কবিতার খাতা
- 28 mins
একুশের গানের খাতা – আরণ্যক বসু।
কতদিন আগে চলে গেছে আমার মা।
তবু তাঁর গানের খাতায় কখনও-বাংলার মাটি, বাংলার জল,
আবার কখনও-আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো…
গোটা গোটা অক্ষরে আলো হয়ে ফুটে আছে।
সেই বাংলা ভাষা আজ কাঁটাতারের এদিকে ওদিকে ছড়িয়ে আছে
খেউড়ের ভাষা হয়ে? আশ্চর্য!
উইলিয়াম কেরী থেকে অ্যান্টনি ফিরিঙ্গির মুখে দুনিয়ার
মধুরতম ভাষা যে ভাবে মিস্টি হাসিতে ঝলমল করে উঠতো, আহা!
নোয়াখালির কোনও লাজুক বালিকা, ঢাকা শহরে এসে
যখন শুদ্ধ উচ্চারণে শামসুর রাহমানের কবিতা আবৃত্তি করে,
তখন রবীন্দ্রনাথ, নজরুল একই সঙ্গে স্মিত হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠেন।
কাঁটাতারের তীক্ষ্ণতাও ডবল রিডের হারমোনিয়ামে-বাঁশিতে
প্রথম আলো হয়ে গেয়ে ওঠে মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম…
ঠিক সেই মুহূর্তে মৌলবাদ আর সন্ত্রাসবাদ ফনা নামিয়ে গর্তে মুখ লুকোয়।
কতদিন আগে চলে গেছেন মহাসাগরের মতো হেমন্ত,
তবু আজও তো নীল আকাশের নিচে এই পৃথিবী…
আর, আব্বাসউদ্দিনের- আল্লা ম্যাঘ দে, পানি দে, ছায়া দে…
রয়ে গেছে বয়স্ক অর্জুন গাছ আর নবীন পলাশের আলিঙ্গনে।
মৌলবাদীরা জানে না, মায়ের হাতের ডাল ফোড়নের সুগন্ধে
যে বাংলা ভাষা, তাতে নোংরা শব্দের বিষ মেশানো যায় না।
একুশের রক্ত আজ শত সহস্র গুলবাগিচায় কৃষ্ণচূড়ার আবির হয়ে
নীল দিগন্ত রাঙিয়ে দিচ্ছে।
মায়ের গানের খাতা এত কিছু বুঝতে চায় না।
ফাল্গুন এলেই একা একাই গেয়ে ওঠে-
আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি,
আমি কি ভুলিতে পারি…
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। আরণ্যক বসু।
একুশের গানের খাতা – আরণ্যক বসু | একুশের গানের খাতা কবিতা | আরণ্যক বসুর কবিতা | একুশে ফেব্রুয়ারির কবিতা
একুশের গানের খাতা: আরণ্যক বসুর ভাষা, মা ও চিরন্তন চেতনার অসাধারণ কাব্যভাষা
আরণ্যক বসুর “একুশের গানের খাতা” কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের একটি অনন্য সৃষ্টি, যা ভাষা, মাতৃস্মৃতি, একুশের চেতনা ও বাঙালির চিরন্তন প্রেরণার এক গভীর কাব্যিক অন্বেষণ। “কতদিন আগে চলে গেছে আমার মা। / তবু তাঁর গানের খাতায় কখনও-বাংলার মাটি, বাংলার জল, / আবার কখনও-আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো… / গোটা গোটা অক্ষরে আলো হয়ে ফুটে আছে।” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে এক গভীর সংযোগ — মায়ের স্মৃতি, ভাষার চিরন্তনতা ও একুশের চেতনার। আরণ্যক বসু বাংলা কবিতার একজন শক্তিমান কবি। তাঁর কবিতায় প্রকৃতি, দেশপ্রেম, ভাষা আন্দোলন ও মানবিক মূল্যবোধের গভীর প্রকাশ ঘটে। “একুশের গানের খাতা” তাঁর একটি বহুপঠিত কবিতা যা একুশের চেতনাকে মায়ের গানের খাতার সাথে অসাধারণভাবে যুক্ত করেছে।
আরণ্যক বসু: প্রকৃতি ও ভাষার কবি
আরণ্যক বসু বাংলা কবিতার একজন শক্তিমান কবি। তাঁর কবিতায় প্রকৃতি, দেশপ্রেম, ভাষা আন্দোলন ও মানবিক মূল্যবোধের গভীর প্রকাশ ঘটে। তিনি সহজ-সরল ভাষায় জটিল অনুভূতি ও ঐতিহাসিক চেতনা ফুটিয়ে তোলেন। “একুশের গানের খাতা” তাঁর একটি বহুপঠিত কবিতা যা একুশের চেতনাকে মায়ের গানের খাতার সাথে অসাধারণভাবে যুক্ত করেছে। আরণ্যক বসুর কবিতা পাঠককে ভাবায়, আন্দোলিত করে এবং নিজের শিকড়ের সন্ধানে নিয়ে যায়। তিনি বাংলা কবিতায় এক স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত।
একুশের গানের খাতা কবিতার বিস্তারিত বিশ্লেষণ
কবিতার শিরোনামের তাৎপর্য
“একুশের গানের খাতা” শিরোনামটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ‘একুশের গান’ — ভাষা আন্দোলনের অমর গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’। ‘খাতা’ — যে খাতায় এই গান লেখা আছে। শিরোনামেই কবি ইঙ্গিত দিয়েছেন — এই কবিতা মায়ের গানের খাতার মাধ্যমে একুশের চেতনার অন্বেষণ।
প্রথম স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“কতদিন আগে চলে গেছে আমার মা। / তবু তাঁর গানের খাতায় কখনও-বাংলার মাটি, বাংলার জল, / আবার কখনও-আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো… / গোটা গোটা অক্ষরে আলো হয়ে ফুটে আছে। / সেই বাংলা ভাষা আজ কাঁটাতারের এদিকে ওদিকে ছড়িয়ে আছে / খেউড়ের ভাষা হয়ে? আশ্চর্য!” প্রথম স্তবকে কবি তাঁর মায়ের গানের খাতার কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন — কতদিন আগে চলে গেছেন তাঁর মা। তবু তাঁর গানের খাতায় কখনও বাংলার মাটি, বাংলার জল, আবার কখনও ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ গোটা গোটা অক্ষরে আলো হয়ে ফুটে আছে। সেই বাংলা ভাষা আজ কাঁটাতারের এদিকে ওদিকে ছড়িয়ে আছে খেউড়ের ভাষা হয়ে? আশ্চর্য!
মায়ের গানের খাতার তাৎপর্য
মায়ের গানের খাতা — এটি একটি স্মৃতিচিহ্ন, মায়ের সান্নিধ্যের প্রতীক। এই খাতায় বাংলার মাটি, বাংলার জলের গান আছে, আবার একুশের গানও আছে। এটি বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ধারক।
গোটা গোটা অক্ষরে আলো হয়ে ফুটে থাকার তাৎপর্য
গানের কথাগুলো গোটা গোটা অক্ষরে আলো হয়ে ফুটে আছে — অর্থাৎ এগুলো শুধু লেখা নয়, এগুলো জ্বলজ্বল করছে, জীবন্ত। মায়ের স্মৃতি ও একুশের চেতনা এখানে চিরন্তন হয়ে আছে।
‘সেই বাংলা ভাষা আজ কাঁটাতারের এদিকে ওদিকে ছড়িয়ে আছে / খেউড়ের ভাষা হয়ে? আশ্চর্য!’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
কবি বিস্ময় প্রকাশ করেছেন — যে বাংলা ভাষা মায়ের গানের খাতায় এত সুন্দর, এত পবিত্র, সেই ভাষা আজ কাঁটাতারের এদিকে ওদিকে ছড়িয়ে আছে খেউড়ের ভাষা হয়ে? ‘খেউড়’ — অশ্লীল, নোংরা ভাষা। বাংলা ভাষার বর্তমান অপব্যবহার ও অপসংস্কৃতির প্রতি কবির ক্ষোভ ও বিস্ময় এখানে প্রকাশ পেয়েছে।
দ্বিতীয় স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“উইলিয়াম কেরী থেকে অ্যান্টনি ফিরিঙ্গির মুখে দুনিয়ার / মধুরতম ভাষা যে ভাবে মিস্টি হাসিতে ঝলমল করে উঠতো, আহা! / নোয়াখালীর কোনও লাজুক বালিকা, ঢাকা শহরে এসে / যখন শুদ্ধ উচ্চারণে শামসুর রাহমানের কবিতা আবৃত্তি করে, / তখন রবীন্দ্রনাথ, নজরুল একই সঙ্গে স্মিত হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠেন। / কাঁটাতারের তীক্ষ্ণতাও ডবল রিডের হারমোনিয়ামে-বাঁশিতে / প্রথম আলো হয়ে গেয়ে ওঠে মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম…” দ্বিতীয় স্তবকে কবি বাংলা ভাষার ঐতিহ্য ও সৌন্দর্যের কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন — উইলিয়াম কেরি থেকে অ্যান্টনি ফিরিঙ্গির মুখে দুনিয়ার মধুরতম ভাষা যে ভাবে মিষ্টি হাসিতে ঝলমল করে উঠত, আহা! নোয়াখালীর কোনো লাজুক বালিকা, ঢাকা শহরে এসে যখন শুদ্ধ উচ্চারণে শামসুর রাহমানের কবিতা আবৃত্তি করে, তখন রবীন্দ্রনাথ, নজরুল একই সঙ্গে স্মিত হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠেন। কাঁটাতারের তীক্ষ্ণতাও ডবল রিডের হারমোনিয়ামে-বাঁশিতে প্রথম আলো হয়ে গেয়ে ওঠে ‘মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম’।
উইলিয়াম কেরি ও অ্যান্টনি ফিরিঙ্গির তাৎপর্য
উইলিয়াম কেরি — ব্রিটিশ মিশনারি ও ভাষাবিদ, যিনি বাংলা ভাষায় প্রথম গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন। অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি — পর্তুগিজ বংশোদ্ভূত কবি, যিনি বাংলায় কবিতা লিখেছেন। এই বিদেশিরাও বাংলা ভাষার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছিলেন।
নোয়াখালীর বালিকা ও শামসুর রাহমানের কবিতার তাৎপর্য
নোয়াখালীর কোনো লাজুক বালিকা ঢাকায় এসে শুদ্ধ উচ্চারণে শামসুর রাহমানের কবিতা আবৃত্তি করে। এটি বাংলা ভাষার সার্বজনীনতা ও শুদ্ধতার চিত্র। গ্রামের মেয়েও শহরে এসে শুদ্ধ বাংলায় কবিতা আবৃত্তি করে।
রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল উজ্জ্বল হওয়ার তাৎপর্য
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম — বাংলা সাহিত্যের দুই দিকপাল। তাঁরা এই শুদ্ধ উচ্চারণ শুনে স্মিত হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠেন — অর্থাৎ বাংলা ভাষার সঠিক চর্চা দেখে তাঁরা সন্তুষ্ট হন, আশীর্বাদ করেন।
‘মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম’ গাওয়ার তাৎপর্য
এটি একটি বিখ্যাত বাংলা গান, যা দুই বাংলার ঐক্যের প্রতীক। কাঁটাতারের তীক্ষ্ণতাও এই গান গেয়ে ওঠে — অর্থাৎ বিভেদের প্রাচীরও ঐক্যের গানে মেতে ওঠে।
তৃতীয় স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“ঠিক সেই মুহূর্তে মৌলবাদ আর সন্ত্রাসবাদ ফনা নামিয়ে গর্তে মুখ লুকোয়। / কতদিন আগে চলে গেছেন মহাসাগরের মতো হেমন্ত, / তবু আজও তো নীল আকাশের নিচে এই পৃথিবী… / আর, আব্বাসউদ্দিনের- আল্লা ম্যাঘ দে, পানি দে, ছায়া দে… / রয়ে গেছে বয়স্ক অর্জুন গাছ আর নবীন পলাশের আলিঙ্গনে। / মৌলবাদীরা জানে না, মায়ের হাতের ডাল ফোড়নের সুগন্ধে / যে বাংলা ভাষা, তাতে নোংরা শব্দের বিষ মেশানো যায় না। / একুশের রক্ত আজ শত সহস্র গুলবাগিচায় কৃষ্ণচূড়ার আবির হয়ে / নীল দিগন্ত রাঙিয়ে দিচ্ছে।” তৃতীয় স্তবকে কবি মৌলবাদের পরাজয় ও একুশের চিরন্তনতার কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন — ঠিক সেই মুহূর্তে মৌলবাদ আর সন্ত্রাসবাদ ফনা নামিয়ে গর্তে মুখ লুকোয়। কতদিন আগে চলে গেছেন মহাসাগরের মতো হেমন্ত, তবু আজও তো নীল আকাশের নিচে এই পৃথিবী। আর আব্বাসউদ্দিনের ‘আল্লা ম্যাঘ দে, পানি দে, ছায়া দে’ রয়ে গেছে বয়স্ক অর্জুন গাছ আর নবীন পলাশের আলিঙ্গনে। মৌলবাদীরা জানে না, মায়ের হাতের ডাল ফোড়নের সুগন্ধে যে বাংলা ভাষা, তাতে নোংরা শব্দের বিষ মেশানো যায় না। একুশের রক্ত আজ শত সহস্র গুলবাগিচায় কৃষ্ণচূড়ার আবির হয়ে নীল দিগন্ত রাঙিয়ে দিচ্ছে।
মৌলবাদ ও সন্ত্রাসবাদ ফনা নামিয়ে গর্তে মুখ লুকানোর তাৎপর্য
যখন বাংলা ভাষা তার শুদ্ধ রূপে, তার ঐক্যের রূপে প্রকাশ পায়, তখন মৌলবাদ ও সন্ত্রাসবাদ পরাজিত হয়, তারা লুকিয়ে পড়ে। ভাষার শক্তি তাদের পরাস্ত করে।
হেমন্ত চলে যাওয়ার তাৎপর্য
হেমন্ত — সম্ভবত হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী। তিনি চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর গান রয়ে গেছে। তেমনি অনেক শিল্পী-সাহিত্যিক চলে গেছেন, কিন্তু তাঁদের সৃষ্টি চিরন্তন।
আব্বাসউদ্দিনের গানের তাৎপর্য
আব্বাসউদ্দিন আহমেদ — প্রখ্যাত লোকসঙ্গীতশিল্পী। তাঁর ‘আল্লা ম্যাঘ দে, পানি দে, ছায়া দে’ গানটি বাংলার মাটি ও মানুষের সাথে সম্পর্কিত। এই গান রয়ে গেছে অর্জুন গাছ ও পলাশের আলিঙ্গনে — প্রকৃতির সাথে মিশে আছে।
মায়ের হাতের ডাল ফোড়নের সুগন্ধের তাৎপর্য
মায়ের হাতের ডাল ফোড়নের সুগন্ধ — বাংলা গৃহস্থালির একটি চিরন্তন চিত্র। এই সুগন্ধে যে বাংলা ভাষা গড়ে উঠেছে, তাতে নোংরা শব্দের বিষ মেশানো যায় না। বাংলা ভাষা পবিত্র, সুগন্ধময়।
একুশের রক্ত কৃষ্ণচূড়ার আবির হয়ে নীল দিগন্ত রাঙানোর তাৎপর্য
একুশের শহীদদের রক্ত আজ কৃষ্ণচূড়া ফুলের আবির (রঙ) হয়ে নীল দিগন্ত রাঙিয়ে দিচ্ছে। অর্থাৎ ভাষা আন্দোলনের চেতনা আজ প্রকৃতিতে, আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে আছে, আমাদের উদ্বুদ্ধ করছে।
চতুর্থ স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“মায়ের গানের খাতা এত কিছু বুঝতে চায় না। / ফাল্গুন এলেই একা একাই গেয়ে ওঠে- / আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, / আমি কি ভুলিতে পারি…” চতুর্থ স্তবকে কবি মায়ের গানের খাতার চিরন্তনতার কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন — মায়ের গানের খাতা এত কিছু বুঝতে চায় না। ফাল্গুন এলেই একা একাই গেয়ে ওঠে — আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি…
‘মায়ের গানের খাতা এত কিছু বুঝতে চায় না’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
মায়ের গানের খাতা জানে না মৌলবাদ কী, সন্ত্রাসবাদ কী, বিভেদ কী। সে কেবল গান জানে, ভালোবাসা জানে। সে সব কিছু বুঝতে চায় না, সে কেবল গেয়ে ওঠে।
ফাল্গুন এলেই গেয়ে ওঠার তাৎপর্য
ফাল্গুন এলে মায়ের গানের খাতা একা একাই গেয়ে ওঠে — একুশের গান। ফাল্গুন মাস একুশের মাস। এই মাস এলেই খাতা নিজে থেকেই গেয়ে ওঠে। এটি ভাষার চিরন্তনতা, একুশের চিরন্তনতা নির্দেশ করে।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য
“একুশের গানের খাতা” কবিতাটি একুশের চেতনার এক অসাধারণ কাব্যিক রূপায়ণ। কবি তাঁর মায়ের গানের খাতার মাধ্যমে বাংলা ভাষা ও একুশের চেতনাকে অন্বেষণ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন — মায়ের খাতায় বাংলার মাটি, বাংলার জল আর একুশের গান আলো হয়ে আছে। সেই বাংলা ভাষা আজ খেউড়ের ভাষা হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে — এটা আশ্চর্যের! কিন্তু ভাষার ঐতিহ্য অমর — উইলিয়াম কেরি থেকে অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি, নোয়াখালীর বালিকা থেকে রবীন্দ্রনাথ-নজরুল — সবাই বাংলার সৌন্দর্যে মুগ্ধ। মৌলবাদ-সন্ত্রাসবাদ ভাষার কাছে পরাজিত। হেমন্ত চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর গান আছে। আব্বাসউদ্দিনের গান আছে অর্জুন-পলাশের আলিঙ্গনে। মায়ের ডাল ফোড়নের সুগন্ধে বাংলা ভাষা পবিত্র। একুশের রক্ত কৃষ্ণচূড়ার আবির হয়ে দিগন্ত রাঙায়। মায়ের গানের খাতা কিছু বুঝতে চায় না, ফাল্গুন এলেই সে গেয়ে ওঠে — ‘আমি কি ভুলিতে পারি’।
একুশের গানের খাতা কবিতা সম্পর্কে প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: একুশের গানের খাতা কবিতার লেখক কে?
একুশের গানের খাতা কবিতার লেখক আরণ্যক বসু। তিনি বাংলা কবিতার একজন শক্তিমান কবি। তাঁর কবিতায় প্রকৃতি, দেশপ্রেম, ভাষা আন্দোলন ও মানবিক মূল্যবোধের গভীর প্রকাশ ঘটে। “একুশের গানের খাতা” তাঁর একটি বহুপঠিত কবিতা।
প্রশ্ন ২: একুশের গানের খাতা কবিতার মূল বিষয়বস্তু কী?
একুশের গানের খাতা কবিতার মূল বিষয়বস্তু হলো মায়ের স্মৃতি, বাংলা ভাষার ঐতিহ্য ও একুশের চিরন্তন চেতনা। কবি তাঁর মায়ের গানের খাতার মাধ্যমে বাংলা ভাষার সৌন্দর্য, ঐতিহ্য ও বর্তমান অপব্যবহার তুলে ধরেছেন। তিনি মৌলবাদের বিরুদ্ধে ভাষার জয়গান গেয়েছেন।
প্রশ্ন ৩: ‘সেই বাংলা ভাষা আজ কাঁটাতারের এদিকে ওদিকে ছড়িয়ে আছে / খেউড়ের ভাষা হয়ে? আশ্চর্য!’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘সেই বাংলা ভাষা আজ কাঁটাতারের এদিকে ওদিকে ছড়িয়ে আছে / খেউড়ের ভাষা হয়ে? আশ্চর্য!’ — এই পঙ্ক্তিতে কবি বাংলা ভাষার বর্তমান অপব্যবহারের প্রতি বিস্ময় ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ‘খেউড়’ — অশ্লীল, নোংরা ভাষা। মায়ের গানের খাতায় যে পবিত্র ভাষা ছিল, তা আজ কাঁটাতারের এপার-ওপার ছড়িয়ে আছে খেউড়ের ভাষা হয়ে। এটি ভাষার প্রতি অসম্মানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।
প্রশ্ন ৪: ‘নোয়াখালীর কোনও লাজুক বালিকা, ঢাকা শহরে এসে / যখন শুদ্ধ উচ্চারণে শামসুর রাহমানের কবিতা আবৃত্তি করে, / তখন রবীন্দ্রনাথ, নজরুল একই সঙ্গে স্মিত হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠেন’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘নোয়াখালীর কোনও লাজুক বালিকা, ঢাকা শহরে এসে / যখন শুদ্ধ উচ্চারণে শামসুর রাহমানের কবিতা আবৃত্তি করে, / তখন রবীন্দ্রনাথ, নজরুল একই সঙ্গে স্মিত হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠেন’ — এই পঙ্ক্তিতে কবি বাংলা ভাষার সার্বজনীনতা ও শুদ্ধচর্চার চিত্র এঁকেছেন। গ্রামের একটি মেয়েও শহরে এসে শুদ্ধ উচ্চারণে কবিতা আবৃত্তি করে। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল — বাংলা সাহিত্যের দুই দিকপাল — এই শুদ্ধচর্চা দেখে সন্তুষ্ট হন, আশীর্বাদ করেন।
প্রশ্ন ৫: ‘মৌলবাদীরা জানে না, মায়ের হাতের ডাল ফোড়নের সুগন্ধে / যে বাংলা ভাষা, তাতে নোংরা শব্দের বিষ মেশানো যায় না’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘মৌলবাদীরা জানে না, মায়ের হাতের ডাল ফোড়নের সুগন্ধে / যে বাংলা ভাষা, তাতে নোংরা শব্দের বিষ মেশানো যায় না’ — এই পঙ্ক্তিতে কবি বাংলা ভাষার পবিত্রতা ও শুদ্ধতার কথা বলেছেন। মায়ের হাতের ডাল ফোড়নের সুগন্ধ বাংলা গৃহস্থালির চিরন্তন চিত্র। এই সুগন্ধে গড়ে ওঠা বাংলা ভাষা এত পবিত্র যে তাতে নোংরা শব্দের বিষ মেশানো যায় না।
প্রশ্ন ৬: ‘মায়ের গানের খাতা এত কিছু বুঝতে চায় না। / ফাল্গুন এলেই একা একাই গেয়ে ওঠে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘মায়ের গানের খাতা এত কিছু বুঝতে চায় না। / ফাল্গুন এলেই একা একাই গেয়ে ওঠে’ — এই পঙ্ক্তিতে কবি মায়ের গানের খাতার চিরন্তনতা ও সরলতার কথা বলেছেন। খাতা জানে না মৌলবাদ কী, সন্ত্রাসবাদ কী, বিভেদ কী। সে কেবল ফাল্গুন এলে একা একাই গেয়ে ওঠে একুশের গান। এটি ভাষা ও একুশের চেতনার চিরন্তনতা নির্দেশ করে।
প্রশ্ন ৭: আরণ্যক বসু সম্পর্কে সংক্ষেপে বলুন।
আরণ্যক বসু বাংলা কবিতার একজন শক্তিমান কবি। তাঁর কবিতায় প্রকৃতি, দেশপ্রেম, ভাষা আন্দোলন ও মানবিক মূল্যবোধের গভীর প্রকাশ ঘটে। তিনি সহজ-সরল ভাষায় জটিল অনুভূতি ও ঐতিহাসিক চেতনা ফুটিয়ে তোলেন। “একুশ ডাকছে মাকে” ও “একুশের গানের খাতা” তাঁর উল্লেখযোগ্য কবিতা।
ট্যাগস: একুশের গানের খাতা, আরণ্যক বসু, আরণ্যক বসুর কবিতা, একুশের গানের খাতা কবিতা, একুশে ফেব্রুয়ারির কবিতা, ভাষা আন্দোলনের কবিতা, শহীদ দিবসের কবিতা, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের কবিতা





