এসো।
ছোঁও।
সম্পূর্ণ পাথর হয়ে গেছি কিনা, দ্যাখো।
পাথরের বুক থেকে মাংস নাও,
পাঁজরের রিডে রিডে চাপ দাও দশটি আঙুলে,
আমাকে বাজাও তুমি
বিঠোফেন-বালিকার হাত,
বলো—
আমি প্রত্ন নই,
নই অন্ধ, জমাট খনিজ,
বলো—সব শেষ নয়,
এখনও আমার কিছু সম্ভাবনা আছে।
টিলার ওপরে হা হা সূর্যাস্ত দেখার সাধ
মেটেনি কুসুম।
ভুল চাওয়া নিয়ে গেছে ভুল সিন্ধু পারে।
সেখানে মুখোশ, পরচুলো
বালির সাদায় ওড়ে দূরতম হাসির মতন,
গাঢ় শোচনার রঙে সন্ধ্যা নামে,
ডেকে ওঠে হাড়গিলে, অসুখী শকুন—
টিলার ওপরে হা হা সূর্যাস্ত দেখার সাধ
মেটেনি কুসুম।
দ্যাখো,
কতখানি দীন হয়ে গেছি আশায় আশায়
কত বেশি পেতে চেয়ে
নিজেকে ভেঙেছি অন্ধ, ভ্রুক্ষেপবিহীন,
ছেঁড়া শিমুলের আঁশে উড়িয়েছি সর্বস্ব আমার,
‘দাও’ ‘দাও’ হাহাকারে
কখন উঠেছে জেগে বৈজুনাথ—প্রধান চণ্ডাল;
সুনীলে পাতালে
এখন যে দিকে চাও
ব্যথিত প্রশ্নের হাড়, করোটি, কংকাল !
মকরবাহিনী-জলে
পোশাক ভাসিয়ে আজ এসে দাঁড়িয়েছি—
স্পর্শ করো,
অগ্নিতে সঁপেছি স্বাহা, অহংকার,
রাখো, ভাঙো মারো,
তুলনামূলক প্রেমে সারারাত জেগে থাক
আমাদের কাঠ ও করাত,
আমাকে বাজাও তুমি
বিঠোফেন-বালিকার হাত।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। অমিতাভ দাসগুপ্তের কবিতা।
এসো স্পর্শ কর – অমিতাভ দাশগুপ্ত | পাথর, মাংস ও বাদ্যযন্ত্রের কবিতা
এসো স্পর্শ কর: কেন এই কবিতা স্পর্শ দিয়ে শুরু হয়?
অমিতাভ দাশগুপ্তের এসো স্পর্শ কর কবিতাটি বাংলা কবিতায় বিরল — কারণ এটি স্পর্শের অনুমতি চেয়ে শুরু হয়। “এসো। ছোঁও। সম্পূর্ণ পাথর হয়ে গেছি কিনা, দ্যাখো।” এখানে স্পর্শ কোনো রোমান্টিক অঙ্গভঙ্গি নয় — স্পর্শ হলো পরীক্ষা, স্পর্শ হলো প্রমাণ, স্পর্শ হলো জীবন-মৃত্যুর নির্ণয়। কবি নিজেকে পাথর বলে সন্দেহ করছেন, এবং সেই সন্দেহ দূর করতে চাইছেন স্পর্শের মাধ্যমে। এই কবিতার পুরো কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে একটি দ্বান্দ্বিকতার ওপর — পাথর বনাম মাংস।
পাথর ও মাংস: কবিতার কেন্দ্রীয় দ্বন্দ্ব
“পাথরের বুক থেকে মাংস নাও, পাঁজরের রিডে রিডে চাপ দাও দশটি আঙুলে।” পাথর ও মাংস দুটি বিপরীত সত্তা — পাথর মানে অনড়তা, মৃত্যু, অনুভূতিহীনতা; মাংস মানে জীবন, উষ্ণতা, নমনীয়তা। কবি বলছেন — যদি আমার ভেতরে মাংস থাকে, তবে সেটা বের করো; যদি পাথর হই, তবে আমাকে ভেঙে ফেলো। এটি এক চরম আত্মসমর্পণ — যেখানে কবি স্পর্শকারীর হাতে নিজের অস্তিত্বের নির্ণয়ের ভার তুলে দিচ্ছেন।
পাঁজরের রিড ও দশটি আঙুল: বাদ্যযন্ত্র হিসেবে শরীর
“পাঁজরের রিডে রিডে চাপ দাও দশটি আঙুলে, আমাকে বাজাও তুমি বিঠোফেন-বালিকার হাত।” রিড মানে বাদ্যযন্ত্রের একটি অংশ, যা বাতাস দিয়ে বাজানো হয় — যেমন হারমোনিয়াম বা বাঁশির ভেতরের রিড। পাঁজরকে রিড বানিয়ে, আঙুলকে বাদকের হাত বানিয়ে, কবি নিজের শরীরকে বাদ্যযন্ত্রে রূপান্তরিত করেছেন। এরপর আসে ‘বিঠোফেন-বালিকা’ — বিঠোফেনের সঙ্গীত, যা কানে শোনা যায়, কিন্তু বিঠোফেন নিজে বধির ছিলেন। অর্থাৎ যে সুর সৃষ্টি করে, সে নিজে শুনতে পায় না। কবিও সেই সুর — যাকে বাজাতে হয়, কিন্তু কে বাজাবে সেটা সে জানে না।
প্রত্ন নই, অন্ধ নই: আত্মপরিচয়ের ঘোষণা
“বলো—আমি প্রত্ন নই, নই অন্ধ, জমাট খনিজ, বলো—সব শেষ নয়, এখনও আমার কিছু সম্ভাবনা আছে।” প্রত্ন মানে পুরাতন, অতীতের জিনিস। খনিজ মানে খনি থেকে তোলা পাথর — যা জড়, যা প্রাণহীন। কবি এই দুই পরিচয় প্রত্যাখ্যান করছেন — তিনি প্রত্ন নন, তিনি খনিজ নন। তিনি জীবিত, তার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো — এই পরিচয় সে নিজে দিচ্ছেন না, অন্যের কাছে চাইছেন। অর্থাৎ আত্মপরিচয় এখানে একাকী নির্ণয় করা যায় না, সাক্ষীর প্রয়োজন।
কুসুম, সূর্যাস্ত ও হাড়গিলে: ভ্রম ও শোচনার চিত্র
“টিলার ওপরে হা হা সূর্যাস্ত দেখার সাধ মেটেনি কুসুম।” কুসুম — একটি নাম, সম্ভবত প্রিয় নারী। তার সাধ মেটেনি — সে সূর্যাস্ত দেখতে পারেনি। “ভুল চাওয়া নিয়ে গেছে ভুল সিন্ধু পারে। সেখানে মুখোশ, পরচুলো, বালির সাদায় ওড়ে দূরতম হাসির মতন।” এখানে কবি একটি ভ্রমের জগৎ তৈরি করছেন — মুখোশ, পরচুলো, বালির সাদা — সবই কৃত্রিম, সবই ভান। এই ভানের জগতে গাঢ় শোচনার রঙে সন্ধ্যা নামে, ডেকে ওঠে হাড়গিলে ও অসুখী শকুন। হাড়গিলে ও শকুন — মৃত্যুর পাখি, শোচনার প্রতীক। প্রেমের সাধ পূরণ না হয়ে সেই সাধ মৃত্যুর জগতে গিয়ে পৌঁছায়।
বৈজুনাথ-প্রধান চণ্ডাল: প্রার্থনার নিচে লুকানো শ্রেণিদ্বন্দ্ব
“‘দাও’ ‘দাও’ হাহাকারে কখন উঠেছে জেগে বৈজুনাথ—প্রধান চণ্ডাল।” বৈজুনাথ একটি শিবলিঙ্গ, প্রধান চণ্ডাল এক নিম্নবর্ণের মানুষ — দুইয়ের মিলনকে কবি এখানে প্রার্থনার ভেতর দিয়ে দেখছেন। ‘দাও দাও’ হাহাকার — চাওয়ার হাহাকার — যার ফলে প্রার্থনা আর শ্রেণিসংগ্রাম একই হয়ে যায়। “সুনীলে পাতালে এখন যে দিকে চাও, ব্যথিত প্রশ্নের হাড়, করোটি, কংকাল!” — চারদিকে শুধু কঙ্কাল, শুধু মৃত্যু, শুধু প্রশ্ন। এই স্তবকে কবি প্রেমের কবিতাকে সামাজিক কবিতায় রূপান্তরিত করেন।
মকরবাহিনী-জলে পোশাক ভাসিয়ে: চূড়ান্ত আত্মসমর্পণ
“মকরবাহিনী-জলে পোশাক ভাসিয়ে আজ এসে দাঁড়িয়েছি—স্পর্শ করো, অগ্নিতে সঁপেছি স্বাহা, অহংকার।” মকরবাহিনী — মকরবাহন, অর্থাৎ গঙ্গা। গঙ্গার জলে পোশাক ভাসিয়ে দাঁড়ানো মানে সম্পূর্ণ裸露 হওয়া, সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ। ‘স্বাহা’ মানে অগ্নিতে আহুতি দেওয়ার মন্ত্র — অর্থাৎ অহংকারকে অগ্নিতে সঁপে দেওয়া হয়েছে। এখন আর কোনো গর্ব নেই, শুধু স্পর্শের অপেক্ষা। শেষে আবার ফিরে আসে সেই বাদ্যযন্ত্রের রূপক — “রাখো, ভাঙো মারো, তুলনামূলক প্রেমে সারারাত জেগে থাক আমাদের কাঠ ও করাত, আমাকে বাজাও তুমি বিঠোফেন-বালিকার হাত।”
কাঠ ও করাত: প্রেমের হিংস্র রূপ
“তুলনামূলক প্রেমে সারারাত জেগে থাক আমাদের কাঠ ও করাত।” কাঠ ও করাত — যন্ত্রণা ও যন্ত্র। করাত কাঠকে কাটে, কাঠ করাতকে ঘষে — দুজনেই দুজনকে ক্ষয় করে। প্রেম এখানে কোমল নয় — প্রেম হিংস্র, প্রেম ঘর্ষণ, প্রেম সারারাত জেগে থাকা। ‘তুলনামূলক প্রেম’ — অর্থাৎ যে প্রেম তুলনা করে, যে প্রেম একে অপরকে মাপে — সেই প্রেমে কাঠ ও করাতের সম্পর্ক।
ট্যাগস: এসো স্পর্শ কর, অমিতাভ দাশগুপ্ত, পাথর ও মাংসের কবিতা, বিঠোফেন-বালিকা, গঙ্গা ও অহংকার, আধুনিক বাংলা কবিতা, স্পর্শের কবিতা
© Kobitarkhata.com – কবি: অমিতাভ দাশগুপ্ত | “এসো। ছোঁও। সম্পূর্ণ পাথর হয়ে গেছি কিনা, দ্যাখো।” | স্পর্শ, মাংস, বাদ্যযন্ত্র ও আত্মসমর্পণের অনবদ্য কাব্য