কবিতার খাতা
- 27 mins
তোমার সন্তান আমি দিয়ে যাবো – শক্তি চট্টোপাধ্যায়।
তোমার বুকের পাশে শুয়ে থাকবে বিপুল আক্রোশে
স্তনদুটি শঙ্খনাদ করে উঠবে ঘুমন্ত কামড়ালে,
নাভীগর্ভে আঙুলের রক্ত ও প্রপাত পড়বে ঝরে —
এ-বয়েসে সব কাজ করতে পারি প্রেমে ও সম্মোহে।
বিদায় নেয়ার আগে বলে যেও অধরে চুম্বন
বারবার ভিক্ষা করি, আমাকে জাগাও নিরুপমা—
আমাকে জাগাও আর গ্লানি দিও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে,
এ-বয়েসে ভিক্ষাবৃত্তি কেবল আমাকে শোভা পায় !
জানি না বলেই আসি, নিকটেতে স্বজন রয়েছে।
তারি মধ্যে রং খেলা এ-বয়েসে সমূহ মানায়,
তোমার চুম্বনরসে মদ্যপান করি,
মুহূর্তে শতাব্দী কেটে যায়।
যাবার সময় ব’লো ফিরে আসবে শুকতারা হ’লে
সন্ধ্যার বিপুল ছায়া ভাঙে এসে পশ্চিমী দরজায় ;
যাবার সময় বলি, ক্লেদ মরে হিংসার দু’পাশে,
আমি ব্যগ্রতম হাতে তোমাকে সাজাই—
দাঁড়াও, আশিরনখে ভিক্ষা দাও, নিস্তব্ধতা থেকে
তোমার সন্তান আমি দিয়ে যাবো, দ্বিরুক্তি করবো না।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। শক্তি চট্টোপাধ্যায়।
তোমার সন্তান আমি দিয়ে যাবো – শক্তি চট্টোপাধ্যায় | তোমার সন্তান আমি দিয়ে যাবো কবিতা | শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা | বাংলা কবিতা
তোমার সন্তান আমি দিয়ে যাবো: শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের প্রেম, কামনা ও অস্তিত্বের অসাধারণ কাব্যভাষা
শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের “তোমার সন্তান আমি দিয়ে যাবো” কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের একটি অনন্য সৃষ্টি, যা প্রেম, কামনা, অস্তিত্ব ও মৃত্যুর এক গভীর দার্শনিক অন্বেষণ। “তোমার বুকের পাশে শুয়ে থাকবে বিপুল আক্রোশে” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে এক তীব্র আবেগের জগৎ, যেখানে প্রেম ও কামনা একাকার হয়ে গেছে, যেখানে শরীর ও আত্মা মিশে গেছে। শক্তি চট্টোপাধ্যায় (১৯৩৩-১৯৯৫) বাংলা কবিতার এক কিংবদন্তি কবি, যিনি ‘হাংরি জেনারেশন’ আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ। তার কবিতায় প্রেম, কামনা, মৃত্যু, অস্তিত্ব ও মানবিক সম্পর্কের গভীর প্রকাশ ঘটে। “তোমার সন্তান আমি দিয়ে যাবো” তার একটি বহুপঠিত কবিতা যা পাঠকের হৃদয়ে গভীর দাগ কাটে।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়: হাংরি জেনারেশনের কিংবদন্তি কবি
শক্তি চট্টোপাধ্যায় (১৯৩৩-১৯৯৫) বাংলা কবিতার এক কিংবদন্তি কবি। তিনি ১৯৩৩ সালের ২৫ নভেম্বর কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ‘হাংরি জেনারেশন’ আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘হে প্রেম হে নৈঃশব্দ্য’ (১৯৬৩) তাকে খ্যাতি এনে দেয়। তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘ধর্মে আছো জিরাফও’, ‘মহাবিশ্বের বাড়ি’, ‘যেতে পারি কিন্তু কেন যাব’, ‘আমি ও তুমি ও বৃষ্টি’ প্রভৃতি। তার কবিতায় প্রেম, কামনা, মৃত্যু, অস্তিত্ব ও মানবিক সম্পর্কের গভীর প্রকাশ ঘটে। তিনি ১৯৯৫ সালে মৃত্যুবরণ করেন। “তোমার সন্তান আমি দিয়ে যাবো” তার একটি বহুপঠিত কবিতা যা প্রেম ও কামনার এক অসাধারণ মিশ্রণ।
তোমার সন্তান আমি দিয়ে যাবো কবিতার বিস্তারিত বিশ্লেষণ
কবিতার শিরোনামের তাৎপর্য
“তোমার সন্তান আমি দিয়ে যাবো” শিরোনামটি অত্যন্ত রহস্যময় ও তাৎপর্যপূর্ণ। ‘তোমার সন্তান আমি দিয়ে যাবো’ — অর্থাৎ কবি নিজেকে প্রিয়তমার সন্তান হিসেবে দিয়ে যেতে চান। এটি এক অদ্ভুত সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয় — প্রেমিকা আবার মা, প্রেমিক আবার সন্তান। এই দ্বৈত সম্পর্ক কবিতার গভীরে একটি জটিল মানসিক অবস্থার ইঙ্গিত দেয়। সন্তান যেমন মায়ের কাছে নিরাপদ, তেমনি কবিও প্রিয়তমার কাছে নিরাপদ হতে চান। কিন্তু সেই নিরাপত্তার মাঝেই আছে কামনা, আছে প্রেম।
প্রথম স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“তোমার বুকের পাশে শুয়ে থাকবে বিপুল আক্রোশে / স্তনদুটি শঙ্খনাদ করে উঠবে ঘুমন্ত কামড়ালে, / নাভীগর্ভে আঙুলের রক্ত ও প্রপাত পড়বে ঝরে — / এ-বয়েসে সব কাজ করতে পারি প্রেমে ও সম্মোহে।” প্রথম স্তবকে কবি প্রেমের এক তীব্র শারীরিক চিত্র এঁকেছেন। তিনি প্রিয়তমার বুকের পাশে শুয়ে থাকবেন বিপুল আক্রোশে — অর্থাৎ তীব্র আকাঙ্ক্ষা নিয়ে। স্তনদুটি শঙ্খনাদ করে উঠবে ঘুমন্ত কামড়ালে — শঙ্খনাদ মানে শঙ্খের শব্দ, যা পূজা-অর্চনায় ব্যবহৃত হয়। এখানে স্তনের সাথে শঙ্খের তুলনা একটি অসাধারণ চিত্রকল্প। নাভীগর্ভে আঙুলের রক্ত ও প্রপাত পড়বে ঝরে — এটি একটি তীব্র কামনার চিত্র। তিনি বলছেন — এ-বয়সে সব কাজ করতে পারেন তিনি — প্রেমে ও সম্মোহে। অর্থাৎ বয়স হয়েছে, কিন্তু প্রেম করার ক্ষমতা আছে, সম্মোহিত করার ক্ষমতা আছে।
বিপুল আক্রোশের তাৎপর্য
বিপুল আক্রোশ — তীব্র আকাঙ্ক্ষা, গভীর কামনা। কবি সেই আক্রোশ নিয়ে প্রিয়তমার বুকের পাশে শুয়ে থাকবেন। এটি প্রেমের তীব্রতা নির্দেশ করে — একটি নিখাদ, অকৃত্রিম, প্রবল আকাঙ্ক্ষা।
শঙ্খনাদ ও স্তনের তুলনার তাৎপর্য
শঙ্খনাদ — পবিত্র শব্দ, ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত। স্তনদুটি শঙ্খনাদ করে উঠবে — এটি একটি অসাধারণ চিত্রকল্প। স্তনকে পবিত্র শঙ্খের সাথে তুলনা করে কবি প্রেমকে এক ধর্মীয় মাত্রা দিয়েছেন। প্রেম শুধু শারীরিক নয়, তা পবিত্রও বটে।
নাভীগর্ভে আঙুলের রক্ত ও প্রপাতের তাৎপর্য
নাভীগর্ভ — নাভির গভীরে। আঙুলের রক্ত ও প্রপাত — আঙুলে রক্ত, অর্থাৎ আঙুল ক্ষত হয়েছে? নাকি রক্ত এখানে প্রাণের প্রতীক? প্রপাত — জলপ্রপাত। এই চিত্রটি অত্যন্ত জটিল ও রহস্যময়। সম্ভবত এটি প্রেমের তীব্রতা ও গভীরতার প্রতীক।
দ্বিতীয় স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“বিদায় নেয়ার আগে বলে যেও অধরে চুম্বন / বারবার ভিক্ষা করি, আমাকে জাগাও নিরুপমা— / আমাকে জাগাও আর গ্লানি দিও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে, / এ-বয়েসে ভিক্ষাবৃত্তি কেবল আমাকে শোভা পায় ! / জানি না বলেই আসি, নিকটেতে স্বজন রয়েছে।” দ্বিতীয় স্তবকে কবি বিদায়ের প্রসঙ্গ এনেছেন। তিনি প্রিয়তমাকে বলছেন — বিদায় নেওয়ার আগে বলে যেও অধরে চুম্বন। তিনি বারবার ভিক্ষা করছেন — তাকে জাগাতে। তিনি তাকে ‘নিরুপমা’ বলে সম্বোধন করেছেন — যার অর্থ অতুলনীয়া। তিনি বলছেন — তাকে জাগাও আর গ্লানি দিও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। গ্লানি — ক্লান্তি, অবসাদ। তিনি গ্লানি চান? নাকি গ্লানি দিয়ে তাকে জাগাতে বলেন? এটি জটিল। তিনি বলছেন — এ-বয়সে ভিক্ষাবৃত্তি কেবল তাকে শোভা পায়। তিনি ভিক্ষা চাইছেন — প্রেমের ভিক্ষা, চুম্বনের ভিক্ষা, জাগরণের ভিক্ষা। তিনি জানেন না বলেই আসছেন — নিকটেতে স্বজন রয়েছে। অর্থাৎ হয়তো তিনি জানেন না যে তার কাছের মানুষ আছে, যারা তাকে ভালোবাসে।
বিদায় নেওয়ার আগে অধরে চুম্বনের তাৎপর্য
বিদায় নেওয়ার আগে অধরে চুম্বন — এটি একটি শেষ ইচ্ছার মতো। কবি জানেন হয়তো বিদায় আসছে, তাই শেষবারের মতো চুম্বন চাইছেন। এই চুম্বন তাকে বাঁচিয়ে রাখবে, স্মৃতি হয়ে থাকবে।
ভিক্ষাবৃত্তির তাৎপর্য
এ-বয়সে ভিক্ষাবৃত্তি কেবল আমাকে শোভা পায় — কবি বলছেন, এই বয়সে ভিক্ষা করা ছাড়া আর কিছুই তাকে শোভা পায় না। তিনি প্রেম ভিক্ষা চান, চুম্বন ভিক্ষা চান, জাগরণ ভিক্ষা চান। এটি এক ধরনের নম্রতা, এক ধরনের আত্মসমর্পণ।
তৃতীয় স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“তারি মধ্যে রং খেলা এ-বয়েসে সমূহ মানায়, / তোমার চুম্বনরসে মদ্যপান করি, / মুহূর্তে শতাব্দী কেটে যায়।” তৃতীয় স্তবকে কবি প্রেমের মাদকতার কথা বলেছেন। তারি মধ্যে — এসবের মধ্যে, এই বয়সে রং খেলা সমূহ মানায়। অর্থাৎ বয়স হয়েছে, কিন্তু রং খেলা — প্রেমের খেলা — তাকে মানায়। তিনি প্রিয়তমার চুম্বনরসে মদ্যপান করেন — চুম্বনই তার মদ, তার নেশা। সেই নেশায় মুহূর্তে শতাব্দী কেটে যায় — সময়ের বোধ হারিয়ে যায়।
চুম্বনরসে মদ্যপানের তাৎপর্য
চুম্বনরসে মদ্যপান — একটি অসাধারণ চিত্রকল্প। চুম্বনকে মদের সাথে তুলনা করা হয়েছে। মদ যেমন নেশা করে, তেমনি চুম্বনও নেশা করে। মদ যেমন সময়ের বোধ হারিয়ে দেয়, তেমনি চুম্বনও সময়ের বোধ হারিয়ে দেয়। মুহূর্তে শতাব্দী কেটে যায় — সময় স্থির হয়ে যায়, চিরন্তন হয়ে যায়।
চতুর্থ স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“যাবার সময় ব’লো ফিরে আসবে শুকতারা হ’লে / সন্ধ্যার বিপুল ছায়া ভাঙে এসে পশ্চিমী দরজায় ; / যাবার সময় বলি, ক্লেদ মরে হিংসার দু’পাশে, / আমি ব্যগ্রতম হাতে তোমাকে সাজাই— / দাঁড়াও, আশিরনখে ভিক্ষা দাও, নিস্তব্ধতা থেকে / তোমার সন্তান আমি দিয়ে যাবো, দ্বিরুক্তি করবো না।” চতুর্থ স্তবকে কবি বিদায়ের চূড়ান্ত মুহূর্ত এঁকেছেন। তিনি বলছেন — যাবার সময় বলে যাও, ফিরে আসবে শুকতারা হলে। শুকতারা সকালের তারা, নতুন দিনের প্রতীক। অর্থাৎ নতুন দিনে ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি চান তিনি। সন্ধ্যার বিপুল ছায়া ভাঙে এসে পশ্চিমী দরজায় — সন্ধ্যা নেমে আসছে, পশ্চিমের দরজায় ছায়া ভাঙছে। যাবার সময় তিনি বলছেন — ক্লেদ মরে হিংসার দু’পাশে। ক্লেদ — ঘৃণা, হিংসা। তিনি চান ঘৃণা ও হিংসা মরে যাক। তিনি ব্যগ্রতম হাতে প্রিয়তমাকে সাজাচ্ছেন — অর্থাৎ শেষবারের মতো তাকে সুন্দর করে তুলছেন। শেষে তিনি বলছেন — দাঁড়াও, আশিরনখে ভিক্ষা দাও, নিস্তব্ধতা থেকে তোমার সন্তান আমি দিয়ে যাবো, দ্বিরুক্তি করবো না। আশিরনখে — আশীর্বাদে? ভিক্ষা দাও — তিনি ভিক্ষা চান। নিস্তব্ধতা থেকে তিনি প্রিয়তমার সন্তান হয়ে যেতে চান। আর দ্বিরুক্তি করবেন না — কোনো আপত্তি করবেন না, কোনো কথা বলবেন না।
শুকতারা হ’লে ফিরে আসার তাৎপর্য
শুকতারা সকালের তারা, নতুন দিনের প্রতীক। যাবার সময় তিনি প্রিয়তমাকে বলতে চান — তিনি ফিরে আসবেন নতুন দিনে। এটি একটি প্রতিশ্রুতি, একটি আশার আলো। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি কি সত্যি হবে?
সন্ধ্যার বিপুল ছায়া ভাঙার তাৎপর্য
সন্ধ্যার বিপুল ছায়া ভাঙে এসে পশ্চিমী দরজায় — সন্ধ্যা নেমে আসছে, অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে। এটি মৃত্যুর প্রতীক হতে পারে। পশ্চিমী দরজা — পশ্চিম দিক, যেখানে সূর্য অস্ত যায়, যেখানে মৃত্যুর দেশ।
ক্লেদ মরে হিংসার দু’পাশের তাৎপর্য
ক্লেদ — ঘৃণা, হিংসা। তিনি চান ঘৃণা ও হিংসা মরে যাক। প্রেমের জগতে ঘৃণা ও হিংসার কোনো স্থান নেই। তিনি চান শুধু প্রেম থাকুক, ভালোবাসা থাকুক।
আশিরনখে ভিক্ষা দেওয়ার তাৎপর্য
আশিরনখে — আশীর্বাদে। তিনি প্রিয়তমার কাছে আশীর্বাদ চান, ভিক্ষা চান। তিনি নিজেকে সম্পূর্ণভাবে প্রিয়তমার কাছে সঁপে দিতে চান।
তোমার সন্তান আমি দিয়ে যাবো — শিরোনামের পুনরাবৃত্তি
শেষ পঙ্ক্তিতে শিরোনামের পুনরাবৃত্তি হয়েছে। তিনি বলছেন — নিস্তব্ধতা থেকে তোমার সন্তান আমি দিয়ে যাবো। অর্থাৎ তিনি নিজেকে প্রিয়তমার সন্তান হিসেবে দিয়ে যাবেন। এটি এক অদ্ভুত আত্মসমর্পণ — প্রেমিকা হয়ে ওঠেন মা, প্রেমিক হয়ে ওঠেন সন্তান। এই সম্পর্কের জটিলতা কবিতাকে এক বিশেষ মাত্রা দিয়েছে।
দ্বিরুক্তি করবো না-র তাৎপর্য
দ্বিরুক্তি করবো না — তিনি কোনো আপত্তি করবেন না, কোনো কথা বলবেন না। তিনি সম্পূর্ণরূপে মেনে নিয়েছেন যা কিছু হবে। এটি এক ধরনের নীরব সম্মতি, এক ধরনের আত্মসমর্পণ।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য
“তোমার সন্তান আমি দিয়ে যাবো” কবিতাটি প্রেম, কামনা ও অস্তিত্বের এক জটিল জাল বুনেছে। কবি প্রিয়তমার কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করেছেন — তিনি তার কামনা, তার আকাঙ্ক্ষা, তার প্রেম সব কিছু জানিয়েছেন। তিনি ভিক্ষা চেয়েছেন — চুম্বনের ভিক্ষা, জাগরণের ভিক্ষা, আশীর্বাদের ভিক্ষা। তিনি জানেন বিদায় আসছে, তাই শেষবারের মতো সব কিছু জানিয়ে রাখতে চান। তিনি চান প্রিয়তমা তাকে জাগাক, তাকে গ্লানি দিক, তাকে ভিক্ষা দিক। শেষ পর্যন্ত তিনি নিজেকে প্রিয়তমার সন্তান হিসেবে দিয়ে যেতে চান — একটি অদ্ভুত, জটিল, গভীর সম্পর্কের প্রতীক। আর তিনি দ্বিরুক্তি করবেন না — সব মেনে নেবেন, সব সহ্য করবেন।
তোমার সন্তান আমি দিয়ে যাবো কবিতা সম্পর্কে প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: তোমার সন্তান আমি দিয়ে যাবো কবিতার লেখক কে?
তোমার সন্তান আমি দিয়ে যাবো কবিতার লেখক শক্তি চট্টোপাধ্যায় (১৯৩৩-১৯৯৫)। তিনি বাংলা কবিতার এক কিংবদন্তি কবি, ‘হাংরি জেনারেশন’ আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘হে প্রেম হে নৈঃশব্দ্য’ (১৯৬৩) তাকে খ্যাতি এনে দেয়। তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘ধর্মে আছো জিরাফও’, ‘মহাবিশ্বের বাড়ি’, ‘যেতে পারি কিন্তু কেন যাব’, ‘আমি ও তুমি ও বৃষ্টি’ প্রভৃতি।
প্রশ্ন ২: তোমার সন্তান আমি দিয়ে যাবো কবিতার মূল বিষয়বস্তু কী?
তোমার সন্তান আমি দিয়ে যাবো কবিতার মূল বিষয়বস্তু হলো প্রেম, কামনা ও অস্তিত্বের গভীর অন্বেষণ। কবি প্রিয়তমার কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করেছেন — তিনি তার কামনা, তার আকাঙ্ক্ষা, তার প্রেম সব কিছু জানিয়েছেন। তিনি ভিক্ষা চেয়েছেন — চুম্বনের ভিক্ষা, জাগরণের ভিক্ষা। শেষ পর্যন্ত তিনি নিজেকে প্রিয়তমার সন্তান হিসেবে দিয়ে যেতে চান — একটি অদ্ভুত, জটিল, গভীর সম্পর্কের প্রতীক।
প্রশ্ন ৩: ‘এ-বয়েসে সব কাজ করতে পারি প্রেমে ও সম্মোহে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘এ-বয়েসে সব কাজ করতে পারি প্রেমে ও সম্মোহে’ — এই পঙ্ক্তিতে কবি বলেছেন, তার বয়স হয়েছে, কিন্তু প্রেম করার ক্ষমতা আছে, সম্মোহিত করার ক্ষমতা আছে। এটি একটি আত্মবিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ। বয়স প্রেমের পথে বাধা নয়, প্রেম চিরন্তন।
প্রশ্ন ৪: ‘তোমার চুম্বনরসে মদ্যপান করি, মুহূর্তে শতাব্দী কেটে যায়’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘তোমার চুম্বনরসে মদ্যপান করি, মুহূর্তে শতাব্দী কেটে যায়’ — এই পঙ্ক্তিতে কবি প্রেমের মাদকতার কথা বলেছেন। চুম্বনকে মদের সাথে তুলনা করা হয়েছে। মদ যেমন নেশা করে, তেমনি চুম্বনও নেশা করে। মদ যেমন সময়ের বোধ হারিয়ে দেয়, তেমনি চুম্বনও সময়ের বোধ হারিয়ে দেয়। মুহূর্তে শতাব্দী কেটে যায় — সময় স্থির হয়ে যায়, চিরন্তন হয়ে যায়।
প্রশ্ন ৫: ‘যাবার সময় ব’লো ফিরে আসবে শুকতারা হ’লে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘যাবার সময় ব’লো ফিরে আসবে শুকতারা হ’লে’ — এই পঙ্ক্তিতে কবি বিদায়ের সময় একটি প্রতিশ্রুতি চেয়েছেন। শুকতারা সকালের তারা, নতুন দিনের প্রতীক। তিনি চান প্রিয়তমা বলুক — তিনি ফিরে আসবেন নতুন দিনে। এটি একটি আশার আলো, একটি প্রতিশ্রুতি যা হয়তো সত্যি হবে না, কিন্তু তবুও তা শুনতে চান তিনি।
প্রশ্ন ৬: ‘তোমার সন্তান আমি দিয়ে যাবো, দ্বিরুক্তি করবো না’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘তোমার সন্তান আমি দিয়ে যাবো, দ্বিরুক্তি করবো না’ — এই পঙ্ক্তিটি কবিতার কেন্দ্রীয় বার্তা। কবি নিজেকে প্রিয়তমার সন্তান হিসেবে দিয়ে যেতে চান। এটি এক অদ্ভুত আত্মসমর্পণ — প্রেমিকা হয়ে ওঠেন মা, প্রেমিক হয়ে ওঠেন সন্তান। আর দ্বিরুক্তি করবেন না — তিনি কোনো আপত্তি করবেন না, কোনো কথা বলবেন না, সব মেনে নেবেন।
প্রশ্ন ৭: শক্তি চট্টোপাধ্যায় সম্পর্কে সংক্ষেপে বলুন।
শক্তি চট্টোপাধ্যায় (১৯৩৩-১৯৯৫) বাংলা কবিতার এক কিংবদন্তি কবি। তিনি ‘হাংরি জেনারেশন’ আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘হে প্রেম হে নৈঃশব্দ্য’ (১৯৬৩) তাকে খ্যাতি এনে দেয়। তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘ধর্মে আছো জিরাফও’, ‘মহাবিশ্বের বাড়ি’, ‘যেতে পারি কিন্তু কেন যাব’, ‘আমি ও তুমি ও বৃষ্টি’ প্রভৃতি। তার কবিতায় প্রেম, কামনা, মৃত্যু, অস্তিত্ব ও মানবিক সম্পর্কের গভীর প্রকাশ ঘটে।
ট্যাগস: তোমার সন্তান আমি দিয়ে যাবো, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা, তোমার সন্তান আমি দিয়ে যাবো কবিতা, বাংলা কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, হাংরি জেনারেশন, প্রেমের কবিতা






