কবিতার খাতা
অভিশাপ দিচ্ছি – শামসুর রাহমান।
না আমি আসিনি ওল্ড টেস্টামেন্টের প্রাচীন পাতা ফুঁড়ে,
দুর্বাশাও নই, তবু আজ এখানে দাঁড়িয়ে এই রক্ত গোধূলিতে অভিশাপ দিচ্ছি।
আমাদের বুকের ভেতর যারা ভয়ানক কৃষ্ণপক্ষ দিয়েছিলো সেঁটে
মগজের কোষে কোষে যারা পুঁতেছিল
আমাদেরই আপন জনেরই লাশ দগ্ধ, রক্তাপ্লুত
যারা গণহত্যা করেছে শহরে গ্রামে টিলায় নদীতে ক্ষেত ও খামারে
আমি অভিশাপ দিচ্ছি নেকড়ের চেয়েও অধিক পশু সেই সব পশুদের।
ফায়ারিং স্কোয়াডে ওদের সারিবদ্ধ দাঁড় করিয়ে নিমেষে ঝাঁ ঝাঁ বুলেটের বৃষ্টি
ঝরালেই সব চুকে বুকে যাবে তা আমি মানি না।
হত্যাকে উৎসব ভেবে যারা পার্কে মাঠে ক্যাম্পাসে বাজারে
বিষাক্ত গ্যাসের মতো মৃত্যুর বীভৎস গন্ধ দিয়েছে ছড়িয়ে,
আমি তো তাদের জন্য অমন সহজ মৃত্যু করি না কামনা।
আমাকে করেছে বাধ্য যারা
আমার জনক জননীর রক্তে পা ডুবিয়ে দ্রুত সিঁড়ি ভেঙ্গে যেতে
ভাসতে নদীতে আর বনেবাদাড়ে শয্যা পেতে নিতে,
অভিশাপ দিচ্ছি, আমি সেইসব দজ্জালদের।
অভিশাপ দিচ্ছি ওরা চিরদিন বিশীর্ণ গলায়
নিয়ত বেড়াক বয়ে গলিত নাছোড় মৃতদেহ,
অভিশাপ দিচ্ছি প্রত্যহ দিনের শেষে ওরা
হাঁটু মুড়ে এক টুকরো শুকনো রুটি চাইবে ব্যাকুল
কিন্তু রুটি প্রসারিত থাবা থেকে রইবে দশ হাত দূরে সর্বদাই।
অভিশাপ দিচ্ছি ওদের তৃষ্ণায় পানপাত্র প্রতিবার
কানায় কানায় রক্তে উঠবে ভরে, যে রক্ত বাংলায়
বইয়ে দিয়েছে ওরা হিংস্র জোয়ারের মত।
অভিশাপ দিচ্ছি আকণ্ঠ বিষ্ঠায় ডুবে ওরা অধীর চাইবে ত্রাণ
অথচ ওদের দিকে কেউ দেবে না কখনো ছুঁড়ে একখন্ড দড়ি।
অভিশাপ দিচ্ছি স্নেহের কাঙ্গাল হয়ে ওরা
ঘুরবে ক্ষ্যাপার মতো এ পাড়া ওপাড়া,
নিজেরি সন্তান প্রখর ফিরিয়ে নেবে মুখ, পারবে না চিনতে কখনো;
অভিশাপ দিচ্ছি এতোটুকু আশ্রয়ের জন্য, বিশ্রামের কাছে আত্মসমর্পণের জন্যে দ্বারে দ্বারে ঘুরবে ওরা। প্রেতায়িত সেই সব মুখের উপর
দ্রুত বন্ধ হয়ে যাবে পৃথিবীর প্রতিটি কপাট,
অভিশাপ দিচ্ছি…
অভিশাপ দিচ্ছি,….
অভিশাপ দিচ্ছি….
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। শামসুর রাহমান।
অভিশাপ দিচ্ছি – শামসুর রাহমান | অভিশাপ দিচ্ছি কবিতা শামসুর রাহমান | শামসুর রাহমানের কবিতা | আধুনিক বাংলা কবিতা | মুক্তিযুদ্ধের কবিতা | গণহত্যার কবিতা | অভিশাপের কবিতা
অভিশাপ দিচ্ছি: শামসুর রাহমানের মুক্তিযুদ্ধ, গণহত্যা ও চিরন্তন অভিশাপের অসাধারণ কাব্যভাষা
শামসুর রাহমানের “অভিশাপ দিচ্ছি” আধুনিক বাংলা কবিতার এক অনন্য ও শক্তিশালী মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কবিতা। “না আমি আসিনি ওল্ড টেস্টামেন্টের প্রাচীন পাতা ফুঁড়ে, / দুর্বাশাও নই, তবু আজ এখানে দাঁড়িয়ে এই রক্ত গোধূলিতে অভিশাপ দিচ্ছি। / আমাদের বুকের ভেতর যারা ভয়ানক কৃষ্ণপক্ষ দিয়েছিলো সেঁটে / মগজের কোষে কোষে যারা পুঁতেছিল / আমাদেরই আপন জনেরই লাশ দগ্ধ, রক্তাপ্লুত / যারা গণহত্যা করেছে শহরে গ্রামে টিলায় নদীতে ক্ষেত ও খামারে / আমি অভিশাপ দিচ্ছি নেকড়ের চেয়েও অধিক পশু সেই সব পশুদের।” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার গণহত্যা, নির্যাতন, ধ্বংসযজ্ঞ, এবং সেই অপরাধীদের প্রতি চিরন্তন অভিশাপের এক গভীর ও বহুমাত্রিক কাব্যচিত্র। শামসুর রাহমান (১৯২৯-২০০৬) ছিলেন বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে স্বীকৃত। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতায় নিজস্ব ভাষাভঙ্গি ও বিষয়বৈচিত্র্যের জন্য পরিচিত। “অভিশাপ দিচ্ছি” তাঁর সেই স্বকীয় কাব্যভাষার এক অসাধারণ শিল্পরূপ — যেখানে তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময়কার গণহত্যাকারীদের প্রতি চিরন্তন অভিশাপ দিয়েছেন, সহজ মৃত্যু নয়, বরং চিরস্থায়ী যন্ত্রণার অভিশাপ।
শামসুর রাহমান: আধুনিক বাংলা কবিতার পুরোধা ও জাতীয় কবি
শামসুর রাহমান ১৯২৯ সালের ২৩ অক্টোবর ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি কবিতা চর্চা শুরু করেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম পুরোধা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’ (১৯৬০), ‘রৌদ্র করোটিতে’ (১৯৬৩), ‘বিপুল বায়ুতে পারে’ (১৯৬৯), ‘আসাদের শার্ট’ (১৯৭০), ‘বাংলা আমার বাংলা’ (১৯৭২), ‘স্বপ্ন ও অন্যান্য’ (১৯৭৮), ‘আমার প্রেমের কবিতা’ (১৯৮৫), ‘অভিশাপ দিচ্ছি’ (১৯৯০) সহ আরও অসংখ্য গ্রন্থ। তিনি ২০০৬ সালের ১৭ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন।
শামসুর রাহমানের কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো প্রেম ও রাজনীতির অনন্য মিশ্রণ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার গভীর উপলব্ধি, প্রতীক ব্যবহারের দক্ষতা, এবং সরল-প্রাঞ্জল ভাষায় গভীর অর্থ সৃষ্টির ক্ষমতা। ‘অভিশাপ দিচ্ছি’ সেই ধারার একটি অসাধারণ উদাহরণ — যেখানে তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময়কার গণহত্যাকারীদের প্রতি চিরন্তন অভিশাপ দিয়েছেন।
অভিশাপ দিচ্ছি: ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক পটভূমি
কবিতাটি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার গণহত্যা ও নির্যাতনের প্রেক্ষাপটে রচিত। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাঙালিদের ওপর গণহত্যা শুরু করে। নয় মাসের সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। সেই সময়কালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগীরা অসংখ্য নিরীহ বাঙালিকে হত্যা করে, নারীদের নির্যাতন করে, গ্রাম-শহর ধ্বংস করে।
কবি এই কবিতায় সেই গণহত্যাকারীদের প্রতি অভিশাপ দিচ্ছেন। তিনি বলছেন — তিনি ওল্ড টেস্টামেন্টের প্রাচীন পাতা ফুঁড়ে আসেননি, দুর্বাশাও নন, তবু আজ এখানে দাঁড়িয়ে এই রক্ত গোধূলিতে অভিশাপ দিচ্ছেন। যারা বুকের ভেতর কৃষ্ণপক্ষ (অন্ধকার পক্ষ) সেঁটে দিয়েছে, যারা মগজের কোষে কোষে আমাদেরই আপন জনের লাশ দগ্ধ, রক্তাপ্লুত পুঁতেছে, যারা গণহত্যা করেছে শহরে গ্রামে টিলায় নদীতে ক্ষেত ও খামারে — তিনি নেকড়ের চেয়েও অধিক পশু সেই সব পশুদের অভিশাপ দিচ্ছেন।
কবি বলছেন — ফায়ারিং স্কোয়াডে ওদের দাঁড় করিয়ে বুলেটের বৃষ্টি ঝরালেই সব চুকে যাবে, তিনি তা মানেন না। হত্যাকে উৎসব ভেবে যারা পার্কে মাঠে ক্যাম্পাসে বাজারে বিষাক্ত গ্যাসের মতো মৃত্যুর বীভৎস গন্ধ ছড়িয়েছে, তিনি তাদের জন্য অমন সহজ মৃত্যু কামনা করেন না। তাকে যারা বাধ্য করেছে — তার জনক জননীর রক্তে পা ডুবিয়ে সিঁড়ি ভেঙ্গে যেতে, নদীতে ভাসতে, বনে-বাদাড়ে শয্যা পেতে নিতে — তিনি সেইসব দজ্জালদের অভিশাপ দিচ্ছেন।
কবি ধাপে ধাপে অভিশাপ দিচ্ছেন — ওরা চিরদিন বিশীর্ণ গলায় নিয়ত বেড়াক বয়ে গলিত নাছোড় মৃতদেহ। প্রত্যহ দিনের শেষে ওরা হাঁটু মুড়ে এক টুকরো শুকনো রুটি চাইবে ব্যাকুল, কিন্তু রুটি প্রসারিত থাবা থেকে রইবে দশ হাত দূরে সর্বদাই। ওদের তৃষ্ণায় পানপাত্র প্রতিবার কানায় কানায় রক্তে উঠবে ভরে, যে রক্ত বাংলায় বইয়ে দিয়েছে ওরা হিংস্র জোয়ারের মত। আকণ্ঠ বিষ্ঠায় ডুবে ওরা অধীর চাইবে ত্রাণ, অথচ ওদের দিকে কেউ দেবে না কখনো ছুঁড়ে একখন্ড দড়ি। স্নেহের কাঙ্গাল হয়ে ওরা ঘুরবে ক্ষ্যাপার মতো এ পাড়া ওপাড়া, নিজের সন্তান প্রখর ফিরিয়ে নেবে মুখ, পারবে না চিনতে কখনো। এতোটুকু আশ্রয়ের জন্য, বিশ্রামের কাছে আত্মসমর্পণের জন্যে দ্বারে দ্বারে ঘুরবে ওরা। প্রেতায়িত সেই সব মুখের উপর দ্রুত বন্ধ হয়ে যাবে পৃথিবীর প্রতিটি কপাট। অভিশাপ দিচ্ছি… অভিশাপ দিচ্ছি… অভিশাপ দিচ্ছি…
অভিশাপ দিচ্ছি: স্তবকভিত্তিক বিস্তারিত বিশ্লেষণ
প্রথম স্তবক: অভিশাপের সূচনা ও গণহত্যার বর্ণনা
“না আমি আসিনি ওল্ড টেস্টামেন্টের প্রাচীন পাতা ফুঁড়ে, / দুর্বাশাও নই, তবু আজ এখানে দাঁড়িয়ে এই রক্ত গোধূলিতে অভিশাপ দিচ্ছি। / আমাদের বুকের ভেতর যারা ভয়ানক কৃষ্ণপক্ষ দিয়েছিলো সেঁটে / মগজের কোষে কোষে যারা পুঁতেছিল / আমাদেরই আপন জনেরই লাশ দগ্ধ, রক্তাপ্লুত / যারা গণহত্যা করেছে শহরে গ্রামে টিলায় নদীতে ক্ষেত ও খামারে / আমি অভিশাপ দিচ্ছি নেকড়ের চেয়েও অধিক পশু সেই সব পশুদের।”
প্রথম স্তবকে কবি অভিশাপের সূচনা ও গণহত্যার বর্ণনা দিচ্ছেন। ‘না আমি আসিনি ওল্ড টেস্টামেন্টের প্রাচীন পাতা ফুঁড়ে’ — তিনি পুরোনো ধর্মগ্রন্থের অভিশাপ নিয়ে আসেননি। ‘দুর্বাশাও নই’ — তিনি দুর্বাশা মুনি (যিনি অভিশাপ দিতে পারদর্শী) নন। ‘তবু আজ এখানে দাঁড়িয়ে এই রক্ত গোধূলিতে অভিশাপ দিচ্ছি’ — তবু রক্ত গোধূলিতে দাঁড়িয়ে অভিশাপ দিচ্ছেন। ‘আমাদের বুকের ভেতর যারা ভয়ানক কৃষ্ণপক্ষ দিয়েছিলো সেঁটে’ — যারা বুকের ভেতর অন্ধকার পক্ষ সেঁটে দিয়েছে। ‘মগজের কোষে কোষে যারা পুঁতেছিল আমাদেরই আপন জনেরই লাশ দগ্ধ, রক্তাপ্লুত’ — যারা মগজের কোষে কোষে আমাদের আপন জনের দগ্ধ, রক্তে ভেজা লাশ পুঁতেছিল। ‘যারা গণহত্যা করেছে শহরে গ্রামে টিলায় নদীতে ক্ষেত ও খামারে’ — যারা সর্বত্র গণহত্যা করেছে। ‘আমি অভিশাপ দিচ্ছি নেকড়ের চেয়েও অধিক পশু সেই সব পশুদের’ — তিনি নেকড়ের চেয়েও অধিক পশু সেই সব পশুদের অভিশাপ দিচ্ছেন।
দ্বিতীয় স্তবক: সহজ মৃত্যু নয়, চিরস্থায়ী যন্ত্রণার অভিশাপ
“ফায়ারিং স্কোয়াডে ওদের সারিবদ্ধ দাঁড় করিয়ে নিমেষে ঝাঁ ঝাঁ বুলেটের বৃষ্টি / ঝরালেই সব চুকে বুকে যাবে তা আমি মানি না। / হত্যাকে উৎসব ভেবে যারা পার্কে মাঠে ক্যাম্পাসে বাজারে / বিষাক্ত গ্যাসের মতো মৃত্যুর বীভৎস গন্ধ দিয়েছে ছড়িয়ে, / আমি তো তাদের জন্য অমন সহজ মৃত্যু করি না কামনা।”
দ্বিতীয় স্তবকে কবি সহজ মৃত্যু নয়, চিরস্থায়ী যন্ত্রণার অভিশাপের কথা বলছেন। ‘ফায়ারিং স্কোয়াডে ওদের সারিবদ্ধ দাঁড় করিয়ে নিমেষে ঝাঁ ঝাঁ বুলেটের বৃষ্টি ঝরালেই সব চুকে বুকে যাবে তা আমি মানি না’ — ফায়ারিং স্কোয়াডে দাঁড় করিয়ে গুলি করে মেরে ফেললেই সব শেষ হয়ে যাবে, তিনি তা মানেন না। ‘হত্যাকে উৎসব ভেবে যারা পার্কে মাঠে ক্যাম্পাসে বাজারে বিষাক্ত গ্যাসের মতো মৃত্যুর বীভৎস গন্ধ দিয়েছে ছড়িয়ে’ — যারা হত্যাকে উৎসব ভেবে সর্বত্র মৃত্যুর গন্ধ ছড়িয়েছে। ‘আমি তো তাদের জন্য অমন সহজ মৃত্যু করি না কামনা’ — তিনি তাদের জন্য অমন সহজ মৃত্যু কামনা করেন না।
তৃতীয় স্তবক: দজ্জালদের অভিশাপ
“আমাকে করেছে বাধ্য যারা / আমার জনক জননীর রক্তে পা ডুবিয়ে দ্রুত সিঁড়ি ভেঙ্গে যেতে / ভাসতে নদীতে আর বনেবাদাড়ে শয্যা পেতে নিতে, / অভিশাপ দিচ্ছি, আমি সেইসব দজ্জালদের।”
তৃতীয় স্তবকে কবি দজ্জালদের অভিশাপের কথা বলছেন। ‘আমাকে করেছে বাধ্য যারা’ — যারা তাকে বাধ্য করেছে। ‘আমার জনক জননীর রক্তে পা ডুবিয়ে দ্রুত সিঁড়ি ভেঙ্গে যেতে’ — যারা তার পিতা-মাতার রক্তে পা ডুবিয়ে সিঁড়ি ভেঙ্গে যেতে বাধ্য করেছে। ‘ভাসতে নদীতে আর বনেবাদাড়ে শয্যা পেতে নিতে’ — নদীতে ভাসতে, বনে-বাদাড়ে শয্যা পেতে নিতে বাধ্য করেছে। ‘অভিশাপ দিচ্ছি, আমি সেইসব দজ্জালদের’ — তিনি সেইসব দজ্জালদের অভিশাপ দিচ্ছেন।
চতুর্থ স্তবক: গলিত মৃতদেহ বয়ে বেড়ানোর অভিশাপ
“অভিশাপ দিচ্ছি ওরা চিরদিন বিশীর্ণ গলায় / নিয়ত বেড়াক বয়ে গলিত নাছোড় মৃতদেহ,”
চতুর্থ স্তবকে কবি গলিত মৃতদেহ বয়ে বেড়ানোর অভিশাপ দিচ্ছেন। ‘অভিশাপ দিচ্ছি ওরা চিরদিন বিশীর্ণ গলায় / নিয়ত বেড়াক বয়ে গলিত নাছোড় মৃতদেহ’ — তারা চিরদিন বিশীর্ণ গলায় নিয়ত বয়ে বেড়াক গলিত, নাছোড় (আঁকড়ে ধরা) মৃতদেহ।
পঞ্চম স্তবক: রুটির দশ হাত দূরে থাকার অভিশাপ
“অভিশাপ দিচ্ছি প্রত্যহ দিনের শেষে ওরা / হাঁটু মুড়ে এক টুকরো শুকনো রুটি চাইবে ব্যাকুল / কিন্তু রুটি প্রসারিত থাবা থেকে রইবে দশ হাত দূরে সর্বদাই।”
পঞ্চম স্তবকে কবি রুটির অভিশাপ দিচ্ছেন। ‘অভিশাপ দিচ্ছি প্রত্যহ দিনের শেষে ওরা হাঁটু মুড়ে এক টুকরো শুকনো রুটি চাইবে ব্যাকুল’ — প্রতিদিন দিনের শেষে তারা হাঁটু মুড়ে এক টুকরো শুকনো রুটি ব্যাকুল হয়ে চাইবে। ‘কিন্তু রুটি প্রসারিত থাবা থেকে রইবে দশ হাত দূরে সর্বদাই’ — কিন্তু রুটি প্রসারিত থাবা থেকে দশ হাত দূরে থাকবে সর্বদা।
ষষ্ঠ স্তবক: পানপাত্রে রক্ত উঠার অভিশাপ
“অভিশাপ দিচ্ছি ওদের তৃষ্ণায় পানপাত্র প্রতিবার / কানায় কানায় রক্তে উঠবে ভরে, যে রক্ত বাংলায় / বইয়ে দিয়েছে ওরা হিংস্র জোয়ারের মত।”
ষষ্ঠ স্তবকে কবি পানপাত্রে রক্ত উঠার অভিশাপ দিচ্ছেন। ‘অভিশাপ দিচ্ছি ওদের তৃষ্ণায় পানপাত্র প্রতিবার / কানায় কানায় রক্তে উঠবে ভরে’ — ওদের তৃষ্ণায় পানপাত্র প্রতিবার কানায় কানায় রক্তে উঠবে ভরে। ‘যে রক্ত বাংলায় বইয়ে দিয়েছে ওরা হিংস্র জোয়ারের মত’ — যে রক্ত বাংলায় হিংস্র জোয়ারের মত বইয়ে দিয়েছে তারা।
সপ্তম স্তবক: বিষ্ঠায় ডুবে থাকার অভিশাপ
“অভিশাপ দিচ্ছি আকণ্ঠ বিষ্ঠায় ডুবে ওরা অধীর চাইবে ত্রাণ / অথচ ওদের দিকে কেউ দেবে না কখনো ছুঁড়ে একখন্ড দড়ি।”
সপ্তম স্তবকে কবি বিষ্ঠায় ডুবে থাকার অভিশাপ দিচ্ছেন। ‘অভিশাপ দিচ্ছি আকণ্ঠ বিষ্ঠায় ডুবে ওরা অধীর চাইবে ত্রাণ’ — তারা আকণ্ঠ বিষ্ঠায় ডুবে অধীর হয়ে ত্রাণ চাইবে। ‘অথচ ওদের দিকে কেউ দেবে না কখনো ছুঁড়ে একখন্ড দড়ি’ — অথচ ওদের দিকে কেউ কখনো একখণ্ড দড়ি ছুঁড়ে দেবে না।
অষ্টম স্তবক: স্নেহের কাঙ্গাল ও সন্তানের মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার অভিশাপ
“অভিশাপ দিচ্ছি স্নেহের কাঙ্গাল হয়ে ওরা / ঘুরবে ক্ষ্যাপার মতো এ পাড়া ওপাড়া, / নিজেরি সন্তান প্রখর ফিরিয়ে নেবে মুখ, পারবে না চিনতে কখনো;”
অষ্টম স্তবকে কবি স্নেহের কাঙ্গাল ও সন্তানের মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার অভিশাপ দিচ্ছেন। ‘অভিশাপ দিচ্ছি স্নেহের কাঙ্গাল হয়ে ওরা ঘুরবে ক্ষ্যাপার মতো এ পাড়া ওপাড়া’ — তারা স্নেহের কাঙ্গাল হয়ে ক্ষ্যাপার মতো এ পাড়া ওপাড়া ঘুরবে। ‘নিজেরি সন্তান প্রখর ফিরিয়ে নেবে মুখ, পারবে না চিনতে কখনো’ — নিজের সন্তান প্রখর (তীব্র, কঠোর) মুখ ফিরিয়ে নেবে, চিনতে পারবে না কখনো।
নবম স্তবক: দ্বারে দ্বারে ঘুরার ও কপাট বন্ধ হওয়ার অভিশাপ
“অভিশাপ দিচ্ছি এতোটুকু আশ্রয়ের জন্য, বিশ্রামের কাছে আত্মসমর্পণের জন্যে দ্বারে দ্বারে ঘুরবে ওরা। প্রেতায়িত সেই সব মুখের উপর / দ্রুত বন্ধ হয়ে যাবে পৃথিবীর প্রতিটি কপাট,”
নবম স্তবকে কবি দ্বারে দ্বারে ঘুরার ও কপাট বন্ধ হওয়ার অভিশাপ দিচ্ছেন। ‘অভিশাপ দিচ্ছি এতোটুকু আশ্রয়ের জন্য, বিশ্রামের কাছে আত্মসমর্পণের জন্যে দ্বারে দ্বারে ঘুরবে ওরা’ — এতটুকু আশ্রয়ের জন্য, বিশ্রামের কাছে আত্মসমর্পণের জন্য তারা দ্বারে দ্বারে ঘুরবে। ‘প্রেতায়িত সেই সব মুখের উপর দ্রুত বন্ধ হয়ে যাবে পৃথিবীর প্রতিটি কপাট’ — প্রেতায়িত (ভূতের মতো) সেই সব মুখের উপর দ্রুত বন্ধ হয়ে যাবে পৃথিবীর প্রতিটি কপাট।
দশম স্তবক: অভিশাপের পুনরাবৃত্তি
“অভিশাপ দিচ্ছি… / অভিশাপ দিচ্ছি,…./ অভিশাপ দিচ্ছি….”
দশম স্তবকে কবি অভিশাপের পুনরাবৃত্তি করছেন। ‘অভিশাপ দিচ্ছি… / অভিশাপ দিচ্ছি,…./ অভিশাপ দিচ্ছি….’ — তিনবার অভিশাপ দিচ্ছি। এটি অভিশাপের চূড়ান্ততা ও অনিবার্যতা নির্দেশ করে।
কবিতার গঠনশৈলী, ছন্দ ও শিল্পরূপ
কবিতাটি দশটি স্তবকে বিভক্ত। প্রথম স্তবকে অভিশাপের সূচনা ও গণহত্যার বর্ণনা, দ্বিতীয় স্তবকে সহজ মৃত্যু নয়, চিরস্থায়ী যন্ত্রণার অভিশাপ, তৃতীয় স্তবকে দজ্জালদের অভিশাপ, চতুর্থ স্তবকে গলিত মৃতদেহ বয়ে বেড়ানোর অভিশাপ, পঞ্চম স্তবকে রুটির অভিশাপ, ষষ্ঠ স্তবকে পানপাত্রে রক্ত উঠার অভিশাপ, সপ্তম স্তবকে বিষ্ঠায় ডুবে থাকার অভিশাপ, অষ্টম স্তবকে স্নেহের কাঙ্গাল ও সন্তানের মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার অভিশাপ, নবম স্তবকে দ্বারে দ্বারে ঘুরার ও কপাট বন্ধ হওয়ার অভিশাপ, দশম স্তবকে অভিশাপের পুনরাবৃত্তি।
ভাষা সরল, প্রাঞ্জল, কিন্তু প্রতীকাত্মক ও আবেগে পরিপূর্ণ। তিনি ব্যবহার করেছেন — ‘ওল্ড টেস্টামেন্টের প্রাচীন পাতা’, ‘দুর্বাশা’, ‘রক্ত গোধূলি’, ‘কৃষ্ণপক্ষ’, ‘মগজের কোষে কোষে’, ‘দগ্ধ, রক্তাপ্লুত লাশ’, ‘গণহত্যা’, ‘ফায়ারিং স্কোয়াড’, ‘বুলেটের বৃষ্টি’, ‘হত্যাকে উৎসব’, ‘বিষাক্ত গ্যাস’, ‘জনক জননীর রক্তে পা ডুবিয়ে’, ‘গলিত নাছোড় মৃতদেহ’, ‘শুকনো রুটি’, ‘পানপাত্রে রক্ত’, ‘আকণ্ঠ বিষ্ঠায় ডুবে’, ‘একখন্ড দড়ি’, ‘স্নেহের কাঙ্গাল’, ‘নিজের সন্তান ফিরিয়ে নেবে মুখ’, ‘প্রেতায়িত মুখ’, ‘কপাট বন্ধ’।
প্রতীক ব্যবহারে তিনি দক্ষ। ‘রক্ত গোধূলি’ — গণহত্যার সময়, সন্ধ্যার রক্তিম আভা। ‘কৃষ্ণপক্ষ’ — অন্ধকার পক্ষ, অশুভ শক্তি। ‘ফায়ারিং স্কোয়াড’ — মৃত্যুদণ্ড। ‘বুলেটের বৃষ্টি’ — গণহত্যা। ‘গলিত নাছোড় মৃতদেহ’ — অপরাধীর মৃতদেহ যা ছাড়া যায় না। ‘শুকনো রুটি’ — ক্ষুধার যন্ত্রণা। ‘পানপাত্রে রক্ত’ — তৃষ্ণার যন্ত্রণা। ‘আকণ্ঠ বিষ্ঠায় ডুবে’ — অপমানের যন্ত্রণা। ‘নিজের সন্তান ফিরিয়ে নেবে মুখ’ — পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা। ‘কপাট বন্ধ’ — আশ্রয়হীনতা।
পুনরাবৃত্তি শৈলী কবিতার সুর তৈরি করেছে। ‘অভিশাপ দিচ্ছি’ — প্রতিটি স্তবকের শুরুতে এই পুনরাবৃত্তি কবিতার মূল সুরকে জোরালো করেছে। শেষের তিনবার ‘অভিশাপ দিচ্ছি’ — অভিশাপের চূড়ান্ততা নির্দেশ করে।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য ও দার্শনিক মাত্রা
“অভিশাপ দিচ্ছি” শামসুর রাহমানের এক অসাধারণ সৃষ্টি। কবি মুক্তিযুদ্ধের সময়কার গণহত্যাকারীদের প্রতি চিরন্তন অভিশাপ দিচ্ছেন। তিনি ওল্ড টেস্টামেন্টের অভিশাপ বা দুর্বাশার অভিশাপ নিয়ে আসেননি, কিন্তু রক্ত গোধূলিতে দাঁড়িয়ে অভিশাপ দিচ্ছেন। যারা বুকের ভেতর কৃষ্ণপক্ষ সেঁটে দিয়েছে, যারা মগজের কোষে কোষে আমাদের আপন জনের দগ্ধ, রক্তাপ্লুত লাশ পুঁতেছে, যারা সর্বত্র গণহত্যা করেছে — তিনি নেকড়ের চেয়েও অধিক পশু সেই সব পশুদের অভিশাপ দিচ্ছেন।
তিনি বলেন — ফায়ারিং স্কোয়াডে দাঁড় করিয়ে গুলি করে মেরে ফেললেই সব চুকে যাবে, তিনি তা মানেন না। যারা হত্যাকে উৎসব ভেবে সর্বত্র মৃত্যুর গন্ধ ছড়িয়েছে, তিনি তাদের জন্য অমন সহজ মৃত্যু কামনা করেন না। যারা তাকে তার পিতা-মাতার রক্তে পা ডুবিয়ে সিঁড়ি ভেঙ্গে যেতে, নদীতে ভাসতে, বনে-বাদাড়ে শয্যা পেতে নিতে বাধ্য করেছে — তিনি সেইসব দজ্জালদের অভিশাপ দিচ্ছেন।
তার অভিশাপের ধাপগুলো চিরন্তন যন্ত্রণার: তারা চিরদিন বিশীর্ণ গলায় গলিত নাছোড় মৃতদেহ বয়ে বেড়াক। প্রতিদিন হাঁটু মুড়ে শুকনো রুটি চাইবে, কিন্তু রুটি দশ হাত দূরে থাকবে। পানপাত্র প্রতিবার রক্তে ভরে উঠবে। আকণ্ঠ বিষ্ঠায় ডুবে ত্রাণ চাইবে, কিন্তু কেউ দড়ি ছুঁড়ে দেবে না। স্নেহের কাঙ্গাল হয়ে ক্ষ্যাপার মতো ঘুরবে, নিজের সন্তান মুখ ফিরিয়ে নেবে, চিনতে পারবে না। আশ্রয়ের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরবে, কিন্তু পৃথিবীর প্রতিটি কপাট বন্ধ হয়ে যাবে। অভিশাপ দিচ্ছি… অভিশাপ দিচ্ছি… অভিশাপ দিচ্ছি…
এই কবিতা আমাদের শেখায় — গণহত্যাকারীদের জন্য সহজ মৃত্যু যথেষ্ট নয়। তাদের চিরস্থায়ী যন্ত্রণা, চিরস্থায়ী অভিশাপের মুখে পড়তে হবে। ক্ষুধা, তৃষ্ণা, অপমান, একাকীত্ব, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা, আশ্রয়হীনতা — সব যন্ত্রণায় তারা জর্জরিত হোক। এটি মুক্তিযুদ্ধের সময়কার গণহত্যার প্রতিশোধের এক অসাধারণ কাব্যচিত্র।
শামসুর রাহমানের কবিতায় মুক্তিযুদ্ধ, গণহত্যা ও প্রতিশোধ
শামসুর রাহমানের কবিতায় মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যা একটি পুনরাবৃত্ত বিষয়। তিনি ‘অভিশাপ দিচ্ছি’ কবিতায় গণহত্যাকারীদের প্রতি চিরন্তন অভিশাপ দিয়েছেন।
তাঁর কবিতায় ‘অভিশাপ’ একটি কেন্দ্রীয় প্রতীক — যা চিরস্থায়ী যন্ত্রণা, ন্যায়বিচারের প্রতীক।
শিক্ষামূলক গুরুত্ব ও পাঠ্যক্রমিক স্থান
বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাংলা সাহিত্যের উচ্চতর পাঠ্যক্রমে শামসুর রাহমানের ‘অভিশাপ দিচ্ছি’ কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত থাকার যোগ্য। এই কবিতাটি শিক্ষার্থীদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, গণহত্যার ভয়াবহতা, প্রতিশোধের চেতনা, এবং আধুনিক বাংলা কবিতার ধারা সম্পর্কে বুঝতে সাহায্য করে।
অভিশাপ দিচ্ছি সম্পর্কে বিস্তারিত প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: অভিশাপ দিচ্ছি কবিতাটির লেখক কে?
এই কবিতাটির লেখক শামসুর রাহমান (১৯২৯-২০০৬)। তিনি বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে স্বীকৃত। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’, ‘রৌদ্র করোটিতে’, ‘বিপুল বায়ুতে পারে’, ‘আসাদের শার্ট’, ‘বাংলা আমার বাংলা’, ‘অভিশাপ দিচ্ছি’।
প্রশ্ন ২: ‘ওল্ড টেস্টামেন্টের প্রাচীন পাতা ফুঁড়ে’ ও ‘দুর্বাশাও নই’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
ওল্ড টেস্টামেন্টে ঈশ্বরের অভিশাপের কথা আছে। দুর্বাশা মুনি অভিশাপ দিতে পারদর্শী ছিলেন। কবি বলছেন — তিনি সেই ধর্মীয় বা পৌরাণিক অভিশাপ নিয়ে আসেননি, তিনি নিজের চেতনা থেকে অভিশাপ দিচ্ছেন।
প্রশ্ন ৩: ‘আমাদের বুকের ভেতর যারা ভয়ানক কৃষ্ণপক্ষ দিয়েছিলো সেঁটে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘কৃষ্ণপক্ষ’ — অন্ধকার পক্ষ, অশুভ শক্তি। তারা বুকের ভেতর অন্ধকার পক্ষ সেঁটে দিয়েছে — অর্থাৎ ভয়, আতঙ্ক, যন্ত্রণা সৃষ্টি করেছে।
প্রশ্ন ৪: ‘ফায়ারিং স্কোয়াডে ওদের সারিবদ্ধ দাঁড় করিয়ে নিমেষে ঝাঁ ঝাঁ বুলেটের বৃষ্টি / ঝরালেই সব চুকে বুকে যাবে তা আমি মানি না’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
কবি বলছেন — ফায়ারিং স্কোয়াডে গুলি করে মেরে ফেললেই সব শেষ হয়ে যাবে, তিনি তা মানেন না। অর্থাৎ সহজ মৃত্যু যথেষ্ট নয়, চিরস্থায়ী যন্ত্রণা প্রয়োজন।
প্রশ্ন ৫: ‘আমি তো তাদের জন্য অমন সহজ মৃত্যু করি না কামনা’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
যারা হত্যাকে উৎসব ভেবে সর্বত্র মৃত্যুর গন্ধ ছড়িয়েছে, তাদের জন্য তিনি সহজ মৃত্যু কামনা করেন না। বরং চিরস্থায়ী যন্ত্রণার অভিশাপ দেন।
প্রশ্ন ৬: ‘অভিশাপ দিচ্ছি ওরা চিরদিন বিশীর্ণ গলায় / নিয়ত বেড়াক বয়ে গলিত নাছোড় মৃতদেহ’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
তারা চিরদিন বিশীর্ণ গলায় গলিত, নাছোড় (আঁকড়ে ধরা) মৃতদেহ বয়ে বেড়াক। এটি চিরস্থায়ী যন্ত্রণার অভিশাপ।
প্রশ্ন ৭: ‘অভিশাপ দিচ্ছি প্রত্যহ দিনের শেষে ওরা / হাঁটু মুড়ে এক টুকরো শুকনো রুটি চাইবে ব্যাকুল / কিন্তু রুটি প্রসারিত থাবা থেকে রইবে দশ হাত দূরে সর্বদাই’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
তারা ক্ষুধায় ব্যাকুল হয়ে রুটি চাইবে, কিন্তু রুটি তাদের নাগালের বাইরে থাকবে। এটি ক্ষুধার চিরস্থায়ী যন্ত্রণার অভিশাপ।
প্রশ্ন ৮: ‘অভিশাপ দিচ্ছি ওদের তৃষ্ণায় পানপাত্র প্রতিবার / কানায় কানায় রক্তে উঠবে ভরে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
তাদের তৃষ্ণায় পানপাত্র প্রতিবার রক্তে ভরে উঠবে — যে রক্ত তারা বাংলায় বইয়ে দিয়েছে। এটি তৃষ্ণার চিরস্থায়ী যন্ত্রণার অভিশাপ।
প্রশ্ন ৯: ‘নিজেরি সন্তান প্রখর ফিরিয়ে নেবে মুখ, পারবে না চিনতে কখনো’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
নিজের সন্তান মুখ ফিরিয়ে নেবে, তাদের চিনতে পারবে না। এটি পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতার চিরস্থায়ী যন্ত্রণার অভিশাপ।
প্রশ্ন ১০: কবিতার মূল শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা কী?
কবিতাটি আমাদের শেখায় — গণহত্যাকারীদের জন্য সহজ মৃত্যু যথেষ্ট নয়। তাদের চিরস্থায়ী যন্ত্রণা, চিরস্থায়ী অভিশাপের মুখে পড়তে হবে। ক্ষুধা, তৃষ্ণা, অপমান, একাকীত্ব, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা, আশ্রয়হীনতা — সব যন্ত্রণায় তারা জর্জরিত হোক। এটি মুক্তিযুদ্ধের সময়কার গণহত্যার প্রতিশোধের এক অসাধারণ কাব্যচিত্র।
ট্যাগস: অভিশাপ দিচ্ছি, শামসুর রাহমান, শামসুর রাহমানের কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, মুক্তিযুদ্ধের কবিতা, গণহত্যার কবিতা, অভিশাপের কবিতা, ১৯৭১-এর কবিতা, বাংলা কবিতা বিশ্লেষণ
© Kobitarkhata.com – কবি: শামসুর রাহমান | কবিতার প্রথম লাইন: “না আমি আসিনি ওল্ড টেস্টামেন্টের প্রাচীন পাতা ফুঁড়ে, / দুর্বাশাও নই, তবু আজ এখানে দাঁড়িয়ে এই রক্ত গোধূলিতে অভিশাপ দিচ্ছি।” | গণহত্যা ও অভিশাপের কবিতা বিশ্লেষণ | আধুনিক বাংলা কবিতার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন






