কবিতার খাতা
- 25 mins
কান্ডারী হুঁশিয়ার – কাজী নজরুল ইসলাম।
দুর্গম গিরি, কান্তার মরূ, দুস্তর পারাবার
লংঘিতে হবে রাত্রি নিশিথে যাত্রীরা হুশিয়ার ।
দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল, ভুলিতেছে মাঝি পথ ,
ছিড়িয়াছে পাল, কে ধরিবে হাল, আছে কার হিম্মত?
কে আছ জোয়ান হও আগুয়ান হাঁকিছে ভবিষ্যত ।
এ তুফান ভারী ,দিতে হবে পাড়ি , নিতে হবে তরী পার।।
তিমির রাত্রি, মাতৃমন্ত্রী সান্ত্রীরা সাবধান !
যুগ যুগান্ত সঞ্চিত ব্যথা ঘোষিয়াছে অভিযান।
ফেনাইয়া উঠে বঞ্চিত বুকে পুঞ্জিত অভিমান ,
ইহাদের পথে নিতে হবে সাথে ,দিতে হতে হবে অধিকার।।
অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া, জানেনা সন্তরণ
কান্ডারী ! আজ দেখিব তোমার মাতৃমুক্তি পন ।
‘‘হিন্দু না ওরা মুসলিম ?” ওই জিজ্ঞাসে কোন জন ?
কান্ডারী ! বল ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র
গিরি সঙ্কট , ভীরু যাত্রীরা গুরু গরজায় বাজ ,
পশ্চাৎপদ -যাত্রীর মনে সন্দেহ জাগে আজ।
কান্ডারী ! তুমি ভুলিবে কি পথ ? ত্যেজিবে কি পথ -মাঝ ?
করে হানাহানি , তবু চলো টানি ,নিয়াছ যে মহাভার ।
কান্ডারী ! তব সম্মুখে ঐ পলাশীর প্রান্তর ,
বাঙালীর খুনে লাল হ‘ল যেথা ক্লাইবের খঞ্জর !
ঐ গঙ্গায় ডুবিয়াছে হায়, ভারতের দিবাকর !
উদিবে সে রবি আমাদেরি খুনে রাঙিয়া পূনর্বার !
ফাঁসির মঞ্চে গেয়ে গেল যারা জীবনের জয়গান ,
আসি অলক্ষ্যে দাঁড়ায়েছে তারা, দিবে কোন বলিদান
আজি পরীক্ষা , জাতির অথবা জাতের করিবে ত্রাণ ?
দুলিতেছে তরী , ফুলিতেছে জল ,কান্ডারী হুশিয়ার
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। কাজী নজরুল ইসলাম।
কান্ডারী হুঁশিয়ার – কাজী নজরুল ইসলাম | কান্ডারী হুঁশিয়ার কাজী নজরুল ইসলাম | কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা | বিদ্রোহীর কবিতা
কান্ডারী হুঁশিয়ার: কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী চেতনা ও মাতৃমুক্তির অমর কাব্য
কাজী নজরুল ইসলামের “কান্ডারী হুঁশিয়ার” একটি অনন্য সৃষ্টি, যা দুর্গম পথ, তুফান, মাতৃমুক্তি ও জাতীয় চেতনার এক গভীর কাব্যিক অন্বেষণ। “দুর্গম গিরি, কান্তার মরূ, দুস্তর পারাবার / লংঘিতে হবে রাত্রি নিশিথে যাত্রীরা হুশিয়ার” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে এক গভীর চেতনা — জাতিকে ডুবিতে দিলে চলে না, কান্ডারীকে হুঁশিয়ার থাকতে হবে, মাতৃমুক্তির পণ নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা কবিতার একজন শক্তিমান কবি। তাঁর কবিতায় বিদ্রোহ, দেশপ্রেম, সাম্যবাদ ও মানবিক মূল্যবোধের গভীর প্রকাশ ঘটে। “কান্ডারী হুঁশিয়ার” তাঁর একটি বহুপঠিত কবিতা যা মাতৃমুক্তি ও জাতীয় জাগরণের চেতনাকে অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।
কাজী নজরুল ইসলাম: বিদ্রোহী কবির জাতীয় চেতনা
কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) বাংলা সাহিত্যের বিদ্রোহী কবি, যিনি তাঁর কবিতায় শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। তিনি সাম্যবাদ, মানবতা ও জাতীয় চেতনার কবি। তাঁর উল্লেখযোগ্য কবিতার মধ্যে রয়েছে ‘বিদ্রোহী’, ‘অগ্নি-বীণা’, ‘কান্ডারী হুঁশিয়ার’, ‘চল্ চল্ চল্’ প্রভৃতি। কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা পাঠককে ভাবায়, আন্দোলিত করে এবং নিজের শিকড়ের সন্ধানে নিয়ে যায়। তিনি বাংলা কবিতায় এক স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত।
কান্ডারী হুঁশিয়ার কবিতার বিস্তারিত বিশ্লেষণ
কবিতার শিরোনামের তাৎপর্য
“কান্ডারী হুঁশিয়ার” শিরোনামটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ‘কান্ডারী’ অর্থ নৌকার মাঝি বা পথপ্রদর্শক, আর ‘হুঁশিয়ার’ অর্থ সতর্ক। শিরোনামেই কবি সতর্কবার্তা দিয়েছেন — যিনি জাতির নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাকে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ দুর্গম পথ, তুফান ও বিপদ সামনে।
প্রথম স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“দুর্গম গিরি, কান্তার মরূ, দুস্তর পারাবার / লংঘিতে হবে রাত্রি নিশিথে যাত্রীরা হুশিয়ার। / দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল, ভুলিতেছে মাঝি পথ, / ছিড়িয়াছে পাল, কে ধরিবে হাল, আছে কার হিম্মত?” প্রথম স্তবকে কবি জাতীয় জীবনের সংকট ও বিপদের চিত্র এঁকেছেন। তিনি বলেছেন — সামনে দুর্গম পথ, কঠিন সমুদ্র, অন্ধকার রাত। তরী দুলছে, জল ফুলছে, মাঝি পথ ভুলছে। পাল ছিঁড়ে গেছে — এমন বিপদের সময় কে হাল ধরবে?
‘দুর্গম গিরি, কান্তার মরূ, দুস্তর পারাবার’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
এগুলি হলো কঠিন পথের প্রতীক — দুর্গম পাহাড়, নির্জন মরুভূমি ও দুস্তর সমুদ্র। জাতীয় জীবনের পথে যে সব বাধা-বিপত্তি আসে, তারই রূপক।
‘লংঘিতে হবে রাত্রি নিশিথে যাত্রীরা হুশিয়ার’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
এই কঠিন পথ অতিক্রম করতেই হবে, রাতের অন্ধকারে। তাই যাত্রীদের সতর্ক থাকতে হবে।
‘দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল, ভুলিতেছে মাঝি পথ’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
জাতির তরী দুলছে, বিপদ বাড়ছে, নেতৃত্ব পথ হারিয়ে ফেলছে — এটি সংকটের গভীরতা নির্দেশ করে।
‘ছিড়িয়াছে পাল, কে ধরিবে হাল, আছে কার হিম্মত?’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
পাল ছিঁড়ে গেছে — অর্থাৎ চলার শক্তি কমে গেছে। এখন এমন কে আছেন যে হাল ধরবেন? সাহস কার আছে?
দ্বিতীয় স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“কে আছ জোয়ান হও আগুয়ান হাঁকিছে ভবিষ্যত। / এ তুফান ভারী, দিতে হবে পাড়ি, নিতে হবে তরী পার।। / তিমির রাত্রি, মাতৃমন্ত্রী সান্ত্রীরা সাবধান! / যুগ যুগান্ত সঞ্চিত ব্যথা ঘোষিয়াছে অভিযান।” দ্বিতীয় স্তবকে কবি যুবকদের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন — ভবিষ্যৎ ডাকছে, জোয়ানরা আগুয়ান হও। তুফান ভারী, কিন্তু তরী পার করতেই হবে। অন্ধকার রাত, মাতৃমন্ত্রীরা সাবধান! যুগ যুগান্তের সঞ্চিত ব্যথা এখন অভিযান ঘোষণা করেছে।
‘কে আছ জোয়ান হও আগুয়ান হাঁকিছে ভবিষ্যত’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
ভবিষ্যৎ ডাকছে — যুবকরা এগিয়ে এসো, নেতৃত্ব দাও।
‘এ তুফান ভারী, দিতে হবে পাড়ি, নিতে হবে তরী পার’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
বিপদ যত বড়ই হোক, জাতির তরী পার করতেই হবে। এটাই কর্তব্য।
‘তিমির রাত্রি, মাতৃমন্ত্রী সান্ত্রীরা সাবধান’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
অন্ধকার রাতে দেশের রক্ষকদের আরও সতর্ক হতে হবে।
‘যুগ যুগান্ত সঞ্চিত ব্যথা ঘোষিয়াছে অভিযান’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জমে থাকা বেদনা এখন বিদ্রোহের অভিযান ঘোষণা করেছে।
তৃতীয় স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“ফেনাইয়া উঠে বঞ্চিত বুকে পুঞ্জিত অভিমান, / ইহাদের পথে নিতে হবে সাথে, দিতে হতে হবে অধিকার।। / অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া, জানেনা সন্তরণ / কান্ডারী! আজ দেখিব তোমার মাতৃমুক্তি পন।” তৃতীয় স্তবকে কবি বঞ্চিত মানুষের কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন — বঞ্চিত বুকে অভিমান ফেনাইয়া উঠে। তাদের পথে সাথে নিতে হবে, তাদের অধিকার দিতে হবে। অসহায় জাতি ডুবছে, সাঁতার জানে না। কান্ডারী! আজ দেখব তোমার মাতৃমুক্তির পণ।
‘ফেনাইয়া উঠে বঞ্চিত বুকে পুঞ্জিত অভিমান’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
বঞ্চিত মানুষের বুকে জমে থাকা অভিমান ফেনিয়ে উঠছে — অর্থাৎ ফেটে পড়ার উপক্রম।
‘ইহাদের পথে নিতে হবে সাথে, দিতে হতে হবে অধিকার’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
এই বঞ্চিত মানুষদের পথে সাথে নিতে হবে, তাদের অধিকার দিতে হবে।
‘অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া, জানেনা সন্তরণ’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
জাতি অসহায় হয়ে ডুবছে, কারণ তারা সাঁতার জানে না — অর্থাৎ নিজেকে রক্ষার পথ জানে না।
‘কান্ডারী! আজ দেখিব তোমার মাতৃমুক্তি পন’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
কান্ডারী (নেতা), আজ দেখব তুমি মাতৃমুক্তির জন্য কতটা পণ নিয়েছ — কতটা দায়িত্বশীল।
চতুর্থ স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন জন? / কান্ডারী! বল ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র। / গিরি সঙ্কট, ভীরু যাত্রীরা গুরু গরজায় বাজ, / পশ্চাৎপদ-যাত্রীর মনে সন্দেহ জাগে আজ।” চতুর্থ স্তবকে কবি সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন — হিন্দু না মুসলিম, কে জিজ্ঞাসা করে? কান্ডারী! বলো মানুষ ডুবছে, আমার মায়ের সন্তান। পথ সংকটে ভীরু যাত্রীরা ভয় দেখায়, পিছিয়ে পড়া যাত্রীদের মনে সন্দেহ জাগে।
‘হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
মানুষ ডুবছে, আর কেউ জিজ্ঞাসা করছে ওরা হিন্দু না মুসলিম? কবি এই সাম্প্রদায়িক প্রশ্নের তীব্র সমালোচনা করেছেন।
‘কান্ডারী! বল ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
কান্ডারী! বলো ওরা ধর্ম নয়, মানুষ — আমার মায়ের সন্তান। সবাই এক মায়ের সন্তান।
‘গিরি সঙ্কট, ভীরু যাত্রীরা গুরু গরজায় বাজ’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
পথ সংকটে ভীরু যাত্রীরা জোরে জোরে কথা বলে — অর্থাৎ ভয় দেখায় বা আতঙ্ক ছড়ায়।
‘পশ্চাৎপদ-যাত্রীর মনে সন্দেহ জাগে আজ’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
যারা পিছিয়ে থাকে, তাদের মনে আজ সন্দেহ জাগে — পথ কি ঠিক? নেতা কি ঠিক?
পঞ্চম স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“কান্ডারী! তুমি ভুলিবে কি পথ? ত্যেজিবে কি পথ-মাঝ? / করে হানাহানি, তবু চলো টানি, নিয়াছ যে মহাভার। / কান্ডারী! তব সম্মুখে ঐ পলাশীর প্রান্তর, / বাঙালীর খুনে লাল হ’ল যেথা ক্লাইবের খঞ্জর!” পঞ্চম স্তবকে কবি ইতিহাসের শিক্ষা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন — কান্ডারী! তুমি কি পথ ভুলবে? মাঝপথে ছেড়ে দেবে? হানাহানি করলেও, টেনে চলো — তুমি যে মহাভার নিয়েছ। তোমার সামনে ঐ পলাশীর প্রান্তর, যেখানে বাঙালির রক্তে লাল হয়েছিল ক্লাইভের খঞ্জর!
‘কান্ডারী! তুমি ভুলিবে কি পথ? ত্যেজিবে কি পথ-মাঝ?’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
কান্ডারী! তুমি কি লক্ষ্য ভুলবে? মাঝপথে ছেড়ে দেবে?
‘করে হানাহানি, তবু চলো টানি, নিয়াছ যে মহাভার’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
অনেকে বাধা দিলেও, হানাহানি করলেও — তুমি টেনে চলো, কারণ তুমি মহান দায়িত্ব নিয়েছ।
‘কান্ডারী! তব সম্মুখে ঐ পলাশীর প্রান্তর’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
সামনেই পলাশীর প্রান্তর — ইতিহাসের সেই স্থান, যেখানে বাঙালি স্বাধীনতা হারিয়েছিল।
‘বাঙালীর খুনে লাল হ’ল যেথা ক্লাইবের খঞ্জর’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
পলাশীতে বাঙালির রক্তে লাল হয়েছিল ক্লাইভের খঞ্জর — অর্থাৎ ইংরেজ শাসনের সূচনা হয়েছিল বাঙালির রক্তের বিনিময়ে।
ষষ্ঠ স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“ঐ গঙ্গায় ডুবিয়াছে হায়, ভারতের দিবাকর! / উদিবে সে রবি আমাদেরি খুনে রাঙিয়া পূনর্বার! / ফাঁসির মঞ্চে গেয়ে গেল যারা জীবনের জয়গান, / আসি অলক্ষ্যে দাঁড়ায়েছে তারা, দিবে কোন বলিদান?” ষষ্ঠ স্তবকে কবি শহীদদের কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন — ঐ গঙ্গায় ডুবে গেছে ভারতের সূর্য! সে সূর্য আবার উদয় হবে — আমাদের রক্তে রাঙিয়ে। ফাঁসির মঞ্চে যারা জীবনের জয়গান গেয়েছিল, তারা অলক্ষ্যে এসে দাঁড়িয়েছে — তারা কী বলিদান দেবে?
‘ঐ গঙ্গায় ডুবিয়াছে হায়, ভারতের দিবাকর’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
গঙ্গায় ডুবে গেছে ভারতের সূর্য — অর্থাৎ ভারতের স্বাধীনতা ডুবে গেছে, সূর্য অস্ত গেছে।
‘উদিবে সে রবি আমাদেরি খুনে রাঙিয়া পূনর্বার’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
সে সূর্য আবার উদয় হবে — আমাদের রক্তে রাঙিয়ে। অর্থাৎ আত্মত্যাগের মাধ্যমে স্বাধীনতা ফিরে আসবে।
‘ফাঁসির মঞ্চে গেয়ে গেল যারা জীবনের জয়গান’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
যারা শহীদ হয়েছেন, ফাঁসির মঞ্চে যারা জীবনের জয়গান গেয়েছেন — তারা অমর।
‘আসি অলক্ষ্যে দাঁড়ায়েছে তারা, দিবে কোন বলিদান?’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
শহীদরা অদৃশ্য হয়ে আমাদের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে — তারা আমাদের কাছে প্রশ্ন করে, তুমি কী বলিদান দেবে?
সপ্তম স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“আজি পরীক্ষা, জাতির অথবা জাতের করিবে ত্রাণ? / দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল, কান্ডারী হুশিয়ার।” সপ্তম স্তবকে কবি শেষ সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন — আজ পরীক্ষা, তুমি জাতির ত্রাণ করবে নাকি জাতের (ধর্মের) ত্রাণ করবে? তরী দুলছে, জল ফুলছে — কান্ডারী হুঁশিয়ার!
‘আজি পরীক্ষা, জাতির অথবা জাতের করিবে ত্রাণ?’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
এটি কবিতার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রশ্ন। ‘জাতির’ অর্থ দেশ, আর ‘জাতের’ অর্থ ধর্ম বা সম্প্রদায়। তুমি কি দেশ রক্ষা করবে, নাকি ধর্মের স্বার্থ দেখবে?
‘দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল, কান্ডারী হুশিয়ার’ — শেষ পঙ্ক্তির তাৎপর্য
এই পঙ্ক্তিটি কবিতার সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ। তরী দুলছে, জল ফুলছে — বিপদ বাড়ছে। কান্ডারীকে সতর্ক থাকতে হবে। একই সাথে এটি একটি সতর্কবার্তা এবং একটি আহ্বান।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য
“কান্ডারী হুঁশিয়ার” কবিতাটি জাতীয় জাগরণ, মাতৃমুক্তি ও সাম্যবাদের এক অসাধারণ চিত্র। কবি প্রথমে বিপদের চিত্র এঁকেছেন — দুর্গম পথ, তুফান, দুলতে থাকা তরী। তারপর যুবকদের আহ্বান জানিয়েছেন — জোয়ান হও আগুয়ান। তিনি সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন — হিন্দু না মুসলিম, ডুবিছে মানুষ। তিনি ইতিহাসের শিক্ষা দিয়েছেন — পলাশীর প্রান্তর, শহীদদের কথা। শেষে তিনি চূড়ান্ত প্রশ্ন রেখেছেন — আজি পরীক্ষা, জাতির অথবা জাতের করিবে ত্রাণ? এবং সতর্ক করে দিয়েছেন — কান্ডারী হুশিয়ার!
কান্ডারী হুঁশিয়ার সম্পর্কে প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: কান্ডারী হুঁশিয়ার কবিতার লেখক কে?
কান্ডারী হুঁশিয়ার কবিতার লেখক কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি বাংলা কবিতার বিদ্রোহী কবি। তাঁর কবিতায় দেশপ্রেম, সাম্যবাদ ও মানবিক মূল্যবোধের গভীর প্রকাশ ঘটে।
প্রশ্ন ২: কান্ডারী হুঁশিয়ার কবিতার মূল বিষয়বস্তু কী?
কান্ডারী হুঁশিয়ার কবিতার মূল বিষয়বস্তু হলো মাতৃমুক্তি, জাতীয় জাগরণ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সচেতনতা। কবি তরীর রূপকের মাধ্যমে জাতির সংকট ও কর্তব্য ফুটিয়ে তুলেছেন। শেষে তিনি বলেছেন — আজি পরীক্ষা, জাতির অথবা জাতের করিবে ত্রাণ? কান্ডারী হুশিয়ার!
প্রশ্ন ৩: ‘হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?’ — মানুষ যখন বিপদে ডুবছে, তখন কেউ যদি ধর্ম জিজ্ঞাসা করে, তা ঘৃণ্য। কবি এখানে সাম্প্রদায়িকতার তীব্র সমালোচনা করেছেন।
প্রশ্ন ৪: ‘কান্ডারী! বল ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘কান্ডারী! বল ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র’ — কান্ডারীকে বলতে হবে, ওরা হিন্দু না মুসলিম না, ওরা মানুষ — আমার মায়ের সন্তান। সবাই এক মায়ের সন্তান।
প্রশ্ন ৫: ‘আজি পরীক্ষা, জাতির অথবা জাতের করিবে ত্রাণ?’ — শেষ পঙ্ক্তির তাৎপর্য কী?
‘আজি পরীক্ষা, জাতির অথবা জাতের করিবে ত্রাণ?’ — এটি কবিতার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রশ্ন। ‘জাতির’ অর্থ দেশ, আর ‘জাতের’ অর্থ ধর্ম। তুমি কি দেশ রক্ষা করবে, নাকি ধর্মের স্বার্থ দেখবে? এই প্রশ্ন আজও সমান প্রাসঙ্গিক।
প্রশ্ন ৬: কাজী নজরুল ইসলাম সম্পর্কে সংক্ষেপে বলুন।
কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) বাংলা সাহিত্যের বিদ্রোহী কবি। তিনি সাম্যবাদ, মানবতা ও জাতীয় চেতনার কবি। ‘বিদ্রোহী’, ‘অগ্নি-বীণা’, ‘কান্ডারী হুঁশিয়ার’, ‘চল্ চল্ চল্’ তাঁর উল্লেখযোগ্য কবিতা।
ট্যাগস: কান্ডারী হুঁশিয়ার, কাজী নজরুল ইসলাম, কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা, কান্ডারী হুঁশিয়ার কাজী নজরুল ইসলাম, বিদ্রোহীর কবিতা, মাতৃমুক্তির কবিতা, জাতীয় জাগরণের কবিতা, সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী কবিতা






