কবিতার খাতা
- 48 mins
হুলিয়া – নির্মলেন্দু গুণ।
হুলিয়া কবিতা – নির্মলেন্দু গুণ | বাংলা কবিতা বিশ্লেষণ
হুলিয়া কবিতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ বিশ্লেষণ
হুলিয়া কবিতা বাংলা আধুনিক কবিতার একটি রাজনৈতিক, সামাজিক, ব্যক্তিগত ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে গভীর রচনা যা নির্মলেন্দু গুণের সবচেয়ে বিখ্যাত ও চর্চিত কবিতাগুলির মধ্যে অন্যতম। নির্মলেন্দু গুণ রচিত এই কবিতাটি দীর্ঘ অনুপস্থিতির পর গ্রামে ফেরার অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক হুলিয়ায় তাড়িত একজন মানুষের চেতনা, স্বদেশে অচেনা হয়ে ওঠার ট্র্যাজেডি, পরিবার, সমাজ ও রাজনীতির মধ্যে সংঘাত, এবং ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের মধ্যে ক্রমাগত দ্বন্দ্বের এক অসাধারণ কাব্যিক অভিব্যক্তি। “আমি যখন বাড়িতে পৌঁছলুম তখন দুপুর, চতুর্দিকে চিক্চিক করছে রোদ্দুর” – এই সরল কিন্তু প্রতীকী শুরুর মাধ্যমে হুলিয়া কবিতা পাঠককে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় একজন মানুষের দীর্ঘ অনুপস্থিতির পর গ্রামে ফেরার এক গভীর কাব্যিক অভিজ্ঞতায় নিয়ে যায়। হুলিয়া কবিতা পড়লে মনে হয় যেন কবি শুধু কবিতা লিখেননি, বাংলাদেশের একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ইতিহাস, ব্যক্তির সাথে রাষ্ট্রের সংঘাত, এবং স্বদেশে নির্বাসিত হওয়ার যন্ত্রণার এক জীবন্ত দলিল রচনা করেছেন। নির্মলেন্দু গুণের হুলিয়া কবিতা বাংলা সাহিত্যের রাজনৈতিক কবিতা, সামাজিক বাস্তববাদী কবিতা, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কবিতা ও মনস্তাত্ত্বিক কবিতার ধারায় একটি কালজয়ী ও প্রভাবশালী সংযোজন হিসেবে স্বীকৃত।
হুলিয়া কবিতার কাব্যিক বৈশিষ্ট্য
হুলিয়া কবিতা একটি আখ্যানধর্মী, বর্ণনামূলক, চিত্রময় ও প্রতীকীবহুল কাঠামোতে রচিত শক্তিশালী কবিতা। নির্মলেন্দু গুণ এই কবিতায় ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক বাস্তবতার অসাধারণ সমন্বয় ঘটিয়েছেন, গ্রামীণ জীবনের চিত্র ও রাজনৈতিক হুলিয়ার ভয়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি করেছেন, এবং দীর্ঘ অনুপস্থিতির পর ফেরার ট্র্যাজেডিকে এক সার্বজনীন রূপ দিয়েছেন। “আমার শরীরের ছায়া ঘুরতে ঘুরতে ছায়াহীন একটি রেখায় এসে দাঁড়িয়েছে” – হুলিয়া কবিতাতে এই পংক্তির মাধ্যমে কবি অস্তিত্বের সংকট, পরিচয়হীনতা ও শেকিচ্ছেদের গভীর প্রতীকী চিত্র অঙ্কন করেছেন। নির্মলেন্দু গুণের হুলিয়া কবিতাতে ভাষা অত্যন্ত বাস্তববাদী, চিত্রময়, প্রতীকী, রাজনৈতিকভাবে সচেতন ও ব্যক্তিগতভাবে আবেগময়। হুলিয়া কবিতা পড়ার সময় প্রতিটি স্তবকে ব্যক্তি ও সমাজ, রাজনীতি ও ব্যক্তিগত জীবন, শৈশবের স্মৃতি ও বর্তমানের বাস্তবতার নতুন নতুন মাত্রার উন্মোচন দেখা যায়। নির্মলেন্দু গুণের হুলিয়া কবিতা বাংলা কবিতার রাজনৈতিক সচেতনতা, সামাজিক বাস্তববাদ, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সার্বজনীনীকরণ ও শৈল্পিক প্রতীকী ভাষার অনন্য প্রকাশ।
নির্মলেন্দু গুণের কবিতার বৈশিষ্ট্য
নির্মলেন্দু গুণ বাংলা সাহিত্যের একজন প্রথাবিরোধী, বিদ্রোহী, রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ও সামাজিকভাবে সচেতন কবি যিনি তাঁর রাজনৈতিক কবিতা, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সাহসী প্রকাশ, ভাষার বাস্তববাদী ব্যবহার, এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রতিচ্ছবি হিসেবে কবিতা রচনার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত ও প্রভাবশালী। তাঁর কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো রাজনৈতিক ঘটনাবলীর কাব্যিক রূপায়ণ, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মাধ্যমে সামাজিক বাস্তবতার প্রকাশ, ভাষার সরাসরি ও বাস্তববাদী ব্যবহার, এবং শৈল্পিক প্রতীকের মাধ্যমে গভীর রাজনৈতিক বক্তব্যের উপস্থাপন। নির্মলেন্দু গুণের হুলিয়া কবিতা এই সকল গুণের পূর্ণ, পরিপূর্ণ, শক্তিশালী ও প্রভাবশালী প্রকাশ। নির্মলেন্দু গুণের কবিতায় ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা জাতীয় ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠে, রাজনৈতিক হুলিয়া ব্যক্তির অস্তিত্ব সংকটে পরিণত হয়। নির্মলেন্দু গুণের হুলিয়া কবিতাতে রাজনৈতিক হুলিয়া ও ব্যক্তিগত ফেরার এই কাব্যিক সমন্বয় অসাধারণ বাস্তববাদিতা, রাজনৈতিক সচেতনতা, ব্যক্তিগত আবেগের গভীরতা ও শৈল্পিক প্রতীকীবহুলতায় অঙ্কিত হয়েছে। নির্মলেন্দু গুণের কবিতা বাংলা সাহিত্যকে নতুন রাজনৈতিক, সামাজিক ও বাস্তববাদী দিকনির্দেশনা দান করেছে।
হুলিয়া কবিতা সম্পর্কে প্রশ্নোত্তর
হুলিয়া কবিতার লেখক কে?
হুলিয়া কবিতার লেখক প্রথাবিরোধী, বিদ্রোহী ও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় বাংলা কবি নির্মলেন্দু গুণ।
হুলিয়া কবিতার মূল বিষয় কী?
হুলিয়া কবিতার মূল বিষয় রাজনৈতিক হুলিয়ায় তাড়িত একজন মানুষের দীর্ঘ অনুপস্থিতির পর গ্রামে ফেরা, স্বদেশে অচেনা হয়ে ওঠার ট্র্যাজেডি, পরিবার, সমাজ ও রাজনীতির মধ্যে সংঘাত, ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের মধ্যে ক্রমাগত দ্বন্দ্ব, শৈশবের স্মৃতি ও বর্তমানের বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান, এবং রাজনৈতিক আদর্শ ও ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে জটিল সম্পর্ক।
নির্মলেন্দু গুণ কে?
নির্মলেন্দু গুণ একজন প্রথাবিরোধী, বিদ্রোহী, রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় বাংলা কবি, লেখক, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী যিনি তাঁর রাজনৈতিক কবিতা, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের কাব্যিক রূপায়ণ, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সাহসী প্রকাশ, এবং সামাজিক বাস্তবতার সাহসী চিত্রায়ণের জন্য বাংলা সাহিত্যে একজন সাড়া জাগানো, প্রভাবশালী ও গুরুত্বপূর্ণ কবি হিসেবে পরিচিত।
হুলিয়া কবিতা কেন বিশেষ?
হুলিয়া কবিতা বিশেষ কারণ এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট সময়ের (বিশেষ করে ১৯৬০-এর দশক ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পূর্ববর্তী সময়) জীবন্ত দলিল, রাজনৈতিক হুলিয়ায় তাড়িত মানুষের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থার গভীর চিত্রায়ণ, স্বদেশে নির্বাসিত হওয়ার ট্র্যাজেডির কাব্যিক রূপ, এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও জাতীয় ইতিহাসের অসাধারণ সমন্বয়।
নির্মলেন্দু গুণের কবিতার বৈশিষ্ট্য কী?
নির্মলেন্দু গুণের কবিতার বৈশিষ্ট্য হলো রাজনৈতিক সচেতনতা ও সক্রিয়তা, সামাজিক বাস্তবতার সাহসী চিত্রায়ণ, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সার্বজনীনীকরণ, ভাষার সরাসরি, বাস্তববাদী ও প্রভাবশালী ব্যবহার, এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের কাব্যিক প্রতিফলন।
হুলিয়া কবিতা কোন কাব্যগ্রন্থের অংশ?
হুলিয়া কবিতা নির্মলেন্দু গুণের “হুলিয়া” কাব্যগ্রন্থের প্রধান কবিতা যা তাঁর রাজনৈতিক কবিতাগুলির একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকলন এবং বাংলা সাহিত্যে একটি ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক ও সাহিত্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।
হুলিয়া কবিতা থেকে কী শিক্ষা পাওয়া যায়?
হুলিয়া কবিতা থেকে রাজনৈতিক নিপীড়নের মানবিক মূল্য, স্বদেশে নির্বাসিত হওয়ার যন্ত্রণা, ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক পরিচয়ের সংকট, পরিবার ও রাজনীতির মধ্যে দ্বন্দ্ব, এবং বাংলাদেশের একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ইতিহাসের শিক্ষা, উপলব্ধি, সচেতনতা ও প্রেরণা পাওয়া যায়।
নির্মলেন্দু গুণের অন্যান্য বিখ্যাত কবিতা কী কী?
নির্মলেন্দু গুণের অন্যান্য বিখ্যাত কবিতার মধ্যে রয়েছে “পৃথিবী”, “অসমাপ্ত কবিতা”, “আফ্রিকার প্রেমের কবিতা”, “প্রেমের কবিতা”, “আমার যত গ্লানি”, “কে এই কে”, “বিদ্রোহের কাব্য”, “রক্তে আমার অনাদি অস্থিরতা” প্রভৃতি রাজনৈতিক, সামাজিক ও ব্যক্তিগত কবিতা।
হুলিয়া কবিতা পড়ার সেরা সময় কখন?
হুলিয়া কবিতা পড়ার সেরা সময় হলো যখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস, ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক, রাজনৈতিক নিপীড়নের মানবিক দিক, স্বদেশে ফেরার ট্র্যাজেডি, এবং রাজনৈতিক কবিতার শক্তি নিয়ে গভীর, রাজনৈতিকভাবে সচেতন, ঐতিহাসিকভাবে অনুসন্ধানী ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে সংবেদনশীল ভাবনার ইচ্ছা, প্রয়োজন ও আগ্রহ থাকে।
হুলিয়া কবিতা আধুনিক প্রেক্ষাপটে কতটা প্রাসঙ্গিক?
হুলিয়া কবিতা আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, প্রয়োজনীয় ও জরুরি, কারণ আধুনিক বিশ্বে রাজনৈতিক নিপীড়ন, রাষ্ট্রীয় হুলিয়া, ব্যক্তির উপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ, স্বদেশে নির্বাসিত হওয়ার অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক আদর্শ ও ব্যক্তিগত জীবনের সংঘাত, এবং স্বাধীনতা, পরিচয় ও অন্তর্গতির প্রশ্নগুলি বর্তমান যুগেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, আলোচিত, বিশ্লেষিত ও সংঘাতপূর্ণ বিষয় যা এই কবিতার বার্তা, অভিজ্ঞতা ও বেদনাকে আরও প্রাসঙ্গিক, গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় করে তুলেছে।
হুলিয়া কবিতার গুরুত্বপূর্ণ লাইন বিশ্লেষণ
“আমি যখন বাড়িতে পৌঁছলুম তখন দুপুর, চতুর্দিকে চিক্চিক করছে রোদ্দুর” – কবিতার শুরুতে ফেরার মুহূর্তের বর্ণনা যা স্বাভাবিকতার ছদ্মাবরণে গভীর ট্র্যাজেডির ইঙ্গিত দেয়।
“আমার শরীরের ছায়া ঘুরতে ঘুরতে ছায়াহীন একটি রেখায় এসে দাঁড়িয়েছে” – অস্তিত্বের সংকট, পরিচয়হীনতা ও শেকিচ্ছেদের গভীর প্রতীকী চিত্র।
“কেউ চিনতে পারেনি আমাকে” – কবিতার কেন্দ্রীয় বেদনা ও ট্র্যাজেডি যা বারবার পুনরাবৃত্ত হয়।
“ট্রেনে সিগারেট জ্বালাতে গিয়ে একজনের কাছ থেকে আগুন চেয়ে নিয়েছিলুম” – সাধারণ মানুষের সাথে সাধারণ মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে অচেনা হয়ে ওঠার চিত্র।
“একজন মহাকুমা স্টেশনে উঠেই আমাকে জাপটে ধরতে চেয়েছিল” – রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ও ব্যক্তির মধ্যে সংঘাতের প্রথম ইঙ্গিত।
“আমি সবাইকে মানুষের সমিল চেহারার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছি” – মানবিকতার প্রতি আহ্বান ও রাজনৈতিক বিভাজনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।
“একজন রাজনৈতিক নেতা তিনি কমিউনিস্ট ছিলেন, মুখোমুখি বসে দূর থেকে বারবার চেয়ে দেখলেন-, কিন্তু চিনতে পারলেন না” – রাজনৈতিক সহযোগীর থেকেও অচেনা হয়ে ওঠার গভীরতর ট্র্যাজেডি।
“বারহাট্টায় নেমেই রফিজের স্টলে চা খেয়েছি, অথচ কী আশ্চর্য, পুনর্বার চিনি দিতে এসেও রফিজ আমাকে চিনল না” – দৈনন্দিন পরিচিত মানুষের থেকেও বিচ্ছিন্ন হওয়ার মর্মস্পর্শী চিত্র।
“দীর্ঘ পাঁচ বছর পর পরিবর্তনহীন গ্রামে ফিরছি আমি” – সময়ের দীর্ঘতা ও স্থানের অপরিবর্তনীয়তার মধ্যে দ্বন্দ্ব।
“সে একই ভাঙাপথ, একই কালোমাটির আল ধরে গ্রামে ফেরা” – শৈশবের পরিচিত পথ ও বর্তমানের অপরিচয়ের মধ্যে বিরোধ।
“অনেক বদলে গেছে বাড়িটি, টিনের চাল থেকে শুরু করে গরুর গোয়াল” – বাহ্যিক পরিবর্তনের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ বিচ্ছিন্নতার চিত্র।
“পড়ার ঘরের বারান্দায় নুয়ে-পড়া বেলিফুলের গাছ থেকে একটি লাউডুগী উত্তপ্ত দুপুরকে তার লক্লকে জিভ দেখালো” – প্রকৃতির মাধ্যমে রাজনৈতিক হুলিয়ার প্রতীকী উপস্থাপন (লাউডুগী সাপ রাজনৈতিক হুলিয়ার প্রতীক)।
“স্বতঃস্ফূর্ত মুখের দাড়ির মতো বাড়িটির চর্তুদিকে ঘাস, জঙ্গল, গর্ত, আগাছার গাঢ় বন গড়ে উঠেছে” – উপেক্ষা, পরিত্যাগ ও বিস্মৃতির চিত্র।
“যেন সবখানেই সভ্যতাকে ব্যঙ্গ করে এখানে শাসন করছে গোঁয়ার প্রকৃতি” – মানুষের অবর্তমানে প্রকৃতির কর্তৃত্ব ও সভ্যতার ক্ষয়ের রূপক।
“একটি শেয়াল একটি কুকুরের পাশে শুয়েছিল প্রায়, আমাকে দেখেই পালাল একজন” – প্রকৃতির মধ্যে রাজনৈতিক ভয় ও সন্দেহের ছায়া।
“গন্ধ শুঁকে নিয়ে আমাকে চিনতে চেষ্টা করল-যেমন পুলিশ-সমেত চেকার তেজগাঁয় আমাকে চিনতে চেষ্টা করেছিল” – প্রাণী ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের আচরণের মধ্যে সমান্তরাল যা নিপীড়নের সার্বজনীনতা নির্দেশ করে।
“হাঁটতে-হাঁটতে একটি গাছ দেখে থমকে দাঁড়ালাম, অশোক গাছ, বাষট্টির ঝড়ে ভেঙে-যাওয়া অশোক” – ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনের প্রতীক (বাষট্টির ঝড়) এবং ভাঙা অশোক গাছ ব্যর্থ স্বপ্নের প্রতীক।
“একসময় কী ভীষণ ছায়া দিত এই গাছটা; অনায়াসে দু’জন মানুষ মিশে থাকতে পারত এর ছায়ায়” – হারানো আশ্রয়, নিরাপত্তা ও ভালোবাসার স্থানের স্মৃতি।
“আমরা ভালোবাসার নামে একদিন সারারাত এ-গাছের ছায়ায় লুকিয়েছিলুম” – ব্যক্তিগত ভালোবাসা ও রাজনৈতিক লুকানোর দ্বৈত তাৎপর্য।
“সেই বাসন্তী, আহা সেই বাসন্তী এখন বিহারে, ডাকাত স্বামীর ঘরে চার-সন্তানের জননী হয়েছে” – হারানো প্রেম, ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি ও সামাজিক অবস্থার পরিবর্তনের চিত্র।
“পুকুরের জলে শব্দ উঠল মাছের, আবার জিভ দেখাল সাপ” – প্রকৃতির মধ্যে নিয়ত বিরাজমান বিপদ ও হুলিয়ার প্রতীক।
“শান্ত-স্থির বোকা গ্রামকে কাঁপিয়ে দিয়ে একটি এরোপ্লেন তখন উড়ে গেলো পশ্চিমে” – আধুনিকতা, রাষ্ট্রীয় শক্তি ও গ্রামীণ জীবনের মধ্যে সংঘাত।
“আমি বাড়ির পেছন থেকে শব্দ করে দরজায় টোকা দিয়ে ডাকলুম-‘মা’” – ফেরার কেন্দ্রীয় মুহূর্ত ও মাতৃস্নেহের প্রতি আকুতি।
“বহুদিন যে-দরোজা খোলেনি, বহুদিন যে-দরোজায় কোনো কণ্ঠস্বর ছিল না” – মৌনতা, অনুপস্থিতি ও বিচ্ছিন্নতার দীর্ঘকালীনতা।
“মরচে-পরা সেই দরোজা মুহূর্তেই ক্যাচ্ক্যাচ শব্দ করে খুলে গেল” – মাতৃস্নেহের অমোঘ শক্তি ও স্বাগতের চিত্র।
“বহুদিন চেষ্টা করেও যে গোয়েন্দা-বিভাগ আমাকে ধরতে পারেনি, চৈত্রের উত্তপ্ত দুপুরে, অফুরন্ত হাওয়ার ভিতরে সেই আমি কত সহজেই একটি আলিঙ্গনের কাছে বন্দি হয়ে গেলুম” – রাজনৈতিক হুলিয়া ও মাতৃস্নেহের মধ্যে বিপরীতমুখী শক্তির তুলনা।
“সেই আমি কত সহজেই মায়ের চোখে চোখ রেখে একটি অবুঝ সন্তান হয়ে গেলুম” – রাজনৈতিক সক্রিয়তা থেকে শিশুসুলভ নির্ভরতায় প্রত্যাবর্তন।
“মা আমাকে ক্রন্দনসিক্ত একটি চুম্বনের মধ্যে লুকিয়ে রেখে অনেক জঙ্গলের পথ অতিক্রম করে পুকুরের জলে চাল ধুতে গেলেন” – মাতৃস্নেহের মাধ্যমে সুরক্ষা ও দৈনন্দিন জীবনে ফেরার চিত্র।
“দেখলুম দু’ঘরের মাঝামাঝি যেখানে সিদ্ধিদাতা গণেশের ছবি ছিল, সেখানে লেনিন, বাবার জমা-খরচের পাশে কার্ল মার্কস” – ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় প্রতীকের স্থানে আধুনিক রাজনৈতিক আদর্শের প্রতিস্থাপন।
“আলমিরার একটি ভাঙা-কাচের অভাব পূরণ করছে স্ক্রুপস্কায়ার ছেঁড়া ছবি” – সমাজতান্ত্রিক আদর্শের টুকরো টুকরো উপস্থিতি ও অসম্পূর্ণতা।
“সেনবাড়ি থেকে খবর পেয়ে বৌদি আসবেন, পুনর্বার বিয়ে করতে অনুরোধ করবেন আমাকে” – ব্যক্তিগত জীবন ও সামাজিক দায়িত্বের দাবি।
“খবর পেয়ে যশমাধব থেকে আসবে ন্যাপকর্মী ইয়াসিন, তিন মাইল বিষ্টির পথ হেঁটে রসুলপুর থেকে আসবে আদিত্য” – রাজনৈতিক সহযোগী ও আন্দোলনের অংশীদারদের আগমন।
“রাত্রে মারাত্মক অস্ত্র হাতে নিয়ে আমতলা থেকে আসবে আব্বাস” – সশস্ত্র সংগ্রামের সম্ভাবনা ও বিপ্লবী তৎপরতা।
“ওরা প্রত্যেকেই জিজ্ঞেস করবে ঢাকার খবর” – রাজনৈতিক কেন্দ্রের প্রতি আগ্রহ ও নির্ভরতা।
“-আমাদের ভবিষ্যত কী? -আইয়ুব খান এখন কোথায়? -শেখ মুজিব কি ভুল করছেন? -আমার নামে কতদিন আর এরকম হুলিয়া ঝুলবে?” – রাজনৈতিক প্রশ্নাবলী যা বাংলাদেশের একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক সময়ের প্রতিফলন।
“আমি কিছুই বলব না” – মৌনতা, নিরুত্তরতা ও ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি।
“আমার মুখের দিকে চেয়ে থাকা সারি সারি চোখের ভিতরে বাঙলার বিভিন্ন ভবিষ্যৎকে চেয়ে চেয়ে দেখব” – ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা ও সম্ভাবনার বহুমুখীতার দিকে তাকানো।
“উৎকন্ঠিত চোখে চোখে নামবে কালো অন্ধকার, আমি চিৎকার করে কণ্ঠ থেকে অক্ষম বাসনার জ্বালা মুছে নিয়ে বলব” – হতাশা, অসহায়ত্ব ও মানসিক যন্ত্রণার প্রকাশ।
“‘আমি এ সবের কিছুই জানি না, আমি এ সবের কিছুই জানি না।'” – কবিতার সমাপ্তিতে চূড়ান্ত অস্বীকৃতি, অসহায়তা ও অজ্ঞতার ঘোষণা যা গভীর রাজনৈতিক হতাশা ও ব্যক্তিগত বিচ্ছিন্নতার চূড়ান্ত প্রকাশ।
হুলিয়া কবিতার ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক তাৎপর্য
হুলিয়া কবিতা শুধু একটি কবিতা নয়, এটি একটি ঐতিহাসিক দলিল, রাজনৈতিক বিবৃতি, সামাজিক প্রতিচ্ছবি ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের সম্মিলিত রূপ। নির্মলেন্দু গুণ এই কবিতায় নয়টি মৌলিক ধারণা উপস্থাপন করেছেন: ১) রাজনৈতিক হুলিয়ায় তাড়িত মানুষের দীর্ঘ অনুপস্থিতির পর ফেরার ট্র্যাজেডি, ২) স্বদেশে অচেনা হয়ে ওঠার মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা, ৩) ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের মধ্যে ক্রমাগত দ্বন্দ্ব ও সংঘাত, ৪) পরিবার, সমাজ ও রাজনীতির মধ্যে জটিল সম্পর্ক, ৫) বাংলাদেশের একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক সময়ের (১৯৬০-এর দশক, বিশেষ করে আইয়ুব খানের শাসনামল ও মুক্তিযুদ্ধ পূর্ববর্তী সময়) রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন, ৬) রাজনৈতিক আদর্শ (সমাজতন্ত্র, কমিউনিজম) ও ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে সংঘাত, ৭) শৈশবের স্মৃতি, প্রেম ও বর্তমানের রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান, ৮) গ্রামীণ জীবন, প্রকৃতি ও রাজনৈতিক হুলিয়ার মধ্যে দ্বন্দ্বময় সম্পর্ক, ৯) শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক জিজ্ঞাসার প্রতি মৌনতা, অস্বীকৃতি ও অজ্ঞতার মাধ্যমে গভীর হতাশার প্রকাশ। হুলিয়া কবিতা পড়লে বোঝা যায় যে নির্মলেন্দু গুণের দৃষ্টিতে “হুলিয়া” শুধু একটি আইনগত বা পুলিশি ব্যবস্থা নয়, এটি একটি অস্তিত্বগত অবস্থা, একটি মনস্তাত্ত্বিক অবস্থান, একটি সামাজিক পরিচয়। কবিতার শুরু থেকেই “কেউ চিনতে পারেনি আমাকে” এই বেদনা বারবার ফিরে আসে – ট্রেনে, স্টেশনে, রাজনৈতিক নেতার কাছ থেকে, রফিজের চায়ের দোকানে। এটি শুধু বাহ্যিক অচেনা হয়ে ওঠা নয়, এটি একটি অস্তিত্বগত সংকট। কবির “শরীরের ছায়া ঘুরতে ঘুরতে ছায়াহীন একটি রেখায় এসে দাঁড়িয়েছে” – এটি পরিচয়হীনতার গভীর প্রতীকী চিত্র। কবিতায় ঐতিহাসিক উল্লেখগুলি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ: “বাষট্টির ঝড়ে ভেঙে-যাওয়া অশোক” ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনের প্রতীক; “আইয়ুব খান এখন কোথায়?” আইয়ুব খানের শাসনামলের প্রতি ইঙ্গিত; “শেখ মুজিব কি ভুল করছেন?” বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পূর্ববর্তী রাজনৈতিক বিতর্কের প্রতিফলন। কবিতার মধ্যে রাজনৈতিক আদর্শের উপস্থিতি লক্ষণীয়: কমিউনিস্ট নেতা, লেনিন, কার্ল মার্কস, স্ক্রুপস্কায়া, ন্যাপকর্মী ইয়াসিন – এগুলি সমাজতান্ত্রিক ও কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রতীক। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কবিতার শেষে কবির মৌনতা ও অস্বীকৃতি: “আমি এ সবের কিছুই জানি না”। এটি শুধু ব্যক্তিগত অজ্ঞতা নয়, এটি একটি রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক ও অস্তিত্বগত হতাশার প্রকাশ, একটি সময়ের ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি, একটি প্রজন্মের নিরাশার কাব্যিক অভিব্যক্তি। হুলিয়া কবিতাতে রাজনৈতিক হুলিয়া, ব্যক্তিগত ফেরা, ঐতিহাসিক সময়, সামাজিক বাস্তবতা ও মনস্তাত্ত্বিক সংকটের এই জটিল, দ্বন্দ্বময়, গভীর ও শিল্পগুণে সমৃদ্ধ চিত্র অসাধারণভাবে ফুটে উঠেছে।
হুলিয়া কবিতায় প্রতীক, রূপক, ঐতিহাসিক উল্লেখ ও রাজনৈতিক প্রসঙ্গের ব্যবহার
নির্মলেন্দু গুণের হুলিয়া কবিতাতে বিভিন্ন শক্তিশালী প্রতীক, গভীর রূপক, সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক উল্লেখ ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রসঙ্গ ব্যবহৃত হয়েছে। “হুলিয়া” শুধু একটি আইনগত ব্যবস্থা নয়, এটি অস্তিত্বগত সংকট, রাজনৈতিক নিপীড়ন, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও মনস্তাত্ত্বিক ভয়ের প্রতীক। “দুপুর” ও “রোদ্দুর” শুধু দিনের একটি সময় নয়, প্রকাশ্যতা, উন্মোচন, তাপ, উত্তাপ ও অস্বস্তির প্রতীক। “ছায়াহীন রেখা” পরিচয়হীনতা, অস্তিত্ব সংকট, শেকিচ্ছেদ ও নির্জনতার প্রতীক। “ট্রেন” যাত্রা, চলাচল, নির্বাসন ও প্রত্যাবর্তনের প্রতীক। “মহাকুমা স্টেশন” রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব, নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারির প্রতীক। “রফিজের স্টল” দৈনন্দিন জীবন, সাধারণ মানুষের বিশ্ব ও পরিচিতির স্থানের প্রতীক। “ভাঙাপথ” ও “কালোমাটির আল” শৈশবের স্মৃতি, পরিচিতি ও ফেরার পথের প্রতীক। “বেলিফুলের গাছ” ও “লাউডুগী সাপ” প্রকৃতির মধ্যে লুকিয়ে থাকা বিপদ, ভয় ও হুলিয়ার প্রতীক। “অশোক গাছ” আশ্রয়, স্মৃতি, প্রেম ও হারানো স্বপ্নের প্রতীক। “বাষট্টির ঝড়” ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক ঘটনার প্রতীক। “বাসন্তী” হারানো প্রেম, ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি ও সময়ের পরিবর্তনের প্রতীক। “এরোপ্লেন” আধুনিকতা, রাষ্ট্রীয় শক্তি, প্রযুক্তি ও বহির্জগতের প্রতীক। “মরচে-পরা দরোজা” মৌনতা, বিচ্ছিন্নতা, অপেক্ষা ও পুনর্মিলনের প্রতীক। “মায়ের আলিঙ্গন” মাতৃস্নেহ, সুরক্ষা, শরণ ও ব্যক্তিগত বিশ্বের প্রতীক। “গণেশের ছবি” ঐতিহ্য, ধর্ম, সংস্কৃতি ও অতীতের প্রতীক। “লেনিন” ও “কার্ল মার্কস” সমাজতন্ত্র, কমিউনিজম, রাজনৈতিক আদর্শ ও আধুনিকতার প্রতীক। “স্ক্রুপস্কায়ার ছবি” সমাজতান্ত্রিক আদর্শের অসম্পূর্ণতা, টুকরো টুকরো অবস্থা ও বাস্তবায়নের কষ্টের প্রতীক। “সেনবাড়ি” সামাজিক সম্পর্ক, দায়িত্ব ও পারিবারিক প্রত্যাশার প্রতীক। “ন্যাপকর্মী ইয়াসিন” ও “আদিত্য” রাজনৈতিক আন্দোলন, সহযোগিতা ও সংগ্রামের প্রতীক। “আব্বাস” ও “মারাত্মক অস্ত্র” সশস্ত্র সংগ্রাম, বিপ্লবী তৎপরতা ও হিংসার প্রতীক। “ঢাকার খবর” রাজনৈতিক কেন্দ্র, তথ্য ও নির্দেশনার প্রতীক। “আইয়ুব খান” পাকিস্তানের সামরিক শাসন, নিপীড়ন ও ঐতিহাসিক সময়ের প্রতীক। “শেখ মুজিব” বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, জাতীয়তাবাদ ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতীক। “কালো অন্ধকার” হতাশা, অনিশ্চয়তা, ভয় ও ভবিষ্যতের অন্ধকারের প্রতীক। “আমি কিছুই জানি না” মৌনতা, অস্বীকৃতি, হতাশা, ব্যর্থতা ও অস্তিত্বগত সংকটের প্রতীক। এই সকল প্রতীক, রূপক, ঐতিহাসিক উল্লেখ ও রাজনৈতিক প্রসঙ্গ হুলিয়া কবিতাকে একটি সরল, ব্যক্তিগত কবিতার স্তর অতিক্রম করে গভীর ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক অর্থময়তা দান করেছে।
হুলিয়া কবিতা পড়ার সঠিক পদ্ধতি ও গভীর বিশ্লেষণ
- হুলিয়া কবিতা প্রথমে সম্পূর্ণভাবে, ধীরে ধীরে, গভীর মনোযোগ সহকারে, ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বুঝে একবার পড়ুন
- কবিতার শিরোনাম “হুলিয়া”-এর আইনগত, রাজনৈতিক, সামাজিক ও অস্তিত্বগত বহুমাত্রিক তাৎপর্য বিশ্লেষণ করুন
- কবিতার আখ্যানধর্মী কাঠামো, বর্ণনামূলক শৈলী ও চিত্রময় ভাষার মধ্যে রাজনৈতিক বার্তার উপস্থাপন পর্যবেক্ষণ করুন
- কবিতার কেন্দ্রীয় দ্বন্দ্বগুলি (ব্যক্তি বনাম রাষ্ট্র, পরিবার বনাম রাজনীতি, অতীত বনাম বর্তমান, পরিচয় বনাম অচেনা) চিহ্নিত করুন
- কবিতার প্রতীকী অর্থ, রূপক ব্যবহার, ঐতিহাসিক উল্লেখ ও রাজনৈতিক প্রসঙ্গের গভীরতা, তাৎপর্য ও উদ্দেশ্য বুঝতে সচেষ্ট হন
- বাংলাদেশের ১৯৬০-এর দশকের রাজনৈতিক ইতিহাস (আইয়ুব খানের শাসন, শিক্ষা আন্দোলন, পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতি) সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞান অর্জন করুন
- কবিতার মধ্যে উল্লিখিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব (লেনিন, মার্কস, স্ক্রুপস্কায়া, আইয়ুব খান, শেখ মুজিব) ও আদর্শ (সমাজতন্ত্র, কমিউনিজম) এর তাৎপর্য বিশ্লেষণ করুন
- কবির ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা (ফেরা, অচেনা হয়ে ওঠা, মায়ের সাথে মিলন) ও জাতীয় রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে সম্পর্ক অনুসন্ধান করুন
- কবিতার শেষের মৌনতা, অস্বীকৃতি ও হতাশার মনস্তাত্ত্বিক, রাজনৈতিক ও দার্শনিক তাৎপর্য চিন্তা করুন
- নির্মলেন্দু গুণের অন্যান্য রাজনৈতিক কবিতা, তাঁর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক কবিতার ঐতিহ্যের সাথে এই কবিতার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করুন
নির্মলেন্দু গুণের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক কবিতা ও রচনা
- হুলিয়া (কাব্যগ্রন্থ)
- প্রেমের কবিতা
- আফ্রিকার প্রেমের কবিতা
- বিদ্রোহের কাব্য
- রক্তে আমার অনাদি অস্থিরতা
- অসমাপ্ত কবিতা
- কে এই কে
- আমার যত গ্লানি
- না প্রেমিক না বিপ্লবী
- কবিতাসমগ্র (১ম-৬ষ্ঠ খণ্ড)
- চিরকুমার সভা ও অন্যান্য কবিতা
- বাংলাদেশের রাজনৈতিক কবিতা
- সমাজতান্ত্রিক কবিতা
- মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক কবিতা
- ঐতিহাসিক কবিতা
- ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক কবিতার সমন্বয়
হুলিয়া কবিতা নিয়ে শেষ কথা ও সারসংক্ষেপ
হুলিয়া কবিতা বাংলা সাহিত্যের একটি ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক ও শৈল্পিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ রচনা যা নির্মলেন্দু গুণের সবচেয়ে বিখ্যাত, চর্চিত, বিশ্লেষিত ও প্রভাবশালী কবিতাগুলির মধ্যে অন্যতম। নির্মলেন্দু গুণ রচিত এই কবিতাটি রাজনৈতিক কবিতা, ঐতিহাসিক কবিতা, সামাজিক বাস্তববাদী কবিতা, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কবিতা ও মনস্তাত্ত্বিক কবিতার ইতিহাসে একটি বিশেষ, কালজয়ী, মর্যাদাপূর্ণ, প্রভাবশালী ও প্রয়োজনীয় স্থান দখল করে আছে। হুলিয়া কবিতা পড়লে পাঠক বুঝতে পারেন কিভাবে কবিতা শুধু শিল্প, সৌন্দর্য, আবেগ বা কল্পনা নয়, একটি জাতির রাজনৈতিক ইতিহাসের দলিল, ব্যক্তির সাথে রাষ্ট্রের সংঘাতের বিবরণ, স্বদেশে নির্বাসিত হওয়ার ট্র্যাজেডির অভিব্যক্তি, রাজনৈতিক আদর্শের প্রতিফলন, এবং মনস্তাত্ত্বিক সংকটেরও শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে। নির্মলেন্দু গুণের হুলিয়া কবিতা বিশেষভাবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস, সামাজিক বাস্তবতা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, প্রয়োজনীয়, জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি ১৯৬০-এর দশকের বাংলাদেশের (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) রাজনৈতিক বাস্তবতা, আইয়ুব খানের শাসনামলের নিপীড়ন, রাজনৈতিক হুলিয়ায় তাড়িত মানুষের জীবন, সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতিফলন, এবং মুক্তিযুদ্ধ পূর্ববর্তী সময়ের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থার এক জীবন্ত চিত্র উপস্থাপন করেছে যা বাংলাদেশের ইতিহাস, রাজনীতি ও সমাজ বুঝতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই কবিতার মাধ্যমে নির্মলেন্দু গুণ রাজনৈতিক হুলিয়াকে শুধু একটি আইনগত ব্যবস্থা নয়, একটি অস্তিত্বগত অবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন, ব্যক্তিগত ফেরার অভিজ্ঞতাকে জাতীয় ট্র্যাজেডিতে রূপান্তরিত করেছেন, এবং শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক জিজ্ঞাসার প্রতি মৌনতা ও অস্বীকৃতির মাধ্যমে একটি প্রজন্মের হতাশা, ব্যর্থতা ও নিরাশার কাব্যিক অভিব্যক্তি রচনা করেছেন। হুলিয়া কবিতা সকলের পড়া, বুঝা, বিশ্লেষণ করা, আলোচনা করা, সমালোচনা করা, শিক্ষা করা ও গবেষণা করা উচিত যারা কবিতার মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস, ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক, রাজনৈতিক নিপীড়নের মানবিক দিক, স্বদেশে ফেরার ট্র্যাজেডি, রাজনৈতিক আদর্শের প্রতিফলন, এবং ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক দিকগুলি অন্বেষণ করতে চান। নির্মলেন্দু গুণের হুলিয়া কবিতা timeless, ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, প্রাসঙ্গিক, প্রভাবশালী, শিক্ষণীয়, এর আবেদন, বার্তা, মূল্য ও প্রেরণা চিরস্থায়ী, চিরন্তন, অনন্ত।
ট্যাগস: হুলিয়া কবিতা, হুলিয়া কবিতা বিশ্লেষণ, নির্মলেন্দু গুণ, নির্মলেন্দু গুণের কবিতা, বাংলা রাজনৈতিক কবিতা, ঐতিহাসিক কবিতা, সামাজিক বাস্তববাদী কবিতা, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কবিতা, বাংলাদেশের কবিতা, বাংলা সাহিত্য, হুলিয়া কাব্যগ্রন্থ, নির্মলেন্দু গুণের রাজনৈতিক কবিতা, ১৯৬০-এর দশকের কবিতা, আইয়ুব খান, শেখ মুজিব, সমাজতান্ত্রিক কবিতা
আমি যখন বাড়িতে পৌঁছলুম তখন দুপুর,
চতুর্দিকে চিক্চিক করছে রোদ্দুর-’
আমার শরীরের ছায়া ঘুরতে ঘুরতে ছায়াহীন
একটি রেখায় এসে দাঁড়িয়েছে।
কেউ চিনতে পারেনি আমাকে,
ট্রেনে সিগারেট জ্বালাতে গিয়ে একজনের কাছ থেকে
আগুন চেয়ে নিয়েছিলুম, একজন মহাকুমা স্টেশনে উঠেই
আমাকে জাপটে ধরতে চেয়েছিল, একজন পেছন থেকে
কাঁধে হাত রেখে চিৎকার করে উঠেছিল; -আমি সবাইকে
মানুষের সমিল চেহারার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছি।
কেউ চিনতে পারেনি আমাকে, একজন রাজনৈতিক নেতা
তিনি কমিউনিস্ট ছিলেন, মুখোমুখি বসে দূর থেকে
বারবার চেয়ে দেখলেন-, কিন্তু চিনতে পারলেন না।
বারহাট্টায় নেমেই রফিজের স্টলে চা খেয়েছি,
অথচ কী আশ্চর্য, পুনর্বার চিনি দিতে এসেও
রফিজ আমাকে চিনল না।
দীর্ঘ পাঁচ বছর পর পরিবর্তনহীন গ্রামে ফিরছি আমি।
সে একই ভাঙাপথ, একই কালোমাটির আল ধরে
গ্রামে ফেরা, আমি কতদিন পর গ্রামে ফিরছি।
আমি যখন গ্রামে পৌঁছলুম তখন দুপুর,
আমার চতুর্দিকে চিক্চিক করছে রোদ,
শোঁ-শোঁ করছে হাওয়া।
অনেক বদলে গেছে বাড়িটি,
টিনের চাল থেকে শুরু করে গরুর গোয়াল;
চিহ্নমাত্র শৈশবের স্মৃতি যেন নেই কোনোখানে।
পড়ার ঘরের বারান্দায় নুয়ে-পড়া বেলিফুলের গাছ থেকে
একটি লাউডুগী উত্তপ্ত দুপুরকে তার লক্লকে জিভ দেখালো।
স্বতঃস্ফূর্ত মুখের দাড়ির মতো বাড়িটির চর্তুদিকে ঘাস, জঙ্গল,
গর্ত, আগাছার গাঢ় বন গড়ে উঠেছে অনায়াসে; যেন সবখানেই
সভ্যতাকে ব্যঙ্গ করে এখানে শাসন করছে গোঁয়ার প্রকৃতি।
একটি শেয়াল একটি কুকুরের পাশে শুয়েছিল প্রায়,
আমাকে দেখেই পালাল একজন, গন্ধ শুঁকে নিয়ে
আমাকে চিনতে চেষ্টা করল-যেমন পুলিশ-সমেত চেকার
তেজগাঁয় আমাকে চিনতে চেষ্টা করেছিল।
হাঁটতে-হাঁটতে একটি গাছ দেখে থমকে দাঁড়ালাম,
অশোক গাছ, বাষট্টির ঝড়ে ভেঙে-যাওয়া অশোক,
একসময় কী ভীষণ ছায়া দিত এই গাছটা;
অনায়াসে দু’জন মানুষ মিশে থাকতে পারত এর ছায়ায়।
আমরা ভালোবাসার নামে একদিন সারারাত
এ-গাছের ছায়ায় লুকিয়েছিলুম।
সেই বাসন্তী, আহা সেই বাসন্তী এখন বিহারে,
ডাকাত স্বামীর ঘরে চার-সন্তানের জননী হয়েছে।
পুকুরের জলে শব্দ উঠল মাছের, আবার জিভ দেখাল সাপ,
শান্ত-স্থির বোকা গ্রামকে কাঁপিয়ে দিয়ে
একটি এরোপ্লেন তখন উড়ে গেলো পশ্চিমে…।
আমি বাড়ির পেছন থেকে শব্দ করে দরজায় টোকা দিয়ে
ডাকলুম-‘মা’।
বহুদিন যে-দরোজা খোলেনি,
বহুদিন যে-দরোজায় কোনো কণ্ঠস্বর ছিল না,
মরচে-পরা সেই দরোজা মুহূর্তেই ক্যাচ্ক্যাচ শব্দ করে খুলে গেল।
বহুদিন চেষ্টা করেও যে গোয়েন্দা-বিভাগ আমাকে ধরতে পারেনি,
চৈত্রের উত্তপ্ত দুপুরে, অফুরন্ত হাওয়ার ভিতরে সেই আমি
কত সহজেই একটি আলিঙ্গনের কাছে বন্দি হয়ে গেলুম;
সেই আমি কত সহজেই মায়ের চোখে চোখ রেখে
একটি অবুঝ সন্তান হয়ে গেলুম।
মা আমাকে ক্রন্দনসিক্ত একটি চুম্বনের মধ্যে
লুকিয়ে রেখে অনেক জঙ্গলের পথ অতিক্রম করে
পুকুরের জলে চাল ধুতে গেলেন; আমি ঘরের ভিতরে তাকালুম,
দেখলুম দু’ঘরের মাঝামাঝি যেখানে সিদ্ধিদাতা গণেশের ছবি ছিল,
সেখানে লেনিন, বাবার জমা-খরচের পাশে কার্ল মার্কস;
আলমিরার একটি ভাঙা-কাচের অভাব পূরণ করছে
স্ক্রুপস্কায়ার ছেঁড়া ছবি।
মা পুকুর থেকে ফিরছেন, সন্ধ্যায় মহাকুমা শহর থেকে
ফিরবেন বাবা, তাঁর পিঠে সংসারের ব্যাগ ঝুলবে তেমনি।
সেনবাড়ি থেকে খবর পেয়ে বৌদি আসবেন,
পুনর্বার বিয়ে করতে অনুরোধ করবেন আমাকে।
খবর পেয়ে যশমাধব থেকে আসবে ন্যাপকর্মী ইয়াসিন,
তিন মাইল বিষ্টির পথ হেঁটে রসুলপুর থেকে আসবে আদিত্য।
রাত্রে মারাত্মক অস্ত্র হাতে নিয়ে আমতলা থেকে আসবে আব্বাস।
ওরা প্রত্যেকেই জিজ্ঞেস করবে ঢাকার খবর:
-আমাদের ভবিষ্যত কী?
-আইয়ুব খান এখন কোথায়?
-শেখ মুজিব কি ভুল করছেন?
-আমার নামে কতদিন আর এরকম হুলিয়া ঝুলবে?
আমি কিছুই বলব না।
আমার মুখের দিকে চেয়ে থাকা সারি সারি চোখের ভিতরে
বাঙলার বিভিন্ন ভবিষ্যৎকে চেয়ে চেয়ে দেখব।
উৎকন্ঠিত চোখে চোখে নামবে কালো অন্ধকার, আমি চিৎকার করে
কণ্ঠ থেকে অক্ষম বাসনার জ্বালা মুছে নিয়ে বলব;
‘আমি এ সবের কিছুই জানি না,
আমি এ সবের কিছুই জানি না।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। নির্মলেন্দু গুণ।






