কবিতার খাতা
- 25 mins
ঘুষ – সুবোধ সরকার।
ঘুষ – সুবোধ সরকার | বাংলা কবিতা বিশ্লেষণ
ঘুষ কবিতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ বিশ্লেষণ
সুবোধ সরকারের “ঘুষ” কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের একটি বাস্তবতাবাদী ও শক্তিশালী কবিতা যা সমাজের এক ভয়াবহ সত্যকে সামনে এনেছে। “রবীন্দ্ররচনাবলীর নবম খন্ড দিয়ে চাপা দেওয়া সুইসাইড নোট, ছেলেকে লেখা।” – এই পংক্তির মধ্য দিয়ে কবি আমাদের নিয়ে যান এক শিক্ষকের আত্মহত্যার ঘটনায়। কবিতাটি একটি আত্মহত্যা করা শিক্ষকের ছেলেকে লেখা শেষ চিঠির বর্ণনা। এই চিঠির মাধ্যমেই আমরা জানতে পারি, কী কারণে একজন সৎ, আজীবন ছাত্র পড়ানো শিক্ষক আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন। তার স্ত্রীর চিকিৎসার খরচ চালাতে না পেরে তিনি একটি ঘুষ নিয়েছিলেন – তিরিশ হাজার টাকা। সেই টাকায় স্ত্রীর চিকিৎসা চলছিল, কিন্তু এই ঘুষ নেওয়ার অপরাধবোধ তাঁকে আত্মহত্যায় বাধ্য করে। কবিতাটি শেষ হয়েছে এক চরম বেদনাদায়ক চিত্র দিয়ে – “ওই একটু বেড়িয়ে থাকা পা দুটি যেন ভারতবর্ষের শেষ মাটি।” এই একটি লাইনে কবি ভারতবর্ষের নৈতিক অবক্ষয়ের শেষ সীমা চিহ্নিত করেছেন।
ঘুষ কবিতার ঐতিহাসিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট
সুবোধ সরকারের এই কবিতাটি ভারতীয় সমাজের একটি জ্বলন্ত সমস্যা – ঘুষ ও দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে। কবিতাটিতে একজন সৎ শিক্ষকের আত্মহত্যার কাহিনী বর্ণিত হয়েছে, যিনি স্ত্রীর চিকিৎসার খরচ জোগাতে না পেরে একটি ঘুষ নিয়েছিলেন এবং সেই অপরাধবোধে আত্মহত্যা করেছেন। কবিতাটি আমাদের সমাজের সেই বাস্তবতা তুলে ধরে যেখানে সৎ মানুষও অসহায় অবস্থায় অসৎ পথ বেছে নিতে বাধ্য হন। আর সেই পথ বেছে নেওয়ার পর অপরাধবোধ তাঁকে আত্মহত্যার পথে ঠেলে দেয়। কবিতাটি একইসাথে শিক্ষক সমাজের দুর্দশা, চিকিৎসা ব্যবস্থার ব্যর্থতা এবং নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের চিত্র তুলে ধরেছে। “যখন সারাটা দেশ দাঁড়িয়ে আছে টাকার ওপর” – এই পংক্তিটি ভারতীয় সমাজের বর্তমান বাস্তবতার এক নির্মম চিত্র।
ঘুষ কবিতার শৈলীগত ও কাব্যিক বিশ্লেষণ
সুবোধ সরকারের এই কবিতাটি একটি গদ্যকাব্যের মতো। এটি একটি ঘটনার সরল বর্ণনা, কিন্তু প্রতিটি শব্দই অত্যন্ত শক্তিশালী ও তাৎপর্যপূর্ণ। কবিতাটি শুরু হয় একটি সুইসাইড নোটের বর্ণনা দিয়ে – “রবীন্দ্ররচনাবলীর নবম খন্ড দিয়ে চাপা দেওয়া সুইসাইড নোট”। রবীন্দ্ররচনাবলী – বাংলার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, জ্ঞানের প্রতীক। সেই রচনাবলী দিয়ে চাপা দেওয়া একটি সুইসাইড নোট – এটি এক চরম বিদ্রূপ। “ছেলেকে লেখা। লিখে, হাতে ব্লেড নিয়ে বাথরুমে ঢুকেছিলেন মাস্টারমশাই” – এই পংক্তিতে কবি অত্যন্ত সরল ভাষায় আত্মহত্যার প্রস্তুতির কথা বলেছেন। “দুপুরবেলা কাজের লোক দরজার তলা দিয়ে রক্ত আসছে দেখে চিত্কার করে ওঠে।” – এই লাইনে আত্মহত্যার ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। তারপর শুরু হয় সেই সুইসাইড নোট – ছেলেকে লেখা প্রথম ও শেষ চিঠি। “অরণি, আমি বিশ্বাস করি সন্তান পবিত্র জলের মতো যদিও তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্ক ভালো নয় তবু তোমাকেই লিখে রেখে যাই” – এই লাইনে দেখা যায়, ছেলের সাথে সম্পর্ক ভালো না হলেও, শেষ মুহূর্তে তাকেই লেখা এই চিঠি। পিতার মর্মবেদনা এখানে প্রকাশ পেয়েছে। “গত দু’বছর তোমার মায়ের চিকিত্সাবাবদ আমার যত্সামান্য সঞ্চয় আপাতত নিঃশেষিত চিকিত্সার ব্যয়ভার আমি আর নিতে পারছিলাম না।” – এখানে শিক্ষকের অসহায় অবস্থার চিত্র। সারা জীবনের সঞ্চয় শেষ, স্ত্রীর চিকিৎসা চালাতে পারছেন না। “জীবনে তোমার টাকা ছুঁইনি, মরেও ছোঁব না। আমি আজীবন ছাত্র পড়িয়েছি, জ্ঞানত কোনও অন্যায় করিনি।” – এই লাইনে তাঁর সততার পরিচয়। তিনি জীবনে কখনও ছেলের টাকা নেননি, তিনি সৎভাবে ছাত্র পড়িয়েছেন। “গত মাসে আমার স্কুলে এক অভিভাবক এসে ঝুলোঝুলি করেন তাঁর ছেলেকে নেবার জন্য আমি প্রথম দিন ফিরিয়ে দিই দ্বিতীয় দিন ফিরিয়ে দিই তৃতীয় দিন পারিনি।” – এখানে সেই ঘুষ নেওয়ার ঘটনার বর্ণনা। প্রথম দুই দিন তিনি ফিরিয়ে দিয়েছেন, কিন্তু তৃতীয় দিন পারেননি। “তিনি আমাকে একটা বড় খামে তিরিশ হাজার টাকা দিয়ে চলে যান। সেই টাকায় এই মাসে তোমার মায়ের চিকিত্সা চলছে” – এই টাকাতেই স্ত্রীর চিকিৎসা চলছে। “জানি না তিনি বাড়ি ফিরবেন কি না কোনও দিন ফিরলে বোলো, পৃথিবীতে আমার বেঁচে থাকার অধিকার চলে গেছে। ইতি বাবা” – এই লাইনে তাঁর অপরাধবোধ ও আত্মহত্যার কারণ স্পষ্ট। তিনি মনে করেন, ঘুষ নেওয়ার পর তাঁর বেঁচে থাকার অধিকার চলে গেছে। “যখন সারাটা দেশ দাঁড়িয়ে আছে টাকার ওপর তখন রবীন্দ্ররচনাবলী দিয়ে চাপা দেওয়া একটা সুইসাইড নোট।” – এই পংক্তিতে কবি সমাজের বাস্তবতা ও শিক্ষকের আত্মহত্যার বৈপরীত্য তুলে ধরেছেন। “হাসপাতালে গাছের তলায় গা ছমছম করছিল এগিয়ে গেলাম সাদা কাপড়ে ঢাকা মাস্টারমশাইয়ের দিকে একটু বেড়িয়ে থাকা পা দুটোর দিকে—— ওই একটু বেড়িয়ে থাকা পা দুটি যেন ভারতবর্ষের শেষ মাটি।” – শেষ লাইনগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী। মাস্টারমশাইয়ের সাদা কাপড়ে ঢাকা শরীর থেকে একটু বেরিয়ে থাকা পা দুটি। কবি সেই পা দুটোকে দেখেছেন ভারতবর্ষের শেষ মাটি হিসেবে। অর্থাৎ এটুকুই শেষ – এরপর আর কিছু নেই। এই দেশে সৎ মানুষের বেঁচে থাকার জায়গা আর নেই।
ঘুষ কবিতার প্রতীকী তাৎপর্য
কবিতাটি প্রতীকে পরিপূর্ণ। ‘রবীন্দ্ররচনাবলী’ বাংলার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, জ্ঞানের প্রতীক। সেই রচনাবলী দিয়ে চাপা দেওয়া একটি সুইসাইড নোট – অর্থাৎ আমাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি আজ আত্মহত্যার মতো ভয়াবহ সত্যকে চাপা দিচ্ছে। ‘মাস্টারমশাই’ – শিক্ষক, জ্ঞানের বাহক, সমাজের পথপ্রদর্শকের প্রতীক। তাঁর আত্মহত্যা মানে সমাজের পথপ্রদর্শকের মৃত্যু। ‘ছেলে’ – ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতীক। পিতা তাঁর শেষ চিঠি ছেলেকে লিখেছেন – অর্থাৎ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তাঁর বেদনার কথা জানিয়ে গেছেন। ‘সন্তান পবিত্র জলের মতো’ – এই উপমা সন্তানের পবিত্রতা নির্দেশ করে। ‘টাকা’ – আধুনিক সমাজের ধন-সম্পদের প্রতীক। ‘জীবনে তোমার টাকা ছুঁইনি, মরেও ছোঁব না’ – পিতার সততা ও স্বাধীনতার প্রতীক। ‘তিরিশ হাজার টাকা’ – ঘুষের পরিমাণ, যা অল্প হলেও একজন সৎ মানুষের জন্য চরম মূল্যের। ‘হাসপাতাল’ – চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতীক। ‘গাছের তলা’ – মৃত্যুর স্থানের প্রতীক। ‘সাদা কাপড়’ – মৃত্যুর প্রতীক। ‘একটু বেড়িয়ে থাকা পা দুটি’ – মৃত্যুর পরও যা বাকি থাকে, জীবনের শেষ চিহ্ন। এই পা দুটিই ‘ভারতবর্ষের শেষ মাটি’ – অর্থাৎ ভারতবর্ষের নৈতিকতার শেষ সীমা।
ঘুষ কবিতা সম্পর্কে প্রশ্নোত্তর
ঘুষ কবিতার লেখক কে?
এই কবিতার লেখক প্রখ্যাত বাংলা কবি সুবোধ সরকার। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতার একজন শক্তিশালী কবি। তার কবিতায় সামাজিক বাস্তবতা, দুর্নীতি, মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় বিশেষভাবে উচ্চারিত। ‘ঘুষ’ তাঁর একটি বিখ্যাত কবিতা।
ঘুষ কবিতার মূল বিষয়বস্তু কী?
কবিতার মূল বিষয়বস্তু হলো একজন সৎ শিক্ষকের আত্মহত্যার কাহিনী, যিনি স্ত্রীর চিকিৎসার খরচ জোগাতে না পেরে একটি ঘুষ নিয়েছিলেন এবং সেই অপরাধবোধে আত্মহত্যা করেছেন। কবিতাটি সমাজের দুর্নীতি, চিকিৎসা ব্যবস্থার ব্যর্থতা, শিক্ষক সমাজের দুর্দশা ও নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের চিত্র তুলে ধরেছে।
“রবীন্দ্ররচনাবলীর নবম খন্ড দিয়ে চাপা দেওয়া সুইসাইড নোট” – এই লাইনের তাৎপর্য কী?
রবীন্দ্ররচনাবলী বাংলার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, জ্ঞানের প্রতীক। সেই রচনাবলী দিয়ে চাপা দেওয়া একটি সুইসাইড নোট – এটি এক চরম বিদ্রূপ। অর্থাৎ আমাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি আজ আত্মহত্যার মতো ভয়াবহ সত্যকে চাপা দিচ্ছে। আমরা আমাদের সংস্কৃতি নিয়ে ব্যস্ত, কিন্তু সমাজের ভয়াবহ সত্য আমরা দেখতে পাচ্ছি না।
“অরণি, আমি বিশ্বাস করি সন্তান পবিত্র জলের মতো” – বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
এই লাইনে পিতা তাঁর ছেলেকে ‘পবিত্র জলের মতো’ বলে বর্ণনা করেছেন। জল যেমন পবিত্র, নির্মল, তেমনি সন্তানও পবিত্র। কিন্তু পরের লাইনেই তিনি বলেছেন, “যদিও তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্ক ভালো নয়”। সম্পর্ক ভালো না হলেও, তিনি সন্তানকে পবিত্র মনে করেন। এটি পিতার মনের গভীর টান ও ভালোবাসার পরিচয়।
“জীবনে তোমার টাকা ছুঁইনি, মরেও ছোঁব না।” – এই লাইনের তাৎপর্য কী?
এই লাইনে পিতার সততা ও স্বাধীনতার পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি জীবনে কখনও ছেলের টাকা নেননি। তিনি সৎভাবে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন। মৃত্যুর পরেও তিনি ছেলের টাকা ছুঁতে চান না। এটি তাঁর চরিত্রের দৃঢ়তার প্রতীক।
“আমি আজীবন ছাত্র পড়িয়েছি, জ্ঞানত কোনও অন্যায় করিনি।” – বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
এই লাইনে পিতা তাঁর জীবনের সততার কথা বলেছেন। তিনি সারা জীবন ছাত্র পড়িয়েছেন, জেনে বুঝে কোনো অন্যায় করেননি। কিন্তু এখন তিনি একটি অন্যায় করেছেন – ঘুষ নিয়েছেন। এটি তাঁর অপরাধবোধের কারণ। তিনি নিজেকে ক্ষমা করতে পারছেন না।
“তৃতীয় দিন পারিনি।” – এই লাইনটির তাৎপর্য কী?
একজন অভিভাবক তাঁর ছেলেকে ভর্তি করার জন্য ঝুলোঝুলি করছেন। প্রথম দিন শিক্ষক ফিরিয়ে দিয়েছেন, দ্বিতীয় দিন ফিরিয়ে দিয়েছেন, কিন্তু তৃতীয় দিন পারেননি। এই ‘পারিনি’ কথাটির মধ্যে তাঁর অসহায়ত্ব, দুর্বলতা ও বাধ্যবাধকতা প্রকাশ পেয়েছে। তিনি আর প্রতিরোধ করতে পারেননি।
“ফিরলে বোলো, পৃথিবীতে আমার বেঁচে থাকার অধিকার চলে গেছে।” – বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
পিতা মনে করেন, ঘুষ নেওয়ার পর তাঁর বেঁচে থাকার অধিকার চলে গেছে। এটি তাঁর অপরাধবোধের চরম প্রকাশ। তিনি নিজেকে ক্ষমা করতে পারছেন না। একজন সৎ মানুষ হিসেবে তিনি নিজের এই পতন মেনে নিতে পারছেন না। তাই তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন।
“যখন সারাটা দেশ দাঁড়িয়ে আছে টাকার ওপর” – বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
এই লাইনটি ভারতীয় সমাজের বর্তমান বাস্তবতার এক নির্মম চিত্র। আজকের সমাজে সবকিছুর মাপকাঠি টাকা। মানুষ টাকার পিছনে ছুটছে, নৈতিকতা, সততা, মূল্যবোধ সবকিছু টাকার কাছে হার মানছে। এই বাস্তবতায় একজন সৎ শিক্ষকের আত্মহত্যা – এক চরম বিদ্রূপ।
“ওই একটু বেড়িয়ে থাকা পা দুটি যেন ভারতবর্ষের শেষ মাটি।” – শেষ লাইনের তাৎপর্য কী?
এই শেষ লাইনটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও তাৎপর্যপূর্ণ। মাস্টারমশাইয়ের সাদা কাপড়ে ঢাকা শরীর থেকে একটু বেরিয়ে থাকা পা দুটি। কবি সেই পা দুটোকে দেখেছেন ভারতবর্ষের শেষ মাটি হিসেবে। অর্থাৎ এটুকুই শেষ – এরপর আর কিছু নেই। এই দেশে সৎ মানুষের বেঁচে থাকার জায়গা আর নেই। শিক্ষকের এই পা দুটিই যেন ভারতবর্ষের শেষ সীমা, শেষ আশা। এরপর আর কিছুই বাকি নেই।
কবিতাটি বাংলা সাহিত্যে কী অবদান রেখেছে?
এই কবিতাটি বাংলা সাহিত্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। প্রথমত, এটি সমাজের দুর্নীতি ও শিক্ষক সমাজের দুর্দশার একটি নির্মম চিত্র তুলে ধরেছে। দ্বিতীয়ত, এটি প্রমাণ করে যে কবিতা শুধু প্রেম-বিরহের নয়, এটি সামাজিক বাস্তবতার শক্তিশালী মাধ্যমও হতে পারে। তৃতীয়ত, এর শেষ লাইন – “ওই একটু বেড়িয়ে থাকা পা দুটি যেন ভারতবর্ষের শেষ মাটি” – বাংলা সাহিত্যের এক স্মরণীয় পংক্তি। চতুর্থত, এটি সুবোধ সরকারের কবিতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন।
কবিতাটি বর্তমান প্রজন্মের পাঠকের কাছে কেন প্রাসঙ্গিক?
বর্তমান প্রজন্মের পাঠকদের জন্য এই কবিতাটি একাধিক কারণে প্রাসঙ্গিক। প্রথমত, এটি তাদের সমাজের বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতন করে। দ্বিতীয়ত, এটি দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে শেখায়। তৃতীয়ত, এটি নৈতিক মূল্যবোধের গুরুত্ব বুঝতে সাহায্য করে। চতুর্থত, এটি শিক্ষক সমাজের দুর্দশা সম্পর্কে ধারণা দেয়। পঞ্চমত, এটি মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে শেখায়।
এই কবিতার অন্যতম সেরা লাইন কোনটি এবং কেন?
এই কবিতার অন্যতম সেরা লাইন হলো – “ওই একটু বেড়িয়ে থাকা পা দুটি যেন ভারতবর্ষের শেষ মাটি।” এই লাইনটি সেরা হওয়ার কারণ এটি পুরো কবিতার মূল বার্তা ধারণ করে। এটি এক চরম বেদনাদায়ক, শক্তিশালী ও তাৎপর্যপূর্ণ চিত্র। একটি শিক্ষকের মৃতদেহ থেকে বেরিয়ে থাকা পা দুটি – যা ভারতবর্ষের শেষ মাটি। অর্থাৎ এই দেশে সৎ মানুষের বেঁচে থাকার আর কোনো জায়গা নেই। এই একটি লাইনে কবি সমগ্র কবিতার বক্তব্য ফুটিয়ে তুলেছেন।
ট্যাগস: ঘুষ সুবোধ সরকার সুবোধ সরকার কবিতা বাংলা কবিতা সামাজিক কবিতা দুর্নীতির কবিতা শিক্ষকের কবিতা আত্মহত্যার কবিতা বাস্তববাদী কবিতা আধুনিক বাংলা কবিতা বাংলাদেশের কবিতা কবিতা বিশ্লেষণ সুবোধ সরকারের শ্রেষ্ঠ কবিতা রবীন্দ্ররচনাবলী ভারতবর্ষের শেষ মাটি
রবীন্দ্ররচনাবলীর নবম খন্ড দিয়ে চাপা দেওয়া সুইসাইড নোট,
ছেলেকে লেখা। লিখে, হাতে ব্লেড নিয়ে
বাথরুমে ঢুকেছিলেন মাস্টারমশাই
দুপুরবেলা কাজের লোক দরজার তলা দিয়ে
রক্ত আসছে দেখে চিত্কার করে ওঠে।
ছেলেকে লেখা এই তার প্রথম এবং শেষ চিঠি :
‘অরণি,
আমি বিশ্বাস করি সন্তান পবিত্র জলের মতো
যদিও তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্ক ভালো নয়
তবু তোমাকেই লিখে রেখে যাই
গত দু’বছর তোমার মায়ের চিকিত্সাবাবদ
আমার যত্সামান্য সঞ্চয় আপাতত নিঃশেষিত
চিকিত্সার ব্যয়ভার আমি আর নিতে পারছিলাম না।
জীবনে তোমার টাকা ছুঁইনি, মরেও ছোঁব না।
আমি আজীবন ছাত্র পড়িয়েছি, জ্ঞানত কোনও অন্যায় করিনি।
গত মাসে আমার স্কুলে এক অভিভাবক এসে
ঝুলোঝুলি করেন তাঁর ছেলেকে নেবার জন্য
আমি প্রথম দিন ফিরিয়ে দিই
দ্বিতীয় দিন ফিরিয়ে দিই
তৃতীয় দিন পারিনি। তিনি আমাকে একটা বড় খামে
তিরিশ হাজার টাকা দিয়ে চলে যান।
সেই টাকায় এই মাসে তোমার মায়ের চিকিত্সা চলছে
জানি না তিনি বাড়ি ফিরবেন কি না কোনও দিন
ফিরলে বোলো, পৃথিবীতে আমার বেঁচে থাকার অধিকার চলে গেছে।
ইতি বাবা’
যখন সারাটা দেশ দাঁড়িয়ে আছে টাকার ওপর
তখন রবীন্দ্ররচনাবলী দিয়ে চাপা দেওয়া একটা সুইসাইড নোট।
হাসপাতালে গাছের তলায় গা ছমছম করছিল
এগিয়ে গেলাম সাদা কাপড়ে ঢাকা মাস্টারমশাইয়ের দিকে
একটু বেড়িয়ে থাকা পা দুটোর দিকে——
ওই একটু বেড়িয়ে থাকা পা দুটি যেন ভারতবর্ষের শেষ মাটি।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। সুবোধ সরকার।






