নিজের রবীন্দ্রনাথ – জয় গোস্বামী | জয় গোস্বামীর স্মৃতিকথা | রবীন্দ্রনাথ ও ব্যক্তিগত বোধের অসাধারণ মেলবন্ধন | সোনার তরী ও অমল ধবল পালের আত্মকথা
নিজের রবীন্দ্রনাথ: জয় গোস্বামীর রবীন্দ্রচেতনা, শৈশব, মৃত্যু ও প্রেমের অসাধারণ কাব্যগদ্য
জয় গোস্বামীর “নিজের রবীন্দ্রনাথ” আধুনিক বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য, মর্মস্পর্শী ও আত্মজৈবনিক রচনা। এটি একটি কবিতা নয়, এটি একটি স্মৃতিকথা — কিন্তু কবিতার চেয়েও বেশি। এখানে লেখক নিজের রবীন্দ্রনাথকে খুঁজেছেন — স্কুলের ছোটদের মুখে, মায়ের কণ্ঠে, বাবার মৃত্যুর শোকে, প্রেমের প্রথম অনুভূতিতে, মেয়ের গানে। “সেটা ছিল বাইশে শ্রাবণ, একটি স্কুলে গেছি রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কিছু বলতে” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া এই আত্মকথনটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে এক ব্যক্তির সারা জীবনে রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন রূপ। জয় গোস্বামী এখানে বলছেন — রবীন্দ্রনাথ কোন স্কুলপাঠ্য অঙ্ক নন, যে সবার খাতায় একই উত্তর হবে। এক-এক জনের রবীন্দ্রনাথ এক-এক রকম। তিনি নিজের জীবনের ‘সোনার তরী’ কবিতাটি নিয়ে বলছেন — কীভাবে তিনি প্রথম সেই কবিতাটি পেয়েছিলেন। ১৯৬২ সালের জুলাই মাসে, বর্ষার বিকেলবেলায়, বারান্দায় বসে, তাঁর মা সঞ্চয়িতা থেকে উচ্চারণ করে করে কবিতাটি পড়ছিলেন। মায়ের কবিতা পড়ার ঝোঁক ছিল না, কিন্তু সেদিন তিনি পড়ছিলেন — কারণ এপ্রিল মাসে বাবা মারা গিয়েছিলেন। বাবার ছিল কবিতা বলা-গান গাওয়ার স্বভাব। সেই সন্ধ্যায়, প্রায় কালো হয়ে আসা আকাশের নীচে, সারাদিনের বৃষ্টিতে ভেজা গাছপালার মধ্যে, সেই কবিতার শেষ লাইনগুলো শুনতে শুনতে জয় গোস্বামীর মনে হয়েছিল — এই কবিতাটি তাঁর বাবার মৃত্যু নিয়েই লেখা। “শ্রাবণ গগন ঘিরে, ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে — শূন্য নদীর তীরে রহিনু পড়ি— যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী” — বুকের মধ্যে চাপা কষ্টের গুরুভার। বাবা ছিল আনন্দের উৎস — সেই লোকটা চলে গেছে, আর আসবে না — এটাই যেন সেই কবিতার সার কথা। পরে বয়স বাড়লে তিনি দেখেন — ওই কবিতা নিয়ে কত তর্কাতর্কি। তিনি বোকার মতো ওই সোনার তরীকে শোকের কবিতা ভেবেছিলেন। কিন্তু আজও যদি চোখ বন্ধ করে ‘তরুছায়ামসীমাখা’ কথাটি ভাবেন — তবে রানাঘাটের সিদ্ধেশ্বরীতলার পুকুরপাড়ের বাড়ি আর চূর্ণী নদীর তীরই মনে পড়ে। আরও আছে — চূর্ণী নদীর ধারে বটগাছের নীচে বাবার সঙ্গে দাঁড়িয়ে বাবার মুখে শোনা গান — “অমল ধবল পালে লেগেছে মন্দ মধুর হাওয়া। দেখি নাই কভু দেখি নাই এমন তরণী-বাওয়া।” তিরিশ পেরিয়ে এক মেয়ের সঙ্গে আলাপ হয়। প্রেমে পড়েন। একদিন উঁচু বাড়ির সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসার সময় কোথাও সেই গান বাজছে — “দেখি নাই কভু দেখি নাই এমন তরণী-বাওয়া”। তিনি থমকে যান — শৈশবের সেই পুরোনো গান এক নতুন মানে নিয়ে সামনে দাঁড়ায়। সেই তরুণীই সেই আশ্চর্য নৌকো বেয়ে যাওয়া। তারপর উনিশ বছর কেটে যায়। তাঁর মেয়ে এখন হস্টেল পড়ে, পনেরো পেরিয়ে ষোলোয়। এক রবিবার বিকেলে মেয়ের সঙ্গে বটগাছের নীচে বসে থাকার সময় মেয়ে গাইতে শুরু করে — “অমল ধবল পালে লেগেছে মন্দ মধুর হাওয়া…” তখন জয় গোস্বামীর চোখ ভেসে যায় চোখের জলে। এই গানের কী মানে হল তাঁর কাছে? এই প্রশ্নের মধ্যে রেখে সূর্য তাঁর অস্তে চললেন। জয় গোস্বামী একজন বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি কবি। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতায় জটিল রূপক, আত্মজৈবনিক উপাদান ও গভীর মানবিক বোধের জন্য পরিচিত। “নিজের রবীন্দ্রনাথ” তাঁর সেই স্বকীয় কাব্যগদ্যের এক অসাধারণ ও চিরকালীন শিল্পরূপ।
জয় গোস্বামী: আত্মজৈবনিকতা, রবীন্দ্রচেতনা ও মানবিক বোধের কবি
জয় গোস্বামী একজন বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি কবি। তিনি বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীর বাংলা কবিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর। তাঁর কবিতায় আত্মজৈবনিক উপাদান, রবীন্দ্রচেতনা, জটিল রূপক ও গভীর মানবিক বোধ ফুটে ওঠে। তিনি ব্যক্তিগত স্মৃতিকে সর্বজনীন কাব্যে রূপান্তরিত করতে দক্ষ। ‘নিজের রবীন্দ্রনাথ’ তাঁর সেই ধারার একটি অসাধারণ ও চিরকালীন উদাহরণ।
জয় গোস্বামীর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘নিজের রবীন্দ্রনাথ’, ‘আজ যদি আমাকে জিগ্যেস করো’, ‘একটি দুর্বোধ্য কবিতা’ প্রভৃতি। তিনি আধুনিক বাংলা সাহিত্যে একটি স্বতন্ত্র ও সম্মানিত স্থানের অধিকারী।
জয় গোস্বামীর রচনার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো আত্মজৈবনিকতা ও স্মৃতিচারণ, রবীন্দ্রচেতনার ব্যক্তিগত রূপায়ণ, সরল ও প্রাণবন্ত গদ্যকাব্য, পিতা-মাতা ও শৈশবের স্মৃতি, প্রেম ও বিয়োগের গভীর অনুভব, এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সাংস্কৃতিক বোধের সঞ্চারণ। ‘নিজের রবীন্দ্রনাথ’ সেই ধারার একটি অসাধারণ ও চিরকালীন উদাহরণ।
নিজের রবীন্দ্রনাথ: শিরোনামের তাৎপর্য ও রচনার পটভূমি
শিরোনাম ‘নিজের রবীন্দ্রনাথ’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ‘নিজের’ শব্দটি ব্যক্তিগত, আত্মকেন্দ্রিক, অন্যের থেকে আলাদা। জয় গোস্বামী এখানে বলতে চেয়েছেন — রবীন্দ্রনাথ সবার জন্য এক নয়। প্রতিটি পাঠকের নিজস্ব রবীন্দ্রনাথ আছে। স্কুলের পাঠ্যবইয়ের রবীন্দ্রনাথ নয়, পরীক্ষার প্রশ্নের রবীন্দ্রনাথ নয় — বরং শৈশবের স্মৃতিতে মিশে যাওয়া, বাবার মৃত্যুর শোকে রঙিন হওয়া, প্রেমের প্রথম অনুভূতিতে জেগে ওঠা, মেয়ের কণ্ঠে ফিরে পাওয়া — সেই ‘নিজের’ রবীন্দ্রনাথ।
রচনাটির পটভূমি জয় গোস্বামীর সারা জীবনের বিভিন্ন মুহূর্ত — ১৯৬২ সালের জুলাই মাসের বর্ষার সন্ধ্যা, রানাঘাটের সিদ্ধেশ্বরীতলার পুকুরপাড়ের বাড়ি, চূর্ণী নদীর ধারের বটগাছ, তিরিশ বছর বয়সে প্রেমের প্রথম অনুভূতি, এবং পঞ্চাশ বছর বয়সে মেয়ের সঙ্গে গঙ্গার ধারে বসে থাকার মুহূর্ত। এই সব মুহূর্ত রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার তরী’ ও ‘অমল ধবল পালে’ গানের সঙ্গে মিশে গিয়ে তৈরি করেছে ‘নিজের রবীন্দ্রনাথ’।
নিজের রবীন্দ্রনাথ: অংশভিত্তিক বিস্তারিত ও গভীর বিশ্লেষণ
প্রথম অংশ: বাইশে শ্রাবণ ও নিজের রবীন্দ্রনাথের সূচনা
“সেটা ছিল বাইশে শ্রাবণ, / একটি স্কুলে গেছি রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কিছু বলতে। / ছোটরা তাদের উৎসুক চোখ নিয়ে তাকিয়ে রয়েছে, / হঠাৎ মনে হলো, কি বলব – / যা বলব তাই যদি এদের কাছে ভুল প্রমাণিত হয় পরে – / রবীন্দ্রনাথ তো কোন স্কুলপাঠ্য অঙ্ক নন, / যে সবার খাতায় একই উত্তর হবে, / এক-এক জনের রবীন্দ্রনাথ এক-এক রকম । / বাড়িতেও মেয়ে এক-আধবার জানতে চায় / তার ক্লাসের রবীন্দ্রনাথ নিয়ে – / হাত ছাড়িয়ে পালাই, / কারণ অনেক সময় যে নিজেই বুঝতে পারি নি রবীন্দ্রনাথকে।”
প্রথম অংশে জয় গোস্বামী নিজের দ্বিধা ও সততার কথা বলছেন। বাইশে শ্রাবণ — রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুবার্ষিকী। স্কুলে ছোটদের কাছে রবীন্দ্রনাথ নিয়ে বলতে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন — রবীন্দ্রনাথ কোন স্কুলপাঠ্য অঙ্ক নয়। সবার খাতায় একই উত্তর হবে না। এক-এক জনের রবীন্দ্রনাথ এক-এক রকম। বাড়িতে মেয়ে যখন ক্লাসের রবীন্দ্রনাথ নিয়ে জানতে চায়, তিনি হাত ছাড়িয়ে পালান — কারণ নিজেই অনেক সময় রবীন্দ্রনাথকে বুঝতে পারেননি। এটি একটি অসাধারণ সততার স্বীকারোক্তি।
দ্বিতীয় অংশ: সোনার তরী — বাবার মৃত্যু ও শৈশবের বর্ষার সন্ধ্যা
“ধরা যাক সোনার তরী, / এই একটা সব-গুলিয়ে দেওয়া লেখা আমার জীবনে, / হ্যাঁ, আমার জীবনে – / অন্যের জীবনে তা নাও হতে পারে। / প্রথম এই কবিতাকে আমি কিভাবে পাই? / পাই একটা বর্ষার বিকেলবেলার শেষে, / এক বারান্দায় বসে থাকার সময়, / কবিতাটি আমাকে দেখা দেয় । / আমার বয়স তখন আট, / ১৯৬২ সালের জুলাই মাস ছিল সেটা। / সারাদিন বৃষ্টি হয়ে সন্ধ্যেবেলা ধরে এসেছে, / আকাশ স্লেট-রঙের কালো থেকে একটু উজ্জ্বল, / সূর্য নেই – / আমার মা কবিতাটি পড়ছিল সঞ্চয়িতা থেকে, / উচ্চারণ করে করে। / আমার মায়ের কিন্তু কবিতা-টবিতা পড়ার ঝোঁক / একেবারেই ছিল না, / সারাদিন নানা কাজে ব্যস্ত থাকতে হত তাকে, / গল্পের বই পড়ত, কবিতা কক্ষণো নয়। / তবে সেদিন মা পড়ছিল কেন? / পড়ছিল আমার বাবার কথা মনে করে। / এপ্রিল মাসে বাবার মৃত্যু হয়েছে, / বাবার ছিল ওই কবিতা বলা-গান গাওয়ার স্বভাব। / এক-একটা মানুষ থাকে না, সারাদিন বাড়িতেই থাকে, / ফুলগাছ লাগায়, বই পড়ে, গান গায়, কবিতাও পড়ে – / কিন্তু কিছু করে না, বাবাও সেই রকমই ছিল। / প্রায় কালো হয়ে আসা আকাশের নীচে / গাছপালা যখন সারাদিনের বৃষ্টিতে ভেজা, / তখন সেই কবিতার শেষ লাইনগুলো শুনতে শুনতে / আমার মনে হয়েছিল – / এই কবিতাটি আমার বাবার মৃত্যু নিয়েই লেখা। / ‘শ্রাবণ গগন ঘিরে, / ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে – / শূন্য নদীর তীরে / রহিনু পড়ি— / যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী’ – / বুকের মধ্যে কি একটা চাপা কষ্টের গুরুভার। / আমাদের ছোট ওই সংসারের মধ্যে / বাবা ছিল একটা আনন্দের উৎস। / সারাদিন ছোট-ছোট গান, মজা, কবিতা, বাগান – / এসব করে অভাবের কথা যেন ভুলিয়ে রাখত। / সেই লোকটা চলে গেছে, আর আসবে না – / এটাই যেন ওই কবিতার সার কথা। / স্নেহ হারানো, শোক পাবার কবিতা হয়েই / ওই সোনার তরী রইল আমার কাছে।”
দ্বিতীয় অংশটি রচনার সবচেয়ে মর্মস্পর্শী ও স্মৃতিকথনমূলক অংশ। জয় গোস্বামী এখানে ‘সোনার তরী’ কবিতার সঙ্গে নিজের প্রথম পরিচয়ের কথা বলছেন। ১৯৬২ সালের জুলাই মাস, বর্ষার বিকেলবেলায়, বারান্দায় বসে। মা সঞ্চয়িতা থেকে কবিতাটি উচ্চারণ করে করে পড়ছিলেন। মায়ের কবিতা পড়ার ঝোঁক ছিল না, কিন্তু সেদিন তিনি পড়ছিলেন — কারণ এপ্রিল মাসে বাবা মারা গিয়েছিলেন। বাবার ছিল কবিতা বলা-গান গাওয়ার স্বভাব। প্রায় কালো হয়ে আসা আকাশের নীচে, সারাদিনের বৃষ্টিতে ভেজা গাছপালার মধ্যে, সেই কবিতার শেষ লাইনগুলো শুনতে শুনতে জয় গোস্বামীর মনে হয়েছিল — এই কবিতাটি তাঁর বাবার মৃত্যু নিয়েই লেখা। ‘শ্রাবণ গগন ঘিরে, ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে — শূন্য নদীর তীরে রহিনু পড়ি— যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী’ — বুকের মধ্যে চাপা কষ্টের গুরুভার। বাবা ছিল আনন্দের উৎস — সেই লোকটা চলে গেছে, আর আসবে না — এটাই যেন সেই কবিতার সার কথা। স্নেহ হারানো, শোক পাবার কবিতা হয়েই ‘সোনার তরী’ রইল তাঁর কাছে।
তৃতীয় অংশ: তর্কাতর্কি ও নিজের বোধের ওপর আস্থা
“তারপর বয়স বাড়ল, / আস্তে আস্তে বইপত্র ওল্টাতে গিয়ে দেখি – / কি ভয়ানক সব তর্কাতর্কি হয়ে গেছে / ওই কবিতা নিয়ে। / বোকার মতো ওই সোনার তরীকে / আমি শোকের কবিতা ভেবেছি কেন? / না কক্ষনো আমি কাউকে বলি না / আর ওই কবিতা নিয়ে একটি কথাও। / কিন্তু আজও যদি চোখ বন্ধ করে মনে ভাবি / ওই ‘তরুছায়ামসীমাখা’ কথাটি – / তবে আমাদের সেই রানাঘাটের সিদ্ধেশ্বরীতলার / সেই পুকুরপাড়ের বাড়ি আর তার গাছ আর / চূর্ণী নদীর তীরই মনে পড়ে।”
তৃতীয় অংশে জয় গোস্বামী নিজের বোধের ওপর আস্থার কথা বলছেন। বয়স বাড়লে তিনি দেখেন — ‘সোনার তরী’ নিয়ে কত তর্কাতর্কি। তিনি বোকার মতো কবিতাটিকে শোকের কবিতা ভেবেছিলেন কেন? তিনি কাউকে এ নিয়ে আর একটি কথাও বলেন না। কিন্তু আজও যদি চোখ বন্ধ করে ‘তরুছায়ামসীমাখা’ কথাটি ভাবেন — তবে রানাঘাটের সিদ্ধেশ্বরীতলার পুকুরপাড়ের বাড়ি আর চূর্ণী নদীর তীরই মনে পড়ে। অর্থাৎ তাঁর কাছে কবিতাটি চিরকাল শোকের ও স্মৃতির কবিতাই হয়ে থাকল।
চতুর্থ অংশ: অমল ধবল পাল — বাবার গান ও চূর্ণী নদীর নৌকো
“আরো আছে, / চূর্ণী নদী বললাম না – / তার ধারে একটা বটগাছের নীচে, / বাবার সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছি। / বাবার মুখে একটা গান – / ‘অমল ধবল পালে লেগেছে মন্দ মধুর হাওয়া । / দেখি নাই কভু দেখি নাই এমন তরণী-বাওয়া ।।’ / তরণী কী? না, নৌকো। / নৌকো তো অনেক যায় আমাদের নদী দিয়ে, / যেমন যায় কচুরিপানারা। / অমলও জানি – অমলদা, / সব-পেয়েছির আসরে ড্রিল করায়, ড্রাম বাজায়। / কিন্তু ধবল কাকে বলে? / গানের পর বাবার উত্তর – ধবল হলো সাদা। / ওই যে বালির নৌকোটাকে দেখ, ওর তো পাল আছে, / সাদা পাল, ঐরকমই। / দেখলাম বড়ো একটা নৌকো ধীরে ধীরে ভেসে চলেছে, / একটা ছই রয়েছে, / ওইরকম নৌকো কতই দাঁড়িয়ে থাকে চূর্ণীর তীরে, / নৌকোর কাণা পর্যন্ত জল, / এই নৌকোটায় বড়ো একটা পাল লাগানো। / মনের ভেতরে থেকে গেল সেই নৌকো, আর তার পাল তুলে যাওয়া। / কিন্তু পাল মোটেই অতো কিছু সাদা ছিল না, / কেমন ময়লা-ময়লা, ত্রিপল-রঙের চাদর একটা – / তখন কত বড় আমি, বছর ছয়-সাত বড় জোর।”
চতুর্থ অংশে জয় গোস্বামী বাবার সঙ্গে শেখা ‘অমল ধবল পালে’ গানের স্মৃতিচারণ করছেন। চূর্ণী নদীর ধারে বটগাছের নীচে বাবার সঙ্গে দাঁড়িয়ে শোনা সেই গান। ‘তরণী’ মানে নৌকো। ‘অমল’ মানে অমলদা, যিনি ড্রিল করান, ড্রাম বাজান। ‘ধবল’ মানে সাদা — বাবার উত্তর। বাবা বালির নৌকোর সাদা পালের কথা বললেও, জয় গোস্বামী দেখেছিলেন — নৌকোর পাল ময়লা-ময়লা, ত্রিপল-রঙের। ছয়-সাত বছর বয়সের সেই স্মৃতি আজও মনে আছে।
পঞ্চম অংশ: তিরিশ বছর বয়সে প্রেম ও পুরোনো গানের নতুন অর্থ
“তিরিশ পেরিয়ে আলাপ হলো একটি মেয়ের সঙ্গে, / সে আসে, কথা বলে, চলে যায়। / পরে দেখছি – যখনি একা হয়ে যাই, তখনি / তারই কোনো না কোনো ছবি মনে পড়ছে। / হয়তো তার একটুকরো হাসি, / কথা বলতে বলতে হঠাৎ থেমে যাওয়া, / কপালের ওপর ঝুঁকে পড়া চুল সরানো- / একি হলো? / আরো কতজনের সঙ্গেই তো কথা বলি, / কারো ক্ষেত্রে তো এমন হয় না। / সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে তার তাকিয়ে থাকা- / ভোরে ঘুম ভেঙে মনে পড়ে, / দুপুরে ঝাঁ ঝাঁ রোদে হাঁটতে হাঁটতেও মনে পড়ে, / কেন পড়ে? / আর কোনো চোখ কী আমি দেখি নি কখনো? / বুঝলাম, আমি প্রেমে পড়েছি। / একদিন এক উঁচু বাড়ির সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছি, / সামনে নেমে চলা তার উড়ন্ত আঁচল, / কোথাও কারো বাড়ি থেকে গান বাজছে – / ‘দেখি নাই কভু দেখি নাই এমন তরণী-বাওয়া ।’ / থমকে আছি, পা চলছে না – / শৈশবের সেই পুরোনো গান কী / এক নতুন মানে নিয়ে আজ আমার সামনে দাঁড়াতে এলো? / এই তরুণীই তবে সেই আশ্চর্য নৌকো বেয়ে যাওয়া? / যখন এর পর থেকে ওই গান শুনেছি, / মনে পড়েছে তার চেয়ে থাকা। / কবরখানার মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বেরিয়ে আসছি দুজনে, / পিছনে রক্তিম সূর্যাস্ত- / একটা জলের বোতল ব্যাগ থেকে বার করে এগিয়ে দেওয়ার সময় তাকিয়ে আছে- / আমাদের সেই দেখাশুনোর ওপর ছেদ পড়তে / কয়েকমাসের বেশি সময় লাগল না, / কিন্তু ওই গানের মধ্যে থেকে গেলো মেয়েটি ।”
পঞ্চম অংশে জয় গোস্বামী তিরিশ বছর বয়সে প্রেমে পড়ার কথা বলছেন। এক মেয়ের সঙ্গে আলাপ — তিনি আসেন, কথা বলেন, চলে যান। তিনি একা হয়ে গেলে তারই ছবি মনে পড়ে। ভোরে ঘুম ভেঙে, দুপুরে রোদে হাঁটতে হাঁটতেও মনে পড়ে। তিনি বুঝলেন — প্রেমে পড়েছেন। একদিন উঁচু বাড়ির সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসার সময় কোথাও গান বাজছে — ‘দেখি নাই কভু দেখি নাই এমন তরণী-বাওয়া’। তিনি থমকে যান — শৈশবের সেই পুরোনো গান এক নতুন মানে নিয়ে সামনে দাঁড়ায়। সেই তরুণীই সেই আশ্চর্য নৌকো বেয়ে যাওয়া। সেই সম্পর্কের ছেদ পড়তে কয়েকমাসের বেশি সময় লাগল না, কিন্তু ওই গানের মধ্যে থেকে গেল মেয়েটি।
ষষ্ঠ অংশ: পঞ্চাশ বছর বয়সে মেয়ের গান ও চোখের জল
“তারপর আরো উনিশ বছর কেটে গেছে। / আমার মেয়েকে যে হস্টেলে দিয়েছি, তার পাশেই গঙ্গা। / এক রবিবার বিকেলে হস্টেলের ধারেই / বটগাছের নীচে সিমেন্ট-বাঁধানো বেদীতে / বসে আছি মেয়ের সঙ্গে। / সে এখন পনেরো পেরিয়ে ষোলোয় পড়েছে। / সেও বর্ষাকাল ভালোবাসে। / আজ সারাদিনের মেঘে ঢাকা ছিল আকাশ, / কিন্তু এখন একটু পরিষ্কার। / সূর্য আস্তে নামছেন, আলো বেরিয়ে আসছে। / মেয়ে বলল, ওই দেখো- / দেখি – ছোট একটা নৌকো, / তরতর করে চলে আসছে স্রোতের সঙ্গে, / তার উপরে একটা পাল লাগানো। / মেয়ে গাইতে শুরু করল – / ‘অমল ধবল পালে লেগেছে মন্দ মধুর হাওয়া । / দেখি নাই কভু দেখি নাই এমন তরণী-বাওয়া ।। ‘ / ও শেখে-টেখে না, শুধু শুনে শুনে জানে। / কিন্তু ওর গেয়ে চলবার সঙ্গে সঙ্গে সব ভুলে / ওই গান এসে দাঁড়াল আমার পঞ্চাশ বছরের দোরগোড়ায়, / তখন আমার চোখ ভেসে যায় চোখের জলে – / এই গানের কি মানে হল তবে আমার কাছে? / আমাকে এই প্রশ্নের মধ্যে রেখে সূর্য তাঁর অস্তে চললেন। / ‘পিছনে ঝরিছে ঝরঝর জল, গুরুগুরু দেয়া ডাকে, / মুখে এসে পড়ে অরুণকিরণ ছিন্ন মেঘের ফাঁকে । / ওগো কান্ডারী, কে গো তুমি, কার হাসিকান্নার ধন / ভেবে মরে মোর মন।’”
ষষ্ঠ অংশটি রচনার চূড়ান্ত ও সবচেয়ে শক্তিশালী সমাপ্তি। উনিশ বছর কেটে গেছে। জয় গোস্বামীর মেয়ে এখন পনেরো পেরিয়ে ষোলোয়। হস্টেলের পাশে গঙ্গা। এক রবিবার বিকেলে মেয়ের সঙ্গে বটগাছের নীচে বসে থাকার সময় মেয়ে গাইতে শুরু করে — ‘অমল ধবল পালে লেগেছে মন্দ মধুর হাওয়া…’ মেয়ে শেখে-টেখে না, শুধু শুনে শুনে জানে। কিন্তু ওর গেয়ে চলবার সঙ্গে সঙ্গে সব ভুলে ওই গান এসে দাঁড়ায় জয় গোস্বামীর পঞ্চাশ বছরের দোরগোড়ায় — তখন তাঁর চোখ ভেসে যায় চোখের জলে। তিনি প্রশ্ন করেন — এই গানের কী মানে হল তাঁর কাছে? এই প্রশ্নের মধ্যে রেখে সূর্য তাঁর অস্তে চললেন। শেষে তিনি ‘সোনার তরী’ কবিতার শেষ লাইনগুলো উদ্ধৃত করেছেন — ‘পিছনে ঝরিছে ঝরঝর জল, গুরুগুরু দেয়া ডাকে, মুখে এসে পড়ে অরুণকিরণ ছিন্ন মেঘের ফাঁকে। ওগো কান্ডারী, কে গো তুমি, কার হাসিকান্নার ধন, ভেবে মরে মোর মন।’
রচনাটির গঠনশৈলী, ভাষা ও শিল্পরূপ
জয় গোস্বামীর ‘নিজের রবীন্দ্রনাথ’ একটি গদ্যকাব্য বা কাব্যগদ্য। এটি ছন্দময় গদ্য, প্রায় কবিতার কাছাকাছি। লাইনগুলো খণ্ডিত, শ্বাসের ছন্দে বিভক্ত। ভাষা অত্যন্ত সরল, কথোপকথনের মতো, কিন্তু আবেগ গভীর। তিনি বারবার ‘আমি’, ‘আমার’ শব্দ ব্যবহার করেছেন — আত্মকেন্দ্রিকতার মাধ্যমে সর্বজনীনতা সৃষ্টি করেছেন।
প্রতীক ও চিত্রকল্প উল্লেখযোগ্য — ‘বাইশে শ্রাবণ’, ‘উৎসুক চোখ’, ‘স্কুলপাঠ্য অঙ্ক’, ‘সোনার তরী’, ‘বর্ষার বিকেল’, ‘স্লেট-রঙের কালো আকাশ’, ‘মায়ের উচ্চারণ’, ‘বাবার মৃত্যু’, ‘শ্রাবণ গগন ঘিরে’, ‘চূর্ণী নদী’, ‘বটগাছ’, ‘অমল ধবল পাল’, ‘তরণী-বাওয়া’, ‘সব-পেয়েছির আসর’, ‘প্রেমে পড়া’, ‘উড়ন্ত আঁচল’, ‘কবরখানা ও সূর্যাস্ত’, ‘গঙ্গা’, ‘মেয়ের গান’, ‘পঞ্চাশ বছরের দোরগোড়া’, ‘চোখের জল’, ‘ওগো কান্ডারী’।
পুনরাবৃত্তি ও প্রশ্ন শৈলী গুরুত্বপূর্ণ — ‘এক-এক জনের রবীন্দ্রনাথ এক-এক রকম’, ‘আমার জীবনে’, ‘কী মানে হল তবে আমার কাছে?’ — বারবার প্রশ্ন।
শেষের ‘আমাকে এই প্রশ্নের মধ্যে রেখে সূর্য তাঁর অস্তে চললেন’ — এটি একটি অসাধারণ ও রহস্যময় সমাপ্তি। প্রশ্নের উত্তর নেই, শুধু সূর্যাস্ত আর প্রশ্ন থেকে যায়।
রচনাটির সামগ্রিক তাৎপর্য ও দার্শনিক মাত্রা
“নিজের রবীন্দ্রনাথ” জয় গোস্বামীর এক অসাধারণ ও চিরকালীন সৃষ্টি। এটি রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে এক ব্যক্তির সারা জীবনের সম্পর্কের কাহিনি — শৈশব থেকে পঞ্চাশ বছর বয়স পর্যন্ত। এটি দেখায় — রবীন্দ্রনাথকে বোঝার জন্য কোনো একক সঠিক পদ্ধতি নেই। প্রতিটি পাঠকের নিজস্ব রবীন্দ্রনাথ আছে — যিনি শৈশবের স্মৃতিতে মিশে থাকেন, বাবার মৃত্যুর শোকে রঙিন হন, প্রেমের প্রথম অনুভূতিতে জেগে ওঠেন, মেয়ের কণ্ঠে ফিরে আসেন। শেষের প্রশ্ন — ‘এই গানের কী মানে হল তবে আমার কাছে?’ — এর কোনো উত্তর নেই। হয়তো উত্তরটাই এই প্রশ্ন।
জয় গোস্বামীর শ্রেষ্ঠ রচনা: নিজের রবীন্দ্রনাথ-র স্থান ও গুরুত্ব
জয় গোস্বামীর বহু জটিল ও জনপ্রিয় রচনার মধ্যে ‘নিজের রবীন্দ্রনাথ’ একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে। এটি আত্মজৈবনিক গদ্যকাব্যের একটি অসাধারণ উদাহরণ। রবীন্দ্রনাথকে ব্যক্তিগত ও আবেগের স্তরে বোঝার এই প্রয়াস বাংলা সাহিত্যে বিরল।
শিক্ষামূলক গুরুত্ব ও পাঠ্যক্রমিক স্থান
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাংলা সাহিত্যের উচ্চতর পাঠ্যক্রমে জয় গোস্বামীর ‘নিজের রবীন্দ্রনাথ’ রচনাটি অন্তর্ভুক্ত থাকার যোগ্য। এটি শিক্ষার্থীদের আত্মজৈবনিক রচনার ধারা, রবীন্দ্রচেতনার ব্যক্তিগত রূপায়ণ, এবং গদ্যকাব্যের কাঠামো সম্পর্কে গভীর ধারণা দিতে পারে।
নিজের রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে বিস্তারিত প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: ‘নিজের রবীন্দ্রনাথ’ রচনাটির লেখক কে?
এই রচনাটির লেখক জয় গোস্বামী। তিনি একজন বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি কবি। তিনি আত্মজৈবনিক উপাদান ও রবীন্দ্রচেতনার জন্য পরিচিত।
প্রশ্ন ২: ‘এক-এক জনের রবীন্দ্রনাথ এক-এক রকম’ — লাইনটির তাৎপর্য কী?
জয় গোস্বামী এখানে বলতে চেয়েছেন — রবীন্দ্রনাথ কোন স্কুলপাঠ্য অঙ্ক নন, যার একটাই সঠিক উত্তর আছে। প্রতিটি পাঠকের নিজস্ব রবীন্দ্রনাথ আছে — নিজের জীবন, অভিজ্ঞতা ও আবেগের আলোকে তিনি রবীন্দ্রনাথকে দেখেন।
প্রশ্ন ৩: জয় গোস্বামী কীভাবে প্রথম ‘সোনার তরী’ কবিতাটি পেয়েছিলেন?
১৯৬২ সালের জুলাই মাসে, বর্ষার বিকেলবেলায়, বারান্দায় বসে। তাঁর মা সঞ্চয়িতা থেকে উচ্চারণ করে করে কবিতাটি পড়ছিলেন। মায়ের কবিতা পড়ার ঝোঁক ছিল না, কিন্তু সেদিন তিনি পড়ছিলেন — কারণ এপ্রিল মাসে বাবা মারা গিয়েছিলেন। বাবার স্মৃতিতে মা কবিতাটি পড়ছিলেন। সেই সন্ধ্যায় জয় গোস্বামীর মনে হয়েছিল — এই কবিতাটি তাঁর বাবার মৃত্যু নিয়েই লেখা।
প্রশ্ন ৪: ‘সোনার তরী’ কবিতাটি জয় গোস্বামীর কাছে কী অর্থ বহন করে?
জয় গোস্বামীর কাছে ‘সোনার তরী’ চিরকাল শোকের কবিতা — বাবার মৃত্যুর কবিতা। ‘যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী’ — বাবা চলে গেছেন, আর আসবেন না। পরবর্তী জীবনে তিনি জানতে পারেন কবিতাটি নিয়ে নানা তর্কাতর্কি, কিন্তু তাঁর কাছে কবিতাটি চিরকাল স্নেহ হারানো, শোক পাবার কবিতাই হয়ে থাকে।
প্রশ্ন ৫: ‘অমল ধবল পালে’ গানটির সঙ্গে জয় গোস্বামীর জীবনের কী সম্পর্ক?
এই গানটি প্রথম শুনেছিলেন বাবার কাছে, চূর্ণী নদীর ধারে বটগাছের নীচে, ছয়-সাত বছর বয়সে। তিরিশ বছর বয়সে প্রেমে পড়ার সময় এই গানটি নতুন অর্থ নিয়ে সামনে দাঁড়ায় — প্রেমিকাই সেই আশ্চর্য নৌকো বেয়ে যাওয়া। পঞ্চাশ বছর বয়সে মেয়ের কণ্ঠে এই গান শুনে তাঁর চোখ ভেসে যায় জলে। এই গানটি তাঁর শৈশব, প্রেম ও পিতৃত্ব — তিনটি যুগকে একসঙ্গে জুড়ে দিয়েছে।
প্রশ্ন ৬: শেষের ‘আমাকে এই প্রশ্নের মধ্যে রেখে সূর্য তাঁর অস্তে চললেন’ — লাইনটির তাৎপর্য কী?
পঞ্চাশ বছর বয়সে মেয়ের গান শুনে জয় গোস্বামী প্রশ্ন করছেন — এই গানের কী মানে হল তাঁর কাছে? এই প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। প্রশ্নটি রয়ে যায়, আর সেই প্রশ্নের মধ্যে রেখে সূর্য অস্তে যায়। এটি জীবনের চিরন্তন প্রশ্নের প্রতীক — যার উত্তর হয়তো কখনো পাওয়া যায় না।
প্রশ্ন ৭: ‘ওগো কান্ডারী, কে গো তুমি, কার হাসিকান্নার ধন’ — লাইনটির তাৎপর্য কী?
এটি ‘সোনার তরী’ কবিতার শেষ লাইন। জয় গোস্বামী তাঁর রচনা শেষ করেছেন এই লাইন দিয়ে। ‘কান্ডারী’ মানে নৌকার মাঝি। তিনি প্রশ্ন করছেন — এই মাঝি কে? তিনি কার হাসি-কান্নার ধন? এই প্রশ্নটিও অমীমাংসিত — যেমন অমীমাংসিত তাঁর নিজের প্রশ্ন।
প্রশ্ন ৮: রচনাটির মূল বক্তব্য কী?
রচনাটির মূল বক্তব্য হলো — রবীন্দ্রনাথকে বোঝার জন্য কোনো একক সঠিক পদ্ধতি নেই। প্রতিটি পাঠকের নিজস্ব রবীন্দ্রনাথ আছে — যিনি শৈশবের স্মৃতিতে মিশে থাকেন, বাবার মৃত্যুর শোকে রঙিন হন, প্রেমের প্রথম অনুভূতিতে জেগে ওঠেন, মেয়ের কণ্ঠে ফিরে আসেন। নিজের রবীন্দ্রনাথকে খুঁজে পাওয়াই আসল।
ট্যাগস: নিজের রবীন্দ্রনাথ, জয় গোস্বামী, জয় গোস্বামীর রচনা, রবীন্দ্রনাথ ও ব্যক্তিগত বোধ, সোনার তরী, অমল ধবল পাল, আত্মজৈবনিক গদ্যকাব্য
© Kobitarkhata.com – লেখক: জয় গোস্বামী | রচনার প্রথম লাইন: “সেটা ছিল বাইশে শ্রাবণ” | রবীন্দ্রনাথ ও ব্যক্তিগত বোধের অসাধারণ মেলবন্ধন | আধুনিক বাংলা গদ্যকাব্যের চিরকালীন নিদর্শন