কবিতার খাতা
- 38 mins
কবির ছুটি – বীথি চট্টপাধ্যায়।
বর্ষা স্পর্শ এখনও আকাশ জুড়ে
শরতের আলো ফুটতে অনেক দেরি,
এবার শরৎ আসার আগেই বুঝি
অকূলসিন্ধু পারে চলে যাবে ফেরি।
গায়ে চাপা দেওয়া, খাটে আধশোয়া কবি
জোড়াসাঁকো যেন থমথমে নীরবতা
কে আমি?এলাম কোথা থেকে? কার ডাকে?
এখন কোথায় রওনা হবার কথা?
কে লিখল এত? কে গেল শিলাইদহ?
এত প্রেম ছিল হৃদয়ে অতল হয়ে?
বিক্ষোভ রাগ অভিমান অভিযোগ
পদ্মার জলে ঢেউ হয়ে যায় বয়ে ।
গঙ্গার তীরে সব দিয়ে দিতে হবে
কে কাকে পাঠায় ক-দিনের ছুটি দিয়ে?
শরতের আগে ফুরোবে কবির ছুটি
রোগশয্যায় ভগ্ন হৃদয় নিয়ে।
ছেলেবেলা সেই কুস্তি লড়ার ভোর
ছাদের ওপর আবছা কাদম্বরী;
পদ্মার তীরে বিন্দু বিন্দু গ্রাম
ঢেউ ভেঙে যেন এগোয় জীবন তরী৷
বালকের সেই প্রথমদিকের লেখা
বক্তৃতা দেওয়া চাবুকের মতো ভাষা,
আশ্রম খুলে কত ধার, কত দেনা
যাত্রী সবাই, শুধু যাওয়া শুধু আসা।
এবার শরতে অপূর্ব আলোছায়া
ফাঁকা পালঙ্ক, টেবিলে চশমা ঘড়ি,
ছবির ওপর চন্দন ফুলমালা,
ঢেউ ভেঙে যেন এগোয় জীবনতরী।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। বীথি চট্টপাধ্যায়।
কবির ছুটি – বীথি চট্টপাধ্যায় | জীবন-মৃত্যু, সৃষ্টি ও বিদায়ের কবিতা বিশ্লেষণ
কবির ছুটি কবিতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন
কবির ছুটি কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত কবি ও ঔপন্যাসিক বীথি চট্টপাধ্যায়ের একটি গভীর জীবনদর্শনমূলক, আত্মচেতনামূলক ও বিদায়ী সুরের অনবদ্য রচনা। বীথি চট্টপাধ্যায় রচিত এই কবিতাটি শেষ জীবনের কবির মনস্তাত্ত্বিক অবস্থান, অতীত স্মৃতি, বর্তমানের শারীরিক সীমাবদ্ধতা এবং অনিবার্য অন্তিম যাত্রার এক মর্মস্পর্শী চিত্রণ। “বর্ষা স্পর্শ এখনও আকাশ জুড়ে/ শরতের আলো ফুটতে অনেক দেরি,/ এবার শরৎ আসার আগেই বুঝি/ অকূলসিন্ধু পারে চলে যাবে ফেরি।” — এই সূচনার মাধ্যমেই কবি প্রকৃতির চক্র ও মানুষের জীবনচক্রের মধ্যে একটি সমান্তরাল টানেন। কবির ছুটি কেবল একটি ছুটির কবিতা নয়; এটি একটি বিদায়ের প্রস্তুতি, একটি জীবনের হিসাব-নিকাশ, এবং একটি সৃষ্টিশীল ব্যক্তিত্বের আত্মঅনুসন্ধানের দলিল। কবিতাটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষ জীবনের ইঙ্গিতবাহী — ‘জোড়াসাঁকো’, ‘শিলাইদহ’, ‘পদ্মা’, ‘গঙ্গার তীর’ এসব স্থান ও উপাদান রবীন্দ্র-জীবনের সাথে সংযুক্ত। বীথি চট্টপাধ্যায় এখানে সম্ভবত রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিকোণ থেকে অথবা একজন রবীন্দ্র-অনুসারী কবির দৃষ্টিতে জীবন-শেষের প্রতিচ্ছবি এঁকেছেন। কবিতাটির ভাষা অত্যন্ত চিত্রময়, সংযত কিন্তু আবেগপূর্ণ, যা পাঠককে গভীর চিন্তায় নিমজ্জিত করে। এটি বাংলা সাহিত্যে জীবনান্ত ও সৃষ্টির সীমাবদ্ধতা নিয়ে লেখা একটি অনন্য কবিতা হিসেবে স্বীকৃত।
কবির ছুটি কবিতার কাব্যিক বৈশিষ্ট্য
কবির ছুটি কবিতাটি একটি আত্মজৈবনিক বা ব্যক্তিনিষ্ঠ গদ্য-কবিতার রূপ নিলেও এর মধ্যে একটি সুস্পষ্ট ছন্দ ও অন্ত্যমিল বিদ্যমান। কবিতাটি সাতটি স্তবকে বিভক্ত, যেখানে প্রথম ও শেষ স্তবকে একটি পূর্ণবৃত্তি তৈরি হয়েছে। প্রথম স্তবকে প্রকৃতির মাধ্যমে জীবনচক্রের রূপক: ‘বর্ষা স্পর্শ’ এখনও আকাশে বিদ্যমান, ‘শরতের আলো’ আসতে দেরি আছে, কিন্তু কবির আশঙ্কা — ‘এবার শরৎ আসার আগেই বুঝি/ অকূলসিন্ধু পারে চলে যাবে ফেরি।’ ‘অকূলসিন্ধু’ (অগাধ সমুদ্র) এখানে মৃত্যু বা অনন্তের প্রতীক, এবং ‘ফেরি’ (নৌকা) হল জীবন বা আত্মা। অর্থাৎ, শরত (জীবনের পরিণত বয়স বা শান্তি) আসার আগেই হয়তো মৃত্যুর পাড়ে চলে যেতে হবে। দ্বিতীয় স্তবকে কবির বর্তমান শারীরিক অবস্থা: ‘গায়ে চাপা দেওয়া, খাটে আধশোয়া কবি’ — একজন শয্যাশায়ী, কম্বল-আবৃত কবি। ‘জোড়াসাঁকো যেন থমথমে নীরবতা’ — রবীন্দ্রনাথের বাসস্থান জোড়াসাঁকো থিয়েটার বা বাড়ির মতো নিস্তব্ধ। তারপর আসে অস্তিত্বের মৌলিক প্রশ্ন: “কে আমি?এলাম কোথা থেকে? কার ডাকে?/ এখন কোথায় রওনা হবার কথা?” — এটি জীবনের শেষ প্রান্তে আত্মপরিচয় ও গন্তব্য নিয়ে দার্শনিক জিজ্ঞাসা। তৃতীয় স্তবকে অতীত সৃষ্টি ও জীবন পর্যালোচনা: “কে লিখল এত? কে গেল শিলাইদহ?/ এত প্রেম ছিল হৃদয়ে অতল হয়ে?” — কবি তাঁর নিজের অতীত কর্ম (লেখালেখি) ও ভ্রমণ (শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি) নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। হৃদয়ের ‘অতল’ (অগাধ) প্রেমের কথা স্মরণ করেন। এবং বলেন: “বিক্ষোভ রাগ অভিমান অভিযোগ/ পদ্মার জলে ঢেউ হয়ে যায় বয়ে।” — জীবনের সকল নেতিবাচক আবেগ (বিক্ষোভ, রাগ, অভিমান) পদ্মার জলের ঢেউয়ের মতো বয়ে গেছে, অর্থাৎ ক্ষণস্থায়ী ও বিলীন হয়ে গেছে। চতুর্থ স্তবকে কবি মৃত্যুর অনিবার্যতার কথা বলেন: “গঙ্গার তীরে সব দিয়ে দিতে হবে/ কে কাকে পাঠায় ক-দিনের ছুটি দিয়ে?” — গঙ্গার তীরে (মৃত্যু বা শেষযাত্রার স্থান) সবকিছু ত্যাগ করতে হবে। ‘কে কাকে পাঠায় ক-দিনের ছুটি দিয়ে?’ — এটি একটি করুণ প্রশ্ন: কে (ঈশ্বর বা নিয়তি) কাকে (কবিকে) কয়েকদিনের ছুটি (জীবন) দিয়ে পাঠায়? এবং তিনি বলেন: “শরতের আগে ফুরোবে কবির ছুটি/ রোগশয্যায় ভগ্ন হৃদয় নিয়ে।” — অর্থাৎ শরতের (শান্তি বা প্রাপ্তি) আগেই কবির জীবন-ছুটি শেষ হবে, রোগশয্যায় ভগ্ন হৃদয় নিয়ে। পঞ্চম স্তবকে কবির শৈশব স্মৃতি: “ছেলেবেলা সেই কুস্তি লড়ার ভোর/ ছাদের ওপর আবছা কাদম্বরী;/ পদ্মার তীরে বিন্দু বিন্দু গ্রাম/ ঢেউ ভেঙে যেন এগোয় জীবন তরী৷” — ‘কুস্তি লড়ার ভোর’ শৈশবের উদ্যম, ‘আবছা কাদম্বরী’ (কদম ফুল) সৌন্দর্য, ‘পদ্মার তীরে বিন্দু বিন্দু গ্রাম’ ছোট ছোট গ্রাম, এবং সবকিছুর মধ্য দিয়ে ‘জীবন তরী’ এগিয়ে যায়। ষষ্ঠ স্তবকে যৌবন ও মধ্যবয়সের স্মৃতি: “বালকের সেই প্রথমদিকের লেখা/ বক্তৃতা দেওয়া চাবুকের মতো ভাষা,/ আশ্রম খুলে কত ধার, কত দেনা/ যাত্রী সবাই, শুধু যাওয়া শুধু আসা।” — ‘প্রথমদিকের লেখা’ ও ‘চাবুকের মতো ভাষা’ যৌবনের সাহসী সৃষ্টি। ‘আশ্রম খুলে’ (সম্ভবত রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন বা নিজের কোনো আদর্শ প্রতিষ্ঠান) ‘কত ধার, কত দেনা’ — দায়িত্ব ও ঋণ। ‘যাত্রী সবাই, শুধু যাওয়া শুধু আসা’ — জীবন একটি যাত্রা, মানুষ আসে ও যায়। সপ্তম ও শেষ স্তবকে বর্তমানের নিষ্প্রভ দৃশ্য: “এবার শরতে অপূর্ব আলোছায়া/ ফাঁকা পালঙ্ক, টেবিলে চশমা ঘড়ি,/ ছবির ওপর চন্দন ফুলমালা,/ ঢেউ ভেঙে যেন এগোয় জীবনতরী।” — এবার শরতের ‘অপূর্ব আলোছায়া’ আছে, কিন্তু কবির স্থান ‘ফাঁকা পালঙ্ক’, টেবিলে শুধু ‘চশমা ঘড়ি’ (ব্যবহৃত জিনিস), এবং ‘ছবির ওপর চন্দন ফুলমালা’ (সম্ভবত শ্রদ্ধার্ঘ্য বা স্মৃতি)। সবশেষে আবারও ‘ঢেউ ভেঙে যেন এগোয় জীবনতরী’ — জীবন তার গতিতেই চলেছে, কবি তার যাত্রা শেষ করছেন।
বীথি চট্টপাধ্যায়ের কবিতার বৈশিষ্ট্য
বীথি চট্টপাধ্যায় (জন্ম ১৯৪০) বাংলা সাহিত্যের একজন প্রখ্যাত কবি, ঔপন্যাসিক ও প্রাবন্ধিক। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। তাঁর কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো গভীর অন্তর্মুখিতা, জীবন ও মৃত্যু সম্পর্কিত দার্শনিক চিন্তা, সূক্ষ্ম চিত্রকল্প, এবং একটি গদ্যময় কিন্তু কবিতাময় ভাষারীতির ব্যবহার। তাঁর কবিতায় ব্যক্তিগত স্মৃতি, ইতিহাস, সাহিত্যিক রেফারেন্স ও সমকালীন বাস্তবতা প্রায়শই মিশে যায়। তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবন ও দর্শন দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত, যা তাঁর অনেক রচনায় প্রতিফলিত হয়। কবির ছুটি কবিতাটি তাঁর এই সকল বৈশিষ্ট্যেরই উজ্জ্বল প্রকাশ: এখানে রবীন্দ্র-জীবনের ইঙ্গিত, ব্যক্তিগত আত্মপর্যালোচনা, জীবন-মৃত্যুর দ্বন্দ্ব, এবং চিত্রময় ভাষা একাকার হয়ে গেছে।
কবির ছুটি কবিতা সম্পর্কে প্রশ্নোত্তর ও বিশদ আলোচনা
কবির ছুটি কবিতার রচয়িতা কে?
কবির ছুটি কবিতার রচয়িতা বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত কবি ও ঔপন্যাসিক বীথি চট্টপাধ্যায়।
কবির ছুটি কবিতার মূল বিষয়বস্তু কী?
কবিতাটির মূল বিষয়বস্তু হলো একজন কবির (সম্ভবত রবীন্দ্রনাথ বা একটি রবীন্দ্র-সদৃশ ব্যক্তিত্ব) শেষ জীবনের আত্মপর্যালোচনা, মৃত্যুর পূর্বাভাস ও বিদায়ের প্রস্তুতি। কবিতাটি প্রকৃতির ঋতুচক্র (বর্ষা থেকে শরৎ) এর মাধ্যমে জীবনচক্রের রূপক হিসেবে ব্যবহার করে। কবি শয্যাশায়ী, তাঁর ‘ছুটি’ (জীবন) ফুরিয়ে আসছে। তিনি তাঁর অতীত স্মৃতি (শৈশব, যৌবন, সৃষ্টি, প্রেম, ভ্রমণ) পর্যালোচনা করেন এবং বুঝতে পারেন যে সমস্ত আবেগ, সংগ্রাম, সাফল্য (‘বিক্ষোভ রাগ অভিমান’, ‘আশ্রম খুলে কত ধার’) শেষ পর্যন্ত ‘পদ্মার জলে ঢেউ হয়ে যায় বয়ে’ — অর্থাৎ ক্ষণস্থায়ী ও বিলীন। কবির সামনে এখন শুধু ‘গঙ্গার তীরে সব দিয়ে দিতে হবে’ — মৃত্যুর কাছে আত্মসমর্পণ। কবি প্রশ্ন তোলেন: ‘কে কাকে পাঠায় ক-দিনের ছুটি দিয়ে?’ — জীবন একটি অল্প সময়ের ‘ছুটি’ মাত্র। কবিতার শেষে বর্তমানের নির্জন দৃশ্য (‘ফাঁকা পালঙ্ক’, ‘চশমা ঘড়ি’, ‘ছবির ওপর চন্দন ফুলমালা’) এবং ‘জীবনতরী’র চলমানতার ইঙ্গিত দেওয়া হয়। সুতরাং, বিষয়বস্তু হল: জীবন একটি সীমিত ‘ছুটি’, যা শেষ হতে চলেছে; অতীত স্মৃতি ও কৃতিত্ব মূল্যহীন হয়ে পড়ে; এবং মৃত্যু অনিবার্য, কিন্তু জীবন-তরী তার গতিতেই এগিয়ে যায়। কবিতাটি একদিকে যেমন মৃত্যুভীতি ও দুঃখ প্রকাশ করে, অন্যদিকে তেমনই একটি শান্ত, গ্রহণযোগ্য দৃষ্টিভঙ্গিও উপস্থাপন করে।
বীথি চট্টপাধ্যায় কে?
বীথি চট্টপাধ্যায় (জন্ম ১৯৪০) হলেন একজন ভারতীয় বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক ও অধ্যাপক। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘নক্ষত্রের পাঁচালী’, ‘পূর্ণিমার চাকতি’, ‘ঘাসপাতার কান্না’ ইত্যাদি। উপন্যাসের মধ্যে ‘অন্তর্গত’ বিশেষভাবে প্রশংসিত। তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বাংলা সাহিত্য নিয়ে গভীর গবেষণামূলক কাজও করেছেন।
কবির ছুটি কবিতা কেন বিশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ?
এই কবিতাটি বিশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি বাংলা সাহিত্যে জীবনান্ত ও সৃষ্টিকর্তার শেষ সময়ের একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও মর্মস্পর্শী চিত্রণ উপস্থাপন করেছে। প্রথমত, কবিতাটি সম্ভবত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষ জীবন (১৯৪১) এর প্রেক্ষাপটে লেখা, যা রবীন্দ্র-পরবর্তী বাংলা কবিতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রবীন্দ্রনাথের ‘জোড়াসাঁকো’, ‘শিলাইদহ’, ‘পদ্মা’, ‘গঙ্গার তীর’ ইত্যাদি স্থান ও উপাদানের উল্লেখ কবিতাটিকে একটি ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক গভীরতা দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, কবিতাটি ‘ছুটি’ রূপকটি ব্যবহার করে জীবনকে একটি সীমিত, অস্থায়ী বিরতি হিসেবে দেখিয়েছে, যা খুবই সৃষ্টিশীল। তৃতীয়ত, কবিতাটির ভাষা ও ছন্দ অত্যন্ত নিপুণ — এটি গদ্যের কাছাকাছি কিন্তু একটি অন্তর্নিহিত লয় রয়েছে। চিত্রকল্প (‘পদ্মার জলে ঢেউ’, ‘আবছা কাদম্বরী’, ‘ফাঁকা পালঙ্ক’) খুবই শক্তিশালী। চতুর্থত, কবিতাটি মৃত্যুকে ভয় বা শোক হিসেবে না দেখে একটি স্বাভাবিক, অনিবার্য যাত্রা হিসেবে দেখিয়েছে, যা একটি পরিণত দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি। এটি বাংলা কবিতায় ‘বিদায়’ বা ‘জীবন-সমাপ্তি’ বিষয়ক কবিতাগুলোর মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন।
বীথি চট্টপাধ্যায়ের কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো কী?
বীথি চট্টপাধ্যায়ের কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো: ১) গভীর আত্মচেতনা ও অন্তর্মুখিতা, ২) জীবন, মৃত্যু, সময় ও স্মৃতি সম্পর্কিত দার্শনিক চিন্তা, ৩) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবন ও সাহিত্যের প্রভাব, ৪) সূক্ষ্ম ও মনোগ্রাহী চিত্রকল্পের ব্যবহার, ৫) গদ্যময় কিন্তু কাব্যিক ঘনত্ব সম্পন্ন ভাষারীতি, ৬) ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও ঐতিহাসিক/সাহিত্যিক প্রসঙ্গের সমন্বয়, এবং ৭) একটি শান্ত, মিতভাষী কিন্তু আবেগপূর্ণ কণ্ঠস্বর।
কবির ছুটি কবিতা থেকে আমরা কী শিক্ষা লাভ করতে পারি?
এই কবিতা থেকে আমরা নিম্নলিখিত শিক্ষাগুলো লাভ করতে পারি: ১) জীবন একটি সীমিত ‘ছুটি’ মাত্র, যা একদিন শেষ হবে — এই বোধ আমাদের জীবনকে মূল্যবান করে তোলে। ২) শেষ জীবনে মানুষ তাঁর অতীত কর্ম, প্রেম, সংগ্রাম নিয়ে ভাবেন এবং বুঝতে পারেন অনেক কিছুই ‘ঢেউ হয়ে বয়ে যায়’ — অর্থাৎ ক্ষণস্থায়ী। ৩) মৃত্যু একটি অনিবার্য যাত্রা (‘গঙ্গার তীরে সব দিয়ে দিতে হবে’), যা আমাদের সবকিছু ত্যাগ করতে শেখায়। ৪) শৈশব ও যৌবনের স্মৃতি (‘কুস্তি লড়ার ভোর’, ‘চাবুকের মতো ভাষা’) শেষ পর্যন্ত আমাদের পরিচয়ের অংশ হয়। ৫) সৃষ্টি ও দায়িত্ব (‘আশ্রম খুলে কত ধার’) জীবনের অর্থ তৈরি করে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ‘যাত্রী সবাই, শুধু যাওয়া শুধু আসা’। ৬) জীবন একটি ‘জীবনতরী’ যা ঢেউ ভেঙে এগিয়ে যায় — আমাদের ব্যক্তিগত শেষ হলেও জীবন চলমান থাকে। ৭) কবিতাটি আমাদের বিনয় শেখায়: আমরা কে, কোথা থেকে এসেছি, কোথায় যাব — এই প্রশ্নগুলো জীবনের শেষ প্রান্তে আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বীথি চট্টপাধ্যায়ের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কবিতা ও রচনা কোনগুলো?
বীথি চট্টপাধ্যায়ের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কবিতা ও রচনার মধ্যে রয়েছে: কাব্যগ্রন্থ: ‘নক্ষত্রের পাঁচালী’, ‘পূর্ণিমার চাকতি’, ‘ঘাসপাতার কান্না’, ‘চৈতালি রাত্রির গান’। উপন্যাস: ‘অন্তর্গত’, ‘নিষাদ দেশে’, ‘শঙ্খচিল’। প্রবন্ধ ও গবেষণা: রবীন্দ্রনাথ ও বাংলা সাহিত্য নিয়ে বহু গ্রন্থ। তিনি শিশুসাহিত্যও রচনা করেছেন।
কবির ছুটি কবিতা পড়ার উপযুক্ত সময় কোনটি?
এই কবিতা পড়ার উপযুক্ত সময় হলো যখন কেউ জীবন, মৃত্যু, সময় বা স্মৃতি নিয়ে গভীর চিন্তা করছেন। বিশেষ করে শেষ বয়সে বা কোনো প্রিয়জনের হারানোর পর এই কবিতা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। রবীন্দ্রনাথের জীবন বা সাহিত্য নিয়ে আগ্রহীদের জন্যও এই কবিতা গুরুত্বপূর্ণ। একাকী, শান্ত সময়ে পড়লে কবিতার মর্মার্থ ভালোভাবে উপলব্ধি করা যায়।
কবির ছুটি কবিতা বর্তমান সমাজে কতটা প্রাসঙ্গিক?
বর্তমান সমাজে এই কবিতা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আজকের দ্রুতগতির, যৌবন-কেন্দ্রিক সংস্কৃতিতে বৃদ্ধাবস্থা, মৃত্যু ও শেষ সময় নিয়ে আলোচনা প্রায় ট্যাবু। এই কবিতাটি সেই ট্যাবু ভাঙে এবং জীবনের শেষ অধ্যায়ের মর্যাদা, গাম্ভীর্য ও সৌন্দর্যকে স্বীকৃতি দেয়। তাছাড়া, আজকের সমাজে যেখানে মানুষ কাজ ও সাফল্যের পিছনে ছুটছে, সেখানে ‘কবির ছুটি’ ধারণাটি মনে করিয়ে দেয় যে জীবনই আসলে একটি ‘ছুটি’, যা শেষ হতে বাধ্য। কবিতাটির রবীন্দ্র-উল্লেখ আমাদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার ও শ্রদ্ধার কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়, যা আজকের বিচ্ছিন্ন সমাজে গুরুত্বপূর্ণ। সর্বোপরি, কবিতাটি মৃত্যুকে ভয় নয়, একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি শেখায়, যা আজকের মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতায় প্রাসঙ্গিক।
কবির ছুটি কবিতার গুরুত্বপূর্ণ পঙ্ক্তি বিশ্লেষণ ও তাৎপর্য
“বর্ষা স্পর্শ এখনও আকাশ জুড়ে/ শরতের আলো ফুটতে অনেক দেরি” – প্রকৃতির মাধ্যমে জীবনচক্রের রূপক। ‘বর্ষা’ যৌবন বা সক্রিয় জীবনের প্রতীক, ‘শরতের আলো’ পরিণত বয়স বা শান্তির প্রতীক। কিন্তু কবির মনে হয় শরত আসার আগেই তার যাত্রা শেষ হবে।
“এবার শরৎ আসার আগেই বুঝি/ অকূলসিন্ধু পারে চলে যাবে ফেরি।” – ‘অকূলসিন্ধু’ (অগাধ সাগর) মৃত্যু বা অনন্তের প্রতীক, ‘ফেরি’ (নৌকা) কবির জীবন বা আত্মা। অর্থাৎ, জীবন-নৌকা মৃত্যুর পারে চলে যাবে।
“গায়ে চাপা দেওয়া, খাটে আধশোয়া কবি/ জোড়াসাঁকো যেন থমথমে নীরবতা” – কবির শয্যাশায়ী অবস্থা। ‘জোড়াসাঁকো’ রবীন্দ্রনাথের বাসস্থান, যা এখন নীরব — এটি রবীন্দ্র-প্রাসাদের শূন্যতার দিকে ইঙ্গিত করে।
“কে আমি?এলাম কোথা থেকে? কার ডাকে?/ এখন কোথায় রওনা হবার কথা?” – জীবনের শেষ প্রান্তে আত্মপরিচয় ও গন্তব্য সম্পর্কিত অস্তিত্ববাদী প্রশ্ন।
“কে লিখল এত? কে গেল শিলাইদহ?/ এত প্রেম ছিল হৃদয়ে অতল হয়ে?” – অতীত সৃষ্টি (লেখা) ও অভিজ্ঞতা (শিলাইদহ ভ্রমণ) নিয়ে বিস্ময়। ‘অতল’ (গভীর) প্রেমের স্মৃতি।
“বিক্ষোভ রাগ অভিমান অভিযোগ/ পদ্মার জলে ঢেউ হয়ে যায় বয়ে ।” – জীবনের নেতিবাচক আবেগগুলো পদ্মার ঢেউয়ের মতো বয়ে গেছে, অর্থাৎ ক্ষণস্থায়ী ও বিলীন।
“গঙ্গার তীরে সব দিয়ে দিতে হবে/ কে কাকে পাঠায় ক-দিনের ছুটি দিয়ে?” – মৃত্যুর পূর্বে সবকিছু ত্যাগ। ‘ক-দিনের ছুটি’ জীবনের জন্য একটি মর্মস্পর্শী রূপক: জীবন কয়েকদিনের ছুটি মাত্র, যা কেউ (ঈশ্বর/নিয়তি) আমাদের দিয়েছেন।
“শরতের আগে ফুরোবে কবির ছুটি/ রোগশয্যায় ভগ্ন হৃদয় নিয়ে।” – জীবন-ছুটি শরতের আগেই শেষ হবে, এবং তা হবে রোগশয্যায়, ভগ্ন হৃদয় নিয়ে। এটি একটি করুণ ভবিষ্যদ্বাণী।
“ছেলেবেলা সেই কুস্তি লড়ার ভোর/ ছাদের ওপর আবছা কাদম্বরী;” – শৈশবের সক্রিয়তা (‘কুস্তি লড়া’) ও সৌন্দর্য (‘কাদম্বরী’ – কদম ফুল) এর স্মৃতি।
“পদ্মার তীরে বিন্দু বিন্দু গ্রাম/ ঢেউ ভেঙে যেন এগোয় জীবন তরী৷” – পদ্মা নদীর তীরের গ্রামগুলো ‘বিন্দু বিন্দু’, এবং ‘জীবন তরী’ ঢেউ ভেঙে এগোয় — জীবন একটি চলমান যাত্রা।
“বালকের সেই প্রথমদিকের লেখা/ বক্তৃতা দেওয়া চাবুকের মতো ভাষা,” – যৌবনের সাহসী, তীক্ষ্ণ লেখনী (‘চাবুকের মতো ভাষা’)।
“আশ্রম খুলে কত ধার, কত দেনা/ যাত্রী সবাই, শুধু যাওয়া শুধু আসা।” – ‘আশ্রম’ (সম্ভবত শান্তিনিকেতন বা কোনো আদর্শ প্রতিষ্ঠান) খুলে নেওয়া দায়িত্ব ও ঋণ (‘ধার, দেনা’)। জীবন একটি যাত্রা, মানুষ আসে ও যায়।
“এবার শরতে অপূর্ব আলোছায়া/ ফাঁকা পালঙ্ক, টেবিলে চশমা ঘড়ি,” – শরতের সৌন্দর্য আছে, কিন্তু কবির জায়গা ‘ফাঁকা পালঙ্ক’ — তিনি চলে গেছেন। ‘চশমা ঘড়ি’ তাঁর ব্যবহার্য জিনিস, এখন শুধু স্মৃতি।
“ছবির ওপর চন্দন ফুলমালা,/ ঢেউ ভেঙে যেন এগোয় জীবনতরী।” – ‘ছবির ওপর চন্দন ফুলমালা’ শ্রদ্ধার্ঘ্য বা স্মারক। এবং শেষবারের মতো ‘জীবনতরী’র চলমানতার কথা বলা হয়েছে — জীবন থেমে নেই, তা চলে যায়।
কবির ছুটি কবিতার দার্শনিক, সাহিত্যিক ও জীবনবোধগত তাৎপর্য
কবির ছুটি কবিতাটি বীথি চট্টপাধ্যায়ের দার্শনিক চিন্তার একটি গভীর প্রকাশ। এটি নিম্নলিখিত দিকগুলো উন্মোচন করে:
১. জীবন একটি ‘ছুটি’: কবিতাটির কেন্দ্রীয় রূপক হলো জীবনকে একটি ‘ছুটি’ হিসেবে দেখা। এটি খুবই সৃষ্টিশীল ধারণা: আমরা এই পৃথিবীতে আসি কয়েকদিনের ‘ছুটি’ নিয়ে, এবং সেই ছুটি শেষ হলে চলে যাই। এটি জীবনকে হালকা ও গুরুত্বপূর্ণ উভয়ই করে তোলে — হালকা কারণ এটি অস্থায়ী, গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি সীমিত।
২. রবীন্দ্র-প্রেক্ষাপট: কবিতাটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষ জীবন (১৯৪১) এর একটি কাব্যিক পুনর্নির্মাণ বলে মনে হয়। জোড়াসাঁকো, শিলাইদহ, পদ্মা, গঙ্গার তীর, আশ্রম — এসব রবীন্দ্র-জীবনেরই অংশ। কবি সম্ভবত রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিকোণ থেকে বা তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এই কবিতা লিখেছেন। এটি বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্র-উত্তর কবিতার একটি বিশেষ ধারা।
৩. সময় ও ঋতুচক্র: কবি প্রকৃতির ঋতুচক্র (বর্ষা, শরৎ) এর মাধ্যমে জীবনচক্র (যৌবন, বার্ধক্য) বুঝিয়েছেন। কিন্তু একটি টুইস্ট আছে: শরত আসার আগেই জীবন শেষ হতে পারে। এটি জীবনের অনিশ্চয়তা ও স্বল্পতাকে নির্দেশ করে।
৪. আত্মপর্যালোচনা ও প্রশ্ন: কবিতাটি একজন সৃষ্টিশীল ব্যক্তির শেষ জীবনের আত্মপর্যালোচনা। “কে আমি? এলাম কোথা থেকে?” — এই প্রশ্নগুলো অস্তিত্বের মৌলিক রহস্য স্পর্শ করে। এটি দেখায় যে শেষ বয়সে মানুষ তাঁর পরিচয় ও উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন করে।
৫. স্মৃতির প্রবাহ: কবি শৈশব থেকে যৌবন পর্যন্ত স্মৃতির একটি প্রবাহ বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এই স্মৃতিগুলো শেষ পর্যন্ত ‘পদ্মার জলে ঢেউ হয়ে বয়ে যায়’ — অর্থাৎ তারা স্রোতে মিলিয়ে যায়, স্থায়ী নয়। এটি জীবনের ক্ষণস্থায়ীত্বের দিকটি তুলে ধরে।
৬. মৃত্যুগ্রহণযোগ্যতা: কবিতাটি মৃত্যুকে একটি ভয়াবহ বা শোকের বিষয় হিসেবে নয়, বরং একটি স্বাভাবিক, অনিবার্য যাত্রা (‘গঙ্গার তীরে সব দিয়ে দিতে হবে’) হিসেবে দেখিয়েছে। কবি ‘ছুটি’ ফুরোনোর কথা বলেছেন, যা একটি শান্ত, বিনয়ী গ্রহণযোগ্যতা নির্দেশ করে।
৭. ‘জীবনতরী’র চলমানতা: কবিতার শেষে ‘ঢেউ ভেঙে যেন এগোয় জীবনতরী’ — এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। ব্যক্তির জীবন শেষ হলেও জীবন নিজেই চলমান থাকে, যেমন নদীর স্রোত চলমান থাকে। এটি একটি সর্বজনীন, চিরন্তন সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে।
৮. শূন্যতা ও উপস্থিতি: কবিতার শেষ স্তবকে ‘ফাঁকা পালঙ্ক’, ‘চশমা ঘড়ি’, ‘ছবির ওপর চন্দন ফুলমালা’ — এই চিত্রগুলো শূন্যতা (কবির অনুপস্থিতি) এবং উপস্থিতি (স্মৃতি, শ্রদ্ধা) এর একইসাথে চিত্রণ করে। কবি চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর স্মৃতি ও প্রভাব রয়ে গেছে।
কবিতাটির ভাষা খুবই মিতব্যয়ী, কিন্তু তা দিয়ে যে গভীর অনুভূতি ও চিন্তা প্রকাশিত হয়েছে, তা অসাধারণ। এটি বাংলা কবিতায় জীবনান্ত নিয়ে লেখা একটি ক্লাসিক রচনা হয়ে থাকবে।
কবির ছুটি কবিতা পড়ার সঠিক পদ্ধতি, বিশ্লেষণ কৌশল ও গভীর অধ্যয়ন
- কবিতাটি প্রথমে ধীরে ধীরে, সম্পূর্ণ পড়ুন এবং এর সাধারণ গল্প ও আবেগ গ্রহণ করুন।
- কবিতায় উল্লিখিত স্থানগুলোর (জোড়াসাঁকো, শিলাইদহ, পদ্মা, গঙ্গার তীর) ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক তাৎপর্য কী, তা জানুন (বিশেষত রবীন্দ্রনাথের জীবন থেকে)।
- ‘ছুটি’ রূপকটি কীভাবে সমগ্র কবিতায় কাজ করেছে, তা বিশ্লেষণ করুন। জীবনকে ‘ছুটি’ দেখা কী কী দার্শনিক তাৎপর্য বহন করে?
- কবিতার সাতটি স্তবকের প্রতিটির মূল ভাব বা থিম কী, তা আলাদা করে লিখুন।
- প্রকৃতির উপাদান (বর্ষা, শরৎ, পদ্মা, গঙ্গা, কাদম্বরী) কীভাবে জীবন ও মনের অবস্থার রূপক হয়েছে, তা খুঁজে দেখুন।
- কবিতায় ব্যবহৃত কিছু বিশেষ চিত্রকল্প (‘চাবুকের মতো ভাষা’, ‘আবছা কাদম্বরী’, ‘ফাঁকা পালঙ্ক’) এর অর্থ ও শৈল্পিক ভূমিকা বিশ্লেষণ করুন。
- বীথি চট্টপাধ্যায়ের অন্যান্য কবিতা বা রবীন্দ্র-বিষয়ক লেখার সাথে এই কবিতার সম্পর্ক খুঁজে দেখুন।
- এই কবিতাকে একজন বৃদ্ধ কবির মনস্তাত্ত্বিক মনোগ্রাম হিসেবে পড়ার চেষ্টা করুন। তাঁর কী কী অনুভূতি ও স্মৃতি কাজ করছে?
- কবিতার শেষ দুই লাইন (‘ঢেউ ভেঙে যেন এগোয় জীবনতরী।’) কীভাবে কবিতার প্রথম স্তবকের (‘অকূলসিন্ধু পারে চলে যাবে ফেরি।’) সাথে সংযুক্ত হয়, তা ভাবুন।
- শেষে, এই কবিতা পড়ে আপনার নিজের জীবনের ‘ছুটি’ বা স্মৃতি নিয়ে কী ভাবনা এলো, তা লিখে রাখুন বা আলোচনা করুন।
বীথি চট্টপাধ্যায়ের সাহিত্যকর্ম ও অন্যান্য উল্লেখযোগ্য রচনা
- কাব্যগ্রন্থ: ‘নক্ষত্রের পাঁচালী’, ‘পূর্ণিমার চাকতি’, ‘ঘাসপাতার কান্না’, ‘চৈতালি রাত্রির গান’, ‘তিমির নিরুদ্দেশ’।
- উপন্যাস: ‘অন্তর্গত’, ‘নিষাদ দেশে’, ‘শঙ্খচিল’, ‘আদিম রাত্রির গান’।
- প্রবন্ধ ও গবেষণা: রবীন্দ্রনাথ, বাংলা কবিতা ও সাহিত্য নিয়ে বহু গ্রন্থ, যেমন ‘রবীন্দ্রনাথ: কয়েকটি মাত্রা’, ‘কবিতার পৃথিবী’।
- শিশুসাহিত্য: ‘রাজকুমার রূপকথা’, ‘ছোটদের রবীন্দ্রনাথ’ ইত্যাদি।
- পুরস্কার: সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার, রবীন্দ্র পুরস্কারসহ বহু সম্মাননা প্রাপ্ত।
কবির ছুটি কবিতা নিয়ে শেষ কথা ও সারসংক্ষেপ
কবির ছুটি কবিতাটি বীথি চট্টপাধ্যায়ের কবিতাভুবনের একটি উজ্জ্বল ও পরিণত রত্ন, যা জীবন, সৃষ্টি ও মৃত্যুর মতো চিরন্তন বিষয়গুলোর উপর একটি গভীর, শান্ত কিন্তু মর্মস্পর্শী আলোকপাত করেছে। কবিতাটি শুধু একজন কবির বিদায়ের গান নয়; এটি প্রতিটি মানুষের জীবনেরই একটি সার্বজনীন আখ্যান — আমরা সবাই এই পৃথিবীতে ‘ক-দিনের ছুটি’ নিয়ে এসেছি, এবং সেই ছুটি একদিন ফুরিয়ে যাবে। কবি প্রকৃতির ঋতুচক্রের মাধ্যমে এই জীবনচক্রকে এমন নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যে পাঠক নিজের জীবনের দিকে তাকাতে বাধ্য হন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবন ও স্থানের উল্লেখ কবিতাটিকে একটি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট দিয়েছে, কিন্তু এর মূল আবেদন সর্বকালীন।
কবিতাটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল এর ‘ছুটি’ রূপকটি। জীবনকে ‘ছুটি’ মনে করার মধ্যেই এক গভীর বিনয় ও মুক্তি নিহিত — আমরা এখানে স্থায়ী নই, অতিথি মাত্র। এই বোধ আমাদের জীবনকে মূল্যবান করে তোলে,但同时 আমাদের অহংকার ও আবেগকে (‘বিক্ষোভ রাগ অভিমান’) ক্ষণস্থায়ী মনে করায়। কবি তাঁর শৈশবের ‘কুস্তি লড়ার ভোর’, যৌবনের ‘চাবুকের মতো ভাষা’ এবং মধ্যবয়সের ‘আশ্রম খুলে কত ধার’ এর কথা স্মরণ করেন, কিন্তু সবই শেষ পর্যন্ত ‘পদ্মার জলে ঢেউ হয়ে বয়ে যায়’। এটি জীবনের ক্ষণস্থায়ীত্বের এক শক্তিশালী চিত্র।
কবিতাটির শেষ অংশে কবির অনুপস্থিতি (‘ফাঁকা পালঙ্ক’) এবং স্মৃতি (‘ছবির ওপর চন্দন ফুলমালা’) এর চিত্র আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ব্যক্তি চলে গেলেও তাঁর সৃষ্টি ও প্রভাব রয়ে যায়। আর সবশেষে ‘জীবনতরী’র চলমানতার উল্লেখ আমাদের আশ্বস্ত করে যে জীবন থেমে থাকে না — একটি যাত্রা শেষ হয়, অন্য যাত্রা শুরু হয়। এটি একটি গভীর আধ্যাত্মিক বা দার্শনিক স্বীকৃতি।
বর্তমানের উদ্বেগপূর্ণ, সফলতা-কেন্দ্রিক বিশ্বে, কবির ছুটি কবিতার বার্তা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে জীবনের আসল অর্থ হয়তো সাফল্য বা সম্পদ নয়, বরং এই সীমিত সময়টিকে কীভাবে কাটানো হলো, কী স্মৃতি ও সৃষ্টি রেখে যাওয়া হলো। এটি আমাদের বৃদ্ধাবস্থা ও মৃত্যুকে ভয় না দেখে, তাদের মর্যাদা ও স্বাভাবিকতা বুঝতে শেখায়। বীথি চট্টপাধ্যায়ের এই কবিতা তাই শুধু একটি সাহিত্যকর্ম নয়, এটি একটি জীবনদর্শন, একটি প্রার্থনা, এবং একটি শান্ত বিদায়ের গান, যা বাংলা কবিতায় চিরকাল স্থান করে নেবে।
ট্যাগস: কবির ছুটি, কবির ছুটি কবিতা, বীথি চট্টপাধ্যায়, বীথি চট্টপাধ্যায়ের কবিতা, জীবন ও মৃত্যুর কবিতা, রবীন্দ্রনাথ, ছুটির রূপক, বাংলা কবিতা, আত্মপর্যালোচনা কবিতা, শেষ জীবনের কবিতা






