পরস্পর – জীবনানন্দ দাশ | পরস্পর কবিতা জীবনানন্দ দাশ | জীবনানন্দ দাশের কবিতা | আধুনিক বাংলা কবিতা
পরস্পর: জীবনানন্দ দাশের রূপকথা, প্রেম, নারীসৌন্দর্য ও অস্তিত্বের অসাধারণ দার্শনিক কাব্যভাষা
জীবনানন্দ দাশের “পরস্পর” একটি অনন্য সৃষ্টি, যা রূপকথা, প্রেম, নারীসৌন্দর্য ও অস্তিত্বের রহস্যের এক গভীর দার্শনিক অন্বেষণ। “মনে প’ড়ে গেল এক রূপকথা ঢের আগেকার , / কহিলাম,- শোনো তবে ,- / শুনিতে লাগিল সবে, / শুনিল কুমার” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে এক গভীর চেতনা — এক ঘুমন্ত মেয়ের রূপকথা, যাকে জাগানোর জন্য প্রয়োজন ভালোবাসার স্পর্শ। কিন্তু এই ঘুমন্ত মেয়ে কি বাস্তব? না কি কল্পনা? তিনি কি এক? না কি অনেক? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে কবিতাটি পৌঁছে যায় অস্তিত্বের গভীরে। জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪) বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রধান বাঙালি কবি, যিনি বাংলা কবিতায় এক নতুন ধারার সূচনা করেন । “পরস্পর” তাঁর একটি বহুপঠিত কবিতা যা রূপকথা ও বাস্তবের এক অপূর্ব মেলবন্ধন ।
জীবনানন্দ দাশ: নিঃসঙ্গতার কবি
জীবনানন্দ দাশ ১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ ভারতের বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন । তিনি বরিশালের ব্রজমোহন স্কুল থেকে ১৯১৫ সালে প্রবেশিকা এবং ১৯১৭ সালে ব্রজমোহন কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। এরপর কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স নিয়ে ভর্তি হন এবং ১৯২১ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন ।
১৯২২ সালে তিনি কলকাতার সিটি কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন, কিন্তু মাত্র এক বছর পর চাকরি হারান। দীর্ঘ দিন বেকারত্বের পর ১৯২৯ সালে তিনি বরিশালের একটি কলেজে যোগ দেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর তিনি কলকাতায় চলে আসেন [citation:2][citation:3] ।
তাঁর প্রথম কবিতা ১৯১৯ সালে ‘ব্রহ্মবাদী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় । তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ঝরা পালক’ ১৯২৮ সালে প্রকাশিত হয় । তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ (১৯৩৬), ‘বনলতা সেন’ (১৯৪২), ‘মহাপৃথিবী’ (১৯৪৪), ‘সাতটি তারার তিমির’ (১৯৪৮), ‘রূপসী বাংলা’ (১৯৫৭, মরণোত্তর), ‘বেলা অবেলা কালবেলা’ (১৯৬১, মরণোত্তর) [citation:1][citation:4]।
জীবনানন্দ দাশ সম্পর্কে বুদ্ধদেব বসু বলেছেন, “তিনি আমাদের সবচেয়ে নিঃসঙ্গ কবি, সবচেয়ে স্বতন্ত্র” । ১৯৫৪ সালের ২২ অক্টোবর কলকাতায় এক ট্রাম দুর্ঘটনায় তিনি গুরুতর আহত হন এবং কয়েকদিন পর ২২ অক্টোবর মৃত্যুবরণ করেন ।
জীবনানন্দ দাশের কবিতায় সময় ও ইতিহাসের চেতনা
জীবনানন্দের কবিতায় সময় ও ইতিহাসের চেতনা গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে [citation:1]। ‘বনলতা সেন’ কবিতায় তিনি ‘হাজার বছর ধরে’ পথ চলার কথা বলেছেন। ‘পরস্পর’ কবিতায় সেই সময়ের চেতনা আরও গভীর হয়েছে — “মনে প’ড়ে গেল এক রূপকথা ঢের আগেকার” । এই ‘ঢের আগেকার’ বলতে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন প্রাচীন কাল থেকে মানবসভ্যতায় চলতে থাকা রূপকথার ঐতিহ্য ।
তিনি ইতিহাসের নানা চরিত্র ও স্থানের উল্লেখ করেছেন তাঁর কবিতায় — বিম্বিসার, অশোক, বিদর্ভ নগর, সাঁচী, কোনারক [citation:1][citation:3]। ‘পরস্পর’ কবিতায় তিনি ‘নবমী ঝরিয়া গেছে নদীর শিয়রে’ বলে নদীর নাম বলতে পারেন না — “পদ্মা – ভাগীরথী – মেঘ্না – কোন নদী যে সে – / সে সব জানি কি আমি !- হয়তো বা তোমাদের দেশে / সেই নদী আজ আর নাই” । এটি এক অপূর্ব সময়-চেতনার প্রকাশ — নদীও বদলে যায়, সময়ের স্রোতে।
পরস্পর কবিতার বিস্তারিত বিশ্লেষণ
কবিতার শিরোনামের তাৎপর্য
“পরস্পর” শিরোনামটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। পরস্পর মানে একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত। কবিতায় আমরা দেখতে পাই — একের পর এক কবি রূপকথা বলছেন, সবাই শুনছেন। এক ঘুমন্ত মেয়ের রূপকথা, আরেক ঘুমন্ত মেয়ের রূপকথা, উত্তর সাগরের মেয়েদের গল্প, শেষ পর্যন্ত বাস্তবের এক মেয়ের গল্প। এই সব গল্প কি পরস্পর সম্পর্কিত? নাকি তারা একই গল্পের বিভিন্ন রূপ? শিরোনামেই কবি ইঙ্গিত দিয়েছেন — এই কবিতা বিভিন্ন গল্পের মাধ্যমে একই সত্যের অন্বেষণ ।
প্রথম স্তবকের বিশ্লেষণ: রূপকথার সূচনা
“মনে প’ড়ে গেল এক রূপকথা ঢের আগেকার , / কহিলাম,- শোনো তবে ,- / শুনিতে লাগিল সবে, / শুনিল কুমার ; / কহিলাম ,- দেখেছি সে চোখ বুজে আছে, / ঘুমানো সে এক মেয়ে – নিঃসাড় পুরীতে এক পাহাড়ের কাছে ; / সেইখানে আর নাই কেহ ,- / এক ঘরে পালঙ্কের’পরে শুধু এক খানা দেহ / প’ড়ে আছে ;” প্রথম স্তবকে কবি রূপকথা বলতে শুরু করেছেন। তিনি বলেছেন — মনে পড়ে গেল এক রূপকথা অনেক আগেকার। আমি বললাম — শোনো তবে। সবাই শুনতে লাগল, কুমারও শুনল। আমি বললাম — দেখেছি সে চোখ বুজে আছে। ঘুমানো এক মেয়ে — নিঃসাড় পুরীতে এক পাহাড়ের কাছে। সেখানে আর কেউ নেই। এক ঘরে পালঙ্কের ওপর শুধু একখানা দেহ পড়ে আছে ।
‘ঘুমানো সে এক মেয়ে – নিঃসাড় পুরীতে এক পাহাড়ের কাছে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
ঘুমন্ত মেয়ে এখানে সুপ্ত সৌন্দর্যের, অপ্রাপ্ত প্রেমের প্রতীক। নিঃসাড় পুরী — জনমানবহীন শহর। পাহাড়ের কাছে — প্রকৃতির কোলে। এই মেয়ে প্রকৃতির অংশ, কিন্তু চিরঘুমে আচ্ছন্ন ।
দ্বিতীয় স্তবকের বিশ্লেষণ: মেয়ের রূপ
“পৃথিবীর পথে- পথে রূপ খুঁজে খুঁজে / তারপর,- তারে আমি দেখেছি গো ,- সেও চোখ বুজে / প’ড়েছিল;- মসৃণ হাতের মতো শাদা হাত দুটি / বুকের উপরে তার রয়েছিল উঠি ! / আসিবে না গতি যেন কোনদিন তাহার দু’পায়ে / পাথরের মতো শাদা গায়ে / এর যেন কোনোদিন ছিল না হৃদয় ,- / কিংবা ছিল – আমার জন্য তা নয় ! / আমি গিয়ে তাই তারে পারিনি জাগাতে , / পাষাণের মতো হাত পাষাণের হাতে / রয়েছে আড়ষ্ট হয়ে লেগে ;” দ্বিতীয় স্তবকে কবি সেই মেয়ের রূপ বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন — পৃথিবীর পথে পথে রূপ খুঁজে খুঁজে তারপর আমি তাকে দেখেছি — সেও চোখ বুজে পড়েছিল। মসৃণ হাতের মতো সাদা হাত দুটি বুকের উপরে উঠে ছিল। যেন তার পায়ে কোনোদিন গতি আসবে না। পাথরের মতো সাদা গায়ে — যেন তার কোনোদিন হৃদয় ছিল না, বা ছিল — কিন্তু আমার জন্য নয়! আমি গিয়ে তাই তাকে জাগাতে পারিনি। পাষাণের মতো হাত পাষাণের হাতে আড়ষ্ট হয়ে লেগে আছে ।
‘পাথরের মতো শাদা গায়ে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
পাথরের মতো শাদা — শুভ্র, নির্মল, কিন্তু প্রাণহীন। এই মেয়ে যেন পাথরের মূর্তি, যার মধ্যে প্রাণ নেই। জীবনানন্দের কবিতায় প্রায়ই পাথর, হাড়, কঙ্কালের উল্লেখ দেখা যায় [citation:3]।
তৃতীয় স্তবকের বিশ্লেষণ: জাগানোর আশা
“توبوও,- হয়তো তবু উঠিবে সে জেগে / তুমি যদি হাত দুটি ধরো গিয়ে তার !- / ফুরালাম রূপকথা , শুনিল কুমার ।” তৃতীয় স্তবকে কবি জাগানোর আশা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন — তবুও, হয়তো তবু উঠবে সে জেগে, তুমি যদি গিয়ে তার হাত দুটি ধরো! শেষ করলাম রূপকথা, কুমার শুনল।
‘তুমি যদি হাত দুটি ধরো গিয়ে তার’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
প্রেমের স্পর্শেই এই মেয়ে জেগে উঠতে পারে। কিন্তু সেই স্পর্শ দেওয়ার মতো কেউ ছিল না। রূপকথা শেষ হলেও কুমার শুধু শুনলেন, কিছু করলেন না ।
চতুর্থ স্তবকের বিশ্লেষণ: কুমারের গল্প
“তারপর, কহিল কুমার, / আমিও দেখেছি তারে,- বসন্তসেনার ! / মতো সেইজন নয় ,- কিংবা হবে তাই ,- / ঘুমন্ত দেশের সে-ও বসন্তসেনাই ! / মনে পড়ে ,- শোনো ,- মনে পড়ে / নবমী ঝরিয়া গেছে নদীর শিয়রে ,- / ( পদ্মা – ভাগীরথী – মেঘ্না – কোন নদী যে সে – / সে সব জানি কি আমি !- হয়তো বা তোমাদের দেশে / সেই নদী আজ আর নাই ,- / আমি তবু তার পাড়ে আজো তো দাঁড়াই ! ) / সেদিন তারার আলো – আর নিবু নিবু জ্যোৎস্নায় / পথ দেখে , যেইখানে নদী ভেসে যায় / কান দিয়ে তার শব্দ শুনে , / দাঁড়ায়েছিলাম গিয়ে মাঘরাতে ,- কিংবা ফালগুনে । / দেশ ছেড়ে শীত যায় চ’লে / সে সময় – প্রথম দখিনে এসে পড়িতেছে ব’লে / রাতারাতি ঘুম ফেঁসে যায়, / আমারো চোখের ঘুম খসেছিল হায়,- / বসন্তের দেশে / জীবনের – যৌবনের ;- আমি জেগে,- ঘুমন্ত শুয়ে সে ! / জমানো ফেনার মতো দেখা গেল তারে / নদীর কিনারে ! / হাতির দাঁতের গড়া মূর্তির মতন / শুয়ে আছে ,- শুয়ে আছে শাদা হাতে ধবধবে স্তন / রেখেছে সে ঢেকে !” চতুর্থ স্তবকে কুমার তাঁর দেখা মেয়ের গল্প বলছেন। তিনি বলেছেন — আমি তাকে দেখেছি, বসন্তসেনার মতো! হয়তো সেইজন নয়, কিংবা তাই হবে — ঘুমন্ত দেশের সে-ও বসন্তসেনাই। মনে পড়ে, শোনো, মনে পড়ে — নবমী নদীর কিনারে ঝরে গেছে। পদ্মা-ভাগীরথী-মেঘ্না — কোন নদী যে সে? আমি কি জানি! হয়তো তোমাদের দেশে সেই নদী আজ আর নেই — আমি তবু তার পাড়ে আজও দাঁড়াই! সেদিন তারার আলো আর নিবু নিবু জোছনায় পথ দেখে, যেখানে নদী ভেসে যায়, কান দিয়ে তার শব্দ শুনে, দাঁড়িয়েছিলাম গিয়ে মাঘরাতে, কিংবা ফাল্গুনে। দেশ ছেড়ে শীত যায় চলে — সে সময়, প্রথম দখিনা এসে পড়েছে বলে রাতারাতি ঘুম ভেঙে যায়। আমারও চোখের ঘুম খসেছিল হায় — বসন্তের দেশে, জীবনের, যৌবনের। আমি জেগে, ঘুমন্ত শুয়ে সে! জমানো ফেনার মতো দেখা গেল তাকে নদীর কিনারে! হাতির দাঁতের গড়া মূর্তির মতো শুয়ে আছে, শুয়ে আছে, সাদা হাতে ধবধবে স্তন রেখেছে সে ঢেকে ।
‘বসন্তসেনা’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
বসন্তসেনা প্রাচীন ভারতের এক বিখ্যাত নারীচরিত্র। কুমার তাঁর দেখা মেয়েকে বসন্তসেনার সাথে তুলনা করেছেন। কিন্তু তিনি দ্বিধায় আছেন — হয়তো সেইজন নয়, কিংবা তাই হবে। এই দ্বিধা জীবনানন্দের কবিতার এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য [citation:1]।
‘পদ্মা – ভাগীরথী – মেঘ্না – কোন নদী যে সে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
নদীর নাম মনে করতে না পারা — সময়ের প্রবাহে সবকিছু বদলে যায়। নদীও বদলে যায়, তার নামও বদলে যায়। কিন্তু কবি তবু তার পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। এটি এক অসাধারণ সময়-চেতনার প্রকাশ [citation:1][citation:2]।
পঞ্চম স্তবকের বিশ্লেষণ: উত্তর সাগরের রূপকথা
“কুমারের শেষ হলে পরে ,- / আর এক দেশের এক রূপকথা বলিল আর একজন , / কহিল সে ,- উত্তর সাগরে / আর নাই কেউ !- / জ্যোৎস্না আর সাগরের ঢেউ / উঁচুনিচু পাথরের’পরে / হাতে হাত ধ’রে / সেইখানে ; কখন জেগেছে তারা – তারপর ঘুমাল কখন ! / ফেনার মতন তারা ঠাণ্ডা – শাদা,- / আর তারা ঢেউয়ের মতন / জড়ায়ে জড়ায়ে যায় সাগরের জলে ! / ঢেউয়ের মতন তারা ঢলে ! / সেই জল মেয়েদের স্তন / ঠাণ্ডা, – শাদা, – বরফের কুঁচির মতন ! / তাহাদের মুখ চোখ ভিজে ,- / ফেনার শেমিজে / তাহাদের শরীর পিছল ! / কাচের গুঁড়ির মতো শিশিরের জল / চাঁদের বুকের থেকে ঝরে / উত্তর সাগরে ! / পায়ে- চলা পথ ছেড়ে ভাসে তারা সাগরের গায়ে ,- / কাঁকরের রক্ত কই তাহাদের পায়ে ! / রূপার মতন চুল তাহাদের ঝিকমিক করে / উত্তর সাগরে ! / বরফের কুঁচির মতন / সেই জল- মেয়েদের স্তন ! / মুখ বুক ভিজে, / ফেনার শেমিজে / শরীর পিছল ! / কাচের গুঁড়ির মতো শিশিরের জল / চাঁদের বুকের থেকে ঝরে / উত্তর সাগরে ! / উত্তর সাগরে !” পঞ্চম স্তবকে আরেকজন উত্তর সাগরের রূপকথা বলছেন। তিনি বলেছেন — উত্তর সাগরে আর কেউ নেই। জ্যোৎস্না আর সাগরের ঢেউ, উঁচুনিচু পাথরের ওপর হাতে হাত ধরে সেইখানে। কখন জেগেছে তারা, তারপর ঘুমাল কখন! ফেনার মতো তারা ঠাণ্ডা, সাদা। আর তারা ঢেউয়ের মতো জড়িয়ে জড়িয়ে যায় সাগরের জলে। ঢেউয়ের মতো তারা ঢলে। সেই জল মেয়েদের স্তন — ঠাণ্ডা, সাদা, বরফের কুঁচির মতো। তাদের মুখ-চোখ ভিজে। ফেনার শেমিজে তাদের শরীর পিছল। কাচের গুঁড়ির মতো শিশিরের জল চাঁদের বুক থেকে ঝরে উত্তর সাগরে। পায়ে-চলা পথ ছেড়ে ভাসে তারা সাগরের গায়ে — কাঁকরের রক্ত কোথায় তাদের পায়ে? রূপার মতো চুল তাদের ঝিকমিক করে উত্তর সাগরে। বরফের কুঁচির মতো সেই জল-মেয়েদের স্তন। মুখ-বুক ভিজে, ফেনার শেমিজে শরীর পিছল। কাচের গুঁড়ির মতো শিশিরের জল চাঁদের বুক থেকে ঝরে উত্তর সাগরে, উত্তর সাগরে !
‘উত্তর সাগরে আর নাই কেউ’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর সাগরের এই নির্জন দৃশ্য — যেখানে শুধু জ্যোৎস্না আর ঢেউ, পাথর আর ফেনা। এই মেয়েরা জলের, ফেনার, ঢেউয়ের অংশ। তাদের পায়ে কাঁকরের রক্ত নেই — তারা সম্পূর্ণ নির্মল, কিন্তু প্রাণহীন।
পুনরাবৃত্তির তাৎপর্য
‘উত্তর সাগরে’ শব্দগুচ্ছের বারবার পুনরাবৃত্তি এক মন্ত্রমুগ্ধকর পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। এই মেয়েদের বর্ণনাও বারবার ফিরে এসেছে — তাদের স্তন, তাদের মুখ, তাদের শরীর — যেন এক সম্মোহনী আবেশে কবি আটকে গেছেন ।
ষষ্ঠ স্তবকের বিশ্লেষণ: নতুন কবির আগমন
“সবাই থামিলে পরে মনে হল – একদিন আমি যাবো চ’লে / কল্পনার গল্প সব ব’লে / তারপর ,- শীত-হেমন্তের শেষে বসন্তের দিন / আবার তো এসে যাবে ; / এক কবি ,- তন্ময় , শৌখিন ,- / আবার তো জন্ম নেবে তোমাদের দেশে ! / আমরা সাধিয়া গেছি যার কথা ,- পরীর মতন এক ঘুমোনো মেয়ে সে / হীরের ছুরির মতো গায়ে / আরো ধার লবে সে শানায়ে ! / সেই দিনও তার কাছে হয়তো রবে না আর কেউ ,- / মেঘের মতন চুল ; তার সে চুলের ঢেউ / এমনি পড়িয়া রবে পালঙ্কের’পর ,- / ধূপের ধোঁয়ার মতো ধলা সেই পুরীর ভিতর ! / চারপাশে তার / রাজ – যুবরাজ – জেতা – যোদ্ধাদের হাড় / গড়েছে পাহাড় ! / এ রূপকথার এই রূপসীর ছবি / তুমিও দেখিবে এসে ,- / তুমিও দেখিবে এসে কবি ! / পাথরের হাতে তার রাখিবে তো হাত ,- / শরীরে ননীর ছিরি ,- ছুঁয়ে দেখো – চোখা ছুরি ,- ধারালো হাতির দাঁত ! / হাড়েরই কাঠামো শুধু ,- তার মাঝে কোনোদিন হৃদয় মমতা / ছিল কই ! – توبو , সে কি জেগে যাবে ? কবে সে কি কথা / তোমার রক্তের তাপ পেয়ে ?- / আমার কথার এই মেয়ে ,-এই মেয়ে !” ষষ্ঠ স্তবকে কবি নতুন কবির আগমন ও সেই ঘুমন্ত মেয়ের কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন — সবাই থামার পর মনে হল — একদিন আমি চলে যাব, কল্পনার গল্প সব বলে। তারপর শীত-হেমন্তের শেষে বসন্তের দিন আবার তো আসবে। এক কবি — তন্ময়, শৌখিন — আবার তো জন্ম নেবে তোমাদের দেশে। আমরা সাধনা করে এসেছি যার কথা — পরীর মতো এক ঘুমন্ত মেয়ে সে। হীরের ছুরির মতো গায়ে আরও ধার লবে সে শান দিয়ে। সেই দিনও তার কাছে হয়তো আর কেউ থাকবে না। মেঘের মতো চুল, তার সে চুলের ঢেউ এমনি পড়ে থাকবে পালঙ্কের ওপর। ধূপের ধোঁয়ার মতো ধলা সেই পুরীর ভিতর। চারপাশে তার রাজা-যুবরাজ-জেতা-যোদ্ধাদের হাড় গড়েছে পাহাড়! এই রূপকথার এই রূপসীর ছবি তুমিও দেখবে এসে, তুমিও দেখবে এসে কবি! পাথরের হাতে তার রাখবে তো হাত — শরীরে ননীর ছিরি — ছুঁয়ে দেখো — চোখা ছুরি — ধারালো হাতির দাঁত! হাড়েরই কাঠামো শুধু, তার মাঝে কোনোদিন হৃদয়-মমতা ছিল কোথায়! তবু, সে কি জেগে যাবে? কবে সে কি কথা তোমার রক্তের তাপ পেয়ে? আমার কথার এই মেয়ে — এই মেয়ে!
‘হীরের ছুরির মতো গায়ে আরো ধার লবে সে শানায়ে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
হীরের ছুরি যেমন ধারালো, তেমনি এই মেয়ের সৌন্দর্য ধারালো, যা কেটে বসে। কিন্তু সেই ধার আরও বাড়বে — নতুন কবির কল্পনায়। এটি সৃষ্টির চিরন্তন প্রক্রিয়ার প্রতীক [citation:1]।
‘রাজ – যুবরাজ – জেতা – যোদ্ধাদের হাড় গড়েছে পাহাড়’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
ক্ষমতাশালীদের হাড় পাহাড় হয়ে গেছে — সময় তাদের গ্রাস করেছে। কিন্তু এই ঘুমন্ত মেয়ে এখনও আছে, এখনও ঘুমিয়ে আছে। এটি মৃত্যু ও অমরত্বের এক অসাধারণ দ্বন্দ্ব [citation:3]।
সপ্তম স্তবকের বিশ্লেষণ: বাস্তবের মেয়ে
“কে যেন উঠিল ব’লে,- তোমরা তো বলো রূপকথা,- / তেপান্তরের গল্প সব ,- ওর কিছু আছে নিশ্চয়তা ! / হয়তো অমনি হবে,- দেখিনিকো তাহা ; / কিন্তু , শোনো –স্বপ্ন নয় , আমাদেরি দেশে কবে আহা !- / যেখানে মায়াবী নাই ,- জাদু নাই কোনো ,- / এ দেশের- গাল নয়, গল্প নয় , দু’একটা শাদা কথা শোনো ! / সে-ও এক রোদে লাল দিন , / রোদে লাল -, সবজীর গানে গানে সবুজ স্বাধীন / একদিন,- সেই একদিন ! / ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিল চোখে , / ছেঁড়া করবীর মত মেঘের আলোকে / চেয়ে দেখি রূপসী কে প’ড়ে আছে খাটের উপরে ! / মায়াবীর ঘরে / ঘুমন্ত কন্যার কথা শুনেছি অনেক আমি , দেখিলাম তবু চেয়ে চেয়ে / এ ঘুমোনো মেয়ে / পৃথিবীর ,- মানুষের দেশের মতন; / রূপ ঝ’রে যায় ,- তবু করে যারা সৌন্দর্যের মিছা আয়োজন ,- / যে যৌবন ছিঁড়েফেরে যায়, / যারা ভয় পায় / আয়নায় তার ছবি দেখে !- / শরীরের ঘুণ রাখে ঢেকে , / ব্যর্থতা লুকায়ে রাখে বুকে, / দিন যাহাদের অসাধে ,- অসুখে !- / দেখিতেছিলাম সেই সুন্দরীর মুখ , / চোখে ঠোঁটে অসুবিধা ,- ভিতরে অসুখ ! / কে যেন নিতেছে তারে খেয়ে !- / এ ঘুমোনো মেয়ে / পৃথিবীর ,- ফোঁপরার মতো ক’রে এরে লয় শুষে / দেবতা গন্ধর্ব নাগ পশু ও মানুষে !…” সপ্তম স্তবকে একজন বাস্তবের মেয়ের গল্প বলছেন। তিনি বলেছেন — কে যেন উঠে বললে — তোমরা তো বলো রূপকথা, তেপান্তরের গল্প সব। ওর কিছু আছে নিশ্চয়তা! হয়তো অমনি হবে, দেখিনি তাহা। কিন্তু শোনো — স্বপ্ন নয়, আমাদের দেশে কবে আহা! যেখানে মায়াবী নেই, জাদু নেই কোনো — এ দেশের, গাল নয়, গল্প নয়, দু-একটা সাদা কথা শোনো। সে-ও এক রোদে লাল দিন, রোদে লাল — সবজির গানে গানে সবুজ স্বাধীন একদিন — সেই একদিন! ঘুম ভেঙে গিয়েছিল চোখে, ছেঁড়া করবীর মতো মেঘের আলোকে চেয়ে দেখি রূপসী কে পড়ে আছে খাটের উপরে! মায়াবীর ঘরে ঘুমন্ত কন্যার কথা শুনেছি অনেক আমি, দেখিলাম তবু চেয়ে চেয়ে — এ ঘুমন্ত মেয়ে পৃথিবীর, মানুষের দেশের মতো। রূপ ঝরে যায়, তবু করে যারা সৌন্দর্যের মিছা আয়োজন — যে যৌবন ছিঁড়ে ফিরে যায়, যারা ভয় পায় আয়নায় তার ছবি দেখে! শরীরের ঘুণ রাখে ঢেকে, ব্যর্থতা লুকায়ে রাখে বুকে, দিন যাহাদের অসাধে, অসুখে! দেখিতেছিলাম সেই সুন্দরীর মুখ, চোখে-ঠোঁটে অসুবিধা, ভিতরে অসুখ! কে যেন নিতেছে তারে খেয়ে! এ ঘুমন্ত মেয়ে পৃথিবীর — ফোঁপরার মতো করে তাকে লয় শুষে দেবতা, গন্ধর্ব, নাগ, পশু ও মানুষে!
‘দেবতা গন্ধর্ব নাগ পশু ও মানুষে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
এই বাস্তবের মেয়েকে সবাই শুষে নিচ্ছে — দেবতা, গন্ধর্ব, নাগ, পশু ও মানুষ। অর্থাৎ তার সৌন্দর্য, তার যৌবন, তার অস্তিত্ব সবাই ভোগ করছে, কেড়ে নিচ্ছে। এটি এক নিষ্ঠুর বাস্তবতার চিত্র [citation:3]।
অষ্টম স্তবকের বিশ্লেষণ: সৌন্দর্য-তান্ত্রিকের কথা
“সবাই উঠিল ব’লে ,- ঠিক –ঠিক –ঠিক ! / আবার বলিল সেই সৌন্দর্য- তান্ত্রিক,- / আমায় বলেছে সে কি শোনো ,- / আর এক জন এই ,- / পরী নয় ,- মানুষ ও সে হয়নি এখনো ,- / বলেছে সে – কাল সাঁঝরাতে / আবার তোমার সাথে / দেখা হবে ? – আসিবে তো ?- তুমি আসিবে তো ! / দেখা যদি পেত ! / নিকটে বসায়ে / কালো খোঁপা ফেলিত খসায়ে ,- / কি কথা বলিতে গিয়ে থেমে যেত শেষে / ফিক ক’রে হেসে ! / তবু , আরো কথা / বলিতে আসিত ,- توبو, সব প্রগলভতা / থেমে যেত ! / খোঁপা বেঁধে ,- ফের খোঁপা ফেলিত খসায়ে,- / স’রে যেত , দেয়ালের গায়ে / রহিত দাঁড়ায়ে ! / রাত ঢের , – বাড়িবে আরো কি / এই রাত!- বেড়ে যায় , তবু চোখাচোখি / হয় নাই দেখা / আমাদের দুজনার !- দুইজন ,- একা !- / বার-বার চোখ توبو কেন ওর ভ’রে আসে জলে ! / কেন বা এমন ক’রে বলে, / কাল সাঁঝরাতে / আবার তোমার সাথে / দেখা হবে !- আসিবে তো?- তুমি আসিবে তো !- / আমি না কাঁদিতে কাঁদে , দেখা যদি পেত !…” অষ্টম স্তবকে সৌন্দর্য-তান্ত্রিকের কথা বলা হয়েছে। তিনি বলেছেন — সবাই উঠে বললে — ঠিক-ঠিক-ঠিক! আবার বলল সেই সৌন্দর্য-তান্ত্রিক — আমাকে বলেছে সে কী শোনো — আর এক জন এই — পরী নয়, মানুষ ও সে হয়নি এখনো — বলেছে সে — কাল সাঁঝরাতে আবার তোমার সাথে দেখা হবে? আসিবে তো? তুমি আসিবে তো! দেখা যদি পেত! কাছে বসিয়ে কালো খোঁপা ফেলিত খসায়ে — কী কথা বলতে গিয়ে থেমে যেত শেষে ফিক করে হেসে! তবু আরও কথা বলিতে আসিত, তবু সব প্রগলভতা থেমে যেত! খোঁপা বেঁধে, ফের খোঁপা ফেলিত খসায়ে — সরে যেত, দেয়ালের গায়ে রহিত দাঁড়ায়ে! রাত ঢের — বাড়িবে আরো কি এই রাত! বেড়ে যায়, তবু চোখাচোখি হয় নাই দেখা আমাদের দুজনের! দুইজন, একা! বারবার চোখ তবু কেন ওর ভরে আসে জলে! কেন বা এমন করে বলে, কাল সাঁঝরাতে আবার তোমার সাথে দেখা হবে! আসিবে তো? তুমি আসিবে তো! আমি না কাঁদিতে কাঁদিতে, দেখা যদি পেত!
‘পরী নয় ,- মানুষ ও সে হয়নি এখনো’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
এই মেয়েটি পরী নয়, আবার মানুষও হয়নি এখনো — অর্থাৎ সে এক সন্ধিক্ষণে আছে। সে মানুষ হতে চায়, কিন্তু হতে পারছে না। এটি অস্তিত্বের এক গভীর সংকটের চিত্র [citation:1][citation:3]।
নবম স্তবকের বিশ্লেষণ: শেষ দেখা
“দেখা দিয়ে বলিলাম , ‘ কে গো তুমি ?’- বলিল সে , ‘ তোমার بکول , / মনে আছে ?’- ‘ এগুলি কি , বাসি চাঁপাফুল ? / হ্যাঁ , হ্যাঁ , মনে আছে ;’ – ‘ভালোবাসো ?’ –হাসি পেল, – হাসি ! / ‘ ফুলগুলো বাসি নয় ,- আমি শুধু বাসি !’ / আঁচলের খুঁট দিয়ে চোখ মুছে ফেলে / নিবানো মাটির বাতি জ্বেলে / চ’লে এল কাছে ,- / জটার মতন খোঁপা অন্ধকারে খসিয়া গিয়াছে – / আজো এত চুল ! / চেয়ে দেখি ,- দুটো হাত, ক’খানা আঙুল / একবার চুপে তুলে ধরি ; / চোখ দুটো চুন-চুন ,- মুখ খড়ি-খড়ি! / থুতনিতে হাত দিয়ে توبو চেয়ে দেখি ,- / সব বাসি ,সব বাসি , একেবারে মেকি !” নবম স্তবকে শেষ দেখা ও সত্য উপলব্ধির কথা বলা হয়েছে। তিনি বলেছেন — দেখা দিয়ে বললাম, ‘কে গো তুমি?’ — বললে সে, ‘তোমার বকুল, মনে আছে?’ — ‘এগুলি কি, বাসি চাঁপাফুল? হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে আছে।’ — ‘ভালোবাসো?’ — হাসি পেল, হাসি! ‘ফুলগুলো বাসি নয়, আমি শুধু বাসি!’ আঁচলের খুঁট দিয়ে চোখ মুছে ফেলে, নিবানো মাটির বাতি জ্বেলে চলে এল কাছে — জটার মতো খোঁপা অন্ধকারে খসে গিয়াছে — আজও এত চুল! চেয়ে দেখি — দুটো হাত, কখানা আঙুল একবার চুপে তুলে ধরি; চোখ দুটো চুন-চুন, মুখ খড়ি-খড়ি! থুতনিতে হাত দিয়ে তবু চেয়ে দেখি — সব বাসি, সব বাসি, একেবারে মেকি !
‘সব বাসি ,সব বাসি , একেবারে মেকি’ — শেষ পঙ্ক্তির তাৎপর্য
এটি কবিতার চূড়ান্ত বাণী। এই মেয়ে, যাকে এত রূপকথায় দেখা গেছে, শেষ পর্যন্ত বাসি ও মেকি হয়ে গেছে। সময়ের স্রোতে সবকিছু বাসি হয়ে যায়, মেকি হয়ে যায়। কিন্তু তবুও কবি চেয়ে দেখেন — এই উপলব্ধিও প্রেমেরই অংশ [citation:1][citation:3]।
কবিতার গঠনশৈলী ও শিল্পরূপ
কবিতাটি নয়টি স্তবকে বিভক্ত। প্রথম স্তবকে রূপকথার সূচনা, দ্বিতীয় স্তবকে ঘুমন্ত মেয়ের রূপ, তৃতীয় স্তবকে জাগানোর আশা, চতুর্থ স্তবকে কুমারের গল্প, পঞ্চম স্তবকে উত্তর সাগরের রূপকথা, ষষ্ঠ স্তবকে নতুন কবির আগমন, সপ্তম স্তবকে বাস্তবের মেয়ে, অষ্টম স্তবকে সৌন্দর্য-তান্ত্রিকের কথা, নবম স্তবকে শেষ দেখা — এই ক্রমিক কাঠামো কবিতাটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ আখ্যানের রূপ দিয়েছে। শেষের পঙ্ক্তি ‘সব বাসি, সব বাসি, একেবারে মেকি’ — কবিতাটিকে এক চরম বাস্তবতার স্তরে নিয়ে গেছে।
শব্দচয়ন ও শৈলীগত বিশেষত্ব
জীবনানন্দ দাশের ভাষা সহজ কিন্তু গভীর প্রতীকী। এখানে তিনি ব্যবহার করেছেন — ‘রূপকথা’, ‘কুমার’, ‘নিঃসাড় পুরী’, ‘পালঙ্ক’, ‘পাষাণ’, ‘বসন্তসেনা’, ‘নবমী’, ‘পদ্মা-ভাগীরথী-মেঘ্না’, ‘মাঘরাত’, ‘ফাল্গুন’, ‘জমানো ফেনা’, ‘হাতির দাঁত’, ‘উত্তর সাগর’, ‘জ্যোৎস্না’, ‘ফেনার শেমিজ’, ‘কাচের গুঁড়ি’, ‘শিশিরের জল’, ‘চাঁদের বুক’, ‘রূপার চুল’, ‘বরফের কুঁচি’, ‘হীরের ছুরি’, ‘ধূপের ধোঁয়া’, ‘পাথরের হাত’, ‘হাড়ের কাঠামো’, ‘রক্তের তাপ’, ‘সৌন্দর্য-তান্ত্রিক’, ‘প্রগলভতা’, ‘বাসি চাঁপাফুল’, ‘চুন-চুন চোখ’, ‘খড়ি-খড়ি মুখ’, ‘মেকি’।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য
“পরস্পর” কবিতাটি জীবনানন্দ দাশের এক অসাধারণ সৃষ্টি। কবি প্রথমে এক রূপকথা বলেছেন — ঘুমন্ত এক মেয়ে, পাহাড়ের কাছে নিঃসাড় পুরীতে। তাকে জাগানোর জন্য প্রয়োজন ভালোবাসার স্পর্শ। তারপর কুমার বললেন তাঁর দেখা মেয়ের গল্প — নদীর কিনারে জমানো ফেনার মতো, হাতির দাঁতের মূর্তির মতো শুয়ে আছে। তারপর আরেকজন বললেন উত্তর সাগরের গল্প — জলের মেয়েরা, ফেনার শেমিজে পিছল শরীর, বরফের কুঁচির মতো স্তন। তারপর কবি বললেন — নতুন কবি আসবে, আবার সেই মেয়েকে দেখবে। তারপর একজন বললেন বাস্তবের এক মেয়ের গল্প — মানুষের দেশের মতো, কিন্তু যাকে দেবতা-গন্ধর্ব-নাগ-পশু-মানুষ শুষে নিচ্ছে। তারপর সৌন্দর্য-তান্ত্রিক বললেন — সেই মেয়ে পরী নয়, মানুষও হয়নি এখনো। শেষে দেখা দিয়ে কবি বুঝলেন — সব বাসি, সব বাসি, একেবারে মেকি।
এই কবিতা আমাদের শেখায় — রূপকথা আর বাস্তবের সীমারেখা কত ধূসর। একই মেয়ের কত রূপ — ঘুমন্ত, জেগে ওঠা, জলের, বাস্তবের, শেষ পর্যন্ত বাসি ও মেকি। কিন্তু এই সব রূপই পরস্পর সম্পর্কিত — যেমন শিরোনাম।
ট্যাগস: পরস্পর, জীবনানন্দ দাশ, জীবনানন্দ দাশের কবিতা, পরস্পর কবিতা জীবনানন্দ দাশ, আধুনিক বাংলা কবিতা, রূপকথার কবিতা, প্রেমের কবিতা, ঘুমন্ত মেয়ের কবিতা
© Kobitarkhata.com – কবি: জীবনানন্দ দাশ | কবিতার প্রথম লাইন: “মনে প’ড়ে গেল এক রূপকথা ঢের আগেকার , / কহিলাম,- শোনো তবে ,- / শুনিতে লাগিল সবে, / শুনিল কুমার ;” | বাংলা রূপকথার কবিতা বিশ্লেষণ