মেয়েটা – নবনীতা দেবসেন।

দুঃখ তাকে তাড়া করেছিল
মেয়েটা ছুটতে, ছুটতে, ছুটতে
কী আর করে? হাতের চিরুনিটাই
ছুঁড়ে মারলো দুঃখকে—
আর অমনি চিরুনির
একশো দাঁত থেকে
গজিয়ে উঠলো হাজার হাজার বৃক্ষ
শ্বাপদসংকুল সঘন অরণ্য, বাঘের ডাকে,
ছম্ ছম্ অন্ধকারে,
কোথায় হারিয়ে গেল
দুঃখ—

ভয় তাড়া করেছিল তাকে
মেয়েটা, ছুটতে, ছুটতে, ছুটতে
কী করে? মুঠোর ছোট্ট আতরের শিশিটাই
ছুঁড়ে মারলো ভয়কে—
আর অমনি সেই আতর ফুঁসে উঠলো
ফেঁপে উঠলো ফেনিল ঘূর্ণিতে, প্রখর কলরোলে
যোজন যোজন ব্যেপে, হিংস্র গেরুয়া স্রোতের
তোড়ে কোথায় ভাসিয়ে নিয়ে গেল
ভয়কে—

প্রেম যেদিন ওকে তাড়া করল
মেয়েটার হাতে কিছুই ছিল না
ছুটতে, ছুটতে, ছুটতে, কী করে?
শেষে বুক থেকে উপড়ে নিয়ে হৃদয়টাকেই
ছুঁড়ে দিল প্রেমের দিকে,
আর অমনি
শ্যামল এক শৈলশ্রেণী হয়ে মাথা তুলল
সেই একমুঠো হৃদয়
ঝরনায়, গুহায়, চড়াইতে, উতরাইতে
রহস্যময়
তার খাদে, তার উপত্যকায়
প্রতিধ্বনি কাঁপছে

ঝোড়ো বাতাসের, জলপ্রপাতের—
তার ঢালুতে ছায়া, আর
চুড়োতে ঝল্-সাচ্ছেন
চাঁদ সূয্যি
সেই ঝলমলে, ভরভর্তি হৃদয়টাই
বুঝি এগোতে দিলে না
তার প্রেমিকের ভীতু
প্রেমকে,
আহা

এবার ওকে তাড়া করেছে ক্লান্তি
হাত খালি, বুক খালি,
ছুটতে, ছুটতে, ছুটতে, কী করে?
এবারে মেয়েটা পিছন দিকে
ছুঁড়ে মারলো শুধু দীর্ঘশ্বাস—
আর অমনি
সেই নিশ্বাসের হলকায় ফস্ করে
জ্বলে উঠল তার সমস্ত অতীত
দশদিশিতে দাউ দাউ ছড়িয়ে পড়ল
উড়ন্ত পুড়ন্ত বালির মরুভূমি

এখন মেয়েটা নিশ্চিন্ত হয়ে ছুটছে,
দুই হাত মাথার ওপরে তোলা—
যাক্,
এবার তাকে তাড়া করেছে, তার
গন্তব্যটাই॥

আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। নবনীতা দেবসেন।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest

0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x