়তার কথা বলেছেন। সময় একবার পেরিয়ে গেলে তা ফিরে আসে না, হারানো সুযোগ ফিরে পাওয়া যায় না। কিছু কিছু বিষয়ের ‘তামাদি’ মওকুফ হয় না। তাই জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগানো উচিত, কারণ ফিরে যাওয়ার পথ নেই।
নতুন কবি হিসেবে মমতাজ মৌ-এর স্বর
একজন নতুন কবি হিসেবে মমতাজ মৌ-এর এই কবিতা আশাব্যঞ্জক। তিনি বাংলা কবিতার চিরায়ত বিষয়বস্তু – জীবন, মৃত্যু, স্বপ্ন, অপূর্ণতা, সময় – নিয়ে লিখেছেন, কিন্তু নিজস্ব ভঙ্গিতে। তাঁর ভাষা আধুনিক, শহুরে, সমসাময়িক। তিনি ইংরেজি শব্দের ব্যবহারে দ্বিধা করেননি, যা বর্তমান সময়ের বাস্তবতার প্রতিফলন। তাঁর কবিতায় নারীর কণ্ঠস্বর স্পষ্ট, কিন্তু তা আক্রমণাত্মক নয়, বরং বাস্তবসম্মত। তিনি নারীর সংগ্রাম ও শক্তি, তার সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাবনা – সবকিছুই তুলে ধরেছেন। একজন নতুন কবি হিসেবে তিনি বাংলা কবিতায় একটি নতুন মাত্রা যোগ করার সম্ভাবনা রাখেন।
সমসাময়িক প্রাসঙ্গিকতা
এই কবিতাটি বর্তমান সময়ের মানুষের জীবনের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। করোনা পরবর্তী বিশ্বে মানুষ যখন অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, চাকরির সংকট, মানসিক চাপের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে, তখন এই কবিতার ‘বাণিজ্যিক ব্যাংকে ঠাই না পাওয়া স্বপ্ন’ বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। তরুণ প্রজন্মের বেকারত্বের হার বাড়ছে, তারা তাদের স্বপ্নগুলো ড্রয়ারে জমিয়ে রাখতে বাধ্য হচ্ছে। এই কবিতা সেই তরুণদের নিজস্ব গল্প বলে।
পাশাপাশি এটি নারীর জীবনসংগ্রামের কথাও বলে। রাজরানী থেকে বস্ত্রবালিকা – সকলের জীবনেই শেকল, সকলের পথেই বাধা। একবিংশ শতাব্দীতেও নারীকে নানা বাধার সম্মুখীন হতে হয়। কর্মক্ষেত্রে, পরিবারে, সমাজে নারীর পথ এত সহজ নয়। এই কবিতা সেই বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরে।
কবিতার শেষ অংশে সময়ের নির্দয়তার কথা বলা হয়েছে। বর্তমান দ্রুতগতির জীবনে মানুষ সময়ের মূল্য বুঝতে পারে না। কিন্তু সময় ফিরে আসে না, হারানো সুযোগ ফিরে পাওয়া যায় না। এই সত্যটি আজীবন প্রাসঙ্গিক।
বাংলা সাহিত্যে কবিতাটির স্থান
বাংলা সাহিত্যে জীবন, মৃত্যু, সময় ও অপূর্ণতা চিরকালীন বিষয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শেষের কবিতা’, জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’, শামসুর রাহমানের ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলছে স্বদেশ’ – সবই এই বিষয় নিয়ে রচিত। মমতাজ মৌ-এর এই কবিতা সেই ধারারই আধুনিক সংস্করণ। তিনি আধুনিক ভাষায়, সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে, শহুরে বাস্তবতার নিরিখে এই চিরন্তন বিষয়গুলোকে নতুন করে উপস্থাপন করেছেন। একজন নতুন কবি হিসেবে তাঁর এই প্রচেষ্টা প্রশংসনীয়।
বিশেষ করে ‘জীবনের পায়ে পায়ে শেকল, পদে পদে হিমালয়’ এবং ‘দুহাতে জঞ্জাল সরাতে পারি, দু পায়ে ডিঙ্গাতে পারি কিলিমাঞ্জারো’ – এই পংক্তিগুলো শক্তিশালী ও স্মরণীয়। ‘জীবন একমুখী পথ বোড়ের মতো সামনে এগিয়ে যাওয়াই ভবিতব্য’ – এই উপমাটিও অত্যন্ত চমৎকার। একজন নতুন কবির পক্ষে এ ধরনের শক্তিশালী চিত্রকল্প সৃষ্টি করা আশাব্যঞ্জক।
উপসংহার
মমতাজ মৌ-এর ‘জীবনের জলছাপ’ কবিতাটি একবিংশ শতাব্দীর তরুণ প্রজন্মের জীবনের একটি শক্তিশালী দলিল। এটি আমাদের অপূর্ণ স্বপ্ন, ভাঙা আশা, জীবনের বাধা ও সময়ের নির্দয়তার কথা বলে। কবি দেখিয়েছেন, জীবনে অপূর্ণতা থাকবেই, কিন্তু আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। আমরা কিলিমাঞ্জারো ডিঙোনোর শক্তি রাখি, কিন্তু শেকল আমাদের আটকে রাখে। শেষ পর্যন্ত আমরা আফসোস আর অপূর্ণতার জাদুঘর হয়ে মৃতের জগতে চলে যাই। জীবন একমুখী পথ, ফিরে যাওয়ার সুযোগ নেই। তাই প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগানো উচিত, কারণ কিছু কিছু বিষয়ের ‘তামাদি’ মওকুফ হয় না।
একজন নতুন কবির পক্ষে এত গভীর জীবনবোধ নিয়ে কবিতা লেখা প্রশংসনীয়। মমতাজ মৌ বাংলা কবিতার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তাঁর এই কবিতা বাংলা সাহিত্যে একটি মূল্যবান সংযোজন।
প্রশ্নোত্তর
১. ‘জীবনের জলছাপ’ কবিতায় ‘ড্রয়ার’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘ড্রয়ার’ বলতে আমাদের অবচেতন মন বা স্মৃতির ভাণ্ডার বোঝানো হয়েছে। আমরা আমাদের জীবনের অপূর্ণ স্বপ্ন, ভাঙা আশা, ব্যর্থতা – সবকিছু আমাদের মনের কোনো না কোনো কোণে জমিয়ে রাখি। কবি সেই জায়গাটিকেই ড্রয়ারের সাথে তুলনা করেছেন। ড্রয়ার যেমন বন্ধ থাকে, তেমনি এই অপূর্ণ স্বপ্নগুলোও আমাদের মনের মধ্যে বন্ধ থাকে, কিন্তু মাঝে মাঝে তারা বেরিয়ে আসে।
২. ‘বাণিজ্যিক ব্যাংকে ঠাই হয় না বলে’ – বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
‘বাণিজ্যিক ব্যাংক’ এখানে সাফল্য, অর্থ, প্রতিষ্ঠা, সামাজিক মর্যাদার প্রতীক। কবি বলছেন, আমাদের অনেক স্বপ্ন আছে যেগুলো বাস্তবে সফল হয় না, যেগুলো সমাজে প্রতিষ্ঠা পায় না। সেই স্বপ্নগুলো ব্যাংকে জমা রাখার মতো মূল্যবান নয় বলে তারা ড্রয়ারেই জমে থাকে। অর্থাৎ আমাদের অপূর্ণ স্বপ্নগুলো সাফল্যের বাজারে মূল্য পায় না।
৩. ‘অপূর্ণ শখগুলো ভেংচি কাটে, বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায়’ – কেন?
আমাদের অপূর্ণ স্বপ্নগুলো যখন আমরা মনে করি, তখন তারা আমাদের ব্যর্থতার কথা মনে করিয়ে দেয়। তারা আমাদের উদ্দেশ্যে ভেংচি কাটে, বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায়, ‘হেরো’ বলে গালি দেয়। অর্থাৎ তারা আমাদের মনে অপরাধবোধ তৈরি করে, আমাদের ব্যর্থতার জন্য দায়ী করে। আসলে এগুলো আমাদের নিজের মনেরই সৃষ্টি – আমাদের আত্মসমালোচনা, আমাদের আক্ষেপ।
৪. ‘সাতে যা পেতে হয়, সত্তুরে তা পাবে না’ – এই লাইনের তাৎপর্য কী?
এই লাইনটি সময়ের নির্দয়তার কথা বলে। জীবনের প্রতিটি বয়সের নিজস্ব চাহিদা আছে, নিজস্ব পাওয়ার বিষয় আছে। সাত বছর বয়সে যে জিনিস পাওয়ার কথা, তা সত্তর বছর বয়সে পাওয়ার অর্থ নেই। সময় পেরিয়ে গেলে আর তা ফিরে পাওয়া যায় না। এটি জীবনের একটি মৌলিক সত্য।
৫. ‘রাজপ্রাসাদ থেকে ঝুপড়ি ঘর – রাজরানী থেকে বস্ত্রবালিকা – সকলের গল্প এক’ – বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
এই পংক্তিতে কবি জীবনের সর্বজনীন সংগ্রামের কথা বলেছেন। ধনী-গরিব, উচ্চবর্ণ-নিম্নবর্ণ, রাজা-প্রজা – সকলের জীবনেই আছে অপূর্ণতা, আছে সংগ্রাম, আছে বেদনা। বাইরের অবস্থান যাই হোক না কেন, ভেতরের অভিজ্ঞতা প্রায় একই। সকলের জীবনেই আছে শেকল, আছে হিমালয়।
৬. ‘জীবনের পায়ে পায়ে শেকল, পদে পদে হিমালয়’ – এই পংক্তির ব্যাখ্যা দিন।
এই পংক্তিটি অত্যন্ত শক্তিশালী। ‘পায়ে পায়ে শেকল’ মানে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে বাধা, প্রতিটি মুহূর্তে বন্ধন। ‘পদে পদে হিমালয়’ মানে প্রতিটি পদক্ষেপে বিশাল বাধা। হিমালয় পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বত, যা অতিক্রম করা অত্যন্ত কঠিন। কবি বলছেন, আমাদের জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপেই এত বড় বাধা। এটি জীবনসংগ্রামের এক চরম রূপক।
৭. ‘দুহাতে জঞ্জাল সরাতে পারি, দু পায়ে ডিঙ্গাতে পারি কিলিমাঞ্জারো’ – বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
এখানে কবি মানুষের শক্তির কথা বলেছেন। কিলিমাঞ্জারো আফ্রিকার সর্বোচ্চ পর্বত। কবি বলছেন, তিনি এই বিশাল পর্বতও ডিঙোতে পারেন, অর্থাৎ তিনি যে কোনো বাধা অতিক্রম করার শক্তি রাখেন। ‘জঞ্জাল সরানো’ অর্থাৎ জীবনের ছোটখাটো বাধা দূর করা। কবি তাঁর শক্তিমত্তার কথা জানিয়েছেন।
৮. ‘শেকল আটকে রাখে নোম্যান্স ল্যান্ডে’ – বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
নো-ম্যান্স ল্যান্ড হলো দুই রাষ্ট্রের মাঝখানের যে ভূমি, যার কোনো মালিক নেই, যেখানে কেউ স্থায়ীভাবে থাকতে পারে না। কবি বলছেন, তিনি যত শক্তিমানই হোন না কেন, শেকল তাঁকে আটকে রাখে এমন এক জায়গায় যেখানে কোনও গন্তব্য নেই, কোনও অগ্রগতি নেই। অর্থাৎ সামাজিক বাধা, পারিপার্শ্বিক অবস্থা তাঁকে থমকে দেয়, তাঁকে এগিয়ে যেতে দেয় না।
৯. ‘কোটি কোটি আফসোস আর অপূর্ণতার জাদুঘর হয়ে’ – বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
‘জাদুঘর’ এমন একটি জায়গা যেখানে পুরোনো জিনিসপত্র সংগ্রহ করে রাখা হয়। কবি বলছেন, জীবনের শেষ পর্যায়ে আমরা আমাদের সমস্ত আফসোস আর অপূর্ণতার এক বিশাল সংগ্রহশালায় পরিণত হয়ে যাই। আমাদের সমগ্র জীবন যেন এক বিরাট জাদুঘর, যেখানে আমাদের অপূর্ণ স্বপ্নগুলো, আমাদের আক্ষেপগুলো টাঙানো থাকে।
১০. ‘জীবন একমুখী পথ বোড়ের মতো সামনে এগিয়ে যাওয়াই ভবিতব্য’ – ‘বোড়’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘বোড়’ অর্থাৎ বোলতা বা ভিমরুল। বোলতা যেমন সোজা লাইনে উড়ে, পেছনে ফিরে তাকায় না, তেমনি জীবনও সোজা লাইনে এগিয়ে চলে। পেছনে ফিরে যাওয়ার সুযোগ নেই। সামনে এগিয়ে যাওয়াই জীবনের নিয়তি। এটি একটি চমৎকার উপমা, যা জীবনের গতিকে ফুটিয়ে তুলেছে।
১১. ‘কিছু তামাদির তো কিছুতেই মওকুফ হয় না’ – ‘তামাদি’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘তামাদি’ একটি আইনি পরিভাষা। আইনে কোনো দাবি জানানোর একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকে; সেই সময় পেরিয়ে গেলে দাবি জানানোর অধিকার হারিয়ে যায়, একে ‘তামাদি’ বলে। কবি এখানে জীবনের সেই সত্যটি বলেছেন যে, জীবনে কিছু কিছু বিষয়ের সময়সীমা একবার পেরিয়ে গেলে তা আর ফিরিয়ে আনা যায় না। কোনও মওকুফ নেই, কোনও ছাড় নেই। সময়ের নির্দয়তা এখানে প্রকাশ পেয়েছে।
১২. এই কবিতায় ‘জীবনের জলছাপ’ বলতে কবি আসলে কী বুঝিয়েছেন?
‘জীবনের জলছাপ’ বলতে কবি জীবনের সেই অদৃশ্য ছাপগুলোর কথা বলেছেন যা আমাদের ওপর পড়ে। জলছাপ যেমন স্বচ্ছ, তেমনি অদৃশ্য কিন্তু স্থায়ী। জীবনের ঘটনাগুলো আমরা হয়তো সব মনে রাখি না, কিন্তু তাদের প্রভাব থেকে যায়। অথবা জলছাপ যেমন জাল টাকার পার্থক্য করে, তেমনি জীবনের প্রকৃত অভিজ্ঞতা আমাদের আসল ও নকলের পার্থক্য শেখায়। কবি তার ড্রয়ারে জমিয়ে রাখা অপূর্ণ স্বপ্ন ও ভাঙা আশাগুলোই সম্ভবত ‘জীবনের জলছাপ’ বলতে বুঝিয়েছেন।
১৩. কবিতায় নারীর অবস্থান সম্পর্কে কী বলা হয়েছে?
কবিতায় ‘রাজরানী থেকে বস্ত্রবালিকা’ সকলের গল্প একই বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কবি এখানে দেখিয়েছেন, নারীর সামাজিক অবস্থান যাই হোক না কেন, তার জীবনেও আছে শেকল, আছে হিমালয়। নারীকেও জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে বাধার সম্মুখীন হতে হয়। কবিতার ‘দুহাতে জঞ্জাল সরাতে পারি’ পংক্তিতে নারীর শক্তির কথাও বলা হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত শেকল তাঁকে আটকে রাখে নো-ম্যান্স ল্যান্ডে। এটি নারীর সংগ্রাম ও সীমাবদ্ধতার একটি বাস্তব চিত্র।
১৪. এই কবিতায় সময়ের ধারণা কীভাবে ফুটে উঠেছে?
এই কবিতায় সময়ের ধারণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম অংশে ভাঙা স্বপ্নগুলো বলে, “সাতে যা পেতে হয়, সত্তুরে তা পাবে না” – এটি সময়ের নির্দয়তার প্রথম ইঙ্গিত। তৃতীয় অংশে কবি সরাসরি বলেছেন, “জীবন একমুখী পথ… ফিরে গিয়ে শূণ্যতা পূরণের সুযোগ সে দেয় না!”। শেষ পংক্তিতে ‘তামাদি’র কথা বলে সময়ের অপরিবর্তনীয়তা ফুটিয়ে তুলেছেন। কবি দেখিয়েছেন, সময় একবার পেরিয়ে গেলে তা ফিরে আসে না, হারানো সুযোগ ফিরে পাওয়া যায় না।
১৫. ‘জীবনের জলছাপ’ কবিতাটি একজন নতুন কবির কবিতা হিসেবে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
একজন নতুন কবির পক্ষে মমতাজ মৌ-এর এই কবিতা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। তিনি বাংলা কবিতার চিরায়ত বিষয়বস্তুকে নিজস্ব ভঙ্গিতে, আধুনিক ভাষায়, সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর ভাষা সাবলীল, চিত্রকল্প শক্তিশালী, ভাবনা গভীর। ‘জীবনের পায়ে পায়ে শেকল, পদে পদে হিমালয়’, ‘দুহাতে জঞ্জাল সরাতে পারি, দু পায়ে ডিঙ্গাতে পারি কিলিমাঞ্জারো’, ‘জীবন একমুখী পথ বোড়ের মতো’ – এই পংক্তিগুলো শক্তিশালী ও স্মরণীয়। একজন নতুন কবি হিসেবে তিনি বাংলা কবিতার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
১৬. কবিতায় ব্যবহৃত ‘মার্চপাস্ট’, ‘নোম্যান্স ল্যান্ড’, ‘গুডবাই’ ইত্যাদি ইংরেজি শব্দের ব্যবহার কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
বাংলা কবিতায় ইংরেজি শব্দের ব্যবহার বিতর্কিত হতে পারে। কিন্তু মমতাজ মৌ এই শব্দগুলো ব্যবহার করে কবিতাকে আধুনিক ও শহুরে স্বাদ দিয়েছেন। ‘মার্চপাস্ট’, ‘গুডবাই’, ‘নোম্যান্স ল্যান্ড’ – এই শব্দগুলো বর্তমান সময়ের শহুরে তরুণ প্রজন্মের ভাষার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এগুলো কবিতাকে সমসাময়িক করে তুলেছে। তবে এগুলোর ব্যবহার সীমিত, যা কবিতার সৌন্দর্য নষ্ট করেনি বরং একটি বিশেষ রস সৃষ্টি করেছে।
১৭. ‘জীবনের জলছাপ’ কবিতার মূল বক্তব্য কী?
এই কবিতার মূল বক্তব্য হলো জীবনের অপূর্ণতা, সংগ্রাম ও সময়ের নির্দয়তা। কবি দেখিয়েছেন, আমাদের জীবনে অনেক স্বপ্ন অপূর্ণ থেকে যায়, অনেক শখ অধরা থেকে যায়। তারা আমাদের মনে জমা থাকে, মাঝে মাঝে বেরিয়ে এসে আমাদের ব্যর্থতার কথা মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু আমাদের এগিয়ে যেতে হয়, কারণ জীবন একমুখী পথ। আমরা কিলিমাঞ্জারো ডিঙোনোর শক্তি রাখলেও শেকল আমাদের আটকে রাখে নো-ম্যান্স ল্যান্ডে। শেষ পর্যন্ত আমরা আফসোস আর অপূর্ণতার জাদুঘর হয়ে মৃতের জগতে চলে যাই। সময় ফিরে আসে না, তাই প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগানো উচিত।
১৮. এই কবিতায় ব্যবহৃত একটি শক্তিশালী চিত্রকল্প নিজের ভাষায় ব্যাখ্যা করুন।
‘জীবনের পায়ে পায়ে শেকল, পদে পদে হিমালয়’ – এই চিত্রকল্পটি অত্যন্ত শক্তিশালী। কবি এখানে জীবনকে এক ব্যক্তিরূপে কল্পনা করেছেন, যার পায়ে পায়ে শেকল পরানো। অর্থাৎ চলার পথে প্রতিটি মুহূর্তে বাধা। আর পদে পদে হিমালয় – প্রতিটি পদক্ষেপে বিশাল পর্বতের মতো বাধা। হিমালয় পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বত, যা অতিক্রম করা অত্যন্ত কঠিন। এই একটি চিত্রকল্পের মধ্য দিয়ে কবি জীবনসংগ্রামের চরম রূপ ফুটিয়ে তুলেছেন।
১৯. কবিতার শেষ তিন লাইনের তাৎপর্য কী?
কবিতার শেষ তিন লাইন হলো: “জীবন একমুখী পথ বোড়ের মতো সামনে এগিয়ে যাওয়াই ভবিতব্য। ফিরে গিয়ে শূণ্যতা পূরণের সুযোগ সে দেয় না ! কিছু তামাদির তো কিছুতেই মওকুফ হয় না।” এই তিন লাইনে কবি জীবনের চূড়ান্ত সত্য বলেছেন। জীবন একমুখী পথ, বোলতার মতো সোজা লাইনে এগিয়ে চলে। ফিরে যাওয়ার সুযোগ নেই। একবার সময় পেরিয়ে গেলে শূন্যতা পূরণের সুযোগ আর নেই। আইনের ‘তামাদি’র মতো জীবনের কিছু কিছু বিষয়ের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে তা আর ফিরিয়ে আনা যায় না। এটি সময়ের নির্দয়তার চূড়ান্ত রূপ।
২০. ‘জীবনের জলছাপ’ কবিতাটি পাঠকের মনে কী ধরনের প্রভাব ফেলে?
এই কবিতাটি পাঠকের মনে গভীর প্রভাব ফেলে। কবিতার শুরুতে ড্রয়ারের জমাকৃত স্বপ্নের বর্ণনা পাঠকের নিজের জীবনের অভিজ্ঞতার কথা মনে করিয়ে দেয়। দ্বিতীয় অংশে রাজপ্রাসাদ থেকে ঝুপড়ি ঘর, রাজরানী থেকে বস্ত্রবালিকা সকলের গল্প একই – এই চিত্র পাঠককে ভাবায় যে সব মানুষের জীবনেই একই রকম সংগ্রাম। তৃতীয় অংশে জীবনের একমুখী পথের বর্ণনা পাঠকের মনে সময়ের গুরুত্ব উপলব্ধি করায়। শেষ পর্যন্ত কবিতাটি পাঠককে নিজের জীবন, নিজের অপূর্ণতা, নিজের সংগ্রাম নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে। এটি এক ধরনের বিষণ্ণতা ও অনুপ্রেরণা মিশ্রিত অনুভূতি তৈরি করে।
ট্যাগস: জীবনের জলছাপ, মমতাজ মৌ, মমতাজ মৌ কবিতা, বাংলা কবিতা, নতুন কবির কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, বাংলাদেশের কবিতা, নারীর কবিতা, জীবন সংগ্রামের কবিতা, অপূর্ণ স্বপ্নের কবিতা, সময়ের কবিতা, একবিংশ শতাব্দীর বাংলা কবিতা, ড্রয়ারের কবিতা, ভাঙা স্বপ্নের কবিতা, নোম্যান্স ল্যান্ড, কিলিমাঞ্জারো, হিমালয়ের প্রতীক, বোড়ের মতো জীবন, তামাদির কবিতা






