কবিতার খাতা
- 29 mins
দুজন – জীবনানন্দ দাশ।
আমাকে খোঁজো না তুমি বহুদিন-
কতদিন আমিও তোমাকে
খুঁজি নাকো;- এক নক্ষত্রের নিচে তবু-
একই আলো পৃথিবীর পারে
আমরা দুজনে আছি; পৃথিবীর পুরনো পথের রেখা হয়ে যায় ক্ষয়,
প্রেম ধীরে মুছে যায়, নক্ষত্রেরও একদিন মরে যেতে হয়,
হয় নাকি?’- বলে সে তাকাল তার সঙ্গিনীর দিকে;
আজ এই মাঠ সূর্য সহধর্মী অঘ্রাণ কার্তিকে
প্রাণ তার ভরে গেছে।
দুজনে আজকে তারা চিরস্থায়ী পৃথিবী ও আকাশের পাশে
আবার প্রথম এল-মনে হয়- যেন কিছু চেয়ে-কিছু একান্ত বিশ্বাসে।
লালচে হলদে পাতা অনুষঙ্গে জাম বট অশ্বত্থের শাখার ভিতরে
অন্ধকারে নড়ে- চড়ে ঘাসের উপর ঝরে পড়ে;
তারপর সান্ত্বনায় থাকে চিরকাল;
যেখানে আকাশে খুব নীরবতা,শান্তি খুব আছে,
হৃদয়ে প্রেমের গল্প শেষ হলে ক্রমে ক্রমে যেখানে মানুষ
আশ্বাস খুঁজেছে এসে সময়ের দায়ভাগী নক্ষত্রের কাছে:
সেই ব্যাপ্ত প্রান্তরে দুজন; চারিদিকে ঝাউ আম নিম নাগেশ্বরে
হেমন্ত আসিয়া গেছে;-চিলের সোনালি ডানা হয়েছে খয়েরী;
ঘুঘুর পালক যেন ঝরে গেছে- শালিকের নেই আর দেরি,
হলুদ কঠিন ঠ্যাং উঁচু করে ঘুমাবে সে শিশিরের জলে;
ঝরিছে মরিছে সব এই খানে বিদায় নিতেছে ব্যাপ্ত নিয়মের ফলে।
নারী তার সঙ্গীকে : ‘পৃথিবীর পুরনো পথের রেখা হয়ে যায় ক্ষয়,
জানি আমি; — তারপর আমাদের দুঃস্থ হৃদয়
কী নিয়ে থাকিবে বলো; — একদিন হৃদয়ে আঘাত ঢের দিয়েছে চেতনা,
তারপর ঝরে গেছে; আজ তবু মনে হয় যদি ঝরিত না
হৃদয়ে প্রেমের শীর্ষ আমাদের — প্রেমের অপূর্ব শিশু আরক্ত বাসনা
ফুরোত না যদি, আহা, আমাদের হৃদয়ের থেকে–’
এই বলে ম্রিয়মাণ আঁচলের সর্বস্বতা দিয়ে মুখ ঢেকে
উদ্বেল কাশের বনে দাঁড়িয়ে রইল হাঁটুভর।
হলুদ রঙের শাড়ি, চোরকাঁটা বিঁধে আছে, এলোমেলো অঘ্রাণের খড়
চারিদিকে শূন্য হতে ভেসে এসে ছুঁয়ে ছেনে যেতেছে শরীর;
চুলের উপর তার কুয়াশা রেখেছে হাত, ঝরিছে শিশির;–
প্রেমিকের মনে হল : ‘এই নারী-অপরূপ-খুঁজে পাবে নক্ষত্রের তীরে
যেখানে রব না আমি, রবে না মাধুরী এই, রবে না হতাশা,
কুয়াশা রবে না আর — জনিত বাসনা নিজে — বাসনার মতো ভালোবাসা
খুঁজে নেবে অমৃতের হরিণীর ভিড় থেকে ইপ্সিতেরে তার।’
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। জীবনানন্দ দাশ।
দুজন – জীবনানন্দ দাশ | দুজন কবিতা | জীবনানন্দ দাশের কবিতা | বাংলা কবিতা
দুজন: জীবনানন্দ দাশের প্রেম, সময় ও অস্তিত্বের অসাধারণ কাব্যভাষা
জীবনানন্দ দাশের “দুজন” কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের একটি অনন্য সৃষ্টি, যা প্রেম, সময়, মৃত্যু ও অস্তিত্বের এক গভীর দার্শনিক অন্বেষণ। “আমাকে খোঁজো না তুমি বহুদিন- / কতদিন আমিও তোমাকে / খুঁজি নাকো;- এক নক্ষত্রের নিচে তবু- / একই আলো পৃথিবীর পারে / আমরা দুজনে আছি” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে এক গভীর সম্পর্কের কথা, যেখানে দুজন মানুষ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে থাকলেও একই নক্ষত্রের নিচে বাস করেন। জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪) বাংলা কবিতার এক কিংবদন্তি কবি, যিনি ‘রূপসী বাংলার কবি’ নামে সমধিক পরিচিত। তাঁর কবিতায় প্রকৃতি, নিসর্গ, জীবন-মৃত্যু, সময় ও ইতিহাসচেতনার গভীর প্রকাশ ঘটে। “দুজন” তাঁর একটি শ্রেষ্ঠ কবিতা যা প্রেম ও সময়ের চিরন্তন সত্যকে অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।
জীবনানন্দ দাশ: রূপসী বাংলার কবি
জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪) বাংলা কবিতার এক কিংবদন্তি কবি, যিনি ‘রূপসী বাংলার কবি’ নামে সমধিক পরিচিত। তিনি ১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সত্যানন্দ দাশগুপ্ত ছিলেন একজন শিক্ষক ও সমাজসেবক, মাতা কুসুমকুমারী দাশ ছিলেন একজন কবি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে এম.এ. করার পর তিনি দীর্ঘদিন অধ্যাপনা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। তিনি কলকাতার সিটি কলেজ, বরিশালের বিএম কলেজ, দিল্লির রামজস কলেজ প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনা করেছেন। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ঝরাপালক’ (১৯২৭) তাঁকে খ্যাতি এনে দেয়। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’, ‘বনলতা সেন’, ‘মহাপৃথিবী’, ‘রূপসী বাংলা’, ‘বেলা অবেলা কালবেলা’, ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ প্রভৃতি। তাঁর কবিতায় প্রকৃতি, নিসর্গ, জীবন-মৃত্যু, সময় ও ইতিহাসচেতনার গভীর প্রকাশ ঘটে। তিনি ১৯৫৪ সালের ২২ অক্টোবর কলকাতায় একটি ট্রাম দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেন। “দুজন” তাঁর একটি বহুপঠিত কবিতা যা প্রেম ও সময়ের চিরন্তন সত্যকে অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।
দুজন কবিতার বিস্তারিত বিশ্লেষণ
কবিতার শিরোনামের তাৎপর্য
“দুজন” শিরোনামটি অত্যন্ত সরল অথচ গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। দুজন — দুই মানুষ, দুই প্রেমিক, দুই আত্মা। এই দুজন হয়তো পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে, কিন্তু একই নক্ষত্রের নিচে বাস করেন। শিরোনামেই কবি ইঙ্গিত দিয়েছেন — এই কবিতা সম্পর্কের, মিলনের, বিচ্ছেদের ও চিরন্তনতার কথা বলে।
প্রথম স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“আমাকে খোঁজো না তুমি বহুদিন- / কতদিন আমিও তোমাকে / খুঁজি নাকো;- এক নক্ষত্রের নিচে তবু- / একই আলো পৃথিবীর পারে / আমরা দুজনে আছি; পৃথিবীর পুরনো পথের রেখা হয়ে যায় ক্ষয়, / প্রেম ধীরে মুছে যায়, নক্ষত্রেরও একদিন মরে যেতে হয়, / হয় নাকি?’- বলে সে তাকাল তার সঙ্গিনীর দিকে; / আজ এই মাঠ সূর্য সহধর্মী অঘ্রাণ কার্তিকে / প্রাণ তার ভরে গেছে।” প্রথম স্তবকে কবি দুজনের সম্পর্কের বর্তমান অবস্থা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন — আমাকে খুঁজো না তুমি বহুদিন, আমিও তোমাকে খুঁজি না। কিন্তু এক নক্ষত্রের নিচে, একই আলোতে, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে আমরা দুজনে আছি। পৃথিবীর পুরনো পথের রেখা ক্ষয় হয়ে যায়, প্রেম ধীরে মুছে যায়, নক্ষত্রেরও একদিন মরে যেতে হয়। “হয় নাকি?” — বলে সে তাকাল তার সঙ্গিনীর দিকে। আজ এই মাঠ সূর্য সহধর্মী অঘ্রাণ কার্তিকে প্রাণ তার ভরে গেছে।
‘এক নক্ষত্রের নিচে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘এক নক্ষত্রের নিচে’ — একই আকাশের নিচে, একই নিয়তির অধীনে। দুজন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে থাকলেও তারা একই নক্ষত্রের নিচে বাস করেন — অর্থাৎ তাদের ভাগ্য, তাদের নিয়তি একই সূত্রে গ্রথিত।
পৃথিবীর পুরনো পথের রেখা ক্ষয় হওয়ার তাৎপর্য
পৃথিবীর পুরনো পথের রেখা ক্ষয় হয়ে যায় — অর্থাৎ সময়ের সাথে সাথে সব কিছু বদলে যায়, পুরনো চিহ্ন মুছে যায়। প্রেমও ধীরে ধীরে মুছে যায়। এমনকি নক্ষত্রেরও একদিন মরে যেতে হয় — মহাবিশ্বের সব কিছুই ধ্বংসশীল।
‘হয় নাকি?’ — প্রশ্নের তাৎপর্য
প্রেমিক প্রশ্ন করে — হয় নাকি? অর্থাৎ এই সত্যগুলো কি সত্যি? সে তার সঙ্গিনীর দিকে তাকায়, যেন তার কাছ থেকে উত্তর চায়। কিন্তু আজ এই মাঠ সূর্য সহধর্মী অঘ্রাণ কার্তিকে প্রাণ তার ভরে গেছে — অর্থাৎ হয়তো তিনি এই মুহূর্তের সৌন্দর্যে, প্রকৃতির সান্নিধ্যে অভিভূত।
দ্বিতীয় স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“দুজনে আজকে তারা চিরস্থায়ী পৃথিবী ও আকাশের পাশে / আবার প্রথম এল-মনে হয়- যেন কিছু চেয়ে-কিছু একান্ত বিশ্বাসে। / লালচে হলদে পাতা অনুষঙ্গে জাম বট অশ্বত্থের শাখার ভিতরে / অন্ধকারে নড়ে- চড়ে ঘাসের উপর ঝরে পড়ে; / তারপর সান্ত্বনায় থাকে চিরকাল;” দ্বিতীয় স্তবকে কবি দুজনের মিলনের চিত্র এঁকেছেন। তিনি বলেছেন — দুজনে আজকে তারা চিরস্থায়ী পৃথিবী ও আকাশের পাশে আবার প্রথম এল — মনে হয়, যেন কিছু চেয়ে, কিছু একান্ত বিশ্বাসে। লালচে হলদে পাতা অনুষঙ্গে জাম, বট, অশ্বত্থের শাখার ভিতরে অন্ধকারে নড়ে-চড়ে ঘাসের উপর ঝরে পড়ে। তারপর সান্ত্বনায় থাকে চিরকাল।
‘চিরস্থায়ী পৃথিবী ও আকাশের পাশে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
পৃথিবী ও আকাশ চিরস্থায়ী — মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী হলেও প্রকৃতি চিরন্তন। সেই চিরন্তন প্রকৃতির পাশে দুজনে আবার প্রথম এল — অর্থাৎ তারা আবার নতুন করে মিলিত হল, যেন প্রথমবারের মতো।
পাতা ঝরার চিত্রের তাৎপর্য
লালচে হলদে পাতা জাম, বট, অশ্বত্থের শাখা থেকে অন্ধকারে নড়ে-চড়ে ঘাসের উপর ঝরে পড়ে। পাতা ঝরা — শরৎ-হেমন্তের চিহ্ন, জীবনের ক্ষণস্থায়ীত্বের প্রতীক। কিন্তু পাতা ঝরে পড়ার পর সান্ত্বনায় থাকে চিরকাল — অর্থাৎ প্রকৃতি সব কিছু মেনে নেয়, সব কিছুকে সান্ত্বনা দেয়।
তৃতীয় স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“যেখানে আকাশে খুব নীরবতা,শান্তি খুব আছে, / হৃদয়ে প্রেমের গল্প শেষ হলে ক্রমে ক্রমে যেখানে মানুষ / আশ্বাস খুঁজেছে এসে সময়ের দায়ভাগী নক্ষত্রের কাছে: / সেই ব্যাপ্ত প্রান্তরে দুজন; চারিদিকে ঝাউ আম নিম নাগেশ্বরে / হেমন্ত আসিয়া গেছে;-চিলের সোনালি ডানা হয়েছে খয়েরী; / ঘুঘুর পালক যেন ঝরে গেছে- শালিকের নেই আর দেরি, / হলুদ কঠিন ঠ্যাং উঁচু করে ঘুমাবে সে শিশিরের জলে; / ঝরিছে মরিছে সব এই খানে বিদায় নিতেছে ব্যাপ্ত নিয়মের ফলে।” তৃতীয় স্তবকে কবি প্রকৃতির চিত্র এঁকেছেন। তিনি বলেছেন — যেখানে আকাশে খুব নীরবতা, শান্তি আছে, যেখানে হৃদয়ে প্রেমের গল্প শেষ হলে মানুষ আশ্বাস খুঁজেছে সময়ের দায়ভাগী নক্ষত্রের কাছে, সেই ব্যাপ্ত প্রান্তরে দুজন। চারিদিকে ঝাউ, আম, নিম, নাগেশ্বরে হেমন্ত এসে গেছে। চিলের সোনালি ডানা হয়েছে খয়েরী। ঘুঘুর পালক ঝরে গেছে। শালিকের নেই আর দেরি, হলুদ কঠিন ঠ্যাং উঁচু করে ঘুমাবে সে শিশিরের জলে। ঝরছে, মরছে সব — বিদায় নিচ্ছে ব্যাপ্ত নিয়মের ফলে।
প্রকৃতির চিত্রের তাৎপর্য
ঝাউ, আম, নিম, নাগেশ্বর — বাংলার প্রকৃতির গাছ। হেমন্ত এসে গেছে — ফসল তোলার ঋতু, প্রকৃতির ক্রমশ নিষ্প্রাণ হয়ে ওঠার সূচনা। চিলের সোনালি ডানা খয়েরী হয়েছে, ঘুঘুর পালক ঝরে গেছে, শালিক শিশিরের জলে ঘুমাবে — সব কিছুই ম্লান হয়ে যাচ্ছে, ঝরে যাচ্ছে, বিদায় নিচ্ছে।
‘ঝরিছে মরিছে সব’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
প্রকৃতিতে সব কিছু ঝরছে, মরছে — পাতা ঝরছে, পাখির পালক ঝরছে, দিন শেষ হচ্ছে। এটি জীবনের ক্ষণস্থায়ীত্বের প্রতীক। সব কিছুই একদিন শেষ হয়, বিদায় নেয়।
চতুর্থ স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“নারী তার সঙ্গীকে : ‘পৃথিবীর পুরনো পথের রেখা হয়ে যায় ক্ষয়, / জানি আমি; — তারপর আমাদের দুঃস্থ হৃদয় / কী নিয়ে থাকিবে বলো; — একদিন হৃদয়ে আঘাত ঢের দিয়েছে চেতনা, / তারপর ঝরে গেছে; আজ তবু মনে হয় যদি ঝরিত না / হৃদয়ে প্রেমের শীর্ষ আমাদের — প্রেমের অপূর্ব শিশু আরক্ত বাসনা / ফুরোত না যদি, আহা, আমাদের হৃদয়ের থেকে–’ / এই বলে ম্রিয়মাণ আঁচলের সর্বস্বতা দিয়ে মুখ ঢেকে / উদ্বেল কাশের বনে দাঁড়িয়ে রইল হাঁটুভর। / হলুদ রঙের শাড়ি, চোরকাঁটা বিঁধে আছে, এলোমেলো অঘ্রাণের খড় / চারিদিকে শূন্য হতে ভেসে এসে ছুঁয়ে ছেনে যেতেছে শরীর; / চুলের উপর তার কুয়াশা রেখেছে হাত, ঝরিছে শিশির;–” চতুর্থ স্তবকে নারী তাঁর সঙ্গীকে প্রশ্ন করেছেন। তিনি বলেছেন — পৃথিবীর পুরনো পথের রেখা ক্ষয় হয়ে যায়, জানি আমি। তারপর আমাদের দুঃস্থ হৃদয় কী নিয়ে থাকবে বলো? একদিন হৃদয়ে আঘাত ঢের দিয়েছে চেতনা, তারপর ঝরে গেছে। আজ তবু মনে হয় যদি ঝরিত না হৃদয়ে প্রেমের শীর্ষ আমাদের — প্রেমের অপূর্ব শিশু আরক্ত বাসনা ফুরোত না যদি, আহা, আমাদের হৃদয়ের থেকে — এই বলে ম্রিয়মাণ আঁচলের সর্বস্বতা দিয়ে মুখ ঢেকে উদ্বেল কাশের বনে দাঁড়িয়ে রইল হাঁটুভর। হলুদ রঙের শাড়ি, চোরকাঁটা বিঁধে আছে, এলোমেলো অঘ্রাণের খড় চারিদিকে শূন্য হতে ভেসে এসে ছুঁয়ে ছেনে যেতেছে শরীর। চুলের উপর কুয়াশা রেখেছে হাত, ঝরিছে শিশির।
নারীর প্রশ্নের তাৎপর্য
নারীর প্রশ্ন — পৃথিবীর পুরনো পথের রেখা ক্ষয় হয়ে যায়, তারপর আমাদের দুঃস্থ হৃদয় কী নিয়ে থাকবে? প্রেম মুছে গেলে, সময় চলে গেলে, আমাদের হৃদয় কী নিয়ে বাঁচবে? এটি অস্তিত্বের এক গভীর প্রশ্ন।
‘প্রেমের অপূর্ব শিশু আরক্ত বাসনা’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
প্রেমের অপূর্ব শিশু — প্রেমের সন্তান? আরক্ত বাসনা — লাল বাসনা, তীব্র আকাঙ্ক্ষা। তিনি বলেন — যদি প্রেমের সেই শিশু, সেই তীব্র বাসনা না ফুরোত, তাহলে কেমন হতো! কিন্তু সব কিছুই ফুরোয়, শেষ হয়।
কাশের বনে দাঁড়িয়ে থাকার চিত্রের তাৎপর্য
কাশের বন — শরৎ-হেমন্তের প্রতীক। নারী সেই কাশের বনে দাঁড়িয়ে আছেন, মুখ ঢেকে, হাঁটুভর। হলুদ শাড়ি, চোরকাঁটা, অঘ্রাণের খড়, কুয়াশা, শিশির — সব মিলিয়ে এক বিষণ্ণ, নস্টালজিক পরিবেশ।
পঞ্চম স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“প্রেমিকের মনে হল : ‘এই নারী-অপরূপ-খুঁজে পাবে নক্ষত্রের তীরে / যেখানে রব না আমি, রবে না মাধুরী এই, রবে না হতাশা, / কুয়াশা রবে না আর — জনিত বাসনা নিজে — বাসনার মতো ভালোবাসা / খুঁজে নেবে অমৃতের হরিণীর ভিড় থেকে ইপ্সিতেরে তার।’” পঞ্চম স্তবকে প্রেমিকের মনে হল — এই নারী অপরূপ। তিনি খুঁজে পাবেন নক্ষত্রের তীরে, যেখানে আমি থাকব না, মাধুরী থাকবে না, হতাশা থাকবে না, কুয়াশা থাকবে না। জনিত বাসনা নিজে — বাসনার মতো ভালোবাসা খুঁজে নেবে অমৃতের হরিণীর ভিড় থেকে তাঁর ইপ্সিতকে।
প্রেমিকের চিন্তার তাৎপর্য
প্রেমিক মনে করছেন — এই নারী অপরূপ। তিনি নক্ষত্রের তীরে খুঁজে পাবেন তাঁর প্রেমকে, যেখানে তিনি নিজে থাকবেন না। এটি এক ধরনের ত্যাগ, এক ধরনের আশীর্বাদ। তিনি চান তাঁর প্রেমিকা সুখী হোক, এমনকি তিনি না থাকলেও।
‘অমৃতের হরিণীর ভিড়’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
অমৃতের হরিণী — অমৃতের সন্ধানে থাকা হরিণী। হরিণী চঞ্চল, সুন্দর। অমৃতের হরিণীর ভিড় থেকে তিনি তাঁর ইপ্সিতকে খুঁজে নেবেন — অর্থাৎ জীবনের চিরন্তন সুখ, চিরন্তন প্রেম খুঁজে পাবেন।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য
“দুজন” কবিতাটি প্রেম, সময় ও অস্তিত্বের এক অসাধারণ দার্শনিক অন্বেষণ। কবি শুরুতে দুজনের সম্পর্কের বর্তমান অবস্থা বর্ণনা করেছেন — তারা একে অপরকে খোঁজে না, কিন্তু একই নক্ষত্রের নিচে বাস করে। পৃথিবীর সব কিছু ক্ষয় হয়ে যায়, প্রেম মুছে যায়, নক্ষত্রও মরে যায়। তারপর তারা আবার মিলিত হয় চিরস্থায়ী পৃথিবী ও আকাশের পাশে, যেন প্রথমবারের মতো। প্রকৃতিতে হেমন্ত এসেছে, সব কিছু ঝরছে, মরছে, বিদায় নিচ্ছে। নারী প্রশ্ন করে — সব শেষে আমাদের হৃদয় কী নিয়ে থাকবে? প্রেম ফুরিয়ে গেলে কী হবে? প্রেমিক মনে করে — এই নারী অপরূপ, তিনি নক্ষত্রের তীরে খুঁজে পাবেন তাঁর প্রেম, এমনকি তিনি না থাকলেও। কবিতাটি প্রেমের চিরন্তনতা ও ক্ষণস্থায়ীত্বের দ্বন্দ্বকে অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।
দুজন কবিতা সম্পর্কে প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: দুজন কবিতার লেখক কে?
দুজন কবিতার লেখক জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪)। তিনি বাংলা কবিতার এক কিংবদন্তি কবি, যিনি ‘রূপসী বাংলার কবি’ নামে সমধিক পরিচিত। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ঝরাপালক’ (১৯২৭) তাঁকে খ্যাতি এনে দেয়। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’, ‘বনলতা সেন’, ‘মহাপৃথিবী’, ‘রূপসী বাংলা’, ‘বেলা অবেলা কালবেলা’ প্রভৃতি।
প্রশ্ন ২: দুজন কবিতার মূল বিষয়বস্তু কী?
দুজন কবিতার মূল বিষয়বস্তু হলো প্রেম, সময় ও অস্তিত্বের দার্শনিক অন্বেষণ। কবি দুজনের সম্পর্কের বর্তমান অবস্থা, তাদের মিলন, প্রকৃতির হেমন্তের চিত্র, নারীর প্রশ্ন ও প্রেমিকের চিন্তার মাধ্যমে প্রেমের চিরন্তনতা ও ক্ষণস্থায়ীত্বের দ্বন্দ্বকে ফুটিয়ে তুলেছেন।
প্রশ্ন ৩: ‘পৃথিবীর পুরনো পথের রেখা হয়ে যায় ক্ষয়, / প্রেম ধীরে মুছে যায়, নক্ষত্রেরও একদিন মরে যেতে হয়’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘পৃথিবীর পুরনো পথের রেখা হয়ে যায় ক্ষয়, / প্রেম ধীরে মুছে যায়, নক্ষত্রেরও একদিন মরে যেতে হয়’ — এই পঙ্ক্তিতে কবি সময়ের প্রবাহে সব কিছুর ক্ষয় ও মৃত্যুর কথা বলেছেন। পৃথিবীর পুরনো পথের চিহ্ন মুছে যায়, প্রেমও সময়ের সাথে সাথে ম্লান হয়, এমনকি নক্ষত্রও একদিন মরে যায়। এটি জীবনের ক্ষণস্থায়ীত্বের প্রতীক।
প্রশ্ন ৪: ‘হৃদয়ে প্রেমের শীর্ষ আমাদের — প্রেমের অপূর্ব শিশু আরক্ত বাসনা / ফুরোত না যদি’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘হৃদয়ে প্রেমের শীর্ষ আমাদের — প্রেমের অপূর্ব শিশু আরক্ত বাসনা / ফুরোত না যদি’ — এই পঙ্ক্তিতে নারী তাঁর অতীত প্রেমের কথা স্মরণ করেছেন। ‘প্রেমের শীর্ষ’ — প্রেমের চরম পর্যায়। ‘প্রেমের অপূর্ব শিশু’ — প্রেমের সন্তান? ‘আরক্ত বাসনা’ — তীব্র আকাঙ্ক্ষা। তিনি বলেন — যদি এই সব না ফুরোত, তাহলে কেমন হতো! কিন্তু সব কিছুই ফুরোয়।
প্রশ্ন ৫: ‘এই নারী-অপরূপ-খুঁজে পাবে নক্ষত্রের তীরে / যেখানে রব না আমি’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘এই নারী-অপরূপ-খুঁজে পাবে নক্ষত্রের তীরে / যেখানে রব না আমি’ — এই পঙ্ক্তিতে প্রেমিক তাঁর প্রেমিকার প্রতি আশীর্বাদ করেছেন। তিনি চান তাঁর প্রেমিকা সুখী হোক, তিনি না থাকলেও। নক্ষত্রের তীরে — দূর ভবিষ্যতে, অন্য কোনো জীবনে, তিনি খুঁজে পাবেন তাঁর প্রেম।
প্রশ্ন ৬: জীবনানন্দ দাশ সম্পর্কে সংক্ষেপে বলুন।
জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪) বাংলা কবিতার এক কিংবদন্তি কবি, যিনি ‘রূপসী বাংলার কবি’ নামে সমধিক পরিচিত। তিনি ১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ঝরাপালক’ (১৯২৭) তাঁকে খ্যাতি এনে দেয়। তাঁর কবিতায় প্রকৃতি, নিসর্গ, জীবন-মৃত্যু, সময় ও ইতিহাসচেতনার গভীর প্রকাশ ঘটে।
ট্যাগস: দুজন, জীবনানন্দ দাশ, জীবনানন্দ দাশের কবিতা, দুজন কবিতা, বাংলা কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, রূপসী বাংলার কবি, প্রেমের কবিতা, হেমন্তের কবিতা






