কবিতার খাতা
- 19 mins
যখন নেই তখন থাকো – তসলিমা নাসরিন।
যখন আমার সঙ্গে নেই তুমি,
আমার সঙ্গে তুমি তখন সবচেয়ে বেশি থাকো।
আমি হাঁটি, পাশাপাশি মনে হয় তুমিও হাঁটছো,
তোমাকে সঙ্গে নিয়ে বাজারে যাই,
যা যা খেতে পছন্দ করো, কিনি, তুমি নেই জেনেও কিনি।
রাঁধি যখন, দরজায় যেন হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছো,
মনে মনে কথা বলি।
খেতে বসি, ভাবি তুমিও বসেছো।
যা কিছুই দেখি, পাশে দাঁড়িয়ে তুমিও দেখছো, শুনি, শুনছো।
তত্ত্বে তর্কে, গানে গপ্পে পাশে রাখি তোমাকে।
তুমি সারাদিন সঙ্গে থাকো,
যতক্ষণ জেগে থাকি, থাকো,
ঘুমোলে স্বপ্নের মধ্যে থাকো।
তুমি নেই, অথচ কি ভীষণভাবে তুমি আছো।
তুমি যখন সত্যিকার সঙ্গে থাকো, তখন কিন্তু
এত বেশি সঙ্গে থাকো না।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। তসলিমা নাসরিন।
যখন নেই তখন থাকো – তসলিমা নাসরিন | যখন নেই তখন থাকো কবিতা | তসলিমা নাসরিনের কবিতা | বাংলা কবিতা
যখন নেই তখন থাকো: তসলিমা নাসরিনের অনুপস্থিতি ও উপস্থিতির অসাধারণ কাব্যভাষা
তসলিমা নাসরিনের “যখন নেই তখন থাকো” কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের একটি অনন্য সৃষ্টি, যা অনুপস্থিতি ও উপস্থিতির দ্বন্দ্ব, স্মৃতি ও বর্তমানের সম্পর্ক, প্রেম ও বিচ্ছেদের এক গভীর কাব্যিক অন্বেষণ। “যখন আমার সঙ্গে নেই তুমি, আমার সঙ্গে তুমি তখন সবচেয়ে বেশি থাকো।” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে এক বিষাদময় সত্য — প্রিয়জন যখন কাছে থাকে না, তখন সে আরও বেশি করে কাছে থাকে। তসলিমা নাসরিন (জন্ম: ১৯৬২) একজন প্রখ্যাত বাংলাদেশি লেখিকা, কবি ও মানবাধিকার কর্মী। তাঁর কবিতায় নারীচেতনা, প্রেম, স্বাধীনতা ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের গভীর প্রকাশ ঘটে। “যখন নেই তখন থাকো” তাঁর একটি বহুপঠিত কবিতা যা পাঠকের হৃদয়ে গভীর দাগ কাটে।
তসলিমা নাসরিন: নারীচেতনার অগ্নিকন্যা
তসলিমা নাসরিন (জন্ম: ১৯৬২) একজন প্রখ্যাত বাংলাদেশি লেখিকা, কবি ও মানবাধিকার কর্মী। তিনি ১৯৬২ সালের ২৫ আগস্ট ময়মনসিংহে জন্মগ্রহণ করেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানে পড়াশোনা করলেও লেখালেখি তাঁর প্রধান পেশা। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নির্বাসনে নিজস্ব’ তাঁকে খ্যাতি এনে দেয়। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘বল্কল’, ‘বেহুলা’, ‘আমার মেয়েবেলা’, ‘মোরে দেখিবে’ প্রভৃতি। তাঁর কবিতায় নারীচেতনা, প্রেম, স্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও সামাজিক বন্ধনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের গভীর প্রকাশ ঘটে। তিনি বর্তমানে নির্বাসিত জীবনযাপন করছেন। “যখন নেই তখন থাকো” তাঁর একটি বহুপঠিত কবিতা যা অনুপস্থিতি ও উপস্থিতির দ্বন্দ্ব নিয়ে রচিত।
যখন নেই তখন থাকো কবিতার বিস্তারিত বিশ্লেষণ
কবিতার শিরোনামের তাৎপর্য
“যখন নেই তখন থাকো” শিরোনামটি একটি অক্সিমোরন বা বিরোধাভাস। যখন নেই, তখন থাকো — অর্থাৎ অনুপস্থিতিতেই উপস্থিতি। এটি প্রেমের এক গভীর সত্যকে নির্দেশ করে। প্রিয়জন যখন কাছে থাকে না, তখন সে স্মৃতিতে, কল্পনায়, অনুভূতিতে আরও বেশি করে থেকে যায়। শিরোনামেই কবি এই দ্বন্দ্বকে ধরে ফেলেছেন।
প্রথম স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“যখন আমার সঙ্গে নেই তুমি, / আমার সঙ্গে তুমি তখন সবচেয়ে বেশি থাকো। / আমি হাঁটি, পাশাপাশি মনে হয় তুমিও হাঁটছো, / তোমাকে সঙ্গে নিয়ে বাজারে যাই, / যা যা খেতে পছন্দ করো, কিনি, তুমি নেই জেনেও কিনি।” প্রথম স্তবকে কবি অনুপস্থিতিতে প্রিয়জনের উপস্থিতির অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন — যখন তুমি আমার সঙ্গে নেই, তখন তুমি সবচেয়ে বেশি থাকো। এটি একটি অদ্ভুত সত্য। তিনি হাঁটেন, মনে হয় প্রিয়তমাও পাশাপাশি হাঁটছেন। তিনি বাজারে যান প্রিয়তমাকে সঙ্গে নিয়ে। প্রিয়তমা যা খেতে পছন্দ করেন, তা কেনেন — জেনেও যে তিনি নেই।
পাশাপাশি হাঁটার তাৎপর্য
পাশাপাশি হাঁটা — এটি প্রেমিক-প্রেমিকার একটি সাধারণ দৃশ্য। কিন্তু এখানে এটি কল্পনায় ঘটে। কবি যখন হাঁটেন, মনে হয় প্রিয়তমাও পাশে হাঁটছেন। এটি অনুপস্থিত প্রিয়জনের এত গভীর উপস্থিতি যে বাস্তব-অবাস্তবের সীমানা মুছে যায়।
বাজারে যাওয়া ও কেনার তাৎপর্য
কবি প্রিয়তমাকে সঙ্গে নিয়ে বাজারে যান — কল্পনায়। প্রিয়তমা যা খেতে পছন্দ করেন, তা কেনেন — জেনেও যে তিনি নেই। এটি প্রেমের এক চরম প্রকাশ — প্রিয়জনের অনুপস্থিতিতেও তার পছন্দ-অপছন্দ মনে রাখা, তার জন্য কেনাকাটা করা।
দ্বিতীয় স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“রাঁধি যখন, দরজায় যেন হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছো, / মনে মনে কথা বলি। / খেতে বসি, ভাবি তুমিও বসেছো। / যা কিছুই দেখি, পাশে দাঁড়িয়ে তুমিও দেখছো, শুনি, শুনছো। / তত্ত্বে তর্কে, গানে গপ্পে পাশে রাখি তোমাকে।” দ্বিতীয় স্তবকে কবি গৃহস্থালি কাজের সময় প্রিয়তমার উপস্থিতি অনুভব করার কথা বলেছেন। তিনি রাঁধেন, তখন মনে হয় প্রিয়তমা দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি মনে মনে তাঁর সাথে কথা বলেন। খেতে বসেন, ভাবেন প্রিয়তমাও বসেছেন। যা কিছু দেখেন, ভাবেন প্রিয়তমাও পাশে দাঁড়িয়ে দেখছেন। যা কিছু শোনেন, ভাবেন প্রিয়তমাও শুনছেন। তত্ত্ব-তর্কে, গানে-গল্পে তিনি প্রিয়তমাকে পাশে রাখেন।
দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়ানোর তাৎপর্য
দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়ানো — এটি একটি ঘরোয়া, অন্তরঙ্গ দৃশ্য। কবি যখন রাঁধেন, তখন মনে হয় প্রিয়তমা দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, তাঁর কাজ দেখছেন। এটি সংসার জীবনের একটি সুখস্মৃতি।
তত্ত্ব-তর্কে, গানে-গল্পে পাশে রাখার তাৎপর্য
তত্ত্ব-তর্ক — গভীর আলোচনা। গানে-গল্পে — হালকা আড্ডা। সব কিছুতে কবি প্রিয়তমাকে পাশে রাখেন। অর্থাৎ তাঁর জীবনযাপনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রিয়তমা উপস্থিত — বাস্তবে না থাকলেও অনুভবে আছেন।
তৃতীয় স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“তুমি সারাদিন সঙ্গে থাকো, / যতক্ষণ জেগে থাকি, থাকো, / ঘুমোলে স্বপ্নের মধ্যে থাকো। / তুমি নেই, অথচ কি ভীষণভাবে তুমি আছো।” তৃতীয় স্তবকে কবি অনুপস্থিত প্রিয়তমার উপস্থিতির চূড়ান্ত রূপ বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন — তুমি সারাদিন সঙ্গে থাকো। যতক্ষণ জেগে থাকি, থাকো। ঘুমালে স্বপ্নের মধ্যে থাকো। তুমি নেই, অথচ কী ভীষণভাবে তুমি আছো। এটি একটি অসাধারণ উপলব্ধি — অনুপস্থিতি এত গভীর উপস্থিতি তৈরি করতে পারে!
জেগে থাকা ও ঘুমের তাৎপর্য
জেগে থাকা অবস্থায় প্রিয়তমা কল্পনায়, অনুভবে থাকেন। ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে থাকেন। অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টাই তিনি কবির সঙ্গে আছেন — জেগে থাকা অবস্থায় যেমন, ঘুমের মধ্যেও তেমন।
ভীষণভাবে থাকার তাৎপর্য
“তুমি নেই, অথচ কি ভীষণভাবে তুমি আছো” — এই পঙ্ক্তিটি কবিতার কেন্দ্রীয় বার্তা। অনুপস্থিতি কখনও কখনও উপস্থিতির চেয়েও বেশি শক্তিশালী হয়। প্রিয়জন যখন নেই, তখন সে স্মৃতি, কল্পনা, অনুভূতির মাধ্যমে আরও গভীরভাবে থেকে যায়।
চতুর্থ স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“তুমি যখন সত্যিকার সঙ্গে থাকো, তখন কিন্তু / এত বেশি সঙ্গে থাকো না।” চতুর্থ স্তবকে কবি একটি চমকপ্রদ সত্য প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন — তুমি যখন সত্যিকার অর্থে সঙ্গে থাকো, তখন এত বেশি সঙ্গে থাকো না। অর্থাৎ বাস্তব উপস্থিতিতে প্রিয়জনের উপস্থিতি এত গভীর হয় না, যতটা গভীর হয় অনুপস্থিতিতে। এটি প্রেমের এক মর্মস্পর্শী সত্য।
বাস্তব উপস্থিতি ও অনুপস্থিতির দ্বন্দ্ব
বাস্তব উপস্থিতিতে মানুষ ব্যস্ত থাকে, কাজ থাকে, দৈনন্দিনতা থাকে। তখন প্রিয়জনের উপস্থিতি মাঝে মাঝে ফিকে হয়ে যায়। কিন্তু অনুপস্থিতিতে প্রিয়জন হয়ে ওঠেন স্মৃতি, কল্পনা, আকাঙ্ক্ষা — আরও শক্তিশালী, আরও গভীর।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য
“যখন নেই তখন থাকো” কবিতাটি প্রেম, অনুপস্থিতি ও উপস্থিতির এক অসাধারণ অন্বেষণ। কবি দেখিয়েছেন — প্রিয়জন যখন নেই, তখন তিনি সবচেয়ে বেশি থাকেন। তিনি কল্পনায় পাশাপাশি হাঁটেন, বাজারে যান, রান্নাঘরে দাঁড়ান, খেতে বসেন, তর্ক-গল্পে মেতে ওঠেন। তিনি সারাদিন থাকেন, জেগে থাকলে যেমন, ঘুমালেও তেমন। অনুপস্থিতিতে তিনি ভীষণভাবে থাকেন। আর বাস্তব উপস্থিতিতে তিনি এত বেশি থাকেন না। এটি প্রেমের এক গভীর সত্য — দূরত্ব কখনও কখনও নৈকট্যের চেয়েও বেশি ঘনিষ্ঠ করে তোলে।
যখন নেই তখন থাকো কবিতা সম্পর্কে প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: যখন নেই তখন থাকো কবিতার লেখক কে?
যখন নেই তখন থাকো কবিতার লেখক তসলিমা নাসরিন (জন্ম: ১৯৬২)। তিনি একজন প্রখ্যাত বাংলাদেশি লেখিকা, কবি ও মানবাধিকার কর্মী। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নির্বাসনে নিজস্ব’ তাঁকে খ্যাতি এনে দেয়। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘বল্কল’, ‘বেহুলা’, ‘আমার মেয়েবেলা’, ‘মোরে দেখিবে’ প্রভৃতি।
প্রশ্ন ২: যখন নেই তখন থাকো কবিতার মূল বিষয়বস্তু কী?
যখন নেই তখন থাকো কবিতার মূল বিষয়বস্তু হলো অনুপস্থিতি ও উপস্থিতির দ্বন্দ্ব। কবি দেখিয়েছেন — প্রিয়জন যখন কাছে থাকে না, তখন সে কল্পনায়, স্মৃতিতে, অনুভূতিতে আরও বেশি করে কাছে থাকে। তিনি পাশাপাশি হাঁটেন, বাজারে যান, রান্নাঘরে দাঁড়ান, খেতে বসেন। তিনি সারাদিন থাকেন, জেগে থাকলে যেমন, ঘুমালেও তেমন। আর বাস্তব উপস্থিতিতে তিনি এত বেশি থাকেন না।
প্রশ্ন ৩: ‘তুমি নেই, অথচ কি ভীষণভাবে তুমি আছো’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘তুমি নেই, অথচ কি ভীষণভাবে তুমি আছো’ — এই পঙ্ক্তিটি কবিতার কেন্দ্রীয় বার্তা। কবি বলতে চেয়েছেন — প্রিয়জন বাস্তবে না থাকলেও অনুভবে, কল্পনায়, স্মৃতিতে তিনি ভীষণভাবে উপস্থিত। এই উপস্থিতি অনেক সময় বাস্তব উপস্থিতির চেয়েও বেশি শক্তিশালী ও গভীর।
প্রশ্ন ৪: ‘তুমি যখন সত্যিকার সঙ্গে থাকো, তখন কিন্তু এত বেশি সঙ্গে থাকো না’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘তুমি যখন সত্যিকার সঙ্গে থাকো, তখন কিন্তু এত বেশি সঙ্গে থাকো না’ — এই পঙ্ক্তিতে কবি একটি চমকপ্রদ সত্য প্রকাশ করেছেন। বাস্তব উপস্থিতিতে মানুষ ব্যস্ত থাকে, কাজ থাকে, দৈনন্দিনতা থাকে। তখন প্রিয়জনের উপস্থিতি মাঝে মাঝে ফিকে হয়ে যায়। কিন্তু অনুপস্থিতিতে প্রিয়জন হয়ে ওঠেন স্মৃতি, কল্পনা, আকাঙ্ক্ষা — আরও শক্তিশালী, আরও গভীর।
প্রশ্ন ৫: তসলিমা নাসরিন সম্পর্কে সংক্ষেপে বলুন।
তসলিমা নাসরিন (জন্ম: ১৯৬২) একজন প্রখ্যাত বাংলাদেশি লেখিকা, কবি ও মানবাধিকার কর্মী। তিনি ১৯৬২ সালের ২৫ আগস্ট ময়মনসিংহে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নির্বাসনে নিজস্ব’ তাঁকে খ্যাতি এনে দেয়। তাঁর কবিতায় নারীচেতনা, প্রেম, স্বাধীনতা ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের গভীর প্রকাশ ঘটে। তিনি বর্তমানে নির্বাসিত জীবনযাপন করছেন।
ট্যাগস: যখন নেই তখন থাকো, তসলিমা নাসরিন, তসলিমা নাসরিনের কবিতা, যখন নেই তখন থাকো কবিতা, বাংলা কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, প্রেমের কবিতা, অনুপস্থিতির কবিতা






