কবিতার খাতা
- 28 mins
সূর্যস্পর্শ – মল্লিকা সেনগুপ্ত ।
কুয়াশা ঘিরে নিল, নৌকো ঢেকে নিল, বাতাস খুলে নিল তন্তুবাস
আমি তো জলনারী, ভীষণ ভয় পেয়ে খুঁজছিলাম কোনও নির্ভর
একটি ডিঙি ছিল আমার সঙ্গিনী, সবুজ ভাগীরথী শিক্ষিকা
আমাকে দিয়েছিল শ্যাওলা পায়জোর, দিয়েছে সারা গায় পলির ঘ্রাণ
তখন ঝড় এল, তখন মেঘ এল, বর্ষাজল যেন নামবে ঘাসে
কিন্তু নামল না, এগিয়ে এল এক কৃষ্ণরূপ মেঘ আমার দিকে
সূর্যস্পর্শার ব্যাকুল দুই হাত ডাকল মেঘ এসো রক্ষা করো
ডিঙি যে ডুবে যায়, কাপড় উড়ে তাকে পালের মতো শুধু ভাসিয়েছে
মহিষরং মেঘে রক্তকিংশুক জরির পাড় যেন আগুন গাছ
বলল মেঘ, আমি মেঘ না, মহাভয়, মুগ্ধ দুই চোখে জ্বলছে রূপ
দু’চোখ খুলে দেখি সৌম্যদর্শন পুরুষ একজন পূর্বাকাশে
নিম্ন নাভিমূলে তড়িৎ পাক দিল, রক্ত কেটে এল গা পোড়া জ্বর
ঘূর্ণমান মাথা, পা টলে পড়লাম অনার্যের দুই বাড়ানো হাতে
আর আমি পারছি না, ভাসুক আজ সব, আমার বন্যায় ভেসে যাক।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। মল্লিকা সেনগুপ্ত ।
সূর্যস্পর্শ – মল্লিকা সেনগুপ্ত | সূর্যস্পর্শ কবিতা | মল্লিকা সেনগুপ্তের কবিতা | বাংলা কবিতা
সূর্যস্পর্শ: মল্লিকা সেনগুপ্তের নারী, প্রকৃতি ও পুরাণের অসাধারণ কাব্যভাষা
মল্লিকা সেনগুপ্তের “সূর্যস্পর্শ” কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের একটি অনন্য সৃষ্টি, যা নারী, প্রকৃতি, পুরাণ ও আত্মার এক গভীর দার্শনিক অন্বেষণ। “কুয়াশা ঘিরে নিল, নৌকো ঢেকে নিল, বাতাস খুলে নিল তন্তুবাস” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে এক রহস্যময় জগৎ, যেখানে জলনারী, নৌকো, নদী, মেঘ, এবং এক রহস্যময় পুরুষের আবির্ভাব ঘটে। মল্লিকা সেনগুপ্ত বাংলা কবিতার একজন শক্তিমান কবি। তার কবিতায় নারীচেতনা, প্রকৃতি, পুরাণ ও আধুনিক জীবনের জটিল সম্পর্ক ফুটে ওঠে। “সূর্যস্পর্শ” তার একটি বহুপঠিত কবিতা যা পাঠকের মনে গভীর দাগ কাটে।
মল্লিকা সেনগুপ্ত: নারীচেতনার কবি
মল্লিকা সেনগুপ্ত বাংলা কবিতার একজন শক্তিমান কবি। তার কবিতায় নারীচেতনা, প্রকৃতি, পুরাণ ও আধুনিক জীবনের জটিল সম্পর্ক ফুটে ওঠে। তিনি সহজ-সরল ভাষায় গভীর জীবনবোধ ও নারীর অন্তর্জগতের জটিলতা ফুটিয়ে তোলেন। “সূর্যস্পর্শ” তার একটি বহুপঠিত কবিতা যা নারী, প্রকৃতি ও পুরাণের এক অসাধারণ সম্মিলন ঘটিয়েছে। মল্লিকা সেনগুপ্তের কবিতা পাঠককে ভাবায়, আন্দোলিত করে এবং নিজের ভেতরে তাকাতে বাধ্য করে। তিনি বাংলা কবিতায় এক স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত।
সূর্যস্পর্শ কবিতার বিস্তারিত বিশ্লেষণ
কবিতার পটভূমি ও সেটিং
“সূর্যস্পর্শ” কবিতার পটভূমি প্রকৃতি ও জল-অভ্যন্তরীণ বাংলার চিরাচরিত পরিবেশ। নদী, নৌকো, কুয়াশা, মেঘ, বৃষ্টি — এই সব উপাদান নিয়ে কবি এক রহস্যময় জগৎ তৈরি করেছেন। কবিতার শুরুতে দেখা যায় — কুয়াশা ঘিরে নিচ্ছে, নৌকো ঢেকে নিচ্ছে, বাতাস খুলে নিচ্ছে তন্তুবাস। এই দৃশ্য একটি সংকটময় মুহূর্তের ইঙ্গিত দেয়। কবি নিজেকে ‘জলনারী’ বলে পরিচয় দিয়েছেন — যিনি জলের সাথে সম্পর্কিত, নদীর সাথে একাত্ম। তিনি ভয় পেয়ে নির্ভর খুঁজছিলেন।
প্রথম স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“কুয়াশা ঘিরে নিল, নৌকো ঢেকে নিল, বাতাস খুলে নিল তন্তুবাস / আমি তো জলনারী, ভীষণ ভয় পেয়ে খুঁজছিলাম কোনও নির্ভর” — এই পঙ্ক্তিগুলোতে কবি একটি সংকটময় মুহূর্তের চিত্র এঁকেছেন। কুয়াশা ঘিরে নিচ্ছে — দৃষ্টি সীমিত হয়ে আসছে, পথ হারানোর ভয়। নৌকো ঢেকে নিচ্ছে — আশ্রয় হারানোর ভয়। বাতাস খুলে নিল তন্তুবাস — তন্তুবাস অর্থ কাপড়, বাতাস তাকে উড়িয়ে নিচ্ছে, তিনি অসহায়। তিনি নিজেকে ‘জলনারী’ বলে পরিচয় দিয়েছেন — জলনারী মানে জলের নারী, জলপরী বা নদীর সাথে সম্পর্কিত এক সত্তা। তিনি ভয় পেয়েছেন, নির্ভর খুঁজছেন।
জলনারী চরিত্রের তাৎপর্য
জলনারী বাংলা পুরাণ ও লোককথার একটি চরিত্র। জলপরী, নদীর দেবী বা নদীর সাথে সম্পর্কিত নারীসত্তা। এখানে কবি নিজেকে জলনারী বলেছেন — অর্থাৎ তিনি নদীর সাথে একাত্ম, জলের সাথে সম্পর্কিত। নদী যেমন চিরস্থায়ী, তেমনি তিনিও চিরস্থায়ী। নদী যেমন বহমান, তেমনি তিনিও বহমান। কিন্তু এই মুহূর্তে তিনি ভয় পেয়েছেন — কারণ নদীতে ঝড় উঠেছে, তার অস্তিত্ব বিপন্ন।
দ্বিতীয় স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“একটি ডিঙি ছিল আমার সঙ্গিনী, সবুজ ভাগীরথী শিক্ষিকা / আমাকে দিয়েছিল শ্যাওলা পায়জোর, দিয়েছে সারা গায় পলির ঘ্রাণ” — এই পঙ্ক্তিগুলোতে কবি তার অতীতের কথা বলেছেন। একটি ডিঙি ছিল তার সঙ্গিনী — নৌকো তার বন্ধু, তার আশ্রয়। সবুজ ভাগীরথী শিক্ষিকা — ভাগীরথী নদী তার শিক্ষিকা, তাকে জীবন শিখিয়েছে। নদী তাকে দিয়েছে শ্যাওলা পায়জোর — শ্যাওলা দিয়ে তৈরি পায়জামা, যা নদীর উপহার। সারা গায়ে দিয়েছে পলির ঘ্রাণ — নদীর পলির গন্ধ, যা নদীর সান্নিধ্যের প্রতীক। এই পঙ্ক্তিগুলোতে কবি নদীর সাথে তার গভীর সম্পর্কের কথা বলেছেন। নদী তার শিক্ষিকা, নদী তাকে জীবন দিয়েছে, নদীর পলি তার গায়ে লেগে আছে।
ডিঙির প্রতীকী তাৎপর্য
ডিঙি একটি ছোট নৌকো। এটি জীবনের ছোট আশ্রয়ের প্রতীক। ডিঙি ছিল কবির সঙ্গিনী — অর্থাৎ তিনি একা নন, তার একটি সঙ্গী আছে। ডিঙি তাকে ঝড়ের সময় আশ্রয় দিত, তাকে নদীতে ভাসিয়ে রাখত। কিন্তু এখন ডিঙি ডুবে যাচ্ছে — তার শেষ আশ্রয়টিও হারিয়ে যাচ্ছে।
ভাগীরথী নদীর তাৎপর্য
ভাগীরথী নদী গঙ্গার একটি শাখা। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, রাজা ভাগীরথ গঙ্গাকে স্বর্গ থেকে মর্ত্যে এনেছিলেন। ভাগীরথী নদী তাই পবিত্র নদী, মোক্ষদায়িনী। এখানে ভাগীরথী কবির শিক্ষিকা — অর্থাৎ নদী তাকে জীবন শিক্ষা দিয়েছে। নদী তাকে শিখিয়েছে কীভাবে বয়ে চলতে হয়, কীভাবে বাধা অতিক্রম করতে হয়।
শ্যাওলা পায়জোর ও পলির ঘ্রাণের তাৎপর্য
শ্যাওলা পায়জোর — শ্যাওলা দিয়ে তৈরি পায়জামা। এটি নদীর উপহার, নদীর সান্নিধ্যের প্রতীক। পলির ঘ্রাণ — নদীর পলির গন্ধ, যা উর্বরতার প্রতীক। এই চিত্রকল্পগুলো কবির নদীর সাথে একাত্ম হওয়ার প্রতীক। তিনি শুধু নদীর ধারে থাকেন না, তিনি নদীর অংশ, নদীর সন্তান।
তৃতীয় স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“তখন ঝড় এল, তখন মেঘ এল, বর্ষাজল যেন নামবে ঘাসে / কিন্তু নামল না, এগিয়ে এল এক কৃষ্ণরূপ মেঘ আমার দিকে” — এই পঙ্ক্তিগুলোতে কবি সংকটের মুহূর্ত বর্ণনা করেছেন। ঝড় এল, মেঘ এল, মনে হলো বর্ষাজল নামবে ঘাসে — স্বাভাবিক বৃষ্টি হবে। কিন্তু নামল না — অস্বাভাবিক কিছু ঘটল। এগিয়ে এল এক কৃষ্ণরূপ মেঘ তার দিকে — একটি কালো মেঘ, কিন্তু তা স্বাভাবিক মেঘ নয়, কৃষ্ণরূপ — অর্থাৎ বিষ্ণুর রূপ। কৃষ্ণরূপ মেঘ তার দিকে এগিয়ে এল — একটি রহস্যময়, পৌরাণিক সত্তার আবির্ভাব ঘটল।
কৃষ্ণরূপ মেঘের তাৎপর্য
কৃষ্ণরূপ — বিষ্ণুর রূপ। বিষ্ণু সংহারকর্তা ও পালনকর্তা। কৃষ্ণরূপ মেঘ এখানে একটি রহস্যময়, শক্তিশালী সত্তার প্রতীক। এই মেঘ সাধারণ মেঘ নয়, এটি মহাভয় — মহাভয়ঙ্কর। কিন্তু একই সাথে মুগ্ধ দুই চোখে জ্বলছে রূপ — এটি সৌন্দর্যময়, আকর্ষণীয়। এই দ্বৈত চরিত্র — ভয়ংকর ও সৌন্দর্যময় — কৃষ্ণরূপ মেঘকে করেছে রহস্যময়।
চতুর্থ স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“সূর্যস্পর্শার ব্যাকুল দুই হাত ডাকল মেঘ এসো রক্ষা করো / ডিঙি যে ডুবে যায়, কাপড় উড়ে তাকে পালের মতো শুধু ভাসিয়েছে” — এই পঙ্ক্তিগুলোতে ‘সূর্যস্পর্শা’ শব্দটি এসেছে। সূর্যস্পর্শা কে? সম্ভবত কবির নিজের নাম, অথবা কবিতার নায়িকার নাম। তার ব্যাকুল দুই হাত ডাকল — তিনি মেঘকে ডাকলেন রক্ষা করতে। কারণ ডিঙি ডুবে যাচ্ছে, তার শেষ আশ্রয় হারিয়ে যাচ্ছে। কাপড় উড়ে তাকে পালের মতো ভাসিয়েছে — তার কাপড় উড়ে গিয়ে পালের মতো কাজ করছে, তাকে ভাসিয়ে রাখছে। কিন্তু এটা সাময়িক, স্থায়ী নয়।
সূর্যস্পর্শা নামের তাৎপর্য
সূর্যস্পর্শা — সূর্যকে স্পর্শ করে যে। সূর্য আলোর উৎস, জীবনের উৎস। সূর্যস্পর্শা মানে যিনি সূর্যের কাছাকাছি, যিনি আলোর সন্ধানী। কিন্তু এই মুহূর্তে তিনি অন্ধকারে, ঝড়ের মধ্যে, বিপন্ন। তিনি মেঘকে ডাকছেন — যিনি সূর্যকে ঢেকে দেন, আলোকে আড়াল করেন। এই দ্বন্দ্ব অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
পঞ্চম স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“মহিষরং মেঘে রক্তকিংশুক জরির পাড় যেন আগুন গাছ / বলল মেঘ, আমি মেঘ না, মহাভয়, মুগ্ধ দুই চোখে জ্বলছে রূপ” — এই পঙ্ক্তিগুলোতে মেঘের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। মহিষরং মেঘ — মহিষের রঙের মতো কালো মেঘ। সেই মেঘে রক্তকিংশুক জরির পাড় — লাল কিংশুক ফুলের জরির পাড়, আগুন গাছের মতো জ্বলছে। এই চিত্রটি অত্যন্ত রহস্যময়। তারপর মেঘ বলল — আমি মেঘ না, মহাভয়। আমি মহাভয় — অর্থাৎ আমি ভয়ংকর, আমি বিপদ। কিন্তু মুগ্ধ দুই চোখে জ্বলছে রূপ — তার চোখে রূপ জ্বলছে, তিনি সৌন্দর্যময়। এই দ্বৈত চরিত্র — ভয়ংকর ও সৌন্দর্যময় — মহাভয়কে করেছে রহস্যময়।
মহিষরং মেঘের তাৎপর্য
মহিষরং মেঘ — মহিষের রঙের মতো কালো মেঘ। মহিষ অসুরের প্রতীক, যাকে দুর্গা বধ করেছিলেন। মহিষরং মেঘ তাই অসুরের প্রতীক, অন্ধকারের প্রতীক। কিন্তু এই মেঘে রক্তকিংশুক জরির পাড় — লাল কিংশুক ফুলের জরির পাড়। কিংশুক ফুল লাল, আগুনের মতো। এই লাল রং বিপদের প্রতীক, আবার শক্তির প্রতীক। আগুন গাছের মতো জ্বলছে — এই মেঘ অন্ধকার হলেও আলো ছড়াচ্ছে।
মহাভয়ের তাৎপর্য
মহাভয় — মহাভয়ঙ্কর। তিনি নিজেকে মেঘ না বলে মহাভয় বলেছেন। তিনি ভয়ংকর, তিনি বিপদ। কিন্তু তার চোখে জ্বলছে রূপ — তিনি সৌন্দর্যময়। এই দ্বৈত চরিত্রের মাধ্যমে কবি দেখাতে চেয়েছেন — ভয় ও সৌন্দর্য একসাথে থাকতে পারে। বিপদও সুন্দর হতে পারে, ভয়ংকরও আকর্ষণীয় হতে পারে।
ষষ্ঠ স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“দু’চোখ খুলে দেখি সৌম্যদর্শন পুরুষ একজন পূর্বাকাশে / নিম্ন নাভিমূলে তড়িৎ পাক দিল, রক্ত কেটে এল গা পোড়া জ্বর / ঘূর্ণমান মাথা, পা টলে পড়লাম অনার্যের দুই বাড়ানো হাতে” — এই পঙ্ক্তিগুলোতে কবি সেই রহস্যময় পুরুষের বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি চোখ খুলে দেখেন পূর্বাকাশে সৌম্যদর্শন পুরুষ একজন। পূর্বাকাশ — পূর্ব দিকের আকাশ, যেখান থেকে সূর্য ওঠে। সৌম্যদর্শন পুরুষ — শান্ত, সুদর্শন পুরুষ। কিন্তু তার নিম্ন নাভিমূলে তড়িৎ পাক দিল — বিদ্যুৎ খেলে গেল। রক্ত কেটে এল গা পোড়া জ্বর — তার শরীরে জ্বর এল। ঘূর্ণমান মাথা — তার মাথা ঘুরছে। পা টলে পড়লেন অনার্যের দুই বাড়ানো হাতে — তিনি অনার্যের হাতে পড়ে গেলেন। অনার্য — আর্য নয় যে, অসভ্য, বর্বর। তিনি সেই বর্বরের হাতে পড়ে গেলেন।
সৌম্যদর্শন পুরুষের তাৎপর্য
সৌম্যদর্শন পুরুষ — শান্ত, সুদর্শন পুরুষ। তিনি পূর্বাকাশে — যেখান থেকে সূর্য ওঠে, আলোর উৎস। তিনি আলোর প্রতীক, শান্তির প্রতীক। কিন্তু তার নিম্ন নাভিমূলে তড়িৎ পাক দিল — বিদ্যুৎ খেলে গেল। নাভিমূল কামশক্তির কেন্দ্র। সেখানে বিদ্যুৎ পাক দেওয়া মানে যৌনতার জাগরণ, শক্তির সঞ্চার। এই শক্তি কবিকে অভিভূত করে।
অনার্যের হাতে পতনের তাৎপর্য
অনার্য — আর্য নয় যে, অসভ্য, বর্বর। অনার্যের হাতে পতন মানে সভ্যতার বাইরে চলে যাওয়া, অজানায় পতিত হওয়া। কবি সেই অনার্যের দুই বাড়ানো হাতে পড়ে গেলেন — অর্থাৎ তিনি আত্মসমর্পণ করলেন, নিজেকে সম্পূর্ণভাবে ছেড়ে দিলেন। এটি মৃত্যুর প্রতীক, আবার নতুন জন্মের প্রতীকও হতে পারে।
সপ্তম স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“আর আমি পারছি না, ভাসুক আজ সব, আমার বন্যায় ভেসে যাক।” শেষ পঙ্ক্তিটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কবি বলেছেন — আর তিনি পারছেন না। সব ভাসুক আজ, তার বন্যায় ভেসে যাক। ‘আমার বন্যায়’ — তার নিজের বন্যায়, তার সৃষ্ট বন্যায়। তিনি নিজেই বন্যা, তিনি নিজেই ধ্বংস। তিনি সব ভাসিয়ে দিতে চান — নিজেকে, জগৎকে, সব কিছুকে। এটি আত্মসমর্পণের চূড়ান্ত পর্যায়।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য
“সূর্যস্পর্শ” কবিতাটি নারী, প্রকৃতি ও পুরাণের এক অসাধারণ সম্মিলন। কবি নিজেকে জলনারী হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন — নদীর সাথে সম্পর্কিত এক নারী। নদী তার শিক্ষিকা, তাকে জীবন শিক্ষা দিয়েছে। কিন্তু ঝড় এল, মেঘ এল — সংকট এল। এক কৃষ্ণরূপ মেঘ এগিয়ে এল — এক রহস্যময় পুরুষের আবির্ভাব ঘটল। তিনি নিজেকে মহাভয় বললেন — ভয়ংকর অথচ সৌন্দর্যময়। কবি সেই পুরুষকে দেখে অভিভূত হলেন — তার নাভিমূলে তড়িৎ পাক দিল, জ্বর এল, মাথা ঘুরল। শেষে তিনি অনার্যের হাতে পড়ে গেলেন — আত্মসমর্পণ করলেন। শেষ পঙ্ক্তিতে তিনি বললেন — আর পারছি না, সব ভাসুক, তার বন্যায় ভেসে যাক। এই কবিতা নারীর আত্মসমর্পণ ও নতুন করে জন্মের এক অসাধারণ কাব্যভাষা।
সূর্যস্পর্শ কবিতা সম্পর্কে প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: সূর্যস্পর্শ কবিতার লেখক কে?
সূর্যস্পর্শ কবিতার লেখক মল্লিকা সেনগুপ্ত। তিনি বাংলা কবিতার একজন শক্তিমান কবি। তার কবিতায় নারীচেতনা, প্রকৃতি, পুরাণ ও আধুনিক জীবনের জটিল সম্পর্ক ফুটে ওঠে। “সূর্যস্পর্শ” তার একটি বহুপঠিত কবিতা যা নারী, প্রকৃতি ও পুরাণের এক অসাধারণ সম্মিলন ঘটিয়েছে।
প্রশ্ন ২: সূর্যস্পর্শ কবিতার মূল বিষয়বস্তু কী?
সূর্যস্পর্শ কবিতার মূল বিষয়বস্তু হলো নারীর আত্মসমর্পণ, প্রকৃতির সাথে তার সম্পর্ক এবং রহস্যময় পুরুষের আবির্ভাবে তার অভিভূত হওয়া। কবি নিজেকে জলনারী হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন, নদী তার শিক্ষিকা। ঝড় ও মেঘের আবির্ভাবে এক রহস্যময় পুরুষ আসে, যে নিজেকে মহাভয় বলে পরিচয় দেয়। কবি তার সৌন্দর্যে অভিভূত হয়ে অনার্যের হাতে পতিত হন এবং সব ভাসিয়ে দিতে চান।
প্রশ্ন ৩: ‘জলনারী’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
জলনারী বাংলা পুরাণ ও লোককথার একটি চরিত্র। জলপরী, নদীর দেবী বা নদীর সাথে সম্পর্কিত নারীসত্তা। এখানে কবি নিজেকে জলনারী বলেছেন — অর্থাৎ তিনি নদীর সাথে একাত্ম, জলের সাথে সম্পর্কিত। নদী যেমন চিরস্থায়ী, তেমনি তিনিও চিরস্থায়ী। নদী যেমন বহমান, তেমনি তিনিও বহমান। কিন্তু এই মুহূর্তে তিনি ভয় পেয়েছেন — কারণ নদীতে ঝড় উঠেছে, তার অস্তিত্ব বিপন্ন।
প্রশ্ন ৪: ‘কৃষ্ণরূপ মেঘ’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
কৃষ্ণরূপ — বিষ্ণুর রূপ। বিষ্ণু সংহারকর্তা ও পালনকর্তা। কৃষ্ণরূপ মেঘ এখানে একটি রহস্যময়, শক্তিশালী সত্তার প্রতীক। এই মেঘ সাধারণ মেঘ নয়, এটি মহাভয় — মহাভয়ঙ্কর। কিন্তু একই সাথে মুগ্ধ দুই চোখে জ্বলছে রূপ — এটি সৌন্দর্যময়, আকর্ষণীয়। এই দ্বৈত চরিত্র — ভয়ংকর ও সৌন্দর্যময় — কৃষ্ণরূপ মেঘকে করেছে রহস্যময়।
প্রশ্ন ৫: ‘সৌম্যদর্শন পুরুষ’ ও ‘অনার্য’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
সৌম্যদর্শন পুরুষ — শান্ত, সুদর্শন পুরুষ। তিনি পূর্বাকাশে — যেখান থেকে সূর্য ওঠে, আলোর উৎস। তিনি আলোর প্রতীক, শান্তির প্রতীক। কিন্তু তার নিম্ন নাভিমূলে তড়িৎ পাক দিল — যৌনতার জাগরণ, শক্তির সঞ্চার। অনার্য — আর্য নয় যে, অসভ্য, বর্বর। অনার্যের হাতে পতন মানে সভ্যতার বাইরে চলে যাওয়া, অজানায় পতিত হওয়া।
প্রশ্ন ৬: ‘আমার বন্যায় ভেসে যাক’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘আমার বন্যায় ভেসে যাক’ — শেষ পঙ্ক্তিটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কবি বলেছেন — আর তিনি পারছেন না। সব ভাসুক আজ, তার বন্যায় ভেসে যাক। ‘আমার বন্যায়’ — তার নিজের বন্যায়, তার সৃষ্ট বন্যায়। তিনি নিজেই বন্যা, তিনি নিজেই ধ্বংস। তিনি সব ভাসিয়ে দিতে চান — নিজেকে, জগৎকে, সব কিছুকে। এটি আত্মসমর্পণের চূড়ান্ত পর্যায়।
প্রশ্ন ৭: মল্লিকা সেনগুপ্ত সম্পর্কে সংক্ষেপে বলুন।
মল্লিকা সেনগুপ্ত বাংলা কবিতার একজন শক্তিমান কবি। তার কবিতায় নারীচেতনা, প্রকৃতি, পুরাণ ও আধুনিক জীবনের জটিল সম্পর্ক ফুটে ওঠে। তিনি সহজ-সরল ভাষায় গভীর জীবনবোধ ও নারীর অন্তর্জগতের জটিলতা ফুটিয়ে তোলেন। “সূর্যস্পর্শ” তার একটি বহুপঠিত কবিতা যা নারী, প্রকৃতি ও পুরাণের এক অসাধারণ সম্মিলন ঘটিয়েছে।
ট্যাগস: সূর্যস্পর্শ, মল্লিকা সেনগুপ্ত, মল্লিকা সেনগুপ্তের কবিতা, সূর্যস্পর্শ কবিতা, বাংলা কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, নারীচেতনার কবিতা, জলনারী, কৃষ্ণরূপ মেঘ, মহাভয়






