টাকাগুলো কবে পাবো – শহীদ কাদরী।

টাকাগুলো কবে পাবো? সামনের শীতে?
আসন্ন গ্রীস্মে নয়?
তবে আর কবে! বৈশাখের ঝড়ের মতো
বিরূপ বাতাসে ঝরে পড়ছে অঝোরে
মণি মাণিক্যের মতো মূল্যবান চুলগুলো আমার এদিকে-
ওদিকে! এখনই মনি-অর্ডার না যদি পাঠাও হে সময়,
হে কাল, হে শিল্প,
তবে
কবে? আর কবে?
যখন পড়বে দাঁত, নড়বে দেহের ভিৎ ?

দ্যাখো দ্যাখো, মেঘের তালি-মারা নীল শার্ট প’রে
ফ্রিজিডেয়ার অথবা কোনো রেকর্ড প্লেয়ার ছাড়া
খামোকা হুল্লোড় করতে করতে যারা পৌঁছে যায়
দারুণ কার্পেটহীনভাবে কবিতার সোনালি তোরণে
সেই সব হা-ঘরে, উপোসী ও উল্লুকদের ভীড়ে
মিশে গিয়ে
আমিও হাসছি খুব বিশ্ববিজয়ীর মতো মুখ করে।

আমাকে দেখলে মনে হবে-
গোপন আয়ের ব্যবস্থা ঠিকই আছে।
-আছেই তো। অস্বীকার কখনো করেছি আমি
হে কাল, হে শিল্প?
ওরা জানে না এবং কোনোদিন জানবে না-
পার্কের নি:সঙ্গ বেঞ্চ,
রাতের টেবিল আর রজনীগন্ধার মতো কিছু শুভ্র সিগারেট ছাড়া
কেউ কোনোদিন জানবে না- ব্যক্তিগত ব্যাঙ্ক এক
আমারও রয়েছে! ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ নামক বিশাল
বাণিজ্যালয়ের সাথে যোগাযোগ আমিও রেখেছি।
তাছাড়া জীবনানন্দ দাশ এবং সুধীন্দ্রনাথ সহ
ওসামু দাজাই
আমাকে টাকা পয়সা নিয়মিতভাবে এখনও পাঠান
বলতে পারো এ ব্যবসা বিশ্বব্যাপী-

একবার শার্ল বোদলেয়ার প্রেরিত এক পিপে সুরা আমি
পেয়েছিলাম কৈশোরে পা রেখে,
রিল্কে পাঠিয়েছিলেন কিছু শিল্পিত গোলাপ
(একজন প্রেমিকের কাছে আমি বিক্রি করেছি নির্ভয়ে)
এজরা পাউন্ড দিয়েছিলেন অনেক ডলার
রাশি রাশি থলে ভরা অসংখ্য ডলার
(ডলার দিয়ে কিনেছি রাতের আকাশ)
এবং একটি গ্রীক মুদ্রা
(সে গ্রীক মুদ্রাটি সেই রাতের আকাশে নিয়মিত জ্বলজ্বল করে)
অতএব কপর্দক-শূন্য আমি,কোনো পুণ্য নেই
আমার বিব্রত অস্তিত্বের কাছে
কেউ নয় ঋণী- এমন দারুণ কথা
কি করে যে বলি! যেদিকে তাকাই
পার্কে, পেভমেন্টে, আঁধারে, রাস্তায়
রেস্তোরায়ঁ, ছড়ানো ছিটানো
প্রজ্জ্বোল কবিতাগুলো চতুর্দিক থেকে উঠে এসে
দুটো নিরপরাধ নরম বই হয়ে ইতিমধ্যে
তোমাদের নোংরা অঙ্গুলির নীচে চলে গেলো,
এই কি যথেষ্ট নয়? এতেই কি লক্ষ লক্ষ টাকা
লেখা হলো না আমার নামে, পাওনা হলো না?

হে সময়, হে কাল, হে শিল্প. হে বান্ধববৃন্দ,
টাকাগুলো কবে পাবো, কবে, কবে, কবে?

আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। শহীদ কাদরী।

টাকাগুলো কবে পাবো – শহীদ কাদরী | বাংলা কবিতা বিশ্লেষণ | কবিতার খাতা

টাকাগুলো কবে পাবো কবিতা – শহীদ কাদরীর আধুনিক বাংলা কবিতার মাইলফলক

কবিতার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য

সত্তরের দশকের বাংলাদেশের সাহিত্য জগতে শহীদ কাদরীর ‘টাকাগুলো কবে পাবো’ কবিতাটি একটি যুগান্তকারী সংযোজন। এই কবিতার মাধ্যমে কবি আধুনিক নাগরিক জীবনের অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব, শিল্পীর আর্থিক সংকট এবং সাহিত্য বাজারের জটিল সম্পর্ককে অনন্য শৈল্পিকভাবে উপস্থাপন করেছেন। কবিতাটি রচনার সময় বাংলাদেশ স্বাধীনতা পরবর্তী অর্থনৈতিক সংকট ও সাংস্কৃতিক পুনর্গঠনের যুগ অতিক্রম করছিল। এই সময়ে শিল্প-সাহিত্যের বাণিজ্যিকীকরণ এবং শিল্পীর আর্থিক নিরাপত্তাহীনতা একটি বড় সমস্যা হিসেবে উদ্ভূত হয়। শহীদ কাদরী তাঁর এই কবিতায় শিল্প সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে বিরাজিত পারস্পরিক সম্পর্ককে গভীর অন্তদৃষ্টি দিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন।

শহীদ কাদরীর সাহিত্যকর্ম ও কাব্যভাষার বিবর্তন

শহীদ কাদরী বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে আবির্ভূত হন ১৯৬০-এর দশকে। তাঁর কাব্যযাত্রার শুরু থেকেই তিনি আধুনিকতা ও নাগরিক জীবনের জটিলতাকে কবিতার মূল বিষয়বস্তু করে তোলেন। ‘উত্তরাধিকার’ কাব্যগ্রন্থে সংকলিত ‘টাকাগুলো কবে পাবো’ কবিতায় তাঁর কাব্যভাষা পূর্ণতা লাভ করে। এই কবিতায় তিনি গতানুগতিকতা থেকে সরে এসে সম্পূর্ণ নতুন এক কাব্যভাষার সৃষ্টি করেন, যেখানে অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও শিল্পসৃষ্টির মধ্যে দ্বন্দ্বকে মর্মস্পর্শীভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তাঁর পূর্ববর্তী রচনাগুলোর তুলনায় এই কবিতায় বেশি পরিণত দার্শনিকতা এবং গভীর জীবনবোধ প্রকাশ পেয়েছে।

শিল্পসৌকর্য ও শব্দচয়নের কৃতিত্ব

কবিতাটির ভাষাগত বিন্যাসে শহীদ কাদরীর স্বকীয়তা পরিস্ফুট। ‘মণি মাণিক্যের মতো মূল্যবান চুল’, ‘মনি-অর্ডার’, ‘কাল’ ও ‘শিল্প’ এর মতো শব্দগুচ্ছের মাধ্যমে কবি অর্থনৈতিক প্রয়োজন ও শিল্পসৃষ্টির মধ্যকার টানাপোড়েনকে চিত্রিত করেছেন। আন্তর্জাতিক সাহিত্যিক ব্যক্তিত্ব যেমন রিল্কে, বোদলেয়ার, এজরা পাউন্ড এর উল্লেখ কবিতাকে বিশ্বসাহিত্যের প্রেক্ষাপটে স্থাপন করেছে। কবির শব্দচয়নে রয়েছে অনন্য মাত্রা – তিনি সাধারণ শব্দকে অসাধারণ অর্থদ্যোতনায় পরিণত করার কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। প্রতিটি শব্দবন্ধনে লুকিয়ে আছে গভীর জীবনদর্শন ও সমাজবীক্ষণ।

সাহিত্যিক প্রতীক ও রূপকের ব্যবহার

কবিতাটিতে ব্যবহৃত প্রতীকসমূহ বাংলা কবিতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ‘পার্কের নি:সঙ্গ বেঞ্চ’ আধুনিক নাগরিকের একাকীত্বের প্রতীক, ‘রজনীগন্ধার মতো কিছু শুভ্র সিগারেট’ জীবনসৌকর্য ও বিলাসিতার দ্বৈততা নির্দেশ করে। ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ নামক বিশাল বাণিজ্যালয়ের উল্লেখ সাহিত্যের বাণিজ্যিকীকরণের প্রতি ইশারা করে। কবিতার কেন্দ্রীয় প্রতীক ‘টাকা’ কেবল অর্থেরই নয়, বরং এটি জীবনের প্রয়োজনীয়তা, শিল্পের বিনিময় মূল্য এবং সামাজিক মর্যাদার সম্মিলিত প্রকাশ। এই সমস্ত প্রতীকের মাধ্যমে কবি পাঠককে একটি জটিল চিন্তার জগতে নিয়ে যান, যেখানে অর্থ ও শিল্পের সম্পর্ক নতুনভাবে পুনর্মূল্যায়িত হয়।

কবিতার গঠনশৈলী ও শিল্পকৌশল

‘টাকাগুলো কবে পাবো’ কবিতাটি তার গঠনশৈলীতেও অনন্য। কবিতাটি传统的 ছন্দ-অলঙ্কার থেকে মুক্ত হয়ে আধুনিক গদ্যকবিতার ধারায় রচিত, তবুও এতে রয়েছে内在 ছন্দের প্রবাহ। কবিতার বিন্যাসে রয়েছে কথোপকথনের ঢং, যা পাঠককে সরাসরি সম্পৃক্ত করে। শহীদ কাদরী এই কবিতায় ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা与 সামাজিক বাস্তবতার মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন অত্যন্ত নিপুণভাবে। তাঁর শিল্পকৌশলের বিশেষত্ব হলো, তিনি জটিল দার্শনিক বিষয়বস্তুকে সহজবোধ্য ও জীবনঘনিষ্ঠ করে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছেন।

সমকালীন প্রভাব ও সাহিত্যিক মূল্যায়ন

শহীদ কাদরীর ‘টাকাগুলো কবে পাবো’ কবিতাটি প্রকাশের পর থেকেই বাংলা সাহিত্য জগতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। সমালোচকরা এই কবিতাকে আধুনিক বাংলা কবিতার একটি মাইলফলক হিসেবে আখ্যায়িত করেন। কবিতাটি কেবল শহীদ কাদরীর ব্যক্তিগত কাব্যকৃতিত্বই নয়, বরং সমগ্র একটি প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা, হতাশা, সংঘাত ও স্বপ্নের দলিল। বাংলা সাহিত্যে শহীদ কাদরীর এই অবদান তাঁকে সমকালীন কবিতায় বিশেষ মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছে। এই কবিতা পাঠ করে আমরা কেবল একটি কবিতাই পড়ি না, বরং একটি যুগের социаль-অর্থনৈতিক ইতিহাসের সাক্ষ্যও গ্রহণ করি।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী

কবিতাটি প্রথম কোন কাব্যগ্রন্থে প্রকাশিত হয়?

কবিতাটি শহীদ কাদরীর ‘উত্তরাধিকার’ কাব্যগ্রন্থে首次 প্রকাশিত হয়, যা ১৯৭৮ সালে পাঠকসমাজে প্রবল সাড়া জাগায়। এই কাব্যগ্রন্থটি বাংলা সাহিত্যের আধুনিক ধারায় একটি যুগান্তকারী সংযোজন হিসেবে বিবেচিত।

কবিতাটির মূল প্রতিপাদ্য বিষয় কী?

কবিতাটির মূল প্রতিপাদ্য আধুনিক শিল্পীর অর্থনৈতিক সংকট, সাহিত্য সৃষ্টি ও বাজার অর্থনীতির জটিল সম্পর্ক এবং শিল্পের মৌলিক价值 নিয়ে প্রশ্ন। কবি দেখিয়েছেন কীভাবে একজন শিল্পী অর্থনৈতিক বাস্তবতা与 শিল্পসৃষ্টির demands-এর মধ্যে平衡 বজায় রাখার চেষ্টা করেন।

কবিতাটি বাংলা সাহিত্যে何种 স্থান দখল করে আছে?

এই কবিতা বাংলা সাহিত্যের আধুনিক ধারায় একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয় এবং সামাজিক বাস্তবতা与 শিল্পসৌকর্যের সমন্বয়ের জন্য বিশেষভাবে সমাদৃত। এটি কেবল একটি কবিতা নয়, বরং একটি ঐতিহাসিক দলিল যা তার সময়ের социаль-অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে ধারণ করে আছে।

শহীদ কাদরীর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কবিতা有哪些?

শহীদ কাদরীর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কবিতার মধ্যে রয়েছে ‘প্রতিদিন একটা করে আকাশ’, ‘তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা’, ‘কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই’, ‘উত্তরাধিকার’, ‘পূর্বপশ্চিম’等। তাঁর এই সমস্ত কবিতা বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে এবং আধুনিক কবিতার ধারাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে।

কবিতাটিতে哪些 আন্তর্জাতিক সাহিত্যিকদের উল্লেখ আছে?

এই কবিতায় শহীদ কাদরী রিল্কে, বোদলেয়ার, এজরা পাউন্ড, ওসামু দাজাই-এর মতো বিশ্ববিখ্যাত সাহিত্যিকদের উল্লেখ করেছেন, যা কবিতাকে একটি আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে স্থাপন করে এবং বিশ্ব সাহিত্যের সাথে বাংলা সাহিত্যের সংযোগ স্থাপন করে।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest

0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x