কবিতার খাতা
- 30 mins
পাখি হয়ে যায় প্রাণ – আবুল হাসান।
পাখি হয়ে যায় প্রাণ – আবুল হাসান | পাখি হয়ে যায় প্রাণ কবিতা | আবুল হাসানের কবিতা | বাংলা কবিতা
পাখি হয়ে যায় প্রাণ: আবুল হাসানের একাকীত্ব, স্মৃতি ও অস্তিত্বের অসাধারণ কাব্যভাষা
আবুল হাসানের “পাখি হয়ে যায় প্রাণ” কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের একটি অনন্য সৃষ্টি, যা একাকীত্ব, স্মৃতি, অস্তিত্ব ও মৃত্যুর এক গভীর দার্শনিক অন্বেষণ। “অবশেষে জেনেছি মানুষ একা! / জেনেছি মানুষ তার চিবুকের কাছেও ভীষণ অচেনা ও একা!” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে এক গভীর সত্য — মানুষ চিরকাল একা, নিজের কাছেও অচেনা। আবুল হাসান (১৯৪৭-১৯৭৫) বাংলা কবিতার এক কিংবদন্তি কবি, যিনি মাত্র ২৮ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করলেও বাংলা কবিতায় এক অনন্য স্থান দখল করে আছেন। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘রাজা যায় রাজা আসে’ (১৯৭২) তাঁকে অমর করে রেখেছে। তাঁর কবিতায় প্রেম, মৃত্যু, সময় ও অস্তিত্বের গভীর চিন্তা ফুটে ওঠে। “পাখি হয়ে যায় প্রাণ” তাঁর একটি বহুপঠিত কবিতা যা একাকীত্ব, স্মৃতি ও আত্মান্বেষণের এক অসাধারণ কাব্যভাষা তৈরি করেছে।
আবুল হাসান: অকালপ্রয়াত কিংবদন্তি কবি
আবুল হাসান (১৯৪৭-১৯৭৫) বাংলা কবিতার এক কিংবদন্তি কবি। তিনি ১৯৪৭ সালের ৪ আগস্ট বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। মাত্র ২৮ বছর বয়সে ১৯৭৫ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘রাজা যায় রাজা আসে’ (১৯৭২) তাঁকে অমর করে রেখেছে। তাঁর অন্যান্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘যে পারে চৌরাস্তার মোড়ে’, ‘প্রতিমা ও প্রতিবিম্ব’, ‘বিধ্বস্ত ক্রন্দনে আমার’, ‘নির্বাচিত কবিতা’ প্রভৃতি। তাঁর কবিতায় প্রেম, মৃত্যু, সময় ও অস্তিত্বের গভীর চিন্তা ফুটে ওঠে। তিনি তাঁর স্বল্প জীবনে বাংলা কবিতায় এক অনন্য স্থান তৈরি করে গেছেন। “পাখি হয়ে যায় প্রাণ” তাঁর একটি বহুপঠিত কবিতা যা একাকীত্ব, স্মৃতি ও আত্মান্বেষণের এক অসাধারণ কাব্যভাষা তৈরি করেছে।
পাখি হয়ে যায় প্রাণ কবিতার বিস্তারিত বিশ্লেষণ
কবিতার শিরোনামের তাৎপর্য
“পাখি হয়ে যায় প্রাণ” শিরোনামটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। প্রাণ পাখি হয়ে যায় — অর্থাৎ আত্মা, জীবন, অস্তিত্ব পাখির রূপ নেয়। পাখি স্বাধীন, উড়তে পারে, আকাশে মিশতে পারে। প্রাণ পাখি হয়ে যাওয়া মানে মৃত্যু? নাকি মুক্তি? নাকি স্বাধীনতা? শিরোনামেই কবি ইঙ্গিত দিয়েছেন — এই কবিতা জীবনের চিরন্তন সত্য, মৃত্যু ও মুক্তির কথা বলে।
প্রথম স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“অবশেষে জেনেছি manusia একা! / জেনেছি manusia তার চিবুকের কাছেও ভীষণ অচেনা ও একা! / দৃশ্যের বিপরীত সে পারে না একাত্ম হতে এই পৃথিবীর সাথে কোনোদিন। / ফাতিমা ফুফুর প্রভাতকালীন কোরানের / মর্মায়িত গানের স্মরণে তাই কেন যেনো আমি / চলে যাই আজো সেই বর্নির বাওড়ের বৈকালিক ভ্রমণের পথে, / যেখানে নদীর ভরা কান্না শোনা যেত মাঝে মাঝে / জনপদবালাদের স্ফুরিত সিনানের অন্তর্লীন শব্দে মেদুর!” প্রথম স্তবকে কবি manusiaর একাকীত্বের সত্য আবিষ্কার করেছেন। তিনি বলেছেন — অবশেষে জেনেছি manusia একা! নিজের চিবুকের কাছেও manusia অচেনা ও একা। দৃশ্যের বিপরীত সে পৃথিবীর সাথে একাত্ম হতে পারে না। তাই ফাতিমা ফুফুর কোরানের গানের স্মরণে তিনি চলে যান বর্নির বাওড়ের বৈকালিক ভ্রমণের পথে, যেখানে নদীর কান্না শোনা যেত জনপদবালাদের স্নানের শব্দে মধুর হয়ে।
‘মানুষ একা’ — এই সত্যের তাৎপর্য
‘মানুষ একা’ — এটি কবিতার কেন্দ্রীয় দর্শন। মানুষ চিরকাল একা, পৃথিবীর সাথে সম্পূর্ণ একাত্ম হতে পারে না। এমনকি নিজের কাছেও সে অচেনা। এই একাকীত্বই মানুষের অস্তিত্বের মৌলিক সত্য।
ফাতিমা ফুফু ও কোরানের গানের তাৎপর্য
ফাতিমা ফুফু — সম্ভবত কবির পরিচিত কেউ। তিনি প্রভাতে কোরানের গান গাইতেন। সেই গানের স্মৃতি কবিকে অতীতে নিয়ে যায়, শৈশবের স্মৃতিতে, গ্রামের স্মৃতিতে।
বর্নির বাওড়ের বৈকালিক ভ্রমণের তাৎপর্য
বর্নির বাওড় — সম্ভবত কোনো স্থানের নাম। বৈকালিক ভ্রমণ — সন্ধ্যার ভ্রমণ। কবি সেই স্মৃতিময় পথে চলে যান, যেখানে নদীর কান্না শোনা যেত জনপদবালাদের স্নানের শব্দে। এটি শৈশবের এক নস্টালজিক স্মৃতি।
দ্বিতীয় স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“মনে পড়ে সরজু দিদির কপালের লক্ষ্মী চাঁদ তারা / নরম যুঁইয়ের গন্ধ মেলার মতো চোখের মাথুর ভাষা আর / হরিকীর্তনের নদীভূত বোল! / বড় ভাই আসতেন মাঝরাতে মহকুমা শহরের যাত্রা গান শুনে, / সাইকেল বেজে উঠতো ফেলে আসা শব্দে যখন, / নিদ্রার নেশায় উবু হয়ে শুনতাম, যেনো শব্দে কান পেতে রেখে: / কেউ বলে যাচ্ছে যেনো, / বাবলু তোমার নীল চোখের ভিতর এক সামুদ্রিক ঝড় কেন? / পিঠে অই সারসের মতো কী বেঁধে রেখেছো?” দ্বিতীয় স্তবকে কবি শৈশবের আরও স্মৃতি মনে করেছেন। তিনি মনে পড়েন — সরজু দিদির কপালের লক্ষ্মী চাঁদ তারা, নরম যুঁইয়ের গন্ধ, চোখের ভাষা, হরিকীর্তনের বোল। বড় ভাই মাঝরাতে যাত্রা গান শুনে ফিরতেন, সাইকেলের শব্দে ঘুম ভাঙত। তিনি শুনতে পেতেন যেন কেউ বলছে — বাবলু, তোমার নীল চোখের ভিতর সামুদ্রিক ঝড় কেন? পিঠে সারসের মতো কী বেঁধে রেখেছো?
সরজু দিদি, লক্ষ্মী চাঁদ তারা, যুঁইয়ের গন্ধের তাৎপর্য
সরজু দিদি — কবির পরিচিত কেউ। তাঁর কপালে লক্ষ্মী চাঁদ তারা ছিল — সম্ভবত সিঁদুরের ফোঁটা? যুঁইয়ের গন্ধ, চোখের ভাষা, হরিকীর্তনের বোল — সব মিলিয়ে এক গ্রামীণ, নস্টালজিক পরিবেশ।
বড় ভাই ও সাইকেলের শব্দের তাৎপর্য
বড় ভাই মাঝরাতে যাত্রা গান শুনে ফিরতেন। তাঁর সাইকেলের শব্দে কবির ঘুম ভাঙত। তিনি সেই শব্দ শুনতে শুনতে ভাবতেন — কেউ যেন বলছে, বাবলু তোমার নীল চোখের ভিতর সামুদ্রিক ঝড় কেন? পিঠে সারসের মতো কী বেঁধে রেখেছো? এটি একটি স্বপ্নিল, রহস্যময় অনুভূতি।
তৃতীয় স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“আসতেন পাখি শিকারের সূক্ষ্ম চোখ নিয়ে দুলাভাই! / ছোটবোন ঘরে বসে কেন যেনো তখন কেমন / পানের পাতার মতো নমনীয় হতো ক্রমে ক্রমে! / আর অন্ধ লোকটাও সন্ধ্যায়, পাখিহীন দৃশ্য চোখে ভরে!” তৃতীয় স্তবকে কবি আরও স্মৃতি মনে করেছেন। তিনি বলেছেন — দুলাভাই আসতেন পাখি শিকারের সূক্ষ্ম চোখ নিয়ে। ছোটবোন তখন পানের পাতার মতো নমনীয় হয়ে যেত। আর অন্ধ লোকটাও সন্ধ্যায় পাখিহীন দৃশ্য চোখে ভরে নিত।
দুলাভাই ও পাখি শিকারের তাৎপর্য
দুলাভাই পাখি শিকারে আসতেন। তাঁর সূক্ষ্ম চোখ ছিল পাখি দেখার। কিন্তু কবি কি পাখি শিকারের বিরোধী? নাকি এটিও শৈশবের স্মৃতিমাত্র?
ছোটবোনের পানের পাতার মতো নমনীয় হওয়ার তাৎপর্য
ছোটবোন তখন কেমন নমনীয় হয়ে যেত — সম্ভবত দুলাভাই এলে তাঁর আচরণ বদলে যেত। এটি একটি সূক্ষ্ম সামাজিক পর্যবেক্ষণ।
অন্ধ লোকটার তাৎপর্য
অন্ধ লোকটা সন্ধ্যায় পাখিহীন দৃশ্য চোখে ভরে নিত। অন্ধ হয়েও তিনি দৃশ্য দেখতেন? কল্পনায়? এটিও এক রহস্যময় চিত্র।
চতুর্থ স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“দীঘিতে ভাসতো ঘনমেঘ, জল নিতে এসে / মেঘ হয়ে যেতো লীলা বৌদি সেই গোধূলি বেলায়, / পাতা ঝরবার মতো শব্দ হতো জলে, ভাবতুম / এমন দিনে কি ওরে বলা যায়-? / স্মরণপ্রদেশ থেকে এক একটি নিবাস উঠে গেছে / সরজু দিদিরা ঐ বাংলায়, বড়ভাই নিরুদ্দিষ্ট, / সাইকেলের ঘণ্টাধ্বনি সাথে কোরে নিয়ে গেছে গাঁয়ের হালট! / একে একে নদীর ধারার মতো তার বহুদূরে গত!” চতুর্থ স্তবকে কবি হারানোর বেদনা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন — দীঘিতে মেঘ ভাসত, জল নিতে এসে লীলা বৌদি মেঘ হয়ে যেতেন গোধূলি বেলায়। পাতা ঝরার মতো শব্দ হতো জলে। তিনি ভাবতেন — এমন দিনে কি ওরে বলা যায়? স্মরণপ্রদেশ থেকে এক একটি নিবাস উঠে গেছে। সরজু দিদিরা চলে গেছেন, বড়ভাই নিরুদ্দিষ্ট, সাইকেলের ঘণ্টাধ্বনি নিয়ে গেছে গাঁয়ের হালট। একে একে সব নদীর ধারার মতো বহুদূরে চলে গেছে।
লীলা বৌদি মেঘ হয়ে যাওয়ার তাৎপর্য
লীলা বৌদি জল নিতে এসে মেঘ হয়ে যেতেন — এটি একটি অসাধারণ চিত্র। মানুষ প্রকৃতির সাথে মিশে যাচ্ছে, মেঘের রূপ নিচ্ছে। এটি স্মৃতি ও কল্পনার মেলবন্ধন।
‘স্মরণপ্রদেশ থেকে এক একটি নিবাস উঠে গেছে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
স্মরণপ্রদেশ — স্মৃতির দেশ। সেখান থেকে এক একটি নিবাস উঠে গেছে — অর্থাৎ স্মৃতি থেকে মানুষগুলো মুছে যাচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে। সরজু দিদি চলে গেছেন, বড়ভাই নিরুদ্দিষ্ট।
সাইকেলের ঘণ্টাধ্বনি ও গাঁয়ের হালটের তাৎপর্য
সাইকেলের ঘণ্টাধ্বনি নিয়ে গেছে গাঁয়ের হালট — সম্ভবত বড়ভাইয়ের সাইকেলের শব্দ, যা এখন আর নেই। সব কিছু হারিয়ে গেছে।
পঞ্চম স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“বদলপ্রয়াসী এই জীবনের জোয়ারে কেবল অন্তঃশীল একটি দ্বীপের মতো / সবার গোচরহীন আছি আজো সুদূর সন্ধানী! / দূরে বসে প্রবাহের অন্তর্গত আমি, তাই নিজেরই অচেনা নিজে / কেবল দিব্যতাদুষ্ট শোনিতের ভারা ভারা স্বপ্ন বোঝাই মাঠে দেখি, / সেখানেও বসে আছে বৃক্ষের মতোন একা একজন লোক, / যাকে ঘিরে বিশজন দেবদূত গাইছে কেবলি / শতজীবনের শত কুহেলী ও কুয়াশার গান! / পাখি হয়ে যায় এ প্রাণ ঐ কুহেলী মাঠের প্রান্তরে হে দেবদূত!” পঞ্চম স্তবকে কবি বর্তমান অবস্থা ও শেষ আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন — বদলপ্রয়াসী এই জীবনের জোয়ারে তিনি অন্তঃশীল একটি দ্বীপের মতো, সবার গোচরহীন, সুদূর সন্ধানী। দূরে বসে প্রবাহের অন্তর্গত তিনি, তাই নিজেরই অচেনা নিজে। তিনি দেখেন দিব্যতাদুষ্ট শোনিতের (রক্তের) ভারা ভারা স্বপ্ন বোঝাই মাঠে। সেখানেও বসে আছে বৃক্ষের মতো একা একজন লোক, যাকে ঘিরে বিশজন দেবদূত গাইছে শতজীবনের শত কুহেলী ও কুয়াশার গান। শেষে তিনি বলেন — পাখি হয়ে যায় এ প্রাণ ঐ কুহেলী মাঠের প্রান্তরে হে দেবদূত!
‘অন্তঃশীল একটি দ্বীপের মতো’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
অন্তঃশীল দ্বীপ — ভেতরে শিলাময়, শক্ত, কিন্তু বিচ্ছিন্ন। কবি নিজেকে সেই দ্বীপের মতো মনে করেন — সবার গোচরহীন, সুদূর সন্ধানী। তিনি একা, বিচ্ছিন্ন।
‘নিজেরই অচেনা নিজে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
প্রথম স্তবকে তিনি বলেছিলেন মানুষ নিজের কাছেও অচেনা। এখানে সেই সত্যের পুনরাবৃত্তি। তিনি নিজের কাছে নিজে অচেনা — অর্থাৎ নিজেকেও তিনি পুরোপুরি জানেন না, বুঝতে পারেন না।
দিব্যতাদুষ্ট শোনিত ও স্বপ্ন বোঝাই মাঠের তাৎপর্য
দিব্যতাদুষ্ট শোনিত — দিব্যতায় দুষ্ট রক্ত? নাকি divine-প্রভাবিত রক্ত? সেই রক্তের স্বপ্ন বোঝাই মাঠ। এটি এক রহস্যময় চিত্র।
বৃক্ষের মতো একা একজন লোক ও বিশজন দেবদূতের তাৎপর্য
সেই মাঠে বসে আছে বৃক্ষের মতো একা একজন লোক। তাঁকে ঘিরে বিশজন দেবদূত গাইছে শতজীবনের শত কুহেলী ও কুয়াশার গান। এটি এক অপূর্ব দৃশ্য — একাকী মানুষকে ঘিরে দেবদূতেরা গান গাইছে। সেই গান কুহেলী ও কুয়াশার — রহস্যময়, অস্পষ্ট।
‘পাখি হয়ে যায় এ প্রাণ’ — শেষ পঙ্ক্তির তাৎপর্য
‘পাখি হয়ে যায় এ প্রাণ ঐ কুহেলী মাঠের প্রান্তরে হে দেবদূত!’ — এই পঙ্ক্তিটি কবিতার শিরোনাম ও কেন্দ্রীয় বার্তা। কবির প্রাণ পাখি হয়ে যেতে চায় সেই কুহেলী মাঠের প্রান্তরে। তিনি দেবদূতকে ডাকছেন। এটি মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষা? নাকি মুক্তির আকাঙ্ক্ষা? পাখি হয়ে ওড়া, আকাশে মিশে যাওয়া — এটি এক ধরনের মোক্ষ, এক ধরনের স্বাধীনতা।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য
“পাখি হয়ে যায় প্রাণ” কবিতাটি একাকীত্ব, স্মৃতি ও অস্তিত্বের এক গভীর অন্বেষণ। কবি শুরুতে মানুষর একাকীত্বের সত্য আবিষ্কার করেছেন — মানুষ একা, নিজের কাছেও অচেনা। তারপর তিনি শৈশবের স্মৃতিতে ডুবে গেছেন — ফাতিমা ফুফুর কোরানের গান, সরজু দিদির কপালের তারা, বড় ভাইয়ের সাইকেলের শব্দ, লীলা বৌদি মেঘ হয়ে যাওয়া। কিন্তু সবাই এখন হারিয়ে গেছে — সরজু দিদি নেই, বড়ভাই নিরুদ্দিষ্ট, সব কিছু চলে গেছে নদীর ধারার মতো। তিনি এখন একা, অন্তঃশীল দ্বীপের মতো, নিজের কাছেও অচেনা। তিনি দেখেন স্বপ্ন বোঝাই মাঠে বৃক্ষের মতো একা একজন লোক, যাকে ঘিরে দেবদূতেরা গান গাইছে। শেষে তিনি আকুল হন — তাঁর প্রাণ পাখি হয়ে যাক সেই কুহেলী মাঠের প্রান্তরে। এটি মৃত্যু ও মুক্তির এক অসাধারণ আকাঙ্ক্ষা।
পাখি হয়ে যায় প্রাণ কবিতা সম্পর্কে প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: পাখি হয়ে যায় প্রাণ কবিতার লেখক কে?
পাখি হয়ে যায় প্রাণ কবিতার লেখক আবুল হাসান (১৯৪৭-১৯৭৫)। তিনি বাংলা কবিতার এক কিংবদন্তি কবি। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘রাজা যায় রাজা আসে’ (১৯৭২) তাঁকে অমর করে রেখেছে। তাঁর কবিতায় প্রেম, মৃত্যু, সময় ও অস্তিত্বের গভীর চিন্তা ফুটে ওঠে।
প্রশ্ন ২: পাখি হয়ে যায় প্রাণ কবিতার মূল বিষয়বস্তু কী?
পাখি হয়ে যায় প্রাণ কবিতার মূল বিষয়বস্তু হলো একাকীত্ব, স্মৃতি ও মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষা। কবি মানুষর একাকীত্বের সত্য আবিষ্কার করেছেন। তিনি শৈশবের স্মৃতিতে ডুবে গেছেন, কিন্তু সবাই হারিয়ে গেছে। তিনি এখন একা, নিজের কাছেও অচেনা। শেষে তিনি চান তাঁর প্রাণ পাখি হয়ে যাক — মৃত্যু ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা।
প্রশ্ন ৩: ‘অবশেষে জেনেছি মানুষ একা! / জেনেছি মানুষ তার চিবুকের কাছেও ভীষণ অচেনা ও একা!’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘অবশেষে জেনেছি manusia একা! / জেনেছি manusia তার চিবুকের কাছেও ভীষণ অচেনা ও একা!’ — এই পঙ্ক্তিটি কবিতার কেন্দ্রীয় দর্শন। manusia চিরকাল একা, পৃথিবীর সাথে সম্পূর্ণ একাত্ম হতে পারে না। এমনকি নিজের কাছেও সে অচেনা। নিজেকে পুরোপুরি চেনা, নিজের সাথে সম্পূর্ণ একাত্ম হওয়া সম্ভব নয়। এই একাকীত্বই মানুষের অস্তিত্বের মৌলিক সত্য।
প্রশ্ন ৪: ‘পাখি হয়ে যায় এ প্রাণ’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘পাখি হয়ে যায় এ প্রাণ’ — এই পঙ্ক্তিটি কবিতার শিরোনাম ও কেন্দ্রীয় বার্তা। কবির প্রাণ পাখি হয়ে যেতে চায়। পাখি স্বাধীন, উড়তে পারে, আকাশে মিশতে পারে। এটি মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষা, মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা। কবি চান তাঁর আত্মা মুক্তি পাক, পাখির মতো উড়ে যাক।
প্রশ্ন ৫: কবিতায় কোন কোন স্মৃতির কথা বলা হয়েছে?
কবিতায় অনেক স্মৃতির কথা বলা হয়েছে: ফাতিমা ফুফুর কোরানের গান, বর্নির বাওড়ের ভ্রমণ, সরজু দিদির কপালের তারা, যুঁইয়ের গন্ধ, হরিকীর্তনের বোল, বড় ভাইয়ের সাইকেলের শব্দ, দুলাভাইয়ের পাখি শিকার, ছোটবোনের নমনীয় হওয়া, অন্ধ লোকটা, লীলা বৌদি মেঘ হয়ে যাওয়া। এই সব স্মৃতি শৈশবের, গ্রামের, হারিয়ে যাওয়া দিনের।
প্রশ্ন ৬: ‘নিজেরই অচেনা নিজে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘নিজেরই অচেনা নিজে’ — এই পঙ্ক্তিতে কবি আত্ম-অচেনার কথা বলেছেন। প্রথম স্তবকে তিনি বলেছিলেন মানুষ নিজের কাছেও অচেনা। এখানে সেই সত্যের পুনরাবৃত্তি। তিনি নিজের কাছে নিজে অচেনা — অর্থাৎ নিজেকেও তিনি পুরোপুরি জানেন না, বুঝতে পারেন না। এটি অস্তিত্বের এক গভীর রহস্য।
প্রশ্ন ৭: আবুল হাসান সম্পর্কে সংক্ষেপে বলুন।
আবুল হাসান (১৯৪৭-১৯৭৫) বাংলা কবিতার এক কিংবদন্তি কবি। তিনি ১৯৪৭ সালের ৪ আগস্ট বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র ২৮ বছর বয়সে ১৯৭৫ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘রাজা যায় রাজা আসে’ (১৯৭২) তাঁকে অমর করে রেখেছে। তাঁর কবিতায় প্রেম, মৃত্যু, সময় ও অস্তিত্বের গভীর চিন্তা ফুটে ওঠে।
ট্যাগস: পাখি হয়ে যায় প্রাণ, আবুল হাসান, আবুল হাসানের কবিতা, পাখি হয়ে যায় প্রাণ কবিতা, বাংলা কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, রাজা যায় রাজা আসে, একাকীত্বের কবিতা, মৃত্যুর কবিতা
অবশেষে জেনেছি মানুষ একা!
জেনেছি মানুষ তার চিবুকের কাছেও ভীষণ অচেনা ও একা!
দৃশ্যের বিপরীত সে পারে না একাত্ম হতে এই পৃথিবীর সাথে কোনোদিন।
ফাতিমা ফুফুর প্রভাতকালীন কোরানের
মর্মায়িত গানের স্মরণে তাই কেন যেনো আমি
চলে যাই আজো সেই বর্নির বাওড়ের বৈকালিক ভ্রমণের পথে,
যেখানে নদীর ভরা কান্না শোনা যেত মাঝে মাঝে
জনপদবালাদের স্ফুরিত সিনানের অন্তর্লীন শব্দে মেদুর!
মনে পড়ে সরজু দিদির কপালের লক্ষ্মী চাঁদ তারা
নরম যুঁইয়ের গন্ধ মেলার মতো চোখের মাথুর ভাষা আর
হরিকীর্তনের নদীভূত বোল!
বড় ভাই আসতেন মাঝরাতে মহকুমা শহরের যাত্রা গান শুনে,
সাইকেল বেজে উঠতো ফেলে আসা শব্দে যখন,
নিদ্রার নেশায় উবু হয়ে শুনতাম, যেনো শব্দে কান পেতে রেখে:
কেউ বলে যাচ্ছে যেনো,
বাবলু তোমার নীল চোখের ভিতর এক সামুদ্রিক ঝড় কেন?
পিঠে অই সারসের মতো কী বেঁধে রেখেছো?
আসতেন পাখি শিকারের সূক্ষ্ম চোখ নিয়ে দুলাভাই!
ছোটবোন ঘরে বসে কেন যেনো তখন কেমন
পানের পাতার মতো নমনীয় হতো ক্রমে ক্রমে!
আর অন্ধ লোকটাও সন্ধ্যায়, পাখিহীন দৃশ্য চোখে ভরে!
দীঘিতে ভাসতো ঘনমেঘ, জল নিতে এসে
মেঘ হয়ে যেতো লীলা বৌদি সেই গোধূলি বেলায়,
পাতা ঝরবার মতো শব্দ হতো জলে, ভাবতুম
এমন দিনে কি ওরে বলা যায়-?
স্মরণপ্রদেশ থেকে এক একটি নিবাস উঠে গেছে
সরজু দিদিরা ঐ বাংলায়, বড়ভাই নিরুদ্দিষ্ট,
সাইকেলের ঘণ্টাধ্বনি সাথে কোরে নিয়ে গেছে গাঁয়ের হালট!
একে একে নদীর ধারার মতো তার বহুদূরে গত!
বদলপ্রয়াসী এই জীবনের জোয়ারে কেবল অন্তঃশীল একটি দ্বীপের মতো
সবার গোচরহীন আছি আজো সুদূর সন্ধানী!
দূরে বসে প্রবাহের অন্তর্গত আমি, তাই নিজেরই অচেনা নিজে
কেবল দিব্যতাদুষ্ট শোনিতের ভারা ভারা স্বপ্ন বোঝাই মাঠে দেখি,
সেখানেও বসে আছে বৃক্ষের মতোন একা একজন লোক,
যাকে ঘিরে বিশজন দেবদূত গাইছে কেবলি
শতজীবনের শত কুহেলী ও কুয়াশার গান!
পাখি হয়ে যায় এ প্রাণ ঐ কুহেলী মাঠের প্রান্তরে হে দেবদূত!
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। আবুল হাসান।





