কবিতার খাতা
উতলা – মোহাম্মদ রফিক।
আজ রাত। সৃষ্টির প্রপাত যেন
আমাকে আমুণ্ডু গ্রাস করে নিল।
অন্ধকারে জ্বলে উঠল বিদ্যুতের ফনা
ঢেলে গেল বিষ মাংসে হৃৎপিন্ডে-হৃদয়ে
উজ্জীবন, ঘটে বিস্ফোরণ জরায়ণে,
তাই বলি, অকাল-মৃত্যুকে ক্ষমা করে দিও।
মিশে রইব স্বদেশের বেহুলা শরীরে,
ভেসে যাব গাঙুড়ের জলে।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। মোহাম্মদ রফিকের কবিতা।
কবিতার কথা –
মোহাম্মদ রফিকের ‘উতলা’ কবিতাটি কবির নিজস্ব মৃত্যুচেতনা, সৃষ্টির ব্যাকুলতা এবং স্বদেশপ্রেমের এক অসামান্য ও তীব্র অভিপ্রকাশ। খুব সংক্ষিপ্ত অবয়বে লেখা এই কবিতাটিতে মৃত্যু কেবল কোনো নিষ্ক্রিয় সমাপ্তি নয়, বরং তা সৃষ্টির আগুনে পুনর্জন্ম এবং স্বদেশের মাটিতে মিশে যাওয়ার এক গভীর রূপান্তর হিসেবে দেখা দিয়েছে।
কবিতার শুরুতে কবি এক প্রলয়ঙ্করি মুহূর্তের সম্মুখীন হন, যেখানে সৃষ্টির গভীর ব্যাকুলতা তাঁকে পুরোপুরি গ্রাস করে নেয়। অন্ধকারের বুক চিরে বিদ্যুতের যে ফনা জ্বলে ওঠে এবং বিষের মতো মাংসে ও হৃদয়ে ছড়িয়ে পড়ে, তা কোনো ধ্বংসের প্রতীক নয়—তা কবিকে এক নতুন রূপান্তর ও উজ্জীবনের দিকে নিয়ে যায়। বিষের তীব্রতা এখানে যেন এক মহাজাগতিক বিস্ফোরণ ঘটায়, যা সত্তার গভীরে নতুন জীবনের জন্ম দেয়। তাই অকাল-মৃত্যু এখানে কোনো পরাজয় নয়, বরং সৃষ্টির তাগিদে নেওয়া এক অনিবার্য আত্মাহুতি; যার জন্য কবি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছেন।
কবিতার শেষ চরণ দুটিতে এসে কবি পৌরাণিক আবহ ও স্বদেশপ্রেমকে এক সুতোয় বেঁধেছেন। মনসামঙ্গলের গাঙুড়ের জলে ভেসে যাওয়া বেহুলার কাহিনীর মতো কবিও তাঁর সমস্ত অস্তিত্ব নিয়ে মিশে যেতে চান নিজের মাতৃভূমির শরীরে। মৃত্যু তাঁর অস্তিত্বকে মুছে দেয় না, বরং স্বদেশের “বেহুলা শরীরে” এবং গাঙুড়ের স্রোতে বিলীন করে দিয়ে তাঁকে দেশের জল-মাটির সঙ্গে চিরকালের জন্য একাত্ম করে তোলে। বিষাদ ও উথাল-পাথাল আবেগের ভেতরেও তাই কবিতাটি শেষ পর্যন্ত স্বদেশের প্রতি পরম সমর্পণ ও অমরতার এক কাব্যিক ইশতেহার হয়ে ওঠে।






